
গুচ্ছ কবিতা – প্রান্তিক দেওঘরিয়া
১. তোমাদের জন্য নয়
নতুন বইয়ের গন্ধের মত গমগম করছে তোমার সারা গা,
দুচোখে ভেসে বেড়াচ্ছে কত কমা-পূর্ণচ্ছেদ,
আঙ্গুলের ফাঁকে ফাঁকে খেলে বেড়াচ্ছে কত যুক্তাক্ষর।
সামনে গেলে চুলের প্রচ্ছদ দিয়ে তুমি ঢেকে দাও সবকিছু,
আমায় সেই কবে একবার দেখিয়েছিলে
উৎসর্গের পাতা,
লেখা ছিল, ‘তোমাদের জন্য নয়’।
২. ঈশ্বর
গাছটি কত যুগ ধরে দাঁড়িয়ে আছে এখানে
ভয়ের স্বর্ণলতা জড়িয়ে রেখেছে তাকে।
কাতারে কাতারে পিঁপড়ে রোজ ওপরে উঠতে চায় হলুদ কাণ্ড বেয়ে,
ওরা স্বর্ণলতাকেই গাছ ভেবে এসেছে চিরকাল।
৩. গ্রামাঞ্চল
চশমার সামনে একশো ওয়াটের বাল্ব জ্বলতে দেখলে,
দু’মিনিট ভুলে থাকা যায় গ্রামাঞ্চল।
তারপর একদিন আবছা হয়ে আসে আলো,
মৃদু হয়ে যায় পেট্রলের সুবাস।
সদ্য চশমা হারানো আধকানা চোখে তখন,
সারি-ঝোলানো টুনি-লাইটগুলোই আমন ধানের ক্ষেত।
৪. যুদ্ধ
এসো সহজাত যুদ্ধের সাথে হাঁটি
নোনা জল আরও অনেক গভীরে পোঁতা,
ধ্বংসাবশেষে যতটুকু পরিপাটি
ওষ্ঠে আমার ততটুকু সরলতা।
বালির বিছানা সাজানো হয়নি তোমার
ফুল চন্দন মুন্ডমালার ভিড়,
একভাগ জুড়ে লবনতা,প্রিয় ট্রমা
প্রিয়তমা আমি তিনভাগ মুসাফির।
হাঁটুর ওপর জীবাশ্ম এঁকে চলা
রাশিমালা সব মিলে যাবে একদিন
ঢেওয়ে ঢেওয়ে যার ক্রমশ ধরেছো কলার
যান্ত্রিক ভিড়ে,সেও যে বন্ধুহীন!
এসো সহজাত যুদ্ধের বিপরীতে
হাত ধরে সোজা জোয়ারের দিকে ছুটি,
ধ্বংসাবশেষ পারবে কি মেনে নিতে
গোলা বারুদের যাবতীয় ভুলত্রুটি?
৫. হ্যালুসিনেশন
আঁশটে গন্ধ ছড়াচ্ছে চাঁদ,
আরও বিকট আঁশটে গন্ধ ছড়াচ্ছে আমার নিথর, আয়ুহীন দেহ।
বমি হয়ে পড়ে আছে নীল পাংশু ভালোবাসা,
কারা ছুরি চালিয়ে আরও গোলমেলে করে দিয়েছে ভ্যান গগ।
তুমি কৃত্রিম তেষ্টায় দাঁড়িয়ে দেখেছো সেসব আমিষ বেহেল্লাপনা,
এই ব্রাত্য ভাগটুকুই তোমার কাছে তখন মরীচিকা।
৬. নিরালা নিরস কবিতা
প্রতিবাদ প্রতিবাদ প্রেম
ভিড়ের উঠোনে ভিড় খুঁজে
নিরালা নিরস কবিতায়
সুয়ে আছে সেও মুখ বুজে।
কতকাল বরফ দেখেনি
কাছ থেকে দেখেনি আগুন
নিরালা নিরস কবিতায়
আজ ঈদ, কাল ফুল মুন।
সংখ্যাগরিষ্ঠতা রোগ
ছোঁয়াচে রোগের তুমি রুগী
নিরালা নিরস কবিতায়
লণ্ঠন হয়ে শব ভুগি।
পার্থিব ঋজু ধান ক্ষেতে
দেহ-মন ভাগচাষ চায়,
দু-কোদাল মাটি কেটে এসো
নিরালা নিরস কবিতায়।
৭. অবহেলা
চোখে চোখ রাখা ভীষণ ইতস্তত
অবহেলা তার অলঙ্কারের মতো,
ঝড় এলে সব উড়িয়ে নিয়ে যাবে
বুকের বাঁদিকে বালিয়াড়ি আছে যত।
পাশের পাড়ায় শুকনো ছাতিম গাছে
চারটে ঠোঁটের গন্ধ লেগে আছে,
শুকনো শেকড় কুড়োচ্ছে সবটুকু
সেপাইরা কেও শুনতে পেলো পাছে।
তাও তো কারও চোখ ভাসেনি জলে
কথার কথা ঘোরায় কথার ছলে,
মলম রানি বুলিয়ে দেবে গায়ে
রক্তক্ষরণ আকাশছোঁয়া হলে।
এর বেশি কী দেবার ছিল তার?
যুদ্ধপ্রেমী একঘেঁয়ে সংসার,
এসবকিছুর মাঝেও তাকে দেখি
অবহেলা তার মিষ্টি অলঙ্কার।
৮. বসন্ত
পথ অচল হয়ে গেছে
পাথেয় হয়েছে অভিঘাত,
ঘোড়াদের চাল বুঝে গেছি
বুঝে গেছি জলপ্রপাত।
শিশির কণার সাথে সাথে
আমরাও ঝরে গেছি কত,
তুমি বুঝি আজও মাঝরাতে
আমার অভাবে তথাগত।
সন্ধ্যাবাতির মতো জ্বলে
পলাশের রঙ বুঝে ফেলো,
হৃদয়ের শহরাঞ্চলে
বসন্ত ডেকে আনি চলো।
চল আজ দাবানল মেখে
আগুনের সাথে সাথে ছুটি,
পুড়ে যাওয়া মৃগনাভি থেকে
কুড়িয়ে এনেছি খুনসুটি।
দুটি পথ ছুটেছে দুদিকে
মাঝখানে দাঁড়িয়েছে ট্রাফিক,
বসন্ত ডেকে আনি চলো
সামান্য, প্রয়োজনমাফিক।
৯. বিষাক্ত
অংকের কঠিন বাস্তবতার মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা নির্লজ্জ গাছ,
কী দেয় তোমায়?
রাংতা মোড়া এক্স সংখ্যক অক্সিজেন।
ও সালার টুকরো দিয়ে দাবার গুঠি বানাই আমি,
ঘোড়ার সাথে চলতে থাকি আড়াই ঘর,আড়াই ঘর।
ধুলোবালি জড় করি বাস্তবতার পক্ষে,
সমতলে ছড়িয়ে দি চন্দ্রচূড়,
গাছের থেকে দু পুকুর দূরে সাপেরা যেখানে ফনা তুলে দাঁড়িয়ে আছে,
ওখানে যাও এক্স সংখ্যক কার্বন ডাই অক্সাইডের মতো বন্ধু পাবে, সোনার কুঠার পাবে তুমি।
১০. মাঝরাতে
মাঝরাতে সে কলম তুলে নেয়
মাঝরাতে সে উলঙ্গ উন্মাদ,
মাঝরাতে সে মাতৃহারা শিশু
মাঝরাতে সে ফোকলা পুঁজিবাদ।
মাঝরাতে সে শিব হয়ে যায় রোজ
মাঝরাতে সে বিষ ঢেলে নেয় বুকে,
মাঝরাতে সে ট্রিগার টেনে ধরে
আঙুল রেখে অচেনা বন্ধুকে।
মাঝরাতে তার এক কানে হেডফোন
মাঝরাতে তার স্বপ্ন আমেরিকা,
মাঝরাতে সে H2SO4
মাঝরাতে সে হলুদ কাঁচের বিকার।
মাঝরাতে সে কাঁচের মতোই ভাঙে
মাঝরাতে সে নিজেই গড়ে ওঠে,
মাঝরাতে সে ট্রিগার টেনে ধরে
আঙুল রাখে বিষাক্ত দুই ঠোঁটে।

