সঙ্গোপনে অলোকরঞ্জনা <br /> মুহূর্তের পুঁথিপট ১  <br />  জিৎ মুখোপাধ্যায়

সঙ্গোপনে অলোকরঞ্জনা
মুহূর্তের পুঁথিপট ১
জিৎ মুখোপাধ্যায়

তখন  ডিসেম্বর। বড়দিনের আগের দিন। অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তর ভাষায় ‘যিশুদিবসের প্রাক্‌লগ্ন’। ততদিনের তিনি আমার কাছে অলোকদা হয়ে উঠেছেন। আমি গেছি একটু রাতের দিকে। উনি দুপুরে ফোন করে বললেন: ‘তুমি আজ রাতে আসছ তো?’ তোমার জন্য সামান্য কয়েকটি পুঁথি আছে! ‘হ্যাঁ, যাব তো অলোকদা। কিন্তু পুঁথি…’ ‘আমার ফোনে একটা দূরসঞ্চারী আহ্বান বাজছে… ভারতবর্ষে এলে কথা হবে’…। [অলোকদা মাঝেমধ্যেই নিজের বাড়িকে ভারতবর্ষ ভাবতে ভালবাসতেন।] এই বলে অলোকদা ফোন রেখে দিয়েছিলেন। আর আমিও হাজির হয়েছি সন্ধে পেরিয়ে রাতে। বসে আছি। অলোকদার লাইব্রেরিতে আমার প্রয়োজনীয় কিছু বই খুঁজছি। প্রায় প্রতিদিন আমার তাই কাজ। আমার থলেতে রয়েছে অলোকদার দুটো বইও। সই করিয়ে নেব। পাঞ্জাবির উপরে হালকা সাদা রঙের একটা শাল জড়িয়ে বসার ঘরে এলেন অলোকদা। এসে বসেই আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন একটা লালরঙা ফাইল। বেশ ভারী। ‘এতে কী আছে অলোকদা?’ ‘তুমি একদিন আমার পুরনো লেখার পাণ্ডুলিপি চাইলে, এতে সেইসব পুঁথিপত্র আছে।’ আমার মনে পড়ল: বায়না করে অলোকদার পাণ্ডুলিপি চেয়েছিলাম। কবিদের পাণ্ডুলিপি, পুরনো পত্রিকা, বইয়ের প্রথম সংস্করণ সংগ্রহ করা ততদিনের আমার নেশা হয়ে উঠেছে। আর উনি যেহেতু নিজে হাতেই লিখতেন সমস্ত লেখা, এবং পত্র-পত্রিকায় লেখা দেওয়ার সময় প্রায়শই মূল লেখাটির ফটোকপি (প্রতিলিপি) দিতেন, বা জার্মানি থেকে ফ্যাক্সে লেখা পাঠাতেন, তাই সেইসব পাণ্ডুলিপি থেকেই যেত। ফাইল খুলেই আমার মাথা ঘুরে উঠল। অজস্র লেখাপত্র, ডায়েরির খণ্ডাংশ, অলোকদার মা নীহারিকা দাশগুপ্তকে লেখা বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের চিঠি, কোনও কোনও কবিতা-বইয়ের সম্পূর্ণ পাণ্ডুলিপি, অজস্র গদ্যপদ্যের বইয়ের ভূমিকা, নিজের হাতে করা শ্রেষ্ঠ কবিতার সূচিপত্র, বিভিন্ন পুরনো নাটকের ক্যাটালগ… আর কত কী! আমার হাত কাঁপছে! এত মূল্যবান সম্পদ দিলেন আমায় অলোকদা! ‘আরও দুটো এইরকম ফাইল আছে, তুমি কি আজ নিয়ে যেতে পারবে?’ অলোকদার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ভাষা আমি হারিয়েছি সেই মুহূর্তে। তাও ভেঙে ভেঙে বললাম: ‘এই সব পুঁথিপত্র আমার?’ ‘হ্যাঁ তোমার, কোনওদিন যদি তোমার দরকারি মনে হয়…’। সেই মুহূর্তে বেজে উঠল অলোকদার ফোন, উনি ততক্ষণে কালো রঙের কডলেসটা নিয়ে পাশের ঘরে চলে যাচ্ছেন কথা বলতে বলতে… যাওয়ার সময় বলছেন, আমি যেন সব গুছিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় ঘরে গিয়ে একবার দেখা করে যাই। ফাইল খুলে প্রথম যে পাণ্ডুলিপি চোখে পড়েছিল, আজ বলি তার কথা। সেখানে রয়েছে ‘প্রসঙ্গত’ শিরোনামে একটা ভূমিকা-অংশ। লেখার তারিখ: কলকাতা/হির্শবার্গ, ৩০ শে জুন, ২০০১। কোন বইয়ের ভূমিকা? ‘ভারত বুক এজেন্সি’ থেকে প্রকাশিত অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের গদ্যের বই ‘যা হয়েছে যা হতেছে এখুনি যা হবে’। প্রকাশক: মোহিত বসু। বইটি প্রকাশিত হয়েছিল ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। ১৯৭৬ সালে ‘আশা প্রকাশনী’ থেকে বেরনো ‘স্থির বিষয়ের দিকে’ বইটি দীর্ঘদিন পাওয়া যায় না। ভূমিকা শুরু হয়েছে সেই কথা দিয়েই: ‘অনেক দিন ধরেই বন্ধু দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় অধুনালুপ্ত ‘স্থির বিষয়ের দিকে’ বইটি পুনর্বার প্রকাশ করার জন্য অগ্রহ জ্ঞাপন করছিলেন। সেই বইখানি উল্টে-পল্টে দেখলাম, নতুন প্রকল্পের চাহিদায় কিছু যোগবিয়োগ না করলে চলবে না। এই মর্মে দেবীপ্রসাদের সঙ্গে দীর্ঘ বিনিময়ের ফলেই তৈরি হল এই সংকলন। পুরনো কোন-কোন রচনা এখানেও রয়ে গেল, সেই সঙ্গে সাম্প্রতিক বেশ কয়েকটি হল অনুস্যূত।’ এরপরে পুরো ভূমিকাটি পড়লে মনে হবে তার কয়েক টুকরো যেন আধুনিক কবিতা/সাহিত্য বিষয়ে কোন ইশতেহার। কীরকম? এক: ‘পিছনের দিকে এক-একবার না তাকিয়ে হাঁটতে গেলে পাঠক বা লেখককে… হুঁচট খেতেই হয়…’। দুই: ‘পিছুটান আর সামনে এগিয়ে-যাওয়া এবং চলতে-চলতে ব্যাপ্ত পরিপার্শ্বের দিকে অভিমুখিতার টানাপোড়েনে হঠাৎ কখন জন্ম নেয় একটি কবিতা’। তিন: ‘শেষ পর্যন্ত নিশ্চয়ই প্রক্রিয়াকে ছাপিয়ে যায় কবিতার স্বতঃসিদ্ধি।’ চার: ‘শিল্পের হয়ে-ওঠার এক-একটি গহন গ্রন্থি ছুঁতে-চাওয়াও নশ্বরের সংগত স্পর্ধার লীলাপরিসর বলে বিবেচিত হতে পারে।’ কেন উল্লেখ করছি ভূমিকার এইসব অংশ? আমরা আজ কীভাবে লিখি গ্রন্থের ভূমিকা? এইভাবে কি বারুদ ভরে দিই? অগ্নি-সংযোগের সচেতন আশায়? এই কথাই বলার, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের বিভিন্ন গদ্য-সন্দর্ভের ভেতর অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে এইরকম বহু বাচনভঙ্গি [Enunciation], যা আজকের দিনের পাঠক ছুঁয়েই দেখেননি হয়তো। সেদিন এই ভূমিকার উল্টোদিকের পাতায় পেয়েছিলাম ‘পাখি, তুমি’ শীর্ষক একটি কবিতাও:

পাখি, তুমি এখনও না ঘুমিয়েই আকাশের মাঠে
স্বযাচিত জেগে আছ! অন্যান্য পাখিরা
আমিষাশী, ঘাসের ভিতরে দিব্বি খুঁটে খুঁটে খায়
পতঙ্গ, অথচ তুমি না খেয়ে না দেয়ে
কোটরে নিবদ্ধ চক্ষু নাভিপিণ্ড স্থগিত যকৃতে—
জেগে আছ, সে কি আমি নিশ্চিত ঘুমোতে পারি বলে?

বন্ধুরা পগার পার হয়ে গেছে, তোমার কী দায়!

কল্পনা করি: এই ভূমিকার উল্টোদিকের পৃষ্ঠায় এই কবিতাই কি ওই অমোঘ বাচনকেই আরও প্রকাশিত করে দিল না: ‘‘পিছুটান আর সামনে এগিয়ে-যাওয়া এবং চলতে-চলতে ব্যাপ্ত পরিপার্শ্বের দিকে অভিমুখিতার টানাপোড়েনে হঠাৎ কখন জন্ম নেয় একটি কবিতা’। আর যে-কথা না বললেই নয়, সেদিন আমার থলেতে কাকতালীয়ভাবে ছিল যে-দুটি বই, তার একটি: ‘যা হয়েছে যা হতেছে এখুনি যা হবে’— এ যেন কালচক্রের জমজমাট মহড়া।

….

 

 

CATEGORIES
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)
demon slauer rule 34 lena the plug leak amateurtrheesome.com cumming in milfs mouth mujer haciendo el amor a un hombre, belle delphine of leaked emma watson in porn xxxamat.com big booty in public hidden cam gay sex, sit on face porn g a y f o r i t forcedpornanal.com please screw my wife female celebrity sex tapes