
অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত: একটি নন-অ্যাকাডেমিক, ব্যক্তিগত বক্তব্য
সঞ্চিতা বসু
আবহমান পত্রিকার সম্পাদক মশাই যতক্ষণে ফোন করেছেন লেখার জন্য ততক্ষণে আমি কলকাতার চৌহদ্দি ছাড়িয়েছি। এদিকে আজকেই লেখা চাই, কয়েক ঘন্টা সময় বাকি! অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তকে নিয়ে কয়েক হাজার বছর সময় পেলেও অ্যাকাডেমিক বা নিদেন নন-অ্যাকাডেমিক আলোচনার স্পর্ধা বা ইচ্ছে আমার ছিল না। শুধু ভদ্রলোক এমন গলায় আচ্ছাটা বললেন যে রাজি হতে হল। এদিকে ভাঁড়ে মা ভবানী। সুতরাং একেবারে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাই শুধু লিখছি, সভয়ে।
সবে যখন বি.এ. ক্লাসে ভর্তি হয়েছি, বাছুরের শিং গজানোর মতো আধুনিক কবিতা পড়া, কবিতার মানে, ছন্দ, ইমেজারি বোঝার চেষ্টায় এদিক ওদিক গোঁত্তা মারছি, আমাদের মাস্টারমশাই জীবনানন্দ দাশের কবিতা বোঝার জন্য বলেছিলেন, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তর ‘জীবনানন্দ’ বইটি পড়তে। তার আগে বেশ খানিক শঙ্খ ঘোষ আর অল্পস্বল্প অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তর কবিতা পড়ার চেষ্টা করেছি। এ বই পড়তে গিয়ে কী হয়েছিল সে এক মজার গল্প, কিন্তু আমাদের সামনে যেন একটা করে নতুন জানলা খুলে দিচ্ছিলেন এঁরা, শুধু কবিতা নয় প্রবন্ধেও৷ অলোকরঞ্জনের গদ্যভাষায় হাবুডুবু খেতে খেতে আমরা বুঝছিলাম প্রবন্ধের গদ্যভাষার প্রয়োগও কত আলাদা হতে পারে। সেই আনকোরা বুদ্ধিতে এটুকু বুঝেছিলাম খুব বন্ধু হলেও শঙ্খ ও অলোকরঞ্জন কেউ কারো দ্বারা কবিতা বা গদ্য লেখার ক্ষেত্রে প্রভাবিত নন। তাঁদের কাব্যবোধ গদ্যভাষা থেকে বক্তব্য সবই মৌলিক ও স্বতন্ত্র। অনেক সময় যেন পিঠোপিঠি বয়ানে বাজিমাত করে দেন দুজনেই! শঙ্খ ঘোষের ‘আত্মঘাত’ কবিতা যেখানে শেষ হয় –
“আমার পৃথিবী নয় এইসব ছাতিম শিরীষ / সব ফেলে যাব বলে প্রস্তুত হয়েছি, শুধু জেনো / আমার বিশ্বাস আজও কিছু বেঁচে আছে, তাই হব / পঁচিশে বৈশাখ কিংবা বাইশে শ্রাবণে আত্মঘাতী।”
যেন এখান থেকেই শুরু হয় অলোকরঞ্জনের অনন্য বয়ান ‘দৃশ্য-কাব্য’ কবিতায়। কবিতার দ্বিতীয় স্তবক শুরুই হয় যেন এর উত্তরে -“আত্মহত্যা করতে গিয়েও বারবার ফিরে আসা / নিজের বাড়িতে, নিজের বাড়ির ছাতে…” এবং যথারীতি আসে সেই বিখ্যাত, জনপ্রিয় পংক্তিগুলি ও রবীন্দ্রনাথের প্রসঙ্গও যা বহু বহু বার ছাত্রবয়সে আওড়াতাম আমরা, সোচ্চারে বা মনে মনে – “রবীন্দ্রনাথ মৌলি পাহাড়, জলপ্রপাত আমি; / দুঃখ তো আর বলি না ইনিয়ে-বিনিয়ে, / কবিতায় বাঁচে প্রজ্ঞাশাসিত অসুস্থ পাগলামি, / রোদ্দুরে যাই রোদ্দুরে যাই মিলিয়ে।”
এই মধ্যবয়সে ভাষা, ছন্দ, অলংকার বা ইমেজারির ক্লাসে বই না দেখেও মাঝে মাঝেই ঢুকে পড়ে অলোকরঞ্জনের কবিতার লাইন। শব্দ প্রয়োগ, পদের ব্যবহার, যতির প্রয়োগ, বাক্যবিন্যাস, সংসক্তি, বিষয় ও ব্যঞ্জনা, ছন্দ, অন্ত্যমিল তাঁর কবিতায় বোঝানো কতটা যায় জানি না, কিন্তু অলোকরঞ্জনের নিতান্ত নিজস্ব ভাষা, তাঁর বয়ানেই হাজির করা যায় বটে। এখনকার বি.এ. ক্লাসের উৎসুক মুখেরা আমাদের মতো রোদ্দুরে মিলোয় কিনা জানি না, তবে পাঁচ মাত্রা ও ছ মাত্রার ছন্দের কুয়াশায় আজও ঘুরপাক খায় তারা, অলোকরঞ্জনের পুব হাওয়া আমাদের ক্লাসেও একটু তর্কের ঝড় তোলে বইকি। সব থেকে বেশিবার অলোকরঞ্জনের লেখা যে লাইনটি আমাদের ক্লাসে ঘুরে ফিরে আসে, সেটি “পাখিটির মাতৃভাষা চেয়ে থাকা”। পাতাহীন শিউলিডালের একলা একা পাখি বাংলা ভাষার এক আলাদা আদল গড়ে দেয় তার মাতৃভাষায়।
বয়স ও অভিজ্ঞতা মানুষকে যেমন যেমন বদলে দেয়, মনের মধ্যে কবিতার লাইন, ঢেউ অন্য আবর্ত তোলে৷ ইদানিং পড়তে গিয়ে একটি কবিতায় চোখ আটকে যায় কেবল, সঙ্গে অঢেল স্মৃতিও: “আপাতত এই ক্ষুধিত পথের ক্ষুরধার চক্রান্ত / কামক্রোধমোহমোহান্তব্যবসায়ী / পার হয়ে যাই, মা কিছু জানে না, মা আজ আমার শিশু।”

