মুঠোয় ভরা বিশ্বের ভয়!    সুমিতা মুখোপাধ্যায়

মুঠোয় ভরা বিশ্বের ভয়! সুমিতা মুখোপাধ্যায়

আচ্ছা, লেখাটা যদি শুরু করা যায় এইভাবে, “ঠান্ডা, মরা ঠোঁট, তাও চুমু খাব। আর আবার কতদিন দেখা হবে না তোমার-আমার”। কী অসম্ভব ভয় করে! নিঃশব্দে চারিয়ে যায় চেতনার শেকড়বাকড়ে। শেষ চুম্বনের উষ্ণতা   অন্তিম আলিঙ্গনে! তারপর ভঙ্গুর গ্লেসিয়ারের মতোই ভালোবাসা ভেসে যায় অতিমারীর লবনাক্ত হ্রদে। না, কোন ট্র্যাজিক উপন্যাসের উপসংহার নয় বরং একটা ভয়াবহ দুঃসময়ের কথামুখ! অতিমারী! মানুষের পাঁজরের গভীরে সেঁধিয়েছে  মৃত্যু চেতনার এক অবিমিশ্র অন্ধকার। প্রতিদিনের দুঃসংবাদে বাতাস ভারি! পৃথিবী জুড়ে এক অব্যর্থ ব্যর্থতার লড়াইয়ে নেমেছিল মানুষ। প্রতিনিয়ত শারিরীক দূরত্ববিধির একাকীত্বের আত্মমগ্নতার বিষন্নতা অন্যদিকে সব দূরত্বকে শিকেয় তুলে মানসিকভাবে পরস্পরকে আঁকড়ে ধরে পরের দিনের একটা জীবন্ত সকাল দেখবার অভিলাষ! পোড়েপাওয়া চোদ্দ আনার মতো যদি আর একটা দিন বেশি জীবন পাওয়া যায় ! কত বিচিত্র সংকট,কত কঠিন সমস্যা! বিপন্ন কালের বোঝা পিঠে নিয়ে এই সময়ের বাংলা কবিতা তার সঠিক অভিমুখ সন্ধানে দিশাহারা! তাই সমকালের ইতিহাস-সত্যকে এড়িয়ে গিয়ে নয়, বরং ভালো-না থাকার সেই সময়কে ধারণ করেই কবি চৈতালী চট্টোপাধ্যায়, তার নিজের মতো করে এই সময়ের কবিতাকে নির্মাণ করে নিয়েছেন। আশাহীন হতাশার মন খারাপ আষ্টেপৃষ্ঠে ছেয়ে থাকে কবিতার দেহ-মন। ফিল-গুডের কবিতা আর লেখা হয় না আস্ত একটা সময় জুড়ে ! এক অচেনা কবি চৈতালী সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় মৃত্যুর বদ্ধভূমিতে। মধুমালতির মতোই প্রেম যে কবির কবিতাকে জড়িয়ে ধরে, একবুক অভিমানে তাকেও বলতে শুনি, “আমার প্রেমের গন্ধ দুঃখ দুঃখ!” (সাইনাস) তখন ভয় তেমন জট পাকায় নি! কিন্তু একসময় বিষাক্ত সরীসৃপের মতো মৃত্যুগন্ধের সংক্রমনে সময়ের অসুখ সিঁধ কাটে কবিমনে! চিন্তনের গভীর ক্ষত থেকে গলগল করে নিঃসৃত হয় বিষাক্ত সময়ের তরল গরল।

“আমি সমসময়ের কথা কিছুতেই কবিতায় বসাতে পারি না”-এই আমার-কথা দিয়ে কবি চৈতালী তার  কবিতা শুরু করলেও, দু-পা এগিয়েই তাকে বলতে শুনি, “পৃথিবী আঁধার হল অসুখের ভরণে পোষণে।”। ৮০-র দশকের কবি চৈতালী চট্টোপাধ্যায়ের ভাবনায় যতই বাস্তবের বিপন্নতা ডানা ঝাপটাক না কেন দিনের শেষে রোমাণ্টিক চৈতন্যের আত্মমগ্নতায় তার কবিতা হয়ে ওঠে ভালোবাসার চিঠি। রন্ধ্রে রন্ধ্রে ভয় চারিয়ে গেলেও সেই হাড়হিম করা আবর্ত থেকে বেরিয়ে এসে জীবনের আলো ধরতে তাঁর বিন্দুমাত্র সময় লাগে না। পজিটিভিজম তার মজ্জাগত এক অসুখের বিলাস। তাই আগামীকাল আরও একটা মৃত্যুমাখা সকাল দেখার মনখারাপ যতবারই তার কবিতায় উঠে আসে ততবারই নিকোনো উঠোনের শান্তির আশ্বাস নিয়ে কবি বলে ওঠেন, “এইসব সেরে গেলে/আমি বাড়ি ফিরবো।/পথেঘাটে রোদ্দুরমাখা লোকজনকে/ছুঁয়ে দেবো খানিক। ………শুধু, এইসব সেরে গেলে তোমার সঙ্গে কী করব ,/কাউকে বলব না” পূর্ণচ্ছেদ পড়ে না কবিতার শেষে। ভাবনাকে ভাসিয়ে দেন তাঁর নিজের নিয়মে। তবু অ-সুখ সময়ের “আন্ধার” হিংস্র সরীসৃপের মতোই কখন যেন সেঁধিয়ে যায় কবির মগ্ন চৈতন্যের পাতালে! যতই তিনি বড়াই করুন না কেন সমসময়ের কথা তিনি কিছুতেই কবিতায় বসাতে পারেন না, কিন্তু ধর্ষকামী এই সমসময় যেন বিকৃত উল্লাসে কবিতার টুঁটি চেপে ধরে! তাই অতিমারির আবহে লেখা কবির কবিতায় অসুখের ক্লিষ্টতা,মৃত্যুর অনিবার্যতা আর যাপনের বিরক্তি বারবার ঘুরেফিরে আসে। আঁশ বঁটির টাটকা রক্তে প্রতিটা ভোর ধুয়ে যায়, সুখের সময় যেন অসুখের শীতঘুমে পাশ ফিরে শোয়।

“এখন আনন্দের গায়ে মরামাস লেগে রয়েছে।

শ্যাম্পু করলে যাচ্ছে না।

এখন দুঃখের গায়েও দুঃখ,ফুঁ দিলে উড়ছে না।

প্রেম,কালো কুচকুচে ওই নিশিযাপনের

আতঙ্কে শুকিয়ে গেছে।

আঁশবটিতে এত রক্ত কেন গো?

আজ বহুদিন হল,আমরা তো অরন্ধনে থাকি” (অশৌচ)

 

অথবা

আকাশ ফুটো করলে আগে

গামলা গামলা শুধু আলো পড়ত।

এখন, ওষুধের বিজ্ঞাপন ! (ওয়েট আনটিল ডার্ক)

অতীতে টোকা মারলে যেখানে রূপকথারা ডানা বিছিয়ে বসত তাদের সুখ-অসুখের গল্প শোনাতে সেখানে আজ শুধুই ভয় আর আতঙ্কের লাভা স্রোত , “পুড়তে পুড়তে নামে, আমাকে ও পোড়ায় এখন”, সেই খাক হয়ে যাওয়া দগ্ধ হৃদয়ে আবেগহীন নিরুত্তাপে কবি আকাশমুখী ,

“একে একে নামডাকা হয়ে গেলে আকাশের দিকে রওনা দিচ্ছে বেঞ্চিতে

বসে-থাকা একেকজন।

ওপাশে পড়ন্ত নাভিশ্বাস।

এপাশে কান্নার আঁশ। (কোভিড-১৯)

কবিতার একেবারে শেষে এসে সম্বিত ফেরে, “আমাকে উড়ে যেতে তুমি /না দিও, লক্ষ্মীটি” চেনা পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাওয়ার ভয় জাপটে ধরে ! নিরন্তর মৃত্যু সংবাদে যখন নিজের বেঁচে থাকার আশ্বাসটাও টলে যায়,তখন প্রেমের কঠিন আলিঙ্গনে নিজেকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিতে চান কবি, মৃত্যুর প্রতিস্পর্ধী হয়ে ওঠে প্রেম ! পরিচিত জীবনের গন্ধকে কিছুতেই  হারিয়ে ফেলতে চান না,

“রক্তের গন্ধ,আমার নাক বন্ধ করে দেয়

সেই থেকে।

ঘ্রাণশক্তি নেই বলে,

মেঘ নামে নয়নের কোলে।

সেই মেঘ, যা আমাকে ,কিছুতেই সুখে থাকতে দেবে না। (সাইনাস)

 

সময়ের সুখ অ-সুখের টানাপোড়েনে “আকাশ আজ অনেকটা নীচে নেমে এসেছে।” কবির মনে হচ্ছে …… “আরেকটু নেমে এলেই দমচাপা হয়ে আমরা ঠিক মরে যাব”। বাধ্যতামূলক লকডাউনের সঙ্গে মৃত্যু-নিঃশ্বাস অবিরত আতঙ্ক ছড়ায়, জনহীন পথঘাট গলির মোড়ে মন-খারাপেরা জটলা করে। অসুখের দিনগুলো রক্তহীন বিবর্ণতায় পান্ডুর ! নীল প্লাস্টিকে মোড়া প্রিয়তম বঞ্চিত হয় শেষ চুম্বন থেকে। রাত্রির বুক চিরে সাইরেনের শব্দে খানখান হয়ে যায় ফেলে আসা গেরস্থালী, অন্ধকার নিঃসঙ্গতায় শেষযাত্রার প্রণামটুকু সেরে ফেলতে হয় ভার্চুয়ালি। চেনা মুখগুলো হারিয়ে ফেলার অবসন্নতায় বিষাদ নামে।

“যখন সে ছিল,

হয়তো ছিল না,

তবুও ঘরদোর উপচে যেত।

লিলি ধরত। চাইনিজ বাঁশ। জবার টুকটুকে রং।

ছবি তুলে পাঠাতাম ওকে।

………………………। আর,

বুনত আলিঙ্গন ,অঙ্গবিহীন, আমাদের।

……………… আজ নেই।

(কবিতা,প্যান্ডেমিক)

 

আজ নেই মানে ? বিপন্ন এই জিজ্ঞাসার উত্তর নেই ! নিরুত্তর সময়ের লজ্জাহীনতায় কুন্ঠিত কবির কবিতা।

 

“নেই মানে, এক-মেডিক্যালকলেজ -দূরত্বে বসে আছে

মারি ও মড়ক নিয়ে, সে।

বস্তাবন্ধ লাশেদের নিয়ে।

সোঁ সোঁ শব্দে রাগ ফুটছে তার মন থেকে,

 

কবিমন বুঝে নিয়েছেন, “জানি তো, কোনদিন দেখা হবে না”(কবিতা ,প্যান্ডেমিক)।

 

আদতে কবি চৈতালী সবসময়ই ছুঁয়ে থাকেন রোমান্টিকতার একটা লোপ্রোফাইল টিউন। যদিও সাড়ম্বরে নয়, এমনটাই তাঁর কবিতার দাবি। তিনি মনে করেন, যতই একপৃথিবী পূঁজরক্ত অসুখবিসুখ নেমে আসুক না কেন, তবু বেঁচে ওঠার মন্ত্রেই তাঁর আস্থা। তাই মৃত্যুবিলাসী সেই মারির আবহে তিনিও প্রেতের মতো ঘুরে বেড়ান  অতিমারীর চক্রব্যূহ থেকে নিষ্ক্রমণের অলিগলি। সময় তাঁর কবিতার কাঁধে হাত রেখে বলে,

“দেখতে পাচ্ছেন না, আজ,অর্ধেক মানুষ বেঁচে নেই,

আমরাও……! (নির্বাচিত প্রেমের কবিতা)

 

অথবা

আকাশ ঘুরপথে নেমে এসে রাস্তায়

ভয় ও আতঙ্ক বিছিয়েছে। (ট্রমা)

 

কবিতার নামের মতোই ট্রমাটাইসড একটা সময় ! এবং সেই সময়ের আবহে লেখা কবি চৈতালীর প্রায় প্রতিটি কবিতাতেই একটা বাকরুদ্ধ অসহায়তা আমাদেরও কোথাও ভয় পাইয়ে দেয়। কখনো বা বিরক্তির সংক্রামক ভাইরাস চারিয়ে  “ঘুম পাড়িয়ে রেখে দেয়”। আমডালের স্বাদ আর মুঠোয় ভরা বিশ্বের ভয় কবিতায় ঢেলে দেয় বীভৎসরস।

তবু সময়ের অন্ধকারে বসত করেও তাকে টপকে গিয়ে আলো ধরতে চাওয়া কবির বরাবরের ইচ্ছে। তাই কবিতায় অলীক সৌন্দর্যকে টেনে নামিয়ে আনেন অনায়াসে। ধুলোমলিন পৃথিবীকে চকচকে পালিশ করে ,

-আবার পায়ে গলিয়ে হাঁটতে বেরোব।

তোমার সঙ্গে।

মাঝে শুধু আলোহীন কয়েকটা দিন” (লকডাউন)

অথবা

কিছু প্রণয়ের গোপনতা ভাঁজ করে ভাতের হাঁড়িতে ঢেকে রেখে দিয়ে

গেলে,

মনে হয়,

থেকে যাবে…………(ট্রমা)

 

তবু আলোয় ফেরার গল্প শুনিয়েছেন প্যান্ডামিক সিচ্যুয়েশনেও। সময়ের বিষাদ ছাড়িয়ে ভাবতে চায়, ফুটফুটে হবে কথা ছিল! ক্যালেণ্ডারের থেকে বড়োদিন খুঁটে তুলে ফেলে দিলেও  বকুলফুল, কলেজস্ট্রীট, পুরোনো নিউমার্কেট, দাশ কেবিন ছুঁয়ে দেখা জীবনের এই চেনা ছবিগুলো অ-সুখ থেকে সেরে ওঠার মন্ত্র শুনিয়ে যায় তাকে ,

সেরে ওঠো……

শুধু, এইসব সেরে গেলে তোমার সঙ্গে কী করব,

কাউকে বলব না (এইসব সেরে গেলে)

 

কী অসম্ভব এক রোমান্টিক প্যাশন নিয়ে কবিতাটা শেষ হয়। শুধু কবিতা কেন, আবার এক থালা আলোর মতোই পৃথিবী হেসে উঠবে! এই স্বপ্ন দেখতে দেখতেই এক কবিতা থেকে আরেক কবিতায় কবি ছুটে যান বেঁচে ওঠার শান্তিজল নিয়ে,

কিন্তু ফের বেঁচে ওঠার মন্ত্রও,

প্রাচীন গাছপালা,খালবিলের জল,হলুদ খড়খড়ে বইপত্রের তাপ আর

ভবিষ্যৎ,

এরা সবাই মিলে আবার আমাদের গায়ে

ছিটিয়ে দিল (প্যান্ডেমিক)

গায়ে মনে অন্ধকার জড়িয়ে থাকে মানুষগুলো আবার রোদ্দুর ছুঁয়ে দেখবে। আর সেদিন “গাছতলা ঘেঁটে বকুলফুল কুড়োব”।

 

 

 

CATEGORIES
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)
demon slauer rule 34 lena the plug leak amateurtrheesome.com cumming in milfs mouth mujer haciendo el amor a un hombre, belle delphine of leaked emma watson in porn xxxamat.com big booty in public hidden cam gay sex, sit on face porn g a y f o r i t forcedpornanal.com please screw my wife female celebrity sex tapes