
সীমিতা মুখোপাধ্যায়-এর কবিতাগুচ্ছ
ব্লাডিমেরি
১.
দুই আউন্স ভদকা, চার আউন্স টমেটো জুস,
নুন এবং গোলমরিচ— মিশিয়েছি কিছু নীতিহীন শর্ত,
পালিয়ে যাওয়ার পটভূমিকা, আমার খসখসে চামড়া,
ত্বকের নীচে ব্লেডে কাটা নির্লিপ্ত স্নায়ু—
যারা টুকরো টুকরো হয়ে ভেসে আছে তোমার স্পর্শে,
আমাদের মেরুদণ্ড বেয়ে ধাপে ধাপে গড়িয়ে পড়ছে
বিচ্ছিন্ন যত অঙ্গ-প্রতঙ্গ, আমরা দুজনে খুঁজে নিচ্ছি—
কোনটা কার হাত, পা, মুখ, বৃক্ক …
অন্ত্র জড়িয়ে-পেঁচিয়ে গেছে চাউমিনের মতো—
একে তুমি আদর বলো?
তোমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে এখন বিষ, রাত্রি-চেরা অ্যাম্বুলেন্স—
কিছুতেই আলাদা হতে দেবো না তোমায়!
২.
ডাইনীর কালো পোশাক ও হাড়ের অলঙ্কারে সেজে
যাব তোমার চোদ্দো পুরুষের ভিটেয়,
মাটিতে গোল কেটে তার মধ্যে আঁকবো শয়তানি তারকা—
যার পাঁচ কোণে বসবে তোমার আত্মীয়দের খুলি,
থাকবে কিছু অপার্থিব চিহ্ন-সংকেত, জ্বলবে মোমবাতি।
এই বংশে জন্ম নেবে আমার রাক্ষসী কন্যা—
যে তার জ্ঞাতি ভাইদের অধর পান করে
তাদের রক্তে রক্তে মিশিয়ে দেবে অজাচার।
তারপর বসবে গিয়ে তোমার নরম কোলে,
পিতার পোশাকের ওম টেনে নিয়ে
ঘুমিয়ে পড়বে নিশ্চিন্তে— যেমন একটা ঘুম
আমি চেয়েছিলাম কখনো … বলতে পারিনি তোমায়!
৩.
এইসব অনুরাগহীন লেখা, অনুভূতিহীন যৌনতার মতো রূঢ়।
শিথিল করো আলিঙ্গন। আমাকে ছাদে উঠতে দাও—
শীতরোদ্দুরে পিঠ রেখে
লাল-নীল কাগজের উড়োজাহাজ ওড়াব আকাশে,
খপ করে ধরে নেব তোমার ধাতব নভযান,
হৃৎপিণ্ডের ভেতরে ফেলব লুকিয়ে, ফিনকি দিয়ে ছুটবে রক্ত!
আলগা করো চুম্বনের বাঁধন—
প্রেমহীন নিথর সম্পর্কের নাগপাশ খুলতে খুলতে
আমি ভাবব— কাঁদছি কেন আমি?
তোমাকে তো ফিরে যেতে দিইনি
আমার এলোমেলো ভূখণ্ড ছেড়ে, বরষণরত স্যাঁতসেঁতে
ছত্রাকে-ভরা তোমার নিজস্ব সবুজাভ করুণ জগতে!
৪.
চারমিনার উড়ান শেষে যখন আমায় নামিয়ে দিয়ে যাবে
গলির মুখে— যেখানে আটকে আছে কুকুরের চিৎকার,
গণ্ডিটুকু পার করলে তবেই শোনা যায়— যেন কোনো
শব্দরোধী অদৃশ্য পর্দা …
এমন ককটেল বিষণ্ণতা, মাথায় রক্ত-ওঠা যন্ত্রণা—
এই ব্লাডিমেরি হ্যাংওভার কাটতে দেবো না আমি।
আমাদের অস্থায়ী চুম্বকত্ব স্মরণীয় করে রাখতে
তুমি উপহার দিয়েছ ফ্রিজ ম্যাগনেট!
তবুও আনন্দে আছি শেষ-দেখাটুকুর দিকে তাকিয়ে—
তুমি যখন আমায় ছেড়ে দিয়ে যাবে
আটপৌরে সেই মান্ধাতা সিগন্যালের নিচে, আসলে
আমার কণ্ঠনালীর অতলে— যেখানে থেমে আছে
ব্যারেজের জলের মতো কান্না, কোনো অলৌকিক ক্ষমতাবলে,
তারপর?
এই তো ভালোই আছি, দিন গুনছি, আরেকবার
তোমার মাংসল শরীরে যাব বলে …
৫.
হাত ছাড়িয়ে, ঠোঁটের থেকে ঠোঁট খুলে, বুকের থেকে
উপড়ে নিয়ে বুক নেমে এসেছি মেলার ভিড়ে—
এখানে মানুষরূপী বেলুনগুলো একটা একটা করে
ফেটে যাচ্ছে— লাল লাল টমেটোর মতো,
আমি রক্তে রক্তে ভিজে নিজেই ব্লাডিমেরি ককটেল যেন!
অদৃশ্য হয়ে যাওয়া হৃৎপিণ্ডগুলো ঘিরে ধরছে আমায়,
চতুর্দিকে মাংস-পচা দুর্গন্ধ— কোথায় গেলে তুমি?
এ তুমি কোথায় ফেলে গেলে আমায়!
এরই মধ্যে কে যেন আমার ছবি তুলে দিচ্ছে,
বলছে— এরপর নাকি তার নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার পালা!
আমার চোখের জল চোখের মধ্যেই আটকে—
মেলার মাঠে লোকজন এরকমই আসে-যায়, বলো?
মরে যাওয়া ফুলের মতো বারবার ফিরে আসে গাছে—
যেমন ওরা এসেছিল, তুমিও আবার আসবে—
তোমার নরম কাঁধ, লালচে গাল, কেটে রাখা কব্জি,
পাতাহীন চোখ, সঙের মতো নাক, সব,
তোমার সবকিছু নিয়ে!


সীমিতার কবিতাগুলো ভালো লাগলো।