
পকেটমার /রুদ্রাঞ্জন মুখোপাধ্যায়
সে রাতে, চাপা ঘেমো বর্ষার হাওয়ায় মাটিতে মুখ গুঁজে পড়ে রইল কালো। মাটি প্রেমিকার কোলের মতো ঢেকে দিল তাকে। ভারি, ভিজে আঙুলে তার গাল, মাথা, চুল, নাক, কান ঠোঁটে আদর করে দিল। কালোর খুব ঘুম পেল। ঘেমো বর্ষার রাতে আচমকা জেগে ওঠার পর আমাদের যেমন ঘুম পায়। কালোর কোমরের নিচ থেকে পায়ের পাতা অবধি কোনও অনুভূতি নেই। অর্থাৎ পা থাকতেও পারে, নাও থাকতে পারে। কিন্তু কেউ জানবে না কালোর শরীর ক্রমে সূক্ষ্ম হয়ে উঠল কীভাবে। কেউ বুঝবে না, ঘেমো ঘুম ভেঙে হঠাৎ যদি মনে হয় শরীরের ভার অনেকটা কমে গেছে, কেমন লাগে। মানুষ সততই উড়তে চায়, পারে না, শুধু শরীরের বোঝা কমে যায়।
কলকাতার মাথার উপর দিয়ে প্রচুর তার চলে গেছে। এর কতকগুলো গিয়ে মিশেছে দুই পরগনায়। আরও বহু তার চলে গেছে বাহির কলকাতায়। শহরের সঙ্গে বাইরের সম্পর্ক তারের। তাতে চাঁদের গন্ধ লাগলে সন্ধে হয়, হাওড়া, শিয়ালদা হয়ে কর্মক্লান্ত মানুষ পৌঁছে যায় মানকুণ্ডু বা বসিরহাট।
ভ্যাপসা গরম দিনের শেষে সেদিন ঝড়ের পূর্বাভাষ ছিল। পরপর দুটো ট্রেন ক্যান্সেল, শিয়ালদায় জনস্রোত, সারি সারি চোখ রেলওয়ে শিডিউল বোর্ডের দিকে। হঠাৎ রম! পাড়ার ক্যাওড়া-কিচায়েন ঘটিত বিস্ফোরণের মতো বাজ পড়ল। বুভুক্ষু যাত্রীদের শরীরে আনচান, চোখের কোণ থেকে শুরু করে জিভের ডগা পর্যন্ত বিরক্তি। এমন সময় ঘোষণা হল:
“আপ শিয়ালদা-হাসনাবাদ লোকাল আটটা বেজে পনেরো মিনিটে চার নম্বর প্ল্যাটফর্মে ঢুকবে।”
হাতে তখনও পনেরো মিনিট, প্রকৃতিতে মহাপ্লাবন, অর্কেস্ট্রার মতো রমরমিয়ে বৃষ্টি পড়ছে প্ল্যাটফর্মের চাল জুড়ে। ডো-রে-মি-ফা-সো-লা-টি-ডো, প্রতিটা স্বর জুড়ে বৃষ্টি। ডাঙার মধ্যে যে নদীপ্রবণতা থাকে তাকে উস্কে দিচ্ছে বারেবারে। ছাঁটের ধাক্কায় দাঁড়ানোর জায়গা নেই, গাদাগাদি করে হাজারখানেক প্যাসেঞ্জার দাঁড়িয়েছে:
“সরে দাঁড়ান না, গায়ের উপর উঠে দাঁড়াতে হবে?”
“এহ! এ শালা চুপচুপে হয়ে গেলাম এক্কেরে। কফ বসবে।”
“তোমাদের বেশিবেশি। বিষ্টি হলেও জ্বালা, না হলেও জ্বালা।”
“তা কী করব? আপিস থেকে এরম কাকভেজা হয়ে ফিরতে ভাল্লাগে?”
“এ গুরুপদ…এদিক…এদিক…আয় পাশ কাটিয়ে…টেরেন ঢুকছে।”
মনুমেন্টাল ভিউ থেকে এত গাদাগাদি করা মানুষকে দেখলে মনে হবে পৃথিবীতে আউশভিৎজ নেমে এসেছে। সার বেঁধে ইহুদী চলেছে গ্যাস চেম্বারে, বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে জার্মান প্রহরী। সবকিছু ছাপিয়ে আশার আলো, ট্রেন ঢুকল ধীরে…ধীরে…শোরগোল বেড়ে গেল। প্ল্যাটফর্ম ভরে উঠল ছানা কাটার গন্ধে।
কালো চলন্ত ট্রেনে পকেট কাটে না। এ লাইনে বেশিদিন আসেনি। বছর দুয়েক। তার আর্মহার্স্ট স্ট্রিটের চায়ের গুমটি উচ্ছেদ অভিযানে ভাঙা পড়ল, তারপর বাড়িতেই থাকত। শ্যামল এ লাইনে নিয়ে এলো। কালো আসতে চায়নি। সতভাবে বাঁচব, সতভাবে রোজগার করব, খাব, ওসব চুরিটুরি করে কে কবে বড়মানুষ হয়েছে? শ্যামল দেশলাই দিয়ে দাঁত খুঁচিয়ে পিচ করে থুতু ফেলে বলেছিল, “ওসব সতপথের কথা সেদিন ওসির বাচ্চা শুনেছিল? ইউনিয়ন মারানিরা? শুনেছিল? মাস গেলে কড়কড়ে নোট দিতে তো…দিতে তো হাতে? তাও দোকান ভাঙলো তো। দাঁড়ালো কেউ পাশে?”
কালো উত্তেজিত, “তাই বলে চুরি শ্যামল? চুরি?”
“খিঃ খিঃ! চুরি হিসাবে ভাবছ কেন? এও তো পফেসন। লোকে করে খাচ্ছে না? তোমাদের হল পিছনে নেই ইন্দি এদিকে ভজরে গোবিন্দি। পাগলামো কোরো না কালোদা। ঘরে বউবাচ্চা আছে। টানতে হবে তো…ন্যাংটা শরীলে ধম্মকথা হয় না।”
“তুই এখন যা শ্যামল। আমার ভাল্লাগছে না।”
“সে যাচ্চি নয়। ডিসিশন নিয়ে বোলো।”
পরে অবশ্য কালোই গেছিল শ্যামলের কাছে। ব্যবসার চালবেচাল বুঝে নিয়েছিল। ভাল দাঁও মারতে পারলে রাতারাতি মালদার। তারপর এলইডি টিভি, ওভারহেড তার থেকে হুক করে এয়ার কন্ডিশনার, পালসার গাড়ি, তবে রিক্স আছে। থাক, সে আর কোন কাজে নেই?
শ্যামলই শিখিয়ে-পড়িয়ে নিল। ভরা ট্রেনে বা বাসে পকেট কাটার হিম্মত এখনও কালোর আসেনি। অফিস টাইমে প্ল্যাটফর্মে ট্রেন দাঁড়ালে প্যাসেঞ্জারদের হেবি ধুঁই পড়ে, তখন টুক করে পকেট থেকে দুটো মোবাইল বা চারটে পার্স সরিয়ে ফেলা সোজা।
“শরীলে শরীল মিশে যেতে হয়। ছায়ার মতো।”
একজন জলজ্যান্ত মানুষ রাতারাতি ছায়ার মতো ফিনফিনে হয়ে যেতে পারে না। সূক্ষ্ম হওয়ার অভ্যেস তাকে চালিয়ে যেতে হয়। প্রত্যেকদিন। কালোর ছায়াবিদ্যা আপাতত ফুরোয়নি। এখনও সে অর্ধেক ছায়া।
ট্রেনের মাঝ বরাবর থিকথিকে ভিড় ঠেলে ঢুঁ মারল কালো। এবার ভিড়ের গতির সঙ্গে শরীর ছেড়ে দিতে হবে পুরোপুরি কিন্তু মস্তিষ্ক থাকবে সজাগ। দামি ক্যানভাস ছুঁয়ে দেখার মতো আলতো আঙুলের ক্ষিপ্রতায় ঠিক জিনিস বেছে চোখের পলকে সরিয়ে ফেলতে হবে। শরীরের উপর পুরোদস্তুর নিয়ন্ত্রণ রেখে…এই তো! পাওয়া গেছে! আহ! পেটমোটা কাতল যেন। ভেতরে থিকথিক করছে নোট…একটু…আরেকটু…শাবাশ!
পেটমোটা বটুয়াটা ঝাড়ার আনন্দ উপভোগ করার সময়টুকু কালোর নেই। তার বুকের ধুকপুকি মিলিয়ে গেছে। কানে তালা লেগে চিঁ শব্দটা ভেদ করে আশেপাশের কোনও আওয়াজ ঢুকছে না। এ অবস্থাতেই তাকে নাগালের বাইরে চলে যেতে হবে। আর কিছু না হোক, অন্তত নিজের বুকের ধুকপুক…খপ! একটা হাত এসে পড়ল কালোর কলারে। একটা থেকে দুটো, দুটো থেকে তিনটে, ট্রেন তখন আস্তে আস্তে চলতে শুরু করেছে।
“মাদারির ছেলে!”
“ধরুন ধরুন! ছাড়বেন না!”
“এদের একটা দল আছে দাদা। লক্ষ্মীকান্তপুরের দিক থেকে আসে। পুজোর আগে এক্কেরে তেড়েফুঁড়ে লাগে।”
“মার! মার! টেনে ধর! চুলের মুঠিটা ধর ভাল করে!”
“কী দরকার দাদা আইন হাতে তুলে নেওয়ার? পুলিশে দিন…”
“ই! চলন্ত ট্রেনে পুলিশ! বেশি একেবারে মায়া না?”
“এই দেখে, দেখে, মরে যাবে!”
পালাবার পথ নেই। অন্তত দশটা হাত জানালার গ্রিলের সঙ্গে সাঁটিয়ে ধরে আছে কালোকে। কালো প্রথমে ট্রেনের সঙ্গে ছুটছিল। তারপর তাল মেলাতে না পেরে ছোটা বন্ধ করে ছ্যাঁচড়াতে লাগল। কালোর বুকে এখন হৃৎপিণ্ড নেই, খুলির ভেতর মস্তিষ্ক নেই, শরীরের চামড়া, কঙ্কাল মিলিয়ে গেছে বহু আগে। কালো এখন একটা আস্ত হাওয়া।
ট্রেন প্ল্যাটফর্ম ছাড়তে রিফ্লেক্সে তার পা দুটো উঠে গেল। কোনওকিছুর আশ্রয় নিতে হল না। দশটা হাত কালোকে ধরে আছে, শক্ত করে। কালোর শরীরে এখন ওজন নেই। যুগে যুগে যে অসাধ্য সাধনের চেষ্টায় মানুষ নিষ্ফল হয়েছে তাই সে করেছে। কালো উড়ছে! উড়ছে! মাধ্যাকর্ষণের সঙ্গে লড়াই করে এখন সে এক নিমেষে পৃথিবী ছাড়িয়ে চাঁদে চলে যেতে পারে। হয়ত পৌঁছে যেতে পারে অন্য কোনও ছায়াপথে। শত শত কিল, চড়, ঘুষি আর কালোর গায়ে লাগছে না। সে উড়ছে!
বাতাসে ভেসে বেড়াবার অভিজ্ঞতা কালোর ছোটবেলায় হয়েছিল। দিদির হাঁটুর উপর উঠে হাত দুটোকে পাখির মতো ছড়িয়ে দিত। খেলাটার নাম ছিল ঘুঙ্গি। ঘুঙ্গি…ঘুঙ্গি…ঘুঙ্গি…দিদির হাঁটুর উপর খেলার সময় মুখ দিয়ে শব্দ করত কালো। ঘুঙ্গি…ঘুঙ্গি…! কালো পাখি হতে চাইত। তারপর দিদি ঘুমিয়ে পড়লে মৃতদেহের শরীরের পিঁপড়ের মতো তার সারা শরীরে বেয়ে বেড়াত। কী যেন খুঁজত। কিন্তু পিঁপড়ের জীবন কালোর নয়।
দিদি সেই হারিয়ে গেল। উঠতি বয়সে। কার সাথে যে হারালো। কালোর কষ্ট হত খুব। বুকটা জোড় দিয়ে মুচড়িয়ে উঠত। আহা দিদি রে! তোর একলা ভাইটাকে ফেলে সগ্গবাসে গেলি রে দিদি।এই করে বছর কাটে। কালোর দিদি স্বর্গবাসে না গেলেও তার বেধবা মা সত্যি স্বর্গবাসে চলে গেল। তার এক বছরের মাথায় একটা ব্যাগের হদিশ পাওয়া গেল। হাওড়া স্টেশনের ভিড়ে। চলার পথের এক ধারে। প্রথম দেখে তো লোকের মনে সে কী ভয়। ভাবে বুঝি বোম। তারপর পুলিশকুত্তা এলো। ব্যাগ থেকে একটা উঠতি মেয়েমানুষের শরীরের টুকরো বেরোল।
“খুন হওয়া মরা বাবা। ওকে আর বাসি হতে দিও না। ওঠো। আগুন দেবে চলো।”
উস্কোখুস্কো চুলের কালোকে টেঁপো মামা ধরে নিয়ে গেল। শ্মশানের অন্ধকারের আর খুচখাচ কথাবার্তার মধ্যে কেউ লক্ষ্য করেনি কালো বিড়বিড় করছে। ঘুঙ্গি…ঘুঙ্গি…ঘুঙ্গি…কালোর চোখের কোলে এক সমুদ্র জল জমে আছে। মুখে চলছে তালে তালে, কেউ দেখতে পাচ্ছে না।
খেলাটার কথা আজ কালোর মনে পড়ছে। এই তো, বাতাসের বুক চিড়ে সত্যিকারের উড়ে যাচ্ছে সে। পাশ দিয়ে কত বাড়ি, ঘর, ফাঁকা জমি সব সরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু আমাদের পেশিতে অনন্ত শক্তি নেই। একটা আস্ত মানুষকে দীর্ঘকাল ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতাও নেই। হাওয়া যেমন অদেখা শূন্য থেকে নেমে ধানক্ষেত ছুঁয়ে যায়, অনেক উঁচু থেকে নেমে নুইয়ে পড়ে পৃথিবীর কাছে, তেমন কালোকেও নুইয়ে পড়তে হল একটা সময়। ঝুপ! হাওয়া থেকে পাথর হওয়ার যাত্রা সহজ নয়। ক্ষয়ক্ষতি হয়, কোল্যাটারাল ড্যামেজ। গুঁড়িয়ে যায় হাড়ের গঠন, শরীরের সমস্ত অঙ্গ। এতকিছু বোঝার অবস্থা তখন কালোর নেই। ফুলস্পিডে ট্রেনের চলে যাওয়ায় তখন সে পাথর হয়ে মাটিতে মিশে গেছে। পড়ে আছে একা, কালো, ঘেমো অন্ধকারে। খানিকক্ষণ পর, আলো ফোটার বহু আগে হয়ত শুরু হবে মানুষের কোলাহল। আবিষ্কৃত হবে চলন্ত ট্রেন থেকে পড়ে যাওয়া এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি। মালাই চাকির নিচ থেকে তার সমস্তটা নব্বই ডিগ্রী ঘোরানো। কেউ জানবে না সে হাওয়া হতে চেয়েছিল। জল, হাওয়া আর আলোর খোঁজ কেউ রাখে না।

