
অরুণ কোলাৎকর-এর কাব্যগ্রন্থ ‘জেজুরি’ ভূমিকা ও অনুবাদ- দীপকরঞ্জন ভট্টাচার্য
অরুণ কোলাৎকারের জন্ম ১৯৩২ সালে মহারাষ্ট্রের কোলাপুরে। ১৯৪৯ সালে তিনি জে জে স্কুল অব আর্ট-এ ভর্তি হন এবং ১৯৫৭ সালে তাঁর ডিপ্লোমা সম্পূর্ণ করেন। এর মধ্যেই তিনি গ্রাফিক শিল্পী হিসেবে যথেষ্ট পরিচিত। মুম্বাইয়ের সফলতম শিল্পনির্দেশক এবং একজন ভবিষ্যদ্ দ্রষ্টা হিসেবে বিপুল খ্যাতি পান তিনি। ১৯৬৩ সালে ভাই মকরন্দ এবং ঔপন্যাসিক মনোহর ওক-এর সঙ্গে প্রথম জেজুরি যান কোলাৎকার। এর প্রায় দশ বছর পর 'জেজুরি' শিরোনামের কবিতাগুচ্ছটি লেখেন তিনি। মারাঠি এবং ইংরেজি, দুটি ভাষাতেই কোলাৎকার কবিতা লিখেছেন। 'জেজুরি'-র মতো ধারাবাহিক কবিতা ইংরেজিতে তিনি আগেও লিখেছেন। 'বোটরাইড' প্রকাশিত হয় অরবিন্দ মেহরোত্রা সম্পাদিত 'damn you/ a magazine of arts' পত্রিকায়। 'কালা ঘোড়া' কবিতাগুচ্ছ এবং রাজনৈতিক-পৌরাণিক কবিতাগুচ্ছ 'সর্প সত্র' যখন প্রকাশ হচ্ছে, কোলৎকর তার সম্ভাব্য মৃত্যুর কথা জেনে গেছেন। ২০০৪ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মারাঠি কবিতাসংকলন "ভিজকি বহি"-র জন্য ২০০৫ সালে মরণোত্তর সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন।
জেজুরি:
.
আঙুরের মতো মিষ্টি
জেজুরির এই পাথর
চৈতন্য বলে
একটুকরো পাথর সে
খপ করে মুখে পুরে নেয়
আর থুঃ থুঃ করে ছড়িয়ে দেয় সমস্ত দেবতা
আশ্চর্যরকম সরল অথচ বিস্ময়করভাবে তীব্র ‘জেজুরি’ শিরোনামের কবিতামালাটি ভারতীয় কবিতায় নতুন একটি ধারার জন্ম দিয়েছে। জেজুরি, কবি অরুণ কোলাৎকর-এর নিজের রাজ্য মহারাষ্ট্রের এক তীর্থস্থান, এবং ‘জেজুরি’ কবিতাবইটি সেই মন্দির-শহরের একটি ট্রাভেলগ বলা যেতে পারে। প্রথম কবিতাটি শুরু হচ্ছে সরকারি বাসে জেজুরি পৌঁছোবার বর্ণনা নিয়ে এবং শেষ কবিতাটিতে আছে ট্রেনে জেজুরি থেকে ফিরে আসার কথা। ভারতবর্ষ ভক্তিমার্গের দেশ, এ’কথা আমরা জানি – ‘জেজুরি’ পড়তে গিয়ে পাঠক দেখতে পান এই ভক্তিভাবকে কীভাবে প্রায় জোর করে আমাদের অর্থনীতির মধ্যে ঠেসে দেওয়া হয়েছে – কীভাবে প্রতিদিনের রুজিরোজগারের জন্য মানুষ নগ্নভাবে এই ভক্তিভাবকে ব্যবহার করে চলেছে:”খাণ্ডবার মেয়েদের গায়ে হাত যেন না পড়ে/
বুড়ো লম্পট কোথাকার/ আগে তোমার টাকার রং দেখাও আমাদের”।
.
এই কবিতা ধারাবাহিকে জেজুরির পবিত্রতার বিপরীতেই তার স্থূল বাণিজ্যিকতার ছাপ রয়ে গেছে, প্রাচীনতা ও সহিষ্ণুতার পাশাপাশিই ধরা আছে তার আধুনিক এবং জীর্ণ বর্তমানও – একইসঙ্গে একরাশ বৈপরীত্য নিয়ে যেন দাঁড়িয়ে আছে জেজুরি:”কোনো ফসল নেই এখানে/এক ভগবান ছাড়া/ আর এখানে ভগবানের চাষ চলে/ সারা বছর জুড়ে/ দিবারাত্রি/ রুখো ফাটা জমি আর/ কঠিন পাথরে”।
.
এই কবিতামালাটি যেন ঈশ্বরের সঙ্গে তর্কযুদ্ধে নামা এক উন্মুক্ত মানুষের আত্মিক, সেই সঙ্গে আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান – প্রতি মুহূর্তে ঐশ্বরিক চিহ্নগুলি খুঁজে পাবার আন্তরিকতা যেখানে ক্ষয়িষ্ণু আর বিনিময়মুখর পৃথিবীতে এসে ধাক্কা খায়। The Oxford India Anthology of Twelve Modern Indian Poets সংকলনের সম্পাদক অরবিন্দ মেহরোত্রা ‘জেজুরি’ প্রথমবার প্রকাশিত হবার প্রায় ষোলো বছর পরে লেখেন, ” ভারতবর্ষে গত চল্লিশ বছরে লিখিত কবিতাগুলির মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ” কবিতা জেজুরি কবিতামালা – “জেজুরি-র মূল দেবতা তো খাণ্ডবা নন – মানুষের চোখ।”
.
প্রকাশ:
১৯৭৪ সালের প্রথমদিকে Opinion Literary Quarterly পত্রিকায় এই কবিতাগুচ্ছ প্রকাশ হয়। পরে ১৯৭৬ সালে এই কবিতাগুচ্ছটি বই হিসেবে প্রকাশ পায়। এই বইটি Commonwealth Poetry পুরস্কার পায়।
শৈলী :
“জেজুরি” কাব্যগ্রন্থের উচ্চারণ বৌদ্ধিক এবং এর স্বর এক কথায় অশ্রুতপূর্ব। জেজুরি কবিতাবইয়ের ছত্রে ছত্রে শ্লেষের জমক। এর উচ্চারণ যত মেধাবী ততই কৌতুকময় – পথচলতি লব্জের পাশেই এক বিষাদের চোরা স্রোত বইছে এখানে – গদ্য চালে কোনো বর্ণনার মাঝেই আছে অপরিকল্পিত অন্ত্যমিল, বর্ণনার খাড়াই পথের পাশেই হঠাৎ একঝলক মায়ার আবডাল। তবে তা একটিমাত্র ঝলকই –এখানে আবেগের কোনো বাড়াবাড়ি পাঠক কোথাও খুঁজে পাবেন না। এমন এক তীক্ষ্ণ, মেধাবী ও নানান দিকে আলো-চোয়ানো ভঙ্গিকে অনুবাদে আরও একবার কবিতায় তুলে আনা তাই দুরূহ এক কাজ।
.
লেখাগুলির স্বর আদ্যন্ত শহুরে এবং প্রাত্যহিক। E.E.Cummings, William Carlos Williams, Marianne Moore এবং বিট প্রজন্মের কবিদের প্রভাব অরুণ কোলাৎকার সহ এ কে রামানুজন, অরবিন্দ মেহরোত্রা এবং অন্য সব ইংরেজি ভাষার ভারতীয় কবিদের ক্ষেত্রেই লক্ষ করা যায়। তাঁদের মূল যুদ্ধ ছিল ‘রানির ভাষা’র থেকে দূরে গিয়ে, শ্রী অরবিন্দের ‘সাবিত্রী’র সুরেলা উচ্চারণ কিংবা গীতাঞ্জলির (অনুবাদের) সর্বব্যাপী উচ্চারণভঙ্গি থেকে সরে, এক নাগরিক রুক্ষতায় ভারতীয় ইংরেজি কবিতাকে দাঁড় করানো। বেশিরভাগ সময়েই সম্পূর্ণ ইংরেজি কবিতাটিতে বড়ো হরফের কোনো ব্যবহার নেই, কোনো যতিচিহ্ন নেই – ছোটো ছোটো তিনটি লাইনের একটি স্তবক দিয়ে অনেক সময় কবিতাগুলি সাজানো হয়েছে।

.
পত্রপত্রিকায় আলোচনা:
“জেজুরি’র প্রাণবন্ত, খোলাচোখ, গভীর অনুভূতিলব্ধ কবিতাবলয়টি, ভারতের আধুনিক ধ্রুপদী সাহিত্যের অংশ হিসেবে বহুল স্বীকৃত।… এটি আধুনিক ভারতীয় সাহিত্যের এক শ্রেষ্ঠ রত্ন।”
— সালমান রুশদি
.
“কখনো মহৎ এবং ব্যঙ্গাত্মক, কখনো কৌতুকভরা এবং দূরদর্শী, খানাখন্দের কাছাকাছি তবু নক্ষত্রময় দৃষ্টি, কোলাৎকার বহুদিন ধরেই এই শহরের ঔপন্যাসিকদের তুল্য কিংবা তাদের শ্রেয়তর। ‘মিডনাইটস চিলড্রেন’ বা একই উচ্চতার কোনো সাহিত্য সন্তানের পাঠকদের তাই কোলাৎকারকেও জানতে হবে।”
— বয়েড টঙ্কিন, দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট
.
.
বাস১
.
রাজ্য পরিবহনের বাসের জানলার
ত্রিপলের ঢাকনিগুলো সেই জেজুরি অবধি
বোতাম আঁটা ছিল।
.
কনকনে একটা হাওয়া ঢাকনাটাকে
উড়িয়ে নিয়ে আছড়ে ফেলছিল
তোমার কনুইয়ের কাছে।
.
গড়গড়ে রাস্তাটার দিকে তাকিয়ে আছ তুমি।
বাস থেকে চোয়ানো সামান্য একটু আলোয়
তুমি ভোরের আলো খুঁজে নিতে চাইছ।
.
তোমারই ভাঙা মুখ এক বৃদ্ধের
নাকে-ঝোলা চশমার দুই কাচে
তোমার দেখা গ্রামগঞ্জের ছবি বলতে এটাই।
.
বুড়ো লোকটার ভুরুজোড়ার মাঝের
বংশতিলক২ পেরিয়ে এক ঠিকানার দিকে
ক্রমশ পৌঁছে যাবার কথা তোমার।
.
বাইরে, চুপচাপ সূর্য উঠে গেছে।
ত্রিপলের ছোট্ট চোখ দিয়ে
সোজা এসে গিঁথেছে সেই বৃদ্ধের চশমায়।
.
এক টুকরো রোদ শান্তভাবে
ড্রাইভারের ডান কপাল ছুঁয়ে দিল।
বাসটা মনে হয় দিক বদল করছে।
.
রামঝাঁকুনির সেই রাস্তার শেষে
দু’দিকেই তোমার এই শ্রীমুখ রেখে
যখন তুমি বাস থেকে নামলে
.
ওই বুড়ো লোকটার মাথার মধ্যে পা রাখনি তুমি।
.
(The Bus)
.
পুরোহিত
.
সাঁকোর ঠান্ডা পাঁচিল বেদির ওপর
গোড়ালি আর পাছার অর্ঘ্য নিয়ে
ওই যে পুরোহিত অপেক্ষা করে।
.
বাস কি আজ কিছুটা দেরিতে?
পুরোহিত ভেবে মরে।
আজ কি একটা পুরন পুলি৩ জুটবে তার থালায়?
.
খড়খড়ে শিশিরভেজা, পাথরের খাঁজে হাত রেখেই
তার পুরুষ-থলি দুটিকে দ্রুত ভিতরে টেনে
সূর্যের দিকে মাথা উঁচু করে সে
.
দৃষ্টির বাইরে চলে যাওয়া
মরা মানুষের তালুর ভাগ্যরেখার মতো
ঘটনাবিহীন দীর্ঘ রাস্তাটার দিকে তাকাতে।
.
রোদের ঝাপট পুরোহিতের মাথা
আর গালদুটোয় থাবড়া বসায়
গ্রামের চেনা নাপিতটার মতো।
.
তার জিভের ওপর ঘুরছে তো ঘুরছেই
ওই যে সুপুরির কুচি
ওটা একটা মন্ত্র।
.
ওতে কাজ হয়।
বাসটা আর তার মাথার মধ্যে নেই এখন।
ওই তো দূরে ওটা বিন্দুর মতো দেখা যায়
.
আর তার ঢিলে গিরগিটি চোখের সামনে
সেটা বড়ো হতে থাকে
ধীরে তার নাকের ওপর একটা জরুলের মতো।
.
ধড়াস দমাস করে একটা গর্ত পেরিয়ে
গোঙাতে গোঙাতে পুরোহিতকে টপকে যায় বাস
লোকটার চোখদুটো নীলরঙে ছুপিয়ে।
.
গোল হয়ে ঘুরে আসে বাসটা।
বাস-স্ট্যান্ডের ভিতর গিয়ে থামে আর
পুরোহিতের মুখোমুখি হয়ে হালকা গড়গড় করে চলে।
.
মুখে সেটার এক বিড়ালহাসি৪
আর দাঁতের দু’পাটির মধ্যে ধরা
তাজা, অবিলম্বে ভোগ্য এক তীর্থযাত্রী।
.
( The Priest)
.
ধ্বংসের কোল
.
ছাত ভেঙে একেবারে শ্রীহনুমানের মাথাতেই।
কেউ তাতে কিছু মনে করেনি।
.
স্বয়ং মারুতিদেব৫ করলেও না হয় কথা ছিল।
হয়তো মন্দিরের এই দশাতেই তিনি বেজায় খুশি।
.
রাস্তার একটা মাদিকুকুর
তার আর বাচ্চাদের আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে
.
ধ্বংসের এই কোলে।
হয়তো মন্দিরের এই দশাতেই সে বেজায় খুশি।
.
ভাঙা টালিতে ছত্রখান দরজার ও’পাশ থেকে
কুকুরটা সাবধানি চোখে খেয়াল রাখছে তোমার।
.
ছানারা সবাই উপুড় হয়ে আছে তার গায়ে।
হয়তো মন্দিরের এই দশাতেই তারা বেজায় খুশি।
.
কালো-কানঅলা বাচ্চাটা বেশ একটু দূরে চলে গেছে।
একটা টালি তার পায়ে খড়মড় করে উঠল।
.
একটা গোবর-পোকার পক্ষে যথেষ্ট
এতেই ভয়ে কেঁপে উঠে
.
আড়াল খুঁজতে ভাঙা
প্রণামী বাক্সটার নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে গুম হয়ে যাওয়া
.
ছাতের সাতমনি বিমের চাপ সামলে
সে বেচারা বাইরে বেরোনোর সুযোগই পায়নি কখনো।
.
পুজোআর্চার জায়গা আর নয় এইটা
এ সাক্ষাৎ ভগবানের বাড়ি ছাড়া কিছু নয়।
.
(Heart of Ruin)
দোরগোড়া
দোরগোড়া নয় ওটা।
একটা থাম দাঁড়িয়ে আছে ওর এক পাশে।
আজ্ঞে হ্যাঁ।
শুধু একটা থাম।
.
(The Doorstep)
.
জল সরবরাহ
.
একটা জলের পাইপ
ভিতের ওপর দিয়ে ছুটে
বাড়িটাকে কোনাকুনি ঘুরে
হঠাৎ মরণ-থামা থেমে
খাড়াই ওপরে উঠে
দেয়ালের গা ঘেঁষে
আবার একইভাবে ফিরে এসে
মোচড় দিয়ে ঘুরে
আচমকা থমকে যায়
ঘাড়ভাঙা এক পিতলের নেংটির কাছে
.
কখনো না জেনেই
পরিস্থিতির কোন চক্করে
একটা সমর্থ জাঁতাও
বাকি জীবনটা কাটায়
শুকনো এক জলের কলের তলায়
.
(Water Supply)
.
দরজা
.
ক্রুশ থেকে অর্ধেকটা
নামিয়ে আনা হয়েছে নবিকে।
ঝুলন্ত এক শহিদ।
.
একটা কবজা যেহেতু ভেঙেছে
মধ্যযুগের এই ভারী দরজাটা
ঝুলে আছে একটামাত্র কবজায়।
.
একটা কোণ রাস্তার ধুলোয় গা ঘষছে।
অন্য কোণটা ঠোকর খাচ্ছে
উঁচু গোবরাটে।
.
কোনো স্মৃতি যেমন সময়ের সঙ্গে
তীব্রতর হয়ে ওঠে,
আঁশগুলো মনে করাচ্ছে গাছপালার
.
যাবতীয় রেখার ইতিকথা
যেন পেশীবহুল ছাল-ওঠা কোনো মানুষ
শরীরবিদ্যার বইতে যে কোনোদিন ফিরে যাবে না আর
.
তাই শান্ত হতে ঝুঁকে পড়েছে
পুরোনো কোনো দরজায়
এলাকার মাতালের মতো।
.
চুলোয় যাক কবজা আর বাদ দাও ওই বাজুর কথা।
অনেক অনেক আগেই হয়তো
দরজাটা সটান হাঁটা দিত
.
যদি ওই দু’প্রস্ত
জাঙিয়া ওর গায়ে
শুকোতে মেলে দেওয়া না থাকত।
.
( The Door)
.
চৈতন্য৬
উঠে এসো
পাথরটাকে চৈতন্য
পাথরের ভাষায় অনুরোধ জানাল
.
মুখ থেকে লাল রংটা মুছে ফেল
ওতে মানাচ্ছে না বোধহয় তোমাকে
বলছি ক্ষতি কী এমন
শুধু একটা পাথর হয়ে থাকায়
তোমার জন্য তবু ফুল এনে দেব
গাঁদা ফুল তোমার খুব পছন্দের
তাই না
আমিও খুব গাঁদা ভালবাসি
.
(Chaitanya)
.
একটা নীচু মন্দির
.
একটা নীচু মন্দির তার দেবতাদের অন্ধকারে রাখে।
পুরোহিত মশাইকে তুমি একটা দেশলাইবাক্স ধার দাও।
একে একে দেবতারা আলোকপ্রাপ্ত হন।
আহ্লাদি ব্রোঞ্জ। হাসিখুশি পাথর। বিস্ময়হীন।
এক মুহূর্তের জন্য একটা দেশলাই কাঠির আয়ু
ইঙ্গিতের পর ইঙ্গিত জাগিয়ে শেষে নিভে যায়।
ভঙ্গির পর মৃত ভঙ্গি খুঁজে পাওয়া যেতেই
তারা আবার হারিয়ে যায়।
কে ছিলেন ইনি, তুমি জানতে চাও।
অষ্টভুজা দেবী, পুরোহিত উত্তর দেন।
একটা অবিশ্বাসী দেশলাই কাঠি হেঁচকি তোলে।
তুমি তো গুনতে পারো।
দেবীর আঠারোটা হাত, তুমি প্রতিবাদ জানাও।
ব্যাপার একই পুরোহিতের কাছে দেবী সেই অষ্টভুজাই।
রোদ্দুরে বেরিয়ে এসে তুমি একটা চারমিনার৭ ধরাও।
কুড়ি ফুটের কচ্ছপটার৮ পিঠের ওপর বাচ্চারা খেলছে।
.
(A Low Temple)
.
নকশা
.
কুড়ি ফুট কাছিমটার
পিঠ জুড়ে৮
এক টুকরো চক দিয়ে
চৌখুপি মতন একটা নকশা
কোনো বুড়োলোক গতকাল নিশ্চয়ই
এঁকে রেখে গেছে
অস্পষ্ট হতে হতে
ক্রমশ সেটা মিলিয়ে যাচ্ছে
শিশুদের খালি পায়ের ছোটাছুটিতে
.
(The Pattern)
.
অশ্বখুর পীঠ
.
পাথরের ওই খাঁজ
মেরেছিল চাঁট অশ্বমহারাজ পাহাড়ের এক পাশে।
এই এখানেই গেঁথে
দুর্মর খুর তার
.
যেন বিদ্যুৎচমক
খাণ্ডবাজী৯ যখন
বধূকে জিনে বসিয়ে পাশাপাশি১০
তার নীল ঘোড়াটাতে
.
লাফিয়ে উপত্যাকা
তিন প্রাণী যান তারা
অন্য উপত্যকায়
যেন ফুলঝুরি বার
.
হল চকমকি থেকে।
বাড়িতে অপেক্ষা
পাহাড়ের ওই পারে
যেন বা বোঝাই খড়।
.
( The Horseshoe Shrine)
.
মনোহর১১
দরজা খোলাই ছিল।
মনোহর ভাবল
এটা আরো একটা মন্দির।
উঁকি দিল মনোহর।
কে জানে
এবার কোন দেবতার দেখা পায়।
চট করে ফিরে আসে সে
আয়ত চোখের এক বাছুর যখন
ঘুরে তাকে দেখে।
.
আরে এটা মন্দির নয়,
মনোহর বলে,
শুধু একটা গোয়াল।
.
(Manohar)
.
এক বৃদ্ধা
.
এক বৃদ্ধা তোমার
জামার হাতাটা খামচে
তোমার সঙ্গে হাঁটতে থাকে।
.
একটা আধুলি তার চাই।
সে বলছে তোমাকে
অশ্বখুরপীঠ ঘোরাবে।
.
তুমি দেখেই নিয়েছ সেটা।
সে তবু থপথপিয়ে হাঁটে
ক্রমশ চেপে ধরে তোমার জামার হাতা।
.
তোমাকে ছাড়বার পাত্রী সে নয়।
বুড়ি মানুষেরা কেমন তোমার জানাই আছে সেটা।
তোমার সঙ্গে এঁটে থাকবে যেন চোরকাঁটা।
.
তুমি ঘুরে দাঁড়িয়ে মুখোমুখি চাও
একটা হেস্তনেস্ত করতে।
এই প্রহসন এখানেই শেষ হোক।
.
যখন শুনলে সে বলছে,
“একটা বুড়ি মানুষ আর কী করবে বাবা
এমন এক হাভাতে পাহাড়ে?”
.
তুমি সোজা আকাশে তাকালে।
স্পষ্ট দুটো বুলেট-ফুটো দিয়ে
চোখ বলে তার যা আছে আসলে।
.
আর তাকিয়ে থাকতে থাকতেই
ফাটলগুলো চোখের পাশ থেকে
তার চামড়া ছাড়িয়ে গেল।
.
আর পাহাড়গুলোতে ফাটল।
আর মন্দিরেতে ফাটল।
আর আকাশ ভেঙে পড়ে
.
ভারী কাচ ভাঙার শব্দ করে
না-ভাঙুনে বুড়ির চারপাশে
একা যে দাঁড়িয়ে আছে।
.
আর তুমি নেহাতই
খুচরো যত পয়সা তার
বাড়িয়ে ধরা হাতের।
.
(An Old Woman)
.
চৈতন্য
.
আঙুরের মতো মিষ্টি
জেজুরির এই পাথর
চৈতন্য বলে
.
একটুকরো পাথর সে
খপ করে মুখে পুরে নেয়
আর থুঃ থুঃ করে ছড়িয়ে দেয় সমস্ত দেবতা
.
(Chaitanya)
.
পাহাড়গুলো
.
পাহাড়গুলো
রাক্ষসদল১২
বালিঝরা কাঁধে
থরে থরে স্লেটপাথর
.
রাক্ষসদল
পাহাড়গুলো
পাথরের পাঁজর ফুঁড়ে
ক্যাকটাস জেগে
.
পাহাড়গুলো
রাক্ষসদল
স্ফটিক হাঁটু
চুনাপাথরের কোমর
.
রাক্ষসদল
পাহাড়গুলো
ক্যাকটাসের শ্বদন্ত
আকাশের মাসে
.
পাহাড়গুলো
রাক্ষসদল
শিরদাঁড়াটা
ধাপকাটা সিঁড়ি
.
রাক্ষসদল
পাহাড়গুলো
রোদের আঁচড়
বালিপাথরের ঊরুতে
.
পাহাড়গুলো
রাক্ষসদল
গ্র্যানাইট শ্রোণি
ভাঙা খিলান
.
রাক্ষসদল
.
(Hills)
.
পুরোহিতের ছেলে
.
এই পাঁচটা পাহাড় হল
পাঁচ রাক্ষস
খাণ্ডবাজী যাদের বধ করেছিলেন
.
পুরোহিতের ছেলেটা বলে
বয়স নেহাতই কম
ইশকুলের ছুটি চলছে
তাই সারথি হয়ে সঙ্গে এসেছে
.
এই গল্পটা সত্যিই বিশ্বাস কর
ওকে জিজ্ঞেস কর তুমি
.
ও চুপচাপ
কিন্তু দেখে মনে হয় অস্বস্তিতে
কাঁধ ঝাঁকিয়ে অন্যদিকে তাকায়
.
আর এক নিমেষে
একটা নড়াচড়া খেয়াল করে
রোদে আঙার হয়ে যাওয়া
এলোখেলো এক চিলতে ঘাসঝোপে
আর বলে ওঠে
.
দেখো দেখো
ওই যে একটা প্রজাপতি
ওইখানে
.
( The Priest’s Son)
.
প্রজাপতি
.
ওর আড়ালে কোনো গল্প নেই।
এক সেকেন্ডের মতো ছিন্ন ও।
নিজেরই কাছে ওর ঘুরেফিরে আসা।
.
ওর কোনো ভবিষ্যৎ নেই।
কোনো অতীতের বুড়ি ছুঁয়ে নেই ও।
এই সময়ের মুখে যেন এক শ্লেষ।
.
ও এক ছোট্ট হলুদ প্রজাপতি।
এই হাভাতে পাহাড়গুলোকে ও
ওর পাখনার তলে রেখেছে।
.
এক চিলতে হলুদ মাত্র,
খুলতে না খুলতেই বন্ধ
আর বন্ধ হতে না হতেই খো
.
গেল কোথায়
.
( The Butterfly)
.
একটা আঁচড়
.
ভগবান কী
আর পাথরই বা কী
দুয়ের কোনো তফাত
যদি থাকেও কোথাও
তা একেবারে চুলের মতো
এই জেজুরিতে
আর প্রতি দ্বিতীয় পাথরটাই
হয় ভগবান নয় তার তুতো ভাই
.
কোনো ফসল নেই এখানে
এক ভগবান ছাড়া
আর এখানে ভগবানের চাষ চলে
সারা বছর জুড়ে
দিবারাত্রি
রুখো ফাটা জমি আর
কঠিন পাথরে
.
ওই যে পাথরের বিশাল ঢিবি
শোবার ঘরের মাপে
ওটা পাথর হয়ে যাওয়া খাণ্ডবাজীর স্ত্রী
টানা ওই যে চিরটা
ওটা খাণ্ডবার বিশাল তরোয়ালের ক্ষত
একবার রাগের মাথায়
যার এক আঘাতে খাণ্ডবা তাকে ধরাশায়ী করে
.
একটা পাথর চিরে দাও
লাফিয়ে উঠুক কিংবদন্তি
.
(A Scratch)
.
আজামিল আর বাঘেরা
.
বাঘের দল তাদের রাজার কাছে গেল
বলল, “আমরা উপোস করে মরছি মহারাজ।
কোনো খাবার জুটছে না আমাদের,
এক কামড়ও নয়,
১৫ দিন আর ১৬ রাত গত।
আজামিল১৩ ভেড়া পাহারার
একটা নতুন কুকুর পুষেছে।
সে আমাদের সব ফন্দি বাঞ্চাল করে
মাংসের এক মাইলের মধ্যেও
আমাদের ঘেঁষতে দিচ্ছে না।”
.
“এ তো জঘন্য ব্যাপার হে,”
বাঘরাজ বলে।
“আগে কেন আসনি তোমরা আমার কাছে?
একটা মোচ্ছবের আয়োজন করো।
ওই ভেড়ুয়া-কুকুরটাকে এমন শিক্ষা দেব কোনোদিন ভুলবে না।”
“শুনুন, শুনুন,” বাঘের দল করল গুনগুন।
“সাবধান,’ রানি গড়গড় করে।
কিন্তু সে কখন বেরিয়ে গেছে,
একা
ভোর হবার আগের অন্ধকারে।
.
এক ঘণ্টা না যেতেই সে এল ফিরে,
সেই যে ভালো রাজা।
চোখের ওপর কালশিটে দাগ তার।
ফাঁসে ঝোলানো লেজা।
আর বলল, “সমস্তটাই এই অধম ছকে রেখেছে
এখন যখন জানাই গেছে দেশের সবটা মিছে।
আমাদের সবারই চেষ্টার দরকার।
ওই শুয়ারের বাচ্চাকে করব গুনতিতে বাজিমাত।
এবার চলবে না হওয়া বেমক্কা কুপোকাত।
কারণ এবার আমিই সেনাপতি দেব ছিঁড়েখুঁড়ে।”
.
ভেড়া তাড়ানো কুকুরটা
ছিল বজ্রচকিত।
বাঘের দলকে সে বন্দি করল,
৫০ বাঘ আর রাজাবাঘ যেটা.
তখনও নেই কোনো থাবার ক্ষত
একটা ভেড়ার গায়েও।
ওদের আদৌ কোনো সুযোগই হয়নি।
একটি কুকুর ছিল ৫১ খানেই।
তাদের সবকটাকে বনফুলের দড়িতে বেঁধে
মালিকের সমুখে সেই গাদা দিল উগড়ে।
.
“একটা কুকুর পেয়েছ বটে, আজামিল,”
বাঘরাজা বলল।
শরীরে যেন নেই তালমিল
এক পাটি দাঁতও থুঃ করে দিল ফেলে।
“কোথাও একটা হয়েছে বুঝলে বোঝাবুঝির ভুল।
এক দানেতেই দিতে পারতাম গোটা দলটাই সাবড়ে।
আমরা চাইনি ভেড়ার পালে ঝাঁপ দিতে গুড়ি মেরে।
মা ফলেষু – উপায়টাকেই শ্রেষ্ঠতর ভাবি যে।
আমরা এলাম বন্ধু হিসেবে তোমাকে আজ পেতে।
তিন সত্যি বলছি দিব্যি গেলে।”
.
পাহারাদার ওই কুকুর এমনই স্বভাব তার
সারা জীবনে একটা ঝুটাও মুখে হয়নি বার।
সে আসলে সরলরেখায় গড়ে উঠেছিল
সোজা কথায় সে হল তিতিবিরক্ত।
ক্ষিপ্ত হয়ে সে নানান ভঙ্গি জুড়ে দিল।
কিন্তু আজামিল, ভালো মেষপালক
জোর করেই অন্যদিকে চেয়ে ছিল
আর দেখাল প্রতিটি কথাই কত না বিশ্বাসজনক
বাঘরাজ যা কিছু করল ব্যক্ত।
আর ভাবখানা সব মিথ্যেই যেন সে বেবাক গিলে নিল।
.
আজামিল তাদের বাঁধন খুলে দিল
আর তাদের সবাইকে রাতের খাবারে দাওয়াত দিল।
এই প্রস্তাব পায়ে ঠেলা বাঘেদের সম্ভব ছিল না।
ভেড়ার মাংসের চপ আর কাবাব সেবন করে,
যখন আজামিল তাদের
দীর্ঘমেয়াদি বন্ধুচুক্তি সই করতে বলে,
এক জোটে সবাই গর্জন করে ওঠে,
“বটে বটে, এর উত্তম আর কী হতে পারে।”
আর শপথ নিল সারাজীবন হলায় গলায় থাকবে
কাঁটাচামচ ছুরিটা যখন নামিয়ে তারা রাখছে।
.
আজামিল সই দিল এক চুক্তিতে
বাঘের দলের সাথে আর ফেরাল সেই শর্তে।
পশমগোলক ভেড়া, আর ছালের ছোটো কোটে
বোঝাই হয়ে – আজামিলও নয় তো বোকা মোটেই।
আজামিলও জানে দর মেষ-পালকের মতো
সময় সময় বাঘেদেরও খাবার চাই গো পেটে।
ওস্তাদ এক মেষপালক তা যোগায় সাধ্যমতো।
এখন সে সারাদিনই বাঁশিতে ধুন তোলে
যখন পেটভর্তি বাঘের সঙ্গে মটকু ভেড়া তেষ্টা মেটায় এক পুকুরের জলে
ভরন্তপেট যৌথচুক্তি বলে।
.
(Ajamil and the Tigers)
.
এক ‘ভাগ্য’-র জন্য গান-১৪
.
মাঝখান থেকে ছিঁড়ে দু’টুকরো
হলুদ আলোয়ান
সূর্যের থেকে যখন সেটা
ধার করলাম আমি।
আমি তো জানিই অর্ধেক তাই
ছুঁড়ে ফেলে দেব দূরে
কখনো যদি পেয়ে যাই আরও
ভালো কিছু আরও দামী।
.
গায়ের রঙের জন্য আমি
খুন করেছি মা-কে।
আমি তো বলব
সামান্য কাজ
এই পুঁটলিটা বানানো
হলুদ যেটাতে রাখি।
.
আমার কাজই বয়ে নিয়ে চলা
তেলের এই যে পাত্র১৫।
আর আপনার কাজ হল তাকে
ভরে দেওয়া দিবারাত্র।
ভিক্ষা নয়তো
চৌর্যবৃত্তি।
হোক তবে শুভচুক্তি?
.
খাণ্ডবাজীর মন্দির
দিন যত বাড়ে জাগে।
ভেঙে যেন চৌচির
না হয় রাত্রি হলে।
প্রদীপের শিখা দিয়ে
আমি তাকে ঠেলে রাখি।
ফেরাবেন না আমাকে।
তেল চাই, ও মা শুনুন।
এক ফোঁটা তেল তা কি
জুটবে না মা, নাই থাক দশগুণ।
.
তারের এই যে যন্ত্র
তার তো মোটে একটা১৬।
আর জেরবার জ্বালা।
টান দিই যেইমাত্র,
একই সুরে লা লা লা।
কিন্তু যদি বা বাজে
একটি পর্দাতেই,
নালিশ জানাব কাকে
আমার ভাঁড়ারে সেই
এক শব্দের গান যখন
গলার অন্দরে?
.
শব্দটি ঈশ্বর
বিপরীতজ্ঞান আমার
শ্বদন্ত জানি তাকে
আমার দুটো কাঁকে।
আবার আমি তাকে
ভেড়া বলেও জানি
দুপাটি দাঁতের ফাঁকে,
জানি জিভের ওপর
জাগা রক্তস্বাদে।
আর এই একটি গানই
চিরদিন গেয়ে থাকি।
.
(A Song for a Vaghya)
.
এক মুরলির জন্য গান-১৭
.
দেখো
ওই পাহাড়ের মাথায়
চাঁদ নেমেছে চারণ করতে
.
খবরদার ওতে সওয়ার হতে যেও না
ডান কাঁধে ওর খাণ্ডবার নিশান দেখনি
ওহে ঘোড়াচোর
.
দেখো
তার নামই তো
বাঁ-কণ্ঠার ঠিক নীচে উল্কি তুলে লেখা
.
খাণ্ডবার মেয়েদের গায়ে হাত যেন না পড়ে
বুড়ো লম্পট কোথাকার
আগে তোমার টাকার রং দেখাও আমাদের
.
( A Song for a Murli)
.
.
চৌবাচ্চা
.
এক ফোঁটা জলও এতে নেই
পেশোয়াদের১৮ তৈরি এই বিশাল চৌবাচ্চায়।
.
কিচ্ছু নেই এটায়।
শুধু একশো বছরের পাঁক আছে তলায়।
.
( The Reservoir)
.
ছোটো একটা পাথরের স্তূপ-১৯
.
একটা জায়গা দেখো
যেখানে মাটি
খুব অসমান নয়
যেখানে হাওয়া
মৃদুমন্দ বয়
.
একটা পাথর
ওপরে আর একটা
তিন নম্বর
দুটোর ওপরে
চার পাঁচ আর ছয়
.
একটা বাছার সময়
তুমি অন্যটাকেও ভেবো
প্রতিটি ঠিক
প্রমাণ মাপের
প্রমাণ ওজন চাই
.
প্রথম পাথর যদি
সঠিক ভাবে বাছো
এমন একটা যা
নির্মাণবান্ধব
বাকি পাথরগুলো থাকে
.
ভগবান ভালো করুন
ও নব্যযুবতী
যেন হও
তেমনই ভাগ্যবতী
যেমন সপ্রতিভ
.
যাও তুমি যাও বাড়ি
হরপার্বতী দু’য়ে
যেন ঠিক পাও খুঁজে
এক সুখের সংসার
চিরঅক্ষয় হোক
.
(A Liitle Pile of Stones)
.
মকরন্দ-২০
.
জামাটা খুলে
তারপর ভিতরে যাব পুজো দিতে?
রক্ষে করো।
.
আমি নেই।
তবে তুমি নির্দ্বিধায় যেতে পারো
যদি পুজো দিতে ইচ্ছে করে।
.
যাবার আগে
দেশলাই বাক্সটা দিয়ে যাও
কি গো?
.
আমি চাতালে গিয়ে দাঁড়াই
ওখানে ধোঁয়া ছাড়লে
কেউ কিছু ভাববে না।
.
( Makarand)
.
মন্দিরের ইঁদুরটা
.
মন্দিরের ইঁদুরটা ত্রিশূলের মাঝখানের বড়ো ফলা থেকে
পাকানো লেজটা খুলে নেয়।
ত্রিশূলের মাঝবরাবর নেমে একদলা
থকথকে কালো রক্তের মতো নোংরা ঝরায়।
.
সমরদেবের চওড়া কাঁধে
একমুহূর্ত থমকে যায় সেটা
চট করে চারদিকে নজর বুলিয়ে নিতে।
স্বর্গীয় পেশীতে একটা কাঁপন।
.
বিরল এক চাউনি
মল্লারী মার্তণ্ডর২১ মুখের রঙিন
যুদ্ধসাজ আর ক্রুদ্ধ চোখদুটোয়,
আর অমনি সে বেপাত্তা।
.
মন্দিরের ইঁদুরটা পিটপিট করে চায়
পাথরের ছাদ থেকে ঝোলা শিকলে নামতে নামতে
আর উজ্জ্বল আলোয় চাটা ভারী ধাতুর আংটাগুলোয়
তার চোখ ঝিকিয়ে ওঠে।
.
একটা ঢাল দিয়ে হড়কে নেমে এসে
বড়ো ঘণ্টিটার উঁচু কানা দিয়ে
বেহায়ার মতো সে চেয়ে দেখে
সবুজ ঝিলিক কাঁপে
.
হাঁটু গেড়ে বসা তন্বী বধূর
দু’হাতে ঠাসা কাচের চুড়ির গোছায়,
পাথরের লিঙ্গের ওপর যখন সে
কলাগুলো পিষে দেয়।
.
আর পুরোহিতের সপ্তা-ভোর
না-কাটা পাকা দাড়ির আড়ালে,
লুকোনো হাসির আভাস লক্ষ করে,
মন্দিরের সেই ইঁদুরটা
.
ঠাকুরের বেদির আড়ালে ঘাপটি মেরে থাকে
বড়ো ঢোলকটার ঠিক পিছনে।
এক মিনিটও হবে কি হবে না।
কেননা ঠিক তখনই ঘণ্টাগুলো ব্যস্ততায় দুলে ওঠে।
.
( The Temple Rat)
.
এক ধরনের ক্রুশ-২২
.
লেজটা দু’পায়ের মধ্যে সেঁধিয়ে
আর পাদুটো ধাতুর পাতে মোড়া শরীরের তলায় ঢুকিয়ে,
মন্দিরচত্বরে একটা থামের ওপরে
ষাঁড়ছানাটা বসে।
.
একটা শিঙে তুমি ধাক্কা দাও। কুঁজটায় মারো ঝাপটা
আর ওপরে তাকিয়ে পীড়নের অদ্ভুত কলটাকে দেখে নাও
পবিত্র ষাঁড়ছানাটা অবধি তার লেজটাকে
যেদিক থেকে গুটিয়ে নিয়েছে।
.
এটা ক্রুশের মতো একটা কিছু,
ক্যাঁচরকোঁচর জোড়গুলোর ওপর, একটা পাথরের বেদিতে মাথা তুলে আছে।
দুটো আড়াআড়ি পাটার এক ধরনের ক্রুশ এটা
যার মাঝখানে শোবে তুমি আর ছিঁড়েখুঁড়ে যাবে,
.
প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গে।
হুক আর গজাল লাগানো পাটাটা
যখন একই জায়গায় থাকে
আর তোমাকে নিয়ে ঘুরে চলে অন্য পাড়টা।
.
পাহাড় আর মন্দিরগুলো চারিদিকে নাচে।
ষাঁড়ছানাগুলো আর কচ্ছপটা সাঁতার কাটে চারিদিকে।
শকুনের মতো গ্রহতারারা মাথার ওপর পাক খায়
একটা খ্যাপাটে বয়ামের মধ্যে।
.
তবে সত্যি হল তেমন কিছুই ঘটেনি।
এ’সব বেআইনি।
দিনের এই বেভুল সময়
কোনোমতেই নক্ষত্রবীথির নয়।
.
আর্তচিৎকারময় কোনো রক্তফোঁটাও
শুভ অরণ্যপথে হন্যে হয়ে ছুটে যায় না
সময়ের সঙ্গে দশগুণ ফুলে
ফসলের খেতের গভীর শস্যভারে।
.
আঙুলের নখের খোঁচায়, দাবনা থেকে
তুমি একটা রিবেট খুঁটে নিতে চাও।
আর হুড়মুড়িয়ে, বুড়ো আঙুলের ফুলো মাথার চাপে,
ঢেকে দিতে চাও পিতলের পাছার টোলটা।
.
(A Kind of a Cross)
.
কাবার্ড-২৩
.
হলুদ হয়ে যাওয়া খবরের কাগজের
টুকরোটাকরা দিয়ে
ভাঙা কাচগুলো কোনোমতে জোড়া
.
দরজার কাঠামোর
প্রতিটি চৌকোনাই
এক জমায়েত
.
নড়বড়ে চৌকো কাচগুলোর
খাঁজকাটা ধার শোচনীয় চৌখুপিগুলোর
নীচে গেঁথে আছে
.
এই ছোট্ট আলমারির
একের পর এক সাফসুতরো তাকে
সার দিয়ে স্বর্ণদেবতারা
.
তোমার চোখ যেতে পারে
শেয়ারবাজারের তালিকা পেরিয়ে
সোনার সেই দেবতাদের দিকে
.
এক টুকরো সম্পাদকীয়
আর চিরযৌবনের নিশ্চয়তার ও’দিক থেকে
তারা তোমার দিকে তাকিয়ে
.
তুমি একটা সোনার হাত দেখো
মাড়ে-সাঁটা
বিশেষজ্ঞের মতামতের পিছনে
.
সবাই যা আশা করে
স্বভাবতই
দরজাতে একটা তালা আঁটা
.
( The Cupboard)
.
যশবন্ত রাও-২৪
.
দেবতা খুঁজছ না কি তুমি?
আমার সন্ধানে আছে ভালো একজন।
তার নাম যশবন্ত রাও
সেরাদের সে অন্যতম।
খুঁজে দেখো তাকে
আবার জেজুরি আসলে কখনো।
.
মানছি দেবতা সে নয় তত দরের
মূল মন্দির পার হয়ে তবে তার থান।
এমনকি তা বার-ফটকেরও পরে।
যেন জায়গাটা তার
কুঠে আর ব্যাপারীর মাঝে।
.
আমি দেবতাদের জানি
কী মিষ্টি তাদের মুখখানা
কী সোজা কুঁচি দেওয়া জামা।
সেই দেবতা সোনার জন্য ঘামিয়ে তোলে তোমায়।
দেবতা সেই হৃদয় পেতে তোমাকে যে কাঁদায়।
সেই দেবতাই হাঁটতে বলে
জ্বলন্ত কয়লায়।
তোমার বউয়ের পেটের শিশু সেই দেবতার দান।
অথবা শত্রুর পেটে গেঁথে দেওয়া ছুরি।
সেই দেবতা তোমাকে শেখায় বেঁচে থাকবার গান,
দ্বিগুণ করা টাকার কারিকুরি
তিনগুণ হওয়া জমি-জায়গার মান।
হাসি চাপাই বেজায় কঠিন সেই দেবতাদের
মাইলখানেক দণ্ডি যখন কাটো তাদেরই নামে।
সেই দেবতা তাকিয়ে দেখেন তোমার ভরাডুবি
নতুন একটা মুকুট যদি না দিতে পার তুমি।
সন্দেহ নেই তাদের সবাই খুবই প্রশংসনীয়,
হয় তারা সব একই ধাতের
নইলে কেমন যাত্রাপালার আমার কাছে অসহনীয়।
.
যশোবন্ত রাও,
আগুনশিলার তাল,
উজ্জ্বল কোনো পোস্ট-বাক্সের মতো,
প্রোটোপ্লাজমের গতর
দেয়ালে ছোঁড়া বিশাল এক
লাভার পিঠের মতো,
না আছে তার হাত, না আছে তার পা
এমনকী একটা মাথাও নেই তার।
.
যশোবন্ত রাও।
দেখা পেতে হবে তোমায় সেই দেবতারই।
যদি তোমার হাত বা পায়ে কম পড়ে থাকে,
যশোবন্ত রাও আছে তো হাত বাড়িয়ে দেবে
নিজের পায়ে তোমাকে সে দাঁড় করাবেই।
.
যশোবন্ত রাও
কিছু এমন করে না আহামরি।
বিশ্বটাকেই তোমাকে সে দেবার পণ করেনি
রকেট চেপে স্বর্গে যাবার টিকিটও তোমাকে দেয়নি।
কিন্তু তোমার হাড়গোড় ভেঙে হলে কোনো হয়রানি,
জেনে রাখো সে সারাবে তক্ষুনি।
শরীরটাকে অবশ্য সে সতেজ করে তুলবেই
আর চাইবে আত্মাটি তার নিজের খেয়াল রাখুক।
সে তো শুধু এক ধরনের হাড়জোড়া কারবারি।
ব্যাপার হল এইটুকু যে,
তার যেহেতু মাথাটাই নেই, না আছে হাত পা,
তোমাকে সে আরও একটু ভালো বুঝতে পারে।
.
(Yeshwant Rao)
.
নীল ঘোড়া
.
ফোকলা দাঁতের গায়িকা
তার হাঁ-মুখটা খোলে।
খড়খড়ে গলার
দুয়েকটা তারে ঘষাঘষি লাগায়।
ফুলকি ছুটে চলে
তার আধপোড়া জিভ থেকে।
.
নিজে থেকেই ঝুঁকে যাওয়া একটা মাথা
আর রোদের তাতে কালো গা আরো কালসিটে মেরে যাওয়া,
বাজনা-বাজিয়ের মুখটা নীল হয়ে ওঠে
যখন সে মাদলটা থাবড়ায় কিংবা তাতে চাঁটি মারে
এবং গানে গলা মেলায় এক দিশাহারা আবেগে।
বসন্তের দাগ-ওঠা তার তুতো ভাই
টুংটাং, টিরিং টারাং টংকার তোলে
একতারার মতো যন্ত্রটায়।
ভগবানের আপন বাছারা
গান বেঁধে নিচ্ছে।
.
তুমি পুরোহিতের দিকে ঘোরো
যিনি সহৃদয় হয়ে তার নিজের বাড়িতেই
এই পবিত্র জলসা গোছের আয়োজন করেছেন
আর তাকে বলো,
“গায়কেরা একটা নীল ঘোড়ার গান গাইছে।
আপনার দেয়ালে টাঙানো ছবিটাতে, কীভাবে তাহলে
ঘোড়াটা সাদা হল?”
“আমার চোখে নীল।”
পুরোহিত বলেন,
সুপুরির একটা টুকরো গালের
বাঁপাশ থেকে ডান দিকে ঠেলে।
জাঁতির একটা হাতলের কোনা
সেই মহান পশুর পেটের তলায় টানতে টানতে।
নীল একটা রেখা ছুঁয়ে
বহু পরিচিত শিল্পী ছায়া বোঝাতে
সাদা কোনো বস্তুতে যে নীলের ব্যবহার করেন।
.
মাদলের বুকে তখনও সমানে চাঁটি পড়ছে।
.
( The Blue Horse)
.
চৈতন্য
.
একঝাঁক উপকথা
পাহাড়ের ঢালে
চারণ থেকে মুখ তুলে তাকাল
চৈতন্যকে দেখা গেল যখন
পাহাড়েরা নিশ্চুপ রইল
চৈতন্য যখন
হেঁটে চলে যাচ্ছে
একটা গরুর টুংটাং ঘণ্টি বাজল
চৈতন্য চোখের আড়ালে গেলে
আর সেই একঝাঁক উপকথা
ফিরে গেল চারণে
.
(Chiatanya)
.
জেজুরি এবং রেল-স্টেশনের মাঝখানে
.
ছোট্ট মন্দির-শহর ছেড়ে চলে যাও তুমি
তার তেষট্টি ঘরের মধ্যে তেষট্টি পুরোহিত ছেড়ে
পাহাড়তলির ভিড়ে ঠেসাঠেসি
তার তিনশো থাম, পাঁচশোটা সিঁড়ি আর
আঠারো খিলান ফেলে।
মন্দির নাচনির চৌষট্টিতম বাড়িটা পেরোও তুমি
যার বিষয়-আশয় হয় অন্য হাতযশে।
তা নিয়ে পুরোহিতের ছেলে মোটে রা কাড়ে না।
সেই বাড়িটায় সে কখনো যায়নি
আর ভাবে কখনো যাবেও না।
ভাঙা মন্দির পার হলে তুমি কিন্তু আস্তানা গাড়া মাদি কুকুরটাকে
দেখলেনা কোথাও।
গোরখনাথ সেলুন পার হলে তুমি।২৫
পার হলে মালসাকান্ত কাফে২৬
আর আটাকল।
ব্যস এইসব।
একেবারে শেষ।
শহরটাকে ফেলে এসেছ তুমি
হাতে একটা নারকোল নিয়ে।
পকেটে পুরোহিতের একটা ভিসিটিং কার্ড
আর মাথায় পাক খাওয়া কিছু প্রশ্ন নিয়ে।
জেজুরি আর রেলস্টেশনের মাঝখানে
থমকে গেলে তুমি।
পাথর হয়ে থেমে গেলে
দাঁড়ালে যেন ভর-হওয়া একটা সুচ।
একটা সূচ যেন নিক্তিমাপা ভারসাম্যে দু’দিকের থেকে
সমান দূরত্বে
কিছু যোগ করারও নেই ঝরানোরও নেই।
যা তোমার হাঁটার গতি রুখে
শ্বাসরুদ্ধ করেছে তোমায়
সে এক দৃশ্য
জোয়ারের খেতে এক ডজন মোরগ-মুরগির
ফসল কাটার নাচের ভঙ্গিতে। এমন পাগলপারা তুমি কখনো দেখনি।
সাতটা লাফিয়ে ওঠে তাদের মাপের
চারগুণ উঁচুতে
পাঁচটা নেমে আসে যেই ঠোঁটে ফসল নিয়ে।
ও
মে র না ও আ মে
না ঠে আ র মে ঠে র না
ও না আ মে
ও
আ র না র ও না আ ও মে
আ ঠে আ র মে ঠে র না
ও
না র না ও আ মে
মে ঠে আ র মে ঠে র না
আর সেখানে তুমি দাঁড়িয়ে থাকো কতটা ভ্যাবলাকান্ত
সেজে সেকথা ভুলে গিয়ে
তোমার বাঁ-কাঁধে যেন এক পুরোহিত
আর ডানদিকে এক স্টেশন মাস্টার নিয়ে।
.
( Between Jejuri and the Rail Station)
.
রেলস্টেশন
১: সূচক
.
কাঠের এক সন্ত
রঙে বাড়ন্ত
.
আর সেই সূচক
ভিতরমুখো সে
দশগুন না হোক
.
নামগুলো গিলে ফেলে
সব রেল-স্টেশনের
যে ক’টা নাম সে জানে
.
হাতগুলো মুখ থেকে
নিয়েছে সরিয়ে
আর তারা ঠাঁই নেয়
পকেটের খোপরে
.
যদি সে জানেও বা
কখন পরের ট্রেন
সুলুক তো দেয় না
.
ঘড়িটা সংখ্যাগুলো
সবকটা যোগ দিল
.
যোগফল শূন্য
.
(The Railway Station
1: the indicator)
.
.
রেলস্টেশন
২: স্টেশনের কুকুরটা
.
এই জায়গার মেজাজটা
স্টেশনের ওই ঘেয়ো নেড়িটার
ভেতরে বাসা বেঁধেছে
.
গত তিনশো বছর ধরে
প্রায়শ্চিত্ত করে চলেছে
আসা-যাওয়ার এই গাছের নীচে
.
কুকুরটা তার ডান চোখ
ততটাই খোলে যাতে তোমার দিকে তাকিয়ে দেখা যায়
তুমি মানুষ না শয়তান না কি কোনো উপদেবতা
.
কিংবা আটকোণা রেলের সময় সারণিটাই
এল আরোগ্যের হাত দিয়ে
তার মাথায় এক ঝাপটা মেরে
.
তাকে স্বর্গে নিয়ে যেতে
নেড়িটা ঠিক করে
সে-দিন আজকে নয়
.
(The Railway Station
2: the station dog)
.
রেলস্টেশন
৩: চায়ের দোকান
.
চায়ের দোকানের আনকোরা ছেলেটা
চুপ করে থাকবে দিব্যি গেলেছে
.
তুমি যখন ওর কাছে কিছু জানতে চাও
তোমাকে জাদু করে দেয় সে
.
ডিশের জল তোমার মুখে ছিটিয়ে
আর বেসিনে তার আচমন চলতেই থাকে
.
আর কাপ-ডিশ ধোয়াধুয়ি সংক্রান্ত
যাবতীয় নিত্যকর্মবিধি
.
( The Railway Station
3: the tea stall)
.
রেলস্টেশন
৪: স্টেশন-মাস্টার
.
টিকিটবাবুর বিশ্বাস হিসেবমতো
পরের ট্রেন আসবার দিকেই
কথাবার্তা গড়িয়ে সময়ের দিকে গেলে
তিনি তার জিভটা খুলে
টিকিট-জানলা গলিয়ে তোমাকে ধরিয়ে দেন
আর ওপরতলার খোঁজখবরের দিকে
হাত দেখান
.
দো-মাথা স্টেশন-মাস্টার
সেই গোত্রের লোক
যিনি সব টাইম-টেবিলই নাকচ করেন
লাইন পাতার বছরে যেগুলো ছাপা হয়নি
সেগুলো প্রামাণ্য নয় বলে
কিন্তু প্রথম টাইম-টেবিলটা ব্যাখ্যা করেন
এমন এক স্বাধীনতায় যাতে পড়ে নেওয়া যায়
পরের সমস্ত টাইম-টেবিল
দুটো ছাপা লাইনের মাঝখানে
.
ডুবে যাওয়া সূর্যটার দিকে ব্যস্ত হয়ে তিনি তাকাতেই থাকেন
যেন এই সূর্যাস্ত গোপন কোনো এক যজ্ঞের আচার
আর তিনি চান না শেষ মুহূর্তে কোনো কিছুতে
ভুল হয়ে যাক
শেষে তিনি হ্যাঁ আর না-য়ের মাঝখানে
ঘাড়টা একভাবে ঝাঁকান
আর বলেন
যেকোনো সময়ে ছাপা যেকোনো টাইম-টেবিল
আর যে-সব টাইম-টেবিল এখনো ছাপা হয়নি
একই সঙ্গে বৈধ
কোনো এক সময়ে আর কোনো একটা লাইনে
কেননা সমস্ত টাইম টেবিলই ঢুকে আছে
সেটার মধ্যে যেটা ছাপা হয়েছিল
লাইন পাতার বছরে
.
এবং দু-মুখেই
লাল হয়ে ওঠেন
একই সঙ্গে
.
( The Railway Station
4: the station master)
.
রেলস্টেশন
৫: মানত
.
ঘড়িটার সামনে একটা ছাগবলি দাও
রেললাইনের ওপর একটা নারকেল ভাঙো
মোরগের রক্ত লেপে দাও ওই সূচকটায়
স্টেশন-মাস্টারকে দুধে চান করাও
আর টিকিটবাবুর কাছে দিব্যি গালো
নিরেট সোনার একটা খেলনা রেলগাড়ি তাকে দেবে
যদি কেউ তোমাকে জানায়
পরের ট্রেন আসবে কখন
.
( The Railway Station
5: vows)
.
রেলস্টেশন
(৬: ডুবন্ত সূর্য)
.
ডুবন্ত সূর্যটা
দিগন্ত ছুঁয়ে দেয়
এমন এক বিন্দুতে যেখানে লাইনদুটোর
কোনো দৈববাণীর
জমজের মতো
মিলন হল মনে হয়
.
ডুবন্ত ওই সূর্য
বিশাল এক চাকার মতো
.
( The Railway Station
6: the setting sun)
.
.
.
জেজুরি ( টীকা)
১
বাস
জেজুরি : মহারাষ্ট্রের পুনের কাছে নীচু এক পাহাড়ের মধ্যে জেজুরি নামের এক মন্দির-শহর আছে। এখানে স্থানীয় এক উপদেবতা খাণ্ডবার পুজো করা হয়। খাণ্ডবাকে গবাদিপশু এবং ভেড়ার পালের রক্ষক মনে করা হয়। খাণ্ডবাকে শিবের অংশ এবং জেজুরিকে শৈবতীর্থ হিসেবে দেখেন ভক্তরা। ব্রাহ্মণরা ছাড়াও স্থানীয় হিন্দু বা মুসলমানদের অনেকেই জেজুরিতে আসেন খাণ্ডবাকে শ্রদ্ধা জানাতে। মহারাষ্ট্রের অনেক জায়গাতেই খাণ্ডবা বাবার মন্দির আছে, এবং দাক্ষিণাত্য মালভূমিতে এই ধরনের আরও অনেক স্থানীয় উপদেবতা আছেন, কিন্তু জেজুরিকে খাণ্ডবা বাবার দুর্গরাজধানী বলে মনে করা হয়।
.
২
বুড়ো লোকটার ভুরুজোড়ার মাঝের/ বংশতিলক পেরিয়ে এক ঠিকানার দিকে
ভক্তদের অনেকেই কপালে চন্দন, হলুদ বা অন্য কোনো প্রলেপ দিয়ে তাদের নির্দিষ্ট কোনো ধর্মবিশ্বাস বোঝাতে চান। কপালের এই চিহ্ন অনেক সময় সমাজের কোন অংশের মানুষ তা বোঝায়, কখনো শুধুমাত্র ভক্তমানুষ হিসেবেই তাদের চিহ্নিত করে।
পুরোহিত
৩
আজ কি একটা পুরন পুলি জুটবে তার থালায়?
চানার ডাল এবং গুড় আর ঘি-য়ে জাল দেওয়া থকথকে পুর দিয়ে বানানো এক ধরনের পুরি। সঙ্গে আদা, এলাচ, জায়ফল এবং অন্যান্য সুগন্ধি মেশানো হয়। দাক্ষিণাত্যের অন্য অন্য জায়গায় এই মিষ্টি জাতীয় খাবারটির অন্য নাম আছে। পুর অংশকে বলা হয় ‘পুরণ’ এবং রুটি জাতীয় খোলটাকে বলা হয় ‘পুরি’। অন্য নাম, ‘পুরনচি পুলি’।
.
৪
মুখে সেটার এক বিড়ালহাসি…তাজা, অবিলম্বে ভোগ্য এক তীর্থযাত্রী।
.
কালীঘাটের পটে দেখতে পাওয়া যায় মুখে বিশাল এক চিংড়িমাছ ধরে একটা বিড়াল তাকিয়ে আছে। এই কবিতায় ভক্তদের যেন সুখাদ্যের সঙ্গে তুলনা করা হল, আর বাসটা যেন সেই বিড়াল যে ভক্তরূপী খাদ্য মুখে ধরে আছে। ধর্মস্থানে ভক্তদের সমাবেশ যেমন যানবাহন চালকদের, তেমনই সেই তীর্থক্ষেত্রের সঙ্গে জড়িত সমস্ত মানুষদেরই রুটিরুজির ব্যবস্থা করে।
.
ধ্বংসের কোল
৫
স্বয়ং মারুতিদেব করলেও না হয় কথা ছিল।
মরুৎপুত্র মারুতি। পবননন্দন হনুমান। রামায়ণে সে রামের সহচর আবার মহারাষ্ট্রের কোনো কোনো অঞ্চলে সে শিবেরও সঙ্গী।
.
৬
চৈতন্য
পঞ্চদশ শতকের শেষের দিকে বাংলায় জন্ম হয় বৈষ্ণবগুরু শ্রীচৈতন্যদেবের। উচ্চবর্ণের এই পণ্ডিত ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে আপন করে নেন – ডোম বা চন্ডাল, হিন্দু বা মুসলমানদের কোনো ভেদাভেদ ছিল না তাঁর কাছে। তিনি ছিলেন এক মহাজ্ঞানী মহাতার্কিক – বহু সভায় তিনি তার যুক্তিজালে হারিয়ে নাস্তানাবুদ করেছেন নানান ধর্মের মান্য পণ্ডিতদের। সারা ভারতের সমস্ত তীর্থক্ষেত্র পরিভ্রমণ করেছিলেন তিনি। শোনা যায় ১৫১০ সালে জেজুরিতেও যান তিনি।
.
একটা নীচু মন্দির
৭
চারমিনার
.
হায়দ্রাবাদের একটি মিনার। এর চারটি গম্বুজ আছে। এখানে একটি কমদামি কড়া ফিলটারহীন সিগারেটের কথা বলা হয়েছে।
.
৮
কুড়ি ফুট কাছিমটার/ পিঠ জুড়ে
জেজুরির কড়ে পাহাড়ে খাণ্ডবার মন্দিরের বাইরেই এই বিশাল পিতলের পাতে মোড়া কচ্ছপটিকে দেখা যায়। কচ্ছপকে বিষ্ণুদেবতার দশাবতারের দ্বিতীয়টি বলে মানা হয়। সমুদ্রমন্থনের সময় কচ্ছপও অংশগ্রহণ করেছিল।
.
অশ্বখুর পীঠ.
৯
খাণ্ডবাজী যখন
স্থানীয় এক উপদেবতা – পূর্বজন্মে তিনি মেষপালক অথবা গ্রামের সর্দার ছিলেন এবং সমস্ত ছোটো খাটো গ্রাম্য বিবাদে তাঁর সিদ্ধান্তই ছিল চূড়ান্ত। তারপর তাঁকে দেবতাজ্ঞানে পুজো করা শুরু হয়।অজন্তার একটি মন্দিরচিত্রে নাকি তাঁর বর্ণনা পাওয়া যায়। খাণ্ডবার মন্দিরে ধর্ম বা জাতিগত কোনো ভেদাভেদ নেই এবং হিন্দু বা মুসলমানদের প্রবেশ সেখানে অবাধ। খাণ্ডবা মন্দিরের পূজারিরাও সকলে অব্রাহ্মণ। মহারাষ্ট্রের বহু জায়গায় তিনি একইসঙ্গে উচ্চবর্ণ এবং নিম্নবর্ণের কুলদেবতা – এবং শিবের প্রতিভূ।
.
১০
বধূকে জীনে বসিয়ে পাশাপাশি
খাণ্ডবার পাঁচ বউয়ের মধ্যে দুজনের নামই বেশি শোনা যায় – একজন এক ব্যবসায়ীর কন্যা আর অন্যজন এক মেষ-পালকের কন্যা। শোনা যায় ব্যবসায়ীর কন্যাকে রীতি মেনে বিয়ে করেন খাণ্ডবা, কিন্তু এক শিকার উৎসবের শেষে তাঁর নীল ঘোড়ায় চড়িয়ে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীকে অপহরণ করে নিয়ে আসেন তিনি। তাঁর এই স্ত্রী সেই মেষ-পালকের কন্যা।এই কবিতায় খাণ্ডবার দ্বিতীয় স্ত্রীয়ের কথাই বলা হয়েছে।
.
১১
মনোহর
কৃষ্ণের একশো আট নামের একটি নাম মনোহর। এই কবিতাটিতে কবির বন্ধু ঔপন্যাসিক মনোহর ওক, যিনি জেজুরি ভ্রমণে কবির সঙ্গী ছিলেন – তাঁর কথা বলা হয়েছে।
.
১২
পাহাড়গুলো/ রাক্ষসদল
.
জেজুরিকে ঘিরে আছে যে পাহাড়গুলো, সেগুলো নাকি দৈত্য, যাদের খাণ্ডবা বধ করেন। ‘পুরোহিতের ছেলে’ কবিতাটিতেও সেই প্রসঙ্গই এসেছে।
.
১৩
আজামিল ভেড়া পাহারার…
.
আজামিল (‘আজামল’ উচ্চারণও কেউ কেউ করেন) এক মেষ-পালকদের সর্দারের নাম। তার পালিতা কন্যা ‘বানাই’ খাণ্ডবার দ্বিতীয় স্ত্রী।
.
১৪
এক ‘ভাগ্য’-র জন্য গান
.
খাণ্ডবার এক পুরুষ ভক্তের দল, যারা নিজেদের খাণ্ডবার পশুশিকারের কুকুরসঙ্গী হিসাবে নিজেদের কল্পনা করে। কোনো ভক্ত সারাজীবন এইভাবেই থেকে যায়, কেউ আবার কোনো নির্দিষ্ট মানত পূরণ না হওয়া অবধি সারমেয় দশায় থাকে। শিবের সঙ্গে যেমন ছাইয়ের সম্পর্ক – খাণ্ডবাবাবার সঙ্গে তেমনই হলুদের সম্পর্ক – ভাগ্য নামের এই ভক্তরা তাই সব সময় হলুদ তাদের সঙ্গে রাখে। হলুদ একই সঙ্গে সোনা এবং সূর্য – এই দুইয়ের প্রতীক।
.
১৫
আমার কাজই বয়ে নিয়ে চলা/তেলের এই যে পাত্র
.
মন্দিরের বাইরের থামে তেলের কুপি জ্বালিয়ে রাখতে তেলের যোগান সর্বক্ষণ রাখতে হত ভক্তদের।
.
১৬
তারের এই যে যন্ত্র/তার তো মোটে একটা
.
একতারা ধরনের তারের এক যন্ত্র খাণ্ডবার ভজনের সময়, বা তাঁকে ঘিরে পৌরাণিক গল্পগুলো গানের মতো গাইবার সময় সুর এবং লয় রাখতে ব্যবহার করা হয়।
.
১৭
এক মুরলির জন্য গান
.
এরাও খাণ্ডবা বাবার দেবদাসীর দল যাদের বাবার স্ত্রী মনে করা হয়। সারারাত তারা নাচ আর গান করে। কখনো তারা বেশ্যাবৃত্তিও করে থাকে।
.
চৌবাচ্চা
১৮
পেশোয়াদের তৈরি এই বিশাল চৌবাচ্চায়
.
মহারাষ্ট্রের পুনে অঞ্চলের অষ্টাদশ শতকের শাসকদের পদবি ছিল ‘পেশোয়া’।
.
১৯
পাথরের স্তূপ
.
রীতি অনুযায়ী নববিবাহিতা বধূটিকে পাথরের ওপর পাথর বসিয়ে একটা স্তূপ গড়ে তুলে খাণ্ডবা বাবাকে উৎসর্গ করতে হয়। পাথরের এই স্তূপ যদি ভেঙে না পড়ে, তাহলে সে নাকি সুখে জীবনযাপন করে।
.
২০
মকরন্দ
কবির ভাই মকরন্দ জেজুরি ভ্রমণের সঙ্গী ছিলেন।
.
মন্দিরের ইঁদুর
২১
মল্লারী মার্তণ্ডর মুখের রঙিন/যুদ্ধসাজ আর ক্রুদ্ধ চোখদুটোয়
বাবা খাণ্ডবা যেমন মল্লকে বধ করেন, তেমন তিনিই হলেন মার্তণ্ড অর্থাৎ সাক্ষাৎ সূর্যদেব।
.
২২
এক ধরনের ক্রুশ
.
জেজুরিতে আগে ‘বাগাদ’ উৎসব হত। একটি ক্রুশকাঠ থেকে পিঠের চামড়ায় বঁড়শি বিঁধিয়ে ভক্ত আত্মনিগ্রহকারীদের কাঠের আড়াআড়ি পাড় থেকে ঝুলিয়ে রাখা হত। বাংলায় এ’ধরনের পরব এখনো চালু আছে – চড়কের মেলায় এই আত্মনিগ্রহকারীদের বঁড়শিতে গেঁথে চারিদিকে ঘোরানো হয়। মূল উৎসবে অংশ নেবার আগের ক’দিন ভক্তদের মন্দিরেই থেকে যেতে হয় – তাদের স্নান এবং খাওয়াদাওয়ার নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলতে হয়। লোকালয় থেকে দূরে খাণ্ডবার প্রান্তিক মন্দিরগুলোতে এখনো এই চড়ক উৎসব পালন করা হয়।
.
২৩
কাবার্ড
.
খান্ডবাকে পুজো দেবার সময় ভগবানের ছোটো সোনার মূর্তি দেবার রীতি আছে।
.
২৪
যশোবন্ত রাও
.
মূল মন্দির তৈরি হবার সময় নীম্নবর্ণের এক শ্রমিক যশোবন্ত রাও মারা যায়। তাকে এই মন্দিরের দ্বাররক্ষী বলা হয়। মন্দিরের বাইরে তার নামে একটি পুজোর বেদি আছে এবং সেখানে যারা পুজো দেয়, তাদের হাড় ভেঙে যাওয়া বা অন্যান্য নানান হাড় সংক্রান্ত রোগ নাকি সেরে যায়। প্রায় নিরাকার এই স্থানীয় দেবতার থানেও জেজুরিতে পুজো দিতে আসা ভক্তরা ভিড় করেন।
.
জেজুরি এবং রেল-স্টেশনের মাঝখানে
.
২৫
গোরখনাথ সেলুন পার হলে তুমি
মধ্যযুগে এক ভিন্ন মত ও পথের সাধক ছিলেন গোরক্ষনাথ। এই ভিন্নধর্মী সাধকরা গুপ্তবিদ্যার চর্চা ও প্রসার করতেন, কিন্তু সমাজের নানান স্তরে অত্যন্ত সাধারণভাবে মিশে থাকতেন তাঁরা। খাণ্ডোবার ভক্তরা যে ধর্মমত অনুসরণ করে, অনেকসময় এই ভিন্নধর্মী সাধকেরাও তার মধ্যে মিশে যান।
.
২৬
পার হলে মালসাকান্ত কাফে
মালসা কান্ত, অর্থাৎ মালসার স্বামী। মালসা হল বাবা খাণ্ডোবার প্রথম স্ত্রীয়ের নাম, যিনি এক ব্যবসায়ীর কন্যা ছিলেন। মালসাকান্ত, অর্থাৎ বাবা খাণ্ডোবা।

