আদুনিসের কবিতাগুচ্ছ <br /> ভাষান্তর ও ভূমিকা– দীপকরঞ্জন ভট্টাচার্য

আদুনিসের কবিতাগুচ্ছ
ভাষান্তর ও ভূমিকা– দীপকরঞ্জন ভট্টাচার্য

আরবি কবিতার আধুনিকতার আন্দোলনের তিনি এক পথিকৃৎ - গঠন আর ভাবের দিক থেকে তাঁর কবিতা আরবি কবিতার জগতে একেবারে অপরিচিত স্বর। এ'পর্যন্ত সতেরোটি ভাষায় অনুবাদ হয়েছে তাঁর কবিতা। পেয়েছেন অনেক সম্মান। Guardian-এর মতে আরবি ভাষার শ্রেষ্ঠ জীবিত কবি তিনি। এখানে যে কবিতাগুলোর বাংলা তর্জমা করা হয়েছে, সেগুলি ১৯৬১ সালে রচিত তাঁর একটি কাব্যগ্রন্থ 'দামাসকাসের মিহ্যারের গান'-এর প্রথম পর্ব ' আজব কথার ঘোড়সওয়ার'-এর ইংরেজি ভাষান্তর থেকে নেওয়া। সেই সময়ে ফরাসি সরকারের আমন্ত্রণে বছরখানেক ফ্রান্সে ছিলেন তিনি। সময়টা ১৯৬০-৬১। তাঁর কথা থেকে জানা যায় এই বইটির বেশিরভাগ লেখাই ফ্রান্সের ধূসর অথচ উজ্জ্বল আকাশের নীচে বসে লেখা । তাঁর মতে ফরাসি ভাষা এবং ফরাসি কবিতায় তাঁর কবিসত্তার এক দ্বিতীয় জন্ম হয়েছে। তাঁর দু'একটি বই, দিনরাত্রির চলাচল ও রূপবদল (১৯৬৫) , মঞ্চ আর আয়নাগুলো (১৯৬৮), আলোচনাগ্রন্থ সুফিবাদ ও অধিবাস্তববাদ (১৯৯৫) ইত্যাদি। শুধু যে নিজের কবিতা লেখা তা তো নয়, ওভিদ, স্যাঁ জন পার্স আরবিতে অনুবাদও করেছেন তিনি।

সিরিয়ার লাটাকিয়ার কাছে এক অজ গ্রাম কোয়াসাবিনের এক কৃষক পরিবারে আদুনিস অর্থাৎ আলি আহমেদ সৈয়দ ইসবারের জন্ম হয় ১৯৩০ সালে। ১৪ বছর বয়সে প্রথমবারের জন্য ইশকুলে যাবার সুযোগ পান তিনি। তাঁর ভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্বাসের জন্য ১৯৫৫ সালে এক বছর তাঁকে বন্দি জীবন কাটাতে হয়। ছাড়া পাবার পর তিনি বেইরুত চলে যান এবং লেবাননের নাগরিকত্ব নেন। ১৯৫৭ সালে তিনি ‘কবিতা’ নামের একটি সাহিত্যপত্রিকা প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৬০ নাগাদ সুফি ভাবধারার আদলে এক সূক্ষ্ম স্যুরিয়ালিজম মিশিয়ে নতুন এক কবিতাধারা গড়ে তোলেন তিনি। ১৯৮৫ সালে লেবাননের গৃহযুদ্ধের উত্তপ্ত পরিস্থিতি আবার তাঁকে প্যারিসে আশ্রয় নিতে বাধ্য করে।

আরবি কবিতার আধুনিকতার আন্দোলনের তিনি এক পথিকৃৎ – গঠন আর ভাবের দিক থেকে তাঁর কবিতা আরবি কবিতার জগতে একেবারে অপরিচিত স্বর। এ’পর্যন্ত সতেরোটি ভাষায় অনুবাদ হয়েছে তাঁর কবিতা। পেয়েছেন অনেক সম্মান। Guardian-এর মতে আরবি ভাষার শ্রেষ্ঠ জীবিত কবি তিনি।

এখানে যে কবিতাগুলোর বাংলা তর্জমা করা হয়েছে, সেগুলি ১৯৬১ সালে রচিত তাঁর একটি কাব্যগ্রন্থ ‘দামাসকাসের মিহ্যারের গান’-এর প্রথম পর্ব ‘ আজব কথার ঘোড়সওয়ার’-এর ইংরেজি ভাষান্তর থেকে নেওয়া। সেই সময়ে ফরাসি সরকারের আমন্ত্রণে বছরখানেক ফ্রান্সে ছিলেন তিনি। সময়টা ১৯৬০-৬১। তাঁর কথা থেকে জানা যায় এই বইটির বেশিরভাগ লেখাই ফ্রান্সের ধূসর অথচ উজ্জ্বল আকাশের নীচে বসে লেখা । তাঁর মতে ফরাসি ভাষা এবং ফরাসি কবিতায় তাঁর কবিসত্তার এক দ্বিতীয় জন্ম হয়েছে। তাঁর দু’একটি বই, দিনরাত্রির চলাচল ও রূপবদল (১৯৬৫) , মঞ্চ আর আয়নাগুলো (১৯৬৮), আলোচনাগ্রন্থ সুফিবাদ ও অধিবাস্তববাদ (১৯৯৫) ইত্যাদি। শুধু যে নিজের কবিতা লেখা তা তো নয়, ওভিদ, স্যাঁ জন পার্স আরবিতে অনুবাদও করেছেন তিনি।

মিহ্যার : এই শব্দটির সরাসরি কোনো মানে নেই, কিন্তু আরবিতে এর মূল লুকিয়ে আছে একটি ক্রিয়াপদে, যার অর্থ ধ্বংস, ভাঙন, তছনছ করা। ‘মিহ্যার’ কি তিনি নিজেই ? তাঁর কথায়, মিহ্যার চরিত্রটিতে তাঁর কোনো ছাপ নেই, বরং সে যেন নিৎসের অপর কবিসত্তা জরাথ্রুষ্ট। মিহ্যার প্রচলিত বিশ্বাসগুলো, অভ্যাসগুলো, চিহ্ণগুলো মাটিতে মিশিয়ে দিতে চায়। মিহ্যার সেই সাধারণ মানুষদেরই একজন, ভবঘুরেদের দলে যার দেখা মেলে। মিহ্যারের কাছে আছে শিকড়ের বেঁচে ওঠার কাহিনি , জাহাজঘাটা আর বিয়েশাদির খবর। মিহ্যার যেন এক পাগলাঘণ্টি – ‘সে স্বপ্ন দেখে খাদের ওপর নেচে বেড়াচ্ছে !’

দামাসকাস : অনেকেরই মতে সিরিয়ার রাজধানী দামাসকাস পৃথিবীর প্রাচীনতম শহর।

দামাসকাসের মিহ্যার

কবিতা : আদুনিস ( আলি আহমেদ সৈদ ইসবার)

ভাষান্তর : দীপকরঞ্জন ভট্টাচার্য

পর্ব : আজব কথার ঘোড়সওয়ার

বন্দনা

এগিয়ে চলে সে নিরস্ত্র যেন বা কোনো অরণ্য প্রতিদ্বন্দ্বীহীন যেন বা এক মেঘের দল। সে এক মহাদেশের জন্ম দিয়েছে গতকাল, বাস্তুহারা করেছে সমুদ্রকে।

দিনের আঁধারঘন দিকটুকু সে আঁকে, পা থেকে চালু সাজে সাজায় সেই দিন, রাতের জুতোজোড়া ধার করে নেয়, আর কখনো যা আসবে না , তাকিয়ে থাকে তারই দিকে। সে-ই বস্তুজ্ঞান — সে জানে তাদের , সে তাদের একান্ত নামে ডাকে। সে-ই প্রকৃত, এবং যা কিছু তার বিপরীত তাও, সে-ই জীবন, এবং যা কিছু জীবন নয় তাও।

যেখানে পাথর হয় দিঘি আর ছায়া এক শহর, সেখানে তার বাস। সে বাঁচে আর পথ ভোলায় হতাশার, আশার বিরাট তল মুছে দিতে দিতে, গ্লানির ফাটল তুলে নাচের ভঙ্গিতে , নেচে নেচে গাছগুলো ঘুম পাড়াতে।

এবং যত চূড়ান্তকে কাছে আনার ডাক দিয়েছে সে , জাদুছাপ মিনে করে দিতে আমাদের কালের কপালে।

অদেখা জীবনখানি ছেয়ে দেয় সে। জীবনকে গড়ে নেয় ফেনিল সাগর আর তাতে দেয় ঝাঁপ । আগামীকে বদলে দেয় যেন কোনো শিকার, পাগলের মতো সে ছোটে তার দিকে। হারানো হারানো আর হারানোর দিকেই তার শব্দগুলো গাঁথা ।

দেশে ছায় অতল বিহ্বলতা, তবু দৃষ্টি তার চোখ জুড়ে থাকে।

ভয় দেখায় সে আর বাঁচিয়ে তোলে।
তার ঘামে থাকে দুঃখ বিদ্রুপে ওপচায় সে।
পরতে পরতে কোনো পিঁয়াজের মতো সে মানুষের বাকল ছাড়ায়।

সে তো সেই বাতাস যে ফিরে আসে না, সে তো সেই জল যে উৎসে ফেরে না। নিজের ছায়ায় সে গড়ে প্রতিরূপ — তার কোনো পূর্বপুরুষ নেই ; তার পদক্ষেপেই তার শিকড়।

তারকা নয়

সে কোনো তারকা নয়, কোনো নবীর প্রেরণা নয়,
চাঁদের মায়ার লেশমাত্র নেই চোখেমুখে –

হাতে এক, বিধর্মীর বল্লম
অক্ষরের দেশে হানা দিয়েছে সে
রক্তাক্ত, যে রক্ত সে সূর্যের দিকে তুলে ধরে,

ন্যাড়া পাথরেই তাকে মানায় ,
গুহাখাদের প্রার্থনায়,

আঁকড়ে ধরেছে সে লঘু পৃথিবীকে।

মিহ্যার এক রাজা

মিহ্যার এক রাজা,
এক রাজা স্বপ্নে যার আগুনের প্রাসাদ আর বাগানগুলো।

আজ এক কণ্ঠস্বর মুছে গিয়ে,
শব্দের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে তাকে।

মিহ্যার হল রাজা,
হাওয়ার রাজত্বে তার বাস
রহস্যের দেশ তার অধীনে।

ডাক

মিহ্যার – ভালোবাসার মানুষদের প্রতারণা ছাওয়া এক মুখ
মিহ্যার – এক স্তব্ধ ঘণ্টি,
আমাদের মুখে মুখে লেখা মিহ্যার,
সেই সুর চুপিসারে আমাদের
নির্বাসনের সাদা প্রান্তরে এসে দাঁড়ায় ,

ঢং – মিহ্যার – ওই তো
ভবঘুরেদের ওই ভিড়ে
গালিলির এই দেশে।

[ গ্যালিলির দেশ — ইজরায়েলের যে অংশটি গ্যালিলি সাগর দিয়ে ঘেরা]

অন্য এক ডাক

সব সুতোগুলো সে হারিয়ে ফেলেছে, তার
ভাবনার শুকতারা দিক্ হারা , তবু কখনো সে হোঁচট খায়নি ,
এমনকী দুটো পা-ই পাথর হয়ে উঠল যখন
ক্লান্তিতে ঝুলে গেল মুখখানা, তখনও।
ছিঁড়েকুটে যাওয়া শরীরটাকে জড়ো করে সে,
জড়ো করে বাঁচার তাগিদে , আর মিশে যায়।

তার চোখদুটো খুলে গেল

উন্নাদ সেই পাথরের ঘূর্ণিতে
যা সিসিফাসকে চায়
তার চোখদুটো খুলে গেল,

তার চোখদুটো খুলে গেল
দিশেহারা সব হেরো চোখগুলোতে
আরিয়ানার খোঁজে আছে যারা,

তার চোখদুটো খুলে গেল
শূন্যতার লাশ থেকে
রক্তের মতো ভেসে আসা এক সফরে,

মৃত্যুর মুখধারী এক পৃথিবীতে,
কোনো আওয়াজ কোনো কথা নেই যে পৃথিবীর ,
তার চোখদুটো খুলে গেল।

[ সিসিফাস, করিন্থ-এর এক রাজা। হাদেস-এর পাহাড়ে আবহমানকাল ধরে সে এক ভারী পাথর তোলার চেষ্টায় আছে। ]
[ আরিয়ানা — গ্রীক ভাষায় ‘আরিয়াদনে’-র মানে পবিত্র। গ্রীক পুরাণ অনুযায়ী তিনি ক্রেট দ্বীপের এক রাজকন্যে, আবার অনেকেই তাঁকে উর্বরতার দেবী বলে জানেন। তাঁর আর এক নাম ‘আরিয়ানা’।]

দিনগুলো

যত দিন যায় দুটো চোখ তার ঝিমিয়ে পড়ে
দিন নেই তাই চোখ দুটো ঝিমিয়ে পড়ে,
কিন্তু দিনের এই দেওয়ালগুলো সে কি ভেঙে দিতে পারবে
অন্য কোনো দিন খুঁজে নিতে?

আছে কি কোথাও – অন্য কোনো – দিন?

মৃত্যুর আহ্বান

(মিলিত স্বর)

“মিহ্যার আমাদের আঘাত করে,
আমাদের জীবনের তুষখুঁড়োগুলো পুড়িয়ে দেয় সে,
আমাদের ধৈর্য আর বিনয় মাথা তুলে দাঁড়ায় ।

ওগো দেশ আমাদের, ভগবান আর স্বেচ্ছাচারীদের প্রিয়া
ধ্বংসের কাছে ভয়ের কাছে মাথা ঝোঁকাও —
আগুনের কাছে মাথা ঝোঁকাও।”

একটি কণ্ঠস্বর

এই লগিতে ওই পাথরে ধাক্কা খায় সে
ভবঘুরেদের সঙ্গে দেখা করে
কুহকীদের ঘড়ার গর্ভে,
ঝিনুকের ফিসফিস শব্দে।

শিকড়ের বেঁচে ওঠার খবর এনেছে সে,
আমাদের বিয়েশাদির, জাহাজঘাটার, গায়কদের –
সাগরের বেঁচে ওঠার খবর এনেছে সে।

গানের মুখোশ

কাদায় ডোবা এক দেশে তার ইতিহাসের দিব্যি গেলে
খিদেয় সে তার ভুরুদুটো সাবাড় করে দেয়,
হাওয়াবাতাস খবরই পায় না কবে সে শেষ হয়ে গেছে
গানের
এই লম্বা মুখোশের তলায়।

সে একাই তো বিশ্বাসী সেই বীজ,
জীবনের গভীরে সে একাই তো থাকে।

মদিনার সঙ্গীরা

মদিনার সঙ্গীরা, ওকে বরণ করো
কাঁটায়, কিংবা বরণ করে নাও পাথরে,
তারপর হাত দুটো উঁচিয়ে ঝুলিয়ে দাও ওকে
যাতে সোজা কবরে যেতে পারে,
কপালে তিলক আঁকো ওর
গনগনে অঙ্গার কিংবা উল্কির,

আর জ্বলতে দাও মিহ্যারকে।


একটা অলিভ গাছ আর এক নদীই শুধু নয় আরও অনেক কিছু,
একঝলক নিঃশ্বাসের আসা-যাওয়াই নয়, আরও অনেক কিছু,
একটা দ্বীপ আর এক অরণ্যই নয়, আরও অনেক কিছু,
একা এক মেঘই শুধু নয় আরও অনেক কিছু
তার ধীর পথে ছুটে যায়
আর নিজেদের বিছানায় শুয়ে, পড়ে , তারই লেখা বই।

(আরবিতে ‘মদিনা’ শব্দের অর্থ ‘শহর’। ৬২২ সালে হজরত মুহাম্মদ মক্কার সেই সময়ের অত্যাচারী শাসকদের হাত থেকে বাঁচতে আর্থ্রিবে অর্থাৎ আমরা আজকে যাকে মদিনা বলে জানি, সেখানে চলে আসেন। মদিনার যে সব মানুষ তাঁকে ঈশ্বরের দূত বলে স্বীকার করে নিয়ে তাঁর প্রচার করা ধর্মে দীক্ষিত হন, তাদের পরে ‘মদিনার সঙ্গী’ বলা হত।)

নব বিধান

এই ভাষাতে কথা বলেনা সে,
শোনেনি সেও মরুভূমির ডাক,
পাথুরে জড়তার দৈবকথা
প্রাচীন কত ভাষায় স্বরে গাঁথা,

সে হেঁটে যায় মেঘের টিলা মাথায়,
অচেনা অক্ষরের জলে-হাওয়ায়
কবিতাগুলো বাতাসে সঁপে দেয়,
কাঁকরে আর জাদু ছোঁয়ানো তামায়,

তার সে ভাষা মাস্তুলে ঝলকায়
আজব কথার ঘোড়সওয়ার যায়

প্রতিধ্বনি আর চিৎকারের মাঝখানে

প্রতিধ্বনি আর চিৎকারের মাঝখানে, সে লুকোয়
বর্ণমালার তুষারের নীচে, সে লুকোয়
ভবঘুরেদের দীর্ঘশ্বাসের মধ্যে, সে লুকোয়
ঢেউয়ের ভিতর, ঝিনুকের দলে, সে লুকোয়।

আর দিন যখন তার দরজাটা বন্ধ করে
তার চোখের ওপর, মরে যখন দিন ,
সে তার মোমবাতিটা পাহাড়ের দিকে উঁচিয়ে ধরে
হতাশায় যেটা সে হারিয়ে ফেলেছিল, আর সেখানে সে আশ্রয় চায়।

সেই ঘণ্টিটা

ঝুঁকে পড়ে পাম গাছ,
ঝুঁকে পড়ে দিন, আর সন্ধে –
সে আসছে, আমাদেরই মতো সে।আকাশ তবু তারই নামে
উঁচিয়ে তোলে তার বৃষ্টির ছাত
আর নীচু হয়ে ক্রমশ কাছে আনে তার মুখখানা
আমাদের ওপর ঝুলিয়ে দিতে, একটা সবুজ ঘণ্টি।

আকাশের সীমানায়

সে স্বপ্ন দেখে চোখদুটো মেলে দিয়েছে
আগামী কোনো শহরের গভীরে,
সে স্বপ্ন দেখে খাদের ওপর নেচে বেড়াচ্ছে ,
সে স্বপ্ন দেখে
খিদে আর সৃষ্টির দিন ফিরে আসবে না

সে স্বপ্ন দেখে ফুলে উঠে ফেটে গেল সে
যেন এক সমুদ্র – স্বপ্ন দেখে গোপন কথাগুলোকে লাগাম পড়িয়েছে
আর আকাশটাকে গড়িয়ে দিচ্ছে সে
আকাশের সীমানা থেকে।

মিহ্যারের মুখ

মিহ্যারের মুখ হল আগুন
পরিচিত তারকাদের পৃথিবী ছাই করে দেয় সে।

খলিফার দেশ পেরিয়ে যায়,
ডুবন্ত তারাদের পথ চেনাতে,
ধুলোয় মেশায় প্রতিটি বাড়িঘর,
ফেলে যায় বাসিন্দাদের,
হতাশাকে মেলে দেয় তার
সময়ের মুখের ওপর যেন এক নিশান।

বিভ্রান্তি

( কতগুলো কণ্ঠস্বর)

“ও বিভ্রান্ত বলেই
ধুলো পড়া শিখিয়েছিল আমাদের।

ও বিভ্রান্ত তাই
ওর আগুনের এক মেঘ, জন্মের পর জন্মের তৃষ্ণার,
আমাদের সাগরের ওপর দিয়ে উড়ে গেছে।

ও বিভ্রান্ত বলেই
কল্পনা আমাদের
ওর কলম আর বই দিয়েছিল।”

সে তার হাতদুটোর ভিতরে ঘুমিয়ে থাকে

হাতের তালুদুটো তার
মৃত দেশ, আর বোবা রাস্তাগুলো ছুঁয়ে দেয়।

যখন তার দু’চোখে ঝোলে মৃত্যু
এই পৃথিবীর খোলসটা আর যা কিছু তার ভিতরে সে গায়ে গলায়,
সে তার হাতদুটোর ভিতরে ঘুমিয়ে থাকে।

তার দু’চোখে

সে তার চোখ থেকে
একটা আলোর রেখা নেয়, দিনের শেষ
আর হাওয়াবাতাস থেকে একটা ফুলকি, তার দুটো হাত
আর বৃষ্টির দ্বীপ থেকে নেয় স্বভাব,
আর সকালের জন্ম দেয়।

আমি জানি তাকে – তার দু’চোখে
সাগরের ভবিতব্য ;
সে আমাকে ইতিহাস নাম দিয়েছে , একটি কবিতা
শূন্যতাকে যা শুদ্ধ করে।

আমি জানি তাকে – সে আমাকে প্লাবন নাম দিয়েছে ।

দিনের যমজ

রাত্রি – সবকটা দরজা আর ডাইনিগুলো
মিহ্যারের ফুসফুসে,
তার হলদেটে মুখ আর দুটি হাতে।

জীবনের আদি, আমাদের সঙ্গেই মরো, আমাদের সঙ্গেই মুছে যাও ,
সাগরে পাঠাও আমাদের তার খোঁজে ,
আমরা তো চাই তাকে, তার জন্যই বেঁচে আছি আমরা – মিহ্যার,
আমাদের যমজ সে, দিনের যমজ।

দিনের বাতাস

ভুল কোথায় ? মিহ্যার হারিয়ে গেছে,
ধাঁধাগুলোর উত্তর পেয়েছে সে, ছুঁড়ে দিয়েছে সেগুলোকে
পাথরের মতো ধুলোর কেতাবের মধ্যে।

তোলো, পাল তুলে দাও,
পাড়ি দাও সমুদ্রে।
আর কোনো সমুদ্র কখনো দেখেছ কি তুমি ?
ভুল কোথায়? দিনের হাওয়া পিছিয়ে দিয়েছে তোমায়।

ওরা

তাদের চিনতে পারে সে,
নিজের পাহাড়গুলো তাদের ওপর ঠেলে সে ঘুরে দাঁড়ায়,
দিন আর বছরের সেই ভাঙন
বয়ে নিয়ে যায় সে এক জাগর শুদ্ধতা যা নিমেষেই গড়ে দেয় ।

আজব এক সীমান্ত থেকে তার মুখটা ঝুলে আছে,
ঝুঁকে পড়ে সেটা তাদেরই ওপর, ঝকমক করে ওঠে।

একটা জায়গায় সে এসেছে, যেখানে
কিছুই সে দেখে না এক নিজেকে ছাড়া ,
অন্য এক জায়গায় ফিরে যায় সে,
যেখানে আর কারো কিছুই চোখে পড়ছে না ,
দিনের সেই ভাঙন বুকে জেগে থাকে তার
নিকট আকাশের পাতাটা মুছে দিতে দিতে।

বর্বর সন্ত

দৃশ্য আর লিপ্সার দেশ শুনতে পাও
এই মিহ্যার হল তোমাদের বর্বর সন্ত –
ওর দু’ঠোঁটে আমারই ঠোঁট আর ওর ভুরুদুটোতে আমারই ভুরু
অর্থহীন এই সময়ের বিপরীতে যা পথিকদের থামাতে এসেছে।

এই মিহ্যার হল তোমাদের বর্বর সন্ত
ওর নখের তলায়,
আর রক্তে এক ঈশ্বর ,
সে সেই একাকী জনক ;
যারা তাকে দেখে পথ হারাল তাদেরকেই সে ভালোবেসেছে।

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)