
ইলোরা ভট্টাচাৰ্য-র কবিতাগুচ্ছ
১
অসুখের দিনগুলি
.
দুঃখের কাব্য ছেনে
ভাত, রুটি, স্তন্যের আয়ু
বেশি হলে
ভাত গেঁজিয়ে মদ
শিউলি গাছের নীচে
বেহুদ্দ গড়াগড়ি
এইটুকুই
.
কাকে বলি?
কে বোঝে?
অন্ধকারে কতটা ভেদ ভাব
অগ্নিস্নান
যে বোঝে সেও তো
অন্ধকারে
একা
.
ইজি চেয়ারে শুয়ে
উজ্জ্বল চোখ দুটি
জানালায় মেলে দিয়েছে সে
মেঘেদের তালিমারা আকাশ
দেখে
রাস্তায়
জন্মদিনের গান
হারিয়ে যাচ্ছে
একে একে
.
কেউ কি দাঁড়িয়ে আছে
বন্ধ দরজার ওপারে?
অপেক্ষার কোনো দিকে
কখনো ছিলাম
আশঙ্কায় মাধবীলতা
থির থির করে কাঁপে
.
পশ্চিমের জানালা দিয়ে
হেলানো সূর্য আসে
ওর দিকে তাকিয়ে গুনতি ভুল হয়ে যায়
এক দুই তিন… আবার গুনি
শুরু থেকে শেষ হয়না
২
‘দৃশ্যমান’ কবিতা গুচ্ছ
.
রূহি গলে যায়
জ্যোৎস্নার জলে
.
টুকটুকে আপেলের পাশে
উদ্যত ছুরি দেখে তুমি
অশালীন ভাবো, আমি দেখি
খিদে ধুয়ে কেটে রাখা প্লেটে।
.
মৃত্যুর অপেক্ষা
শিখিয়েছে
জীবনের রূপকথা।
.
বর্ষা প্ৰিয় ঋতু, অশ্রু নয়
শব্দে বোনো আলো, রাত্রি নয়।
.
আহত পিঞ্জরে
পালক ঝরে পড়ে।
৩
যাওয়া
হেঁটে যাচ্ছি। বিকেলের নরম গোলাপি রাস্তা ধরে, একে একে জ্বলে ওঠা চূড়ান্ত স্মার্ট স্ট্রিট লাইটের উল্কা নাচন দেখতে দেখতে ক্রমশ শহর, উড়াল, সমুদ্র, জাহাজের মাস্তুল ছাড়িয়ে, উঠোন,বন্যার ফেনা পায়ে মেখে হেঁটে যাচ্ছি। পুকুর, ডোবা জলে বুনো হাঁস, কাদায় ঘুমন্ত ব্যাঙের স্মৃতি, কাকের মাংসপোড়া আদিবাসী হাটের আটচালা , লম্ফ, পিদিম, আফিমের প্রাজ্ঞ ঝিম পাশ কাটিয়ে , লাফিয়ে উঠে আবার হেঁটে যাচ্ছি বাদা বনের কাঁটা বিঁধে, ধুলোর মলম কুবো পাখির নিঃসীম ডাকের কাছে থেমে, জাম অন্ধকার গায়ে মেখে, খাঁড়ির জলে মাছের খরা-বাঁধা ডিঙিয়ে শ্মশানের নিষিদ্ধ গন্ধ গিলে সুর অসুর ধূমাবতী পার হয়ে বুড়ো অশ্বত্থ কে বানের জলে ভাসিয়ে হেঁটে যাচ্ছি মেঘময় ডুব সাঁতারে যেখানে ঘোড়া গুলি, বিশুদ্ধ সফেদ ঘোড়াগুলি নীলাভ প্রান্তরের ঘাস খাচ্ছে স্থির চিহ্ন ছাড়িয়ে আদিম চাঁদের নীচে। আমার চারিদিকে অসংখ্য ময়ুরপুচ্ছ ছড়িয়ে আছে। বাঁশি বাজে, মৃদঙ্গ বাজে, কত খইফুল..
৪
চিঠি
একটানা অনর্গল বৃষ্টি চলেছে এদিকে। কুবো পাখি বারান্দার ঝুলে বসে বিষন্নতার সুর ভাঁজছে। লেখার খাতা ভিজে গেছে লবণ জলে।
এইসবই আর কি বলি তোমায় সকাল বেলায় এখনো কোনো গল্প ঘটে নি। টানা চার ঘন্টা ঘুম পাহারা দিয়ে রাত্রি আপাতত বিদায় নিয়েছে। শামুক-গতি নিয়ে কী করে একটা জীবন পার হবে ভাবি। দিনের চামড়ায় বেশ কদিন ধরে ছাই মেখে কেমন চেকনাই খুলেছে। নাটকের পোশাকের জন্য এই ঢের। ফুটপাথের মুখোশের দোকান খোলেনি এখনো। পুড়ে যাওয়া পত্রিকা অফিস থেকে এখনো ধোঁয়া বেরোচ্ছে গত শতাব্দীর। তোমার সঙ্গে কথা বলতে বলতেই বেশ একটা চলনসই গোছের স্তব্ধতা খাটের বাজু ধরে দাঁড়িয়েছে। শিলুদের ঘরে নাকি দুটো দাঁড়াস সাপ জড়াজড়ি করে খেলছিল গত দুপুরে। পুরোনো কাসুন্দির টোকো গন্ধ বেরোচ্ছে ছিপি খোলা ভ্যাপসা বোতল থেকে। চিঠি লিখতে বলব না তোমায়। নতুন কথায় ভয় করে।
ভালো থেকো।
পুনশ্চ : এমন কোনো আশ্চর্য অনুভূতি নেই যা তোমাকে দেওয়া যায়
৫
নিভৃতে
.আলগা কথার মতো ব্যথার রেশমি সুতো জড়িয়ে রেখেছে মন। রাতের বুকের তারে জলের সেতার বাজে মগ্ন মধ্যমে। যতনা ফেরাও তুমি মুখ, ক্লান্তি আসেনি কোনোদিন।
.
সুঠাম মোমের শিখা গল্প বলেছে সারারাত। নদীর রাশিতে জন্মেছে যেই মেয়ে, ভাঙনে বেঁধো না তাকে, উষ্ণ দেশের জল। এখনো শ্রাবণ মাঠে বন্যা রচিত হয় নিয়মিত। সোনালি প্যাঁচারা ভাসান পাহারা দেয় রাতভর। প্রাচীন প্রেতের দল অপরিচয়ের হাত ধরে গর্ভশূন্য চোখে তাকায় আকাশে। আমার আহুত তারা নীলাভ ধূসর বনে পিনকুশনের মতো গেঁথে আছে, একাকী, শীতল।
৬
অলীক হাওয়া
তোমাকে তোমার মতো করে পাবার হাওয়া বইছে আজ। তুলোটে ধুলোয় রঙিন চারিপাশ। শূন্য আর পূর্ণের বিস্ময়কর খেলা চলেছে উঠোন ময়। অজানা বীজের ফাটল চিরে জন্ম নিল কত সম্ভাবনার ফুল। তোমার ফেরার টিকিট ডাক বাক্সে ঘুমিয়ে আছে। কাচপোকার ডানায় আলো পিছলে যায় যতবার দেখি। একটানে দশমাস আকাশের সাথে সঙ্গম সেরে দাঁড়ে এসে বসে যে পাখি তার ডানা নীলরসে ভিজে থাকে। আকাশি পাঞ্জাবির বুকপকেটে তোমাকে না লেখা চিঠির গুঞ্জন। আমার সারাটা দিন কেবল তোমার দিকে যাওয়া।
.
তোমাকে তোমার মতো করে হারাবার হাওয়া বইছে আজ
৭
সিল্যুয়েট
রাত-ঘরে বৃষ্টির মৌতাত। ডানার নিভাঁজে আফিমের মৃদু তাপ আড়মোড়া ভাঙে। ধূসর মরশুমে পাহাড়ি ঝিমগাছ আড়াল হয়ে আছে। ডুবুরি হয়েছ বলে যত্র তত্র ঝাঁপাও চৌখসে। চর্চার গভীরে বয়ে চলা মাংসল নদীতে সাঁতার কেটে চলো। নির্দেশে ডুবে যায় গোপন খোয়াবনামা, কুমারী আলাপ। প্রৌঢ়ার বেপথু চোখে পৃথুল মাস্কারা ঘষে নেয় জলের সবুজ। আকাট ছাইগাদা খুঁড়ে ঈগলের প্রতিরূপ শূন্যে ভাসমান। । মাঝারি রঙচঙে বেড়ালের মূল্য অনেক বেড়েছে বাজারে। বটতলার শিকড়ে ফাটল ঢুকে বহুদিন হলো পাতাল ছুঁয়েছে
৮
ক্ষমা
ছিপছিপে বৃষ্টি, একক, উতলা
কোন উপায়ে যাবে সংগীত মুখর
পাতালে!
যে পথে যাবে, আলো জ্বালিয়ে
ঝলমল করে যাবে।
.
একলা নিষাদ হয়ে ঘোরো
বনান্তরে,
শুকনো পাতার শব্দে
উড়ে গেলে পাখি
শূন্যতাকে জেনো।
.
ফিরে আসা সহজ নাকি!
কত কাঠ খড় পুড়িয়ে
দেবতাকে ত্রিসন্ধ্যা নিবেদন।
চৌকাঠ মাড়িয়ে জপ ধ্বনি
তুলসি তলায় সপাটে
আছড়ায় মাটিতে।
ক্ষমা কোরো ঈশ্বর।
০৯
ঝলমলে ফুলগাছ টা এবারের বর্ষায় মরে গেল। শেষ কবে সে সূর্য স্নান করেছিল তা দিয়ে আয়ু মাপা যায় না। পথ চলতি কত মানুষ মৃদু আলাপে মাতে, একটু আধটু আদর বিনিময় করে, করতলে উষ্ণতা ঝরে, রেশম সুতোর মতো সব যোগাযোগ গুটিয়ে, চলে যায়। রাস্তা কখনো প্রশ্ন করে না তা’বলে! মোম-সাদা বাকলে ঢাকা ইউক্যালিপটাস যেদিন প্রবল ঝড়ে কোমর ভেঙে সাপটে নিল মাটি, তার ফিনফিনে হাওয়া কাটা পাতায় সেদিনও কী সুগন্ধের ভিড়! নদীতে নেমেছিল আবক্ষ মূর্তির মতো জলজ কিশোরী। এক পুরুষের জমা ধুলো রগড়ে নিতেই বৃষ্টি এলো ঝাঁপতালে। যে প্রেমিক ফিরে আসেনি কখনো, তার অপেক্ষার জল পড়ে, অঝোরে।
প্রতিটি প্রত্যাখ্যানে একটি করে বসরাই গোলাপ ফোটে। তুমি সেই ভাষা শিখে নিও। নীরবতা কোনো ছবি আঁকেনা আজকাল, যদিও সব ফুটে ওঠাই মিথ্যে শেষ অব্দি। শোনো, একঘেয়ে দুপুরে ডাহুকের ধ্বনি কী সুরেলা মনে হয়! বিকেলের পোস্টম্যান দরজায় রেখে গেছে ফিরে আসা চিঠি। আমাদের কাঠের বাড়িতে ফার্ন এসে রেলিং ছুঁয়েছে। যাবে না, এই হেমন্তে?
১০
বোবার ডায়েরি
বোবা দিনক্ষণ
পঞ্জিকা পাঁচালি উপুড় করে
ছিঁড়ে দেয় শনির বলয়
.
সরাইখানায় মত্ত প্রহরী
ডিক্যান্টারে গাঢ় রাত্রির
জল মেপে আগুন ছানে
সুধা বিষে পোড়ে
বনাঞ্চল
.
পাথর চোয়ানো দুধে
পচে ওঠে ফুল
হড়হড়ে মেঝে জুড়ে
মাছিদের পিছল সাঁতার
.
ফুটপাথ খুঁটে খায়
দেবতার মা।
.
কালো পাথরের
গা-ভর্তি হীরের দ্যুতিতে..
সুমহান অন্ধকার
.
সন্ধ্যারতি…
আভোগ শেষ হলে
ভোগের আয়োজন
.
প্রগাঢ় চাতালে
নূপুর বাজে
বিনুনিতে কালসর্প
আঁটোসাটো কাঁচুলিতে
করমুক্ত রমণী
.
লোল মাখা আগুনে
গণিকার শীৎকার মুছে
গণৎকার ঘোষণা করে
সিংহাসনের ভবিষ্যত

