
গুচ্ছ কবিতা – সোমা দে
১) অনুতাপ
শব্দের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে গেলে, কবিতা লেখার ইচ্ছে আত্মহত্যা করে
পেটের ভেতরে দলা পাকানো খিদের পরিপ্রেক্ষিতে
বুক পকেটে সঞ্চিত বর্ণমালা ভাতের যোগান দিতে ব্যর্থ হচ্ছে..
শতছিন্ন অভাবের গায়ে সেলাই করেও আড়াল করা যায় না
কর্মহীন মানুষের তীব্র আর্তনাদ
অথচ চারদিকে আনন্দ উৎসব হয়, খোল করতাল বাজে
সারি সারি তেলেভাজার স্তুপের উপর ক্ষুধার্ত মাছিরা ভীড় করে
বিকিকিনি শেষে বেকার কিছু উচ্ছিষ্ট আবর্জনা ছড়িয়ে থাকে
শুধু বারো মাস ও তেরো পার্বণের মাঝামাঝি সময়ে
উর্দ্ধতনের প্রতিশ্রুতির গায়ে বাস্তবায়নের শিলমোহর উহ্য থেকে যায়।
২. গাণিতিক সংসার
অঙ্কের মতো সমাধান সূত্র খুঁজতে গিয়ে
সমস্যা জটিল হয়ে উঠছে ক্রমশঃ
সহজাত সরলীকরণের বিপরীতে সিঁড়িভাঙা জীবন
ধৈর্য্য অধৈর্য্যের ভেতর অবিরাম ঘূর্ণনরত গতি ও সময়
কৌনিক দূরত্বে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে থাকে সম্পর্কের বাঁধন
অথচ ঘড়ির কাঁটার নিরিখে পাল্টে যায়
অভাব-অভিযোগ, প্রশ্ন- উত্তর, ক্যালেন্ডারের ঘর
এভাবেই অন্য একটি দিনের দিকে এগিয়ে চলে,
একটি জীবন্ত গাণিতিক সংসার..
৩. ফিনিশিং লাইন
অভাবের কাছে হার মানছে কাব্যিকতা কিংবা সাহিত্য উল্লাস
সমাজের শরীর থেকে খসে যাচ্ছে ন্যায় বিচার
দূর্লভ রুজি রোজগারের বৈপরীত্যে
সুলভ নামাঙ্কিত একগুচ্ছ সরকারি প্রকল্প কেমন অট্টহাসি হাসে
চৌকাঠের ভেতরে তীব্র হচ্ছে জৈবিক লড়াই
ক্ষোভেরা এখন আর জোট বাঁধে না, প্রতিনিয়ত নাভিমূলে আত্মহত্যা করে
আপাতত কবিতা লেখার মতো অভিধানে কোনো উৎকৃষ্ট শব্দ নেই
শুধু মৃত্যুর মতো আঁশটে গন্ধ ছেঁয়ে আছে
বেকার তরুণ কবির মন-মস্তিষ্কের শিরায় শিরায়..
৪. হক
নুন আনতে পান্তা ফুরোয় জীবনে মাসের প্রথম দিক,
ম্যানিকুইনের দিকে তাকিয়ে থাকা শিশুটির সন্ধানে গেলাম
এবার সে বিখ্যাত কেক শপের বাইরে দাঁড়িয়ে
আমাদের মধ্যেকার দূরত্বে শহরের যাবতীয় চলাচল
যান্ত্রিক ব্যস্ততার গভীরে হারিয়ে গেল ক্ষুদার্থ চোখজোড়া
আমার হাতে একটি জামা ও একখানা কেকের প্যাকেট
হাঁটতে হাঁটতে জরাজীর্ণ ঝুপড়ির দরজায় ফের মোলাকাত
ধূলোমাখা শরীরজুড়ে ঠুকরে বেরিয়ে আসছে অপুষ্টির কাঠামো
পা দুটো অসাড় হয়ে এলো, মনুষ্যত্ববোধে আক্রমণ হয়েছে
মাইনর সেরিব্রাল অ্যাটাক!
কানের ভেতর রি রি করে বাজছে তীব্র ডেসিবেলযুক্ত ভাষণটি
প্রত্যেক নাগরিকের প্রথম অধিকার রোটি-কাপড়া-মাকান
শিশুটিকে নয়, এবার ঐ নেতাটির মেরুদণ্ড তল্লাশে যেতে হবে..
৫. জন্মকালীন
জ্বর মাপতে চেয়ে উষ্ণতা বিকিয়ে আসি বিলাসবহুল শয়নকক্ষে
দীর্ঘ অন্তর্দহনের আঁচে তপ্ত হতে হতে
কাঠকয়লার গভীরে হারিয়ে ফেলি স্বকীয়তা
ছাইচাপা আগুনে জ্বলতে থাকা বিষাক্ত প্রেম শুদ্ধ করতে
ফের যুগলে পুড়তে হবে।
আবহমানকালের অভিমানী মেঘ ভেঙে গিয়ে খরস্রোতার বুকে প্লাবনের ত্রাস
বৃষ্টি ধুয়ে দেবে যাবতীয় মলিন অভিযোগ
দুকূল ছেপে এবারে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে উঠবে রুক্ষ বালিয়াড়ির শরীর
সেখানে জন্ম নেবে বলিষ্ঠ জারুল শিশু..
৬. পরিণতি
সময়ান্তে তীব্র আকর্ষণও ম্রিয়মান হয়
আপন কক্ষে মন্থর হয়ে আসে অস্তিত্ব রক্ষার গতি
পথবাতির আলো ঝাপসা দেখায় বৃষ্টিস্নাতা রাতের গভীরে
ঝুপড়ির উনুনের ধোঁয়ায় মিশে থাকে দিনান্তের ক্লান্তির সোঁদা গন্ধ
নিঃস্ব ভবঘুরের নোনাসিক্ত চোখ ফুঁড়ে নেমে আসে একমুঠো খিদে
ম্যানহোল দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে শহরের যাবতীয় দর্প
হাত বদলের অছিলায় পবিত্র জল হয়ে যায় সমস্ত টক্সিক বর্জ্য
এভাবেই বিষজলে স্নান সেরে বিষাক্ত হয়ে উঠছে ধর্ম
তবুও গান্ধারীর মুখে নিত্যদিন উচ্চারিত হচ্ছে পুণ্য-শ্লোক..
৭. বাজিগর
মায়া কাটাবার শেষ সমাধান সূত্র হিসেবে
মৃত্যু চেয়েও আশ্চর্যজনকভাবে আজও বেঁচে আছি
সময়ের ঘর বদলের অবকাশে সেরে গেছে
শীতকালীন অন্তঃসারশূন্য গাছের ক্ষত
পুনরায় অঙ্গ সজ্জিত হয়েছে বাসন্তিক আবরণে
একদিন পূরণ হবে এই ভেবে অন্দরের স্বপ্নগুলো ফুরিয়ে যায়নি
শুধু একই দৃশ্যপটে উপন্যাসিক চরিত্রের রূপ বদলেছে
তবে এই যে আমরা হেরে গিয়েও
উদ্দাম ছন্দে সাম্রাজ্যের দুপ্রান্তে সুখ যাপনের খেলায় মেতেছি
হয়তো চালচক্রের কাছে জীবন বাজি রেখে দীর্ঘায়ু জিতে গেছি..
৮. রিভেঞ্জ
ট্রিগারের ডগায় রেখে দিচ্ছি প্রেম
তর্জনীর সিদ্ধান্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছে মূহুর্ত
সূর্য ডোবার আগেই জ্বলেপুড়ে ছারখার বিশ্বস্ত লাল সুতো
গা গুলোয় বারুদের ঝাঁঝে অথচ রক্তচোখে দৃষ্টি স্থির
যুদ্ধক্ষেত্র কিংবা সম্পর্কের বৃত্তে বেঈমানের স্থান বদল
আর লড়াইয়ের অবকাশে হেরে গিয়ে প্রাণপাতের মধ্যে বিস্তর ফারাক
ঝরে পড়ুক উড়ন্ত সাদা পায়রার পালক..
এ জন্মের মতো সভ্য হোক বিবেকের ঘর, মননের অনুরণন
ভালো-বাসার দেশ।

