
গুচ্ছ কবিতা – অয়ন দে
(১)
আমার বড় বলতে ইচ্ছে করে,
ঐ যে আমার দেশ…
ঐ আমার আশ্রয়,
আমার মাটি।
জন্ম মাটি ছেড়ে দিলাম,
আমার নাকি অধিকার নেই!
তোমাকে ভালবাসি দেশ…
নাওয়া নেই, খাওয়া নেই, এভাবে কী বাঁচা যায়?
বলো দেশ…
মাথার ওপর আদিগন্ত আকাশ,
জানি জন্মমাটি ছুঁয়ে পায়ের তলা।
জানো দেশ, তোমায় তো তুলে আনতে পারি না!
আঁচড় কেটে তাই এনেছি জন্মমাটি,
তোমায় ভালবাসি দেশ…
(২)
কেউ জানুক বা না জানুক, বছর জানে।
কোন সুদূরের মায়া খেলার বার্তা নিয়ে এসেছিল উতল হাওয়া
তখনও আদুল পায়ের হাঁটা হয় নি শুরু পুনরায়!
একটি বছরের একটি দিন একটি উপহার।
তোমার উপস্থিতি সূর্যকে নরম করে,
তারপর হারিয়ে যাই উতল হাওয়ায়।
আমাদের লাভের লাভ করেছিল, আষাঢ়ের ঘন কালো মেঘ।
দেখলে না কেমন সবাই রাস্তা ছেড়ে দিল,
আমাদের লাভের লাভ ওই টুকুই,
এতক্ষন ওই নির্জনতা টুকুই…
কেউ জানুক বা না জানুক, বছর জানে।
(৩)
আমার যত মাটির পুতুল
ভাঙতে চায় রোজ দুবেলা।
ভাঙ্গা গড়ার খেলার মাঝে
নিজের ক্ষতি, দেশের ক্ষতি
এই তো দেখি।
রক্ত জমাট বাঁধতে দেখি
আমার যত মাটির মানুষ
মারতে দেখি!
কী বা লিখি?
ছুটছে মানুষ এপার-ওপার!
আসা-যাওয়া বছর ধরে।
কোথায় গেলে দু’মুঠো ভাত!
বসে নয় খেটে পাওয়া যাবে?
তাই আসে মানুষ!
সাধে কী ছাড়ে ভিটে সাধে কী আর ছাড় মাটি?
রক্তে যেমন আছে ইতিহাস,
এও তো একদিন হবে ইতিহাস!
জানতে যদি নাই বা দাও
তবুও জানবে ছিল কবিতা,
ছিল মা ঠাকুমা, আর যে ছিল গল্প!
মানুষ সব ভুলে যায়, দেশ ভোলে না।
ভাতের স্বাদ ভোলে না!
আদুল পায়ে হাঁটা ভোলে না।
(৪)
আর একবার নিঃস্ব হতে হতে বেঁচে গেলাম,
আদুল পায়ের হাঁটা থেকে বিরত হলাম আমি।
কিন্তু আমরা?
ওরা দেশ দেশ বিদ্বেষ করে!
আদুল পায়ে হাঁটতে বাধ্য করে,
হা হা করে না ওদের বুক
ঠাণ্ডা ঘরে বসে যাপন করে সুখ, মনে ভাবে হাঁটুক!
মানব হয়ে মানবিক হ
আঘাতে আঘাতে হৃদয় হয়েছে শান,
সেই দ্যুতি ধরা দেয় দিঠি।
অধিকার ছিনিয়ে নিলে
মৃত্যুভয় থাকে না!
আঘাতে আঘাতে হৃদয় হয়েছে শান
মানুষ বড় বোকা নয়!
তারা ঠিক জানে কোথায় হাত রাখতে হয়।
(৫)
অশান্ত সময়ে পথ হাঁটছি…
এখনও আদুল পায়ের ক্ষত শেষ হয়নি,
ফুরোয় নি ব্যথা!
এই তো একটু আগে উত্তর আকাশে
তারা খসে গেল,
পরিযায়ী পাখি গায়
আনমনে গান,
ক্রমশ রাত বেড়ে চলে
দিনের টানে।
এখনও আদুল পা বিরাম পায় নি,
এখনও আদুল পায়ের ক্ষত হয় নি শেষ।
এখনও আদুল পা খুঁজে পায় নি দেশ!
(৬)
আকাশ সমান ভালোবেসে
এখন হৃদয় শানিত করেছি।
বজ্র সমান শাসন ভেঙে
নতুন পাহাড় কিনেছি।
এমন সাহস আছে কারুর?
নেহাত আমি কবি বলে,
একটি গোটা পাহাড় দিলাম।
আর কী দিব?
নাও নাও গোটা কয়েক পাইন,
বিশাল তরুবর।
গোটা পাহাড়ের শরীর জুড়ে
বিছিয়ে দিয়ো নরম শ্যাওলাচাদর।
আর রেখো একটি উন্মুক্ত গুহা!
কবিতার জন্য তুমি…
মনে রেখো কবিতাই বিপ্লব,
কবিতাই প্লাবন।
আসমুদ্র আমি কবিতা জানি,
আদিগন্ত আকাশ কবিতা মানি।
(৭)
পুরট হতে হতে মানুষ ভূমিষ্ঠ হয়,
গাছ মহীরুহ।
রক্ত বাঁধে জমাট,
ক্ষয় হয় শুরু!
দেবদারু গাছ সন্ধ্যা ডেকে আনে,
তরল অন্ধকার নামে।
তবু কল্পনায় দেখতে পাই
স্বচ্ছ নয়!
রাত্রি ডেকে আনে পুরুষ প্যাঁচা,
গাঢ় অন্ধকার নামে
শিকার হবে এখন…
বাঁচতে চাই, বাঁচাতে চাই
মৃত্যু এসে চুম্বন করে…
সহসা শরীর কাঠ হয়ে যায়।
(৮)
আমি ধোঁয়ার আবেশে জড়িয়ে প্রথম প্রেমে পড়েছি,
স্বপ্নে আমরা অনেকটা পথ পেরিয়ে সবে মাত্র পর্বত শিখরে।
এখানে পথ অনন্ত নয়, পথের শেষ!
আমায় তুমি আঙুল দিয়ে হিমালয়ের পর্বত চুড়া চিনিয়ে দিলে
চিনিয়ে দিলে উৎস ধারা।
সমস্ত দিন কম পড়ল তোমার আমার পথ চলাতে
সমস্ত রাত বৃথা গেল।
ধোয়ার আবেশ জড়িয়ে আচ্ছন্ন
ক্লান্ত দুই পথিক মন,
শেষ সিগারেট ভাগ হয়ে যায়
স্পর্শ কী শুধু চুম্বনে হয়?
নেশায় নয়! ধোঁয়ার আবেশ কাটিয়ে উঠি।
নতুন সকালে আবার বন্ধু সিগারেট।
(৯)
আমি তাকে ভিজতে দেখেছি
আষাঢ় বর্ষায়,
কালো মেঘের ঝলক…
অন্ধ মেঘে অন্ধ কে যে?
দ্বন্দ্ব তারই চলছে এখন!
রাত্রি নামে আঁধার কূপে,
মেঘ ভেসে যায় সহস্র দূর…
মুখ মনে নেই!
অন্ধ পক্ষে অন্ধ সবই
দ্বন্দ্ব তারই চলছে এখন!
ক্লান্ত আকাশ ঝরিয়ে বৃষ্টি,
ফুরায় মেঘ ,ফুরায় না কো সৃষ্টি।
(১০)
এমন আষাঢ় রাত্রি নিশীথে,
তালবন ঘিরে অযাচিত কালোমেঘ,
বর্ষা নিয়ে আসে।
যেমনি করে প্রেম আসে
প্রজাপতি পাখা রং মেখে।
বিরহের ঘন আঁধার
দিঠি বিন্দু জানে।
দুর্গম পথ, দূরত্ব অজানা,
শূণ্য পকেট, ব্যর্থ অভিসার!
এমনি করেই প্রেম বিদায়!
প্রজাপতি পাখা মেলে।
বিরহের ঘন আঁধার,
বৃষ্টি বিন্দু জানে।
CATEGORIES কবিতা

