
অনিন্দ্য সরকার- এর কবিতাগুচ্ছ
তন্মাত্র
………
মা বলে গিয়েছিলেন, তাই নিত্যপুজো না করে
জলস্পর্শ করি না আমি।
রোজ সকালে উঠে গঙ্গাস্নান করি,
গঙ্গার বুক থেকে একতাল মাটি তুলে এনে
ইচ্ছে মতো দেবীমূর্তি গড়ি।
কখনও ত্রিনয়ন, কখনও লোল জিহ্বা
কখনও বা শান্ত সুন্দর দুটি চোখ, মুখে মৃদু হাসি
যেন গঙ্গাফেরত পাড়ার মেয়েটি।
কখনও হয় না কিছুই, মাটি তেমনি পড়ে থাকে
তবুও চন্দন দিলে মনে হয় ফুটে ওঠে চোখ।
পুজো সেরে মূর্তিটি ভাসিয়ে দিই জলে
আর ফিরেও তাকাই না।
আমি জানি না কোন দেবীমূর্তি হয়ে ওঠে তারা
আদৌ হয় কি না!
শুধু জানি এ পুজো আমাকে করে যেতে হবে চিরকাল।
চিন্ময়ী
………
জানি না কোন দেবীর পুজো করি আমি
মন্ত্রতন্ত্রও তো জানি না কিছুই,
শুধু নিজে লেখা কিছু আখর, কিছু ছন্দ
তবুও মনে থাকে না রোজ
তাই দিয়ে পুজো করি।
তুলসীপত্রে, বিল্বপত্রে পুজো করি তার
শ্বেতচন্দনে যদি ফুটে ওঠে চোখ
রক্তচন্দনের ফোঁটা এঁকে দিই তাতে।
কখনও মনে হয় স্বর্গের দেবী তিনি
কখনও সাধিকা, কখনও বা প্রেমিকা
কখনও যেন নিজেকেই গড়ি।
কখনও এ কোন দেবী পীন পয়োধরা
সর্বক্ষণ মুখ হা করা,
যেন বলছে খেতে দে, আরও খেতে দে..
মা এ কোন পুজোপাঠ দিয়ে গেলো আমায়!
জলজ
……….
বাড়ির পেছনের জানালা দিয়ে উঁকি দিলেই দেখা যায়
পুকুর ভরতি পানার ওপর দুটো ডাহুক
আলতো আলতো পা ফেলে হাঁটছে।
কচুরি পানার পাতা, বেগুনি রঙের ফুল
উলটে পালটে খুঁজে নিচ্ছে পোকামাকড়, ছোট মাছ।
নীচে অগাধ জলতল। ওপরে ডাহুকী সংসার।
জীবনও বোধ হয় তাই! পানার মতোই তুচ্ছতার ওপর
হেঁটে বেড়াই। সুখ খুঁজি, সংসার পাতি।
ভাবি এই জমি বুঝি শক্ত, অথচ
দুঃখ আসে, বিচ্ছেদ এসে ধরা দেয়। জীবন কেঁপে ওঠে।
কখন কোন মহাপ্রলয়, অথবা বৃহৎ মৎসাবতার তার
লেজের আঘাতে এই সংসার চুরমার করে দেবে কে জানে!
সংশয়
………
ঈশ্বরের নামে বিশ্বাস রেখে পায়ে হেঁটে নদী
পারাপার করেছিল একজন,
সেই যে গল্পে শুনেছিলাম
তারপর কতোবার কল্পনা করেছি সে দৃশ্য।
তার পায়ের নীচে নাকি ঈশ্বরের করতল পরপর
সেতুর মতো সাজানো..
সমস্ত গল্পের পাশে চুপটি করে দাঁড়িয়ে
থাকে বিশ্বাস। সামান্য আঙুলে আঙুল ছোঁয়ানো।
বিশ্বাসের পায়ের কাছে নত হয়ে বসে আছে ঈশ্বর।
আমিও ঈশ্বরে বিশ্বাস করি, তবুও তো পা ডুবে যায়
নদীতে নেমে ভয়.. কেন?
ডুবে যাবে না তো.. সংশয় হয়েছিল তোমার মনে
তাই ডুবে যাচ্ছো তুমি।
সংশয় মাত্রই ভুল, সম্পূর্ণ বিশ্বাস করতে হয়।
কে যেন এসে চুপিচুপি বলে যায়..
দূর থেকে হাওয়াতে ভেসে আসে মৃদু স্বর। অতঃপর।
ঈশ্বরবিশ্বাস
…………….
তুমি আছো, এ কথা আমি বিশ্বাস করি না ঈশ্বর
এই বলে আমি মুখ ঘুরিয়ে নিলাম।
কিন্তু মনে মনে তো জানি,
তাই আড়চোখে দেখি কেউ এলো কি না!
আমার ঈশ্বরবিশ্বাস আসলে এক শিশু
যে রোজ অভিমান করে
বাড়ি থেকে পালায়।
আমাকে কেউ ভালোবাসে না, এ কথা বলে
গাছতলায় বসে থাকে নিরালায়।
মা গিয়ে তাকে ডেকে আনে
আদর করে বলে, তোকে কতো ভালোবাসি..
নিজের হাতে মেখে ভাত খাওয়ায়।
ঠিক তেমনই ঈশ্বর এসে মুছে দেবে সব দুঃখ
ভুলিয়ে দেবে আমার সমস্ত অভিমান
বলবে, আমি তো আছি।
সেই লোভে রোজ আমার ঈশ্বরবিশ্বাস ভেঙে যায়।

