রিয়া ঢোলের কবিতাগুচ্ছ
না পারার ভেতরে
একটা অদৃশ্য দেওয়ালের সামনে
রোজ এসে দাঁড়িয়ে পড়ছি
শুকনো নদীর মতো জলের দাগ খোঁজা
-এও এক অঅন্বেষণ।
ঝড়ের ভিতর নিভে যেতে চাওয়া প্রদীপটা
দু হাতে আগলে প্রবোধ দিচ্ছি নিজেকেই-
..শান্ত থাকো..
মনে হয় অনেকটা পথ হাঁটছি
তবু যেন ঘুড়ির সুতো ছিঁড়ে যাওয়া আমাকে
স্থির থাকতে দিচ্ছি না।
আবারও –
একটা বন্ধ দরজার সামনে রোজ এসে দাঁড়াচ্ছি
কড়াও নাড়ছি
নিজেকে বলছি
..শান্ত থাকো..
ওপাশ থেকে কোনো শব্দ আসে না।
সময়-ভাঙা প্রেমে
ক্লকটাইমের লাল কাঁটাটা ছুঁচ হয়ে বিঁধে বুকে,
ওয়াইফাইয়ের সিগন্যাল জুড়ে কেবল তোমার দূরত্ব।
স্ক্রিনের ওপাশে তুমি অনলাইন, অথচ মাঝখানে
অফিসের কিউবিকল আর অফুরন্ত ব্যস্ততার মরুতুষ্টি।
আমাদের প্রেম আজ মেট্রো রেলে ঝুলে থাকা ক্লান্তি,
লিফটের কপাট বন্ধ হওয়ার আগের এক পলক দেখা।
দুপুর বা আড়াইটে মানেই ডেডলাইনের চাপা আতঙ্ক—
এরই মাঝে মেসেঞ্জারের ইনবক্সে হঠাৎ ভেসে ওঠে:
“কফি খাবে?”
সময় নেই, তাও সময় চুরি করে গলে পড়ে ভালোবাসার কণা,
কংক্রিটের জঙ্গল ভেদ করে এই যে এক মুঠো ছোঁয়া—
তাতেই তো বেঁচে থাকে আমাদের এই আধুনিক শিহরণ।
যান্ত্রিক ঘড়ির কাঁটার বিরুদ্ধে তবু অনন্ত এক দীর্ঘশ্বাস।
মহীরুহের গান
ঝড়ের রাতেও যে চারাগাছটি মাথা নোয়ায়নি,
সে জানে পরে একদিন সে মহীরুহ হবে।
পাথরের বুকে শিকড় চালিয়ে যে ফুল ফোটায় হাসি,
সে চেনে দীর্ঘশ্বাস তবু আলোর আকাশ।
সে আকাশে জমেছে কালো মেঘের পাহাড়,
তবু হাসে রূপালী ভোরের রোদ।
টিকে থাকার জেদ।
টিকে থাকার জেদ? তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে নিয়তি।
সময়ের বুকে তো জোয়ার-ভাটা চলে নিয়মের টানেই।
লোহা পুড়ে তবে ইস্পাত হয়, সোনা পায় তার রূপ,
কষ্টের মাঝে আদলটা লুকিয়ে থাকে সাফল্যের আঁচলে
তিমির পেরিয়ে আসবে আলো, এই আশাটুকু থাক,
লক্ষ্য আমার ধ্রুবতারা।
স্বপ্ন ডানা মেলুক,
আমার জেদের কাছে এই কঠিন সময়
তিমির বিনাশী হতে চায়।
নির্ধারিত জিততে চায় শ্রমে
আমরা কি তিমিরবিলাসী?
আমরা তো তিমিরবিনাশী
হ’তে চাই।
আমরা তো তিমিরবিনাশী।
একটি পুরুষের জবানিতে...
অনেকদিন ধরে একটা নদী আটকে আছে তার ভেতরে
বর্ষা আসছে না, তীর ভিজছে না, অথচ অস্থিরতা?
জলের নিচে বাড়ছে।
তার শরীরে একটা বাড়ি
যে বাড়িতে সব আলো জ্বলে
কিন্তু একটা ঘর সে তালা দিয়ে রেখেছে
বহুদিন কেউ খোলেনি।
সেই ঘরে একটা চাপা গরম জমে আছে
যেমন রোদের পর বদ্ধ ঘরে
হাওয়া জমে থাকে।
সে চায়
কেউ এসে জানলাটা খুলে দিক
আস্তে, যেন পর্দাটা উড়ে না যায়।
সে চায়
কেউ তার নাম ধরে ডাকুক
সেই ডাকা গিয়ে লাগুক
তার কোমরের ভাঁজে।
না ছোঁয়া একটা ফলের মত
অনেকদিন সে ভেতরে পেকে উঠছে।
রস গড়িয়ে পড়ার আগের মুহূর্ত যেমন থাকে
টানটান।
স্ক্রিনশটের শহর
স্ক্রিনের নীল আলোয় ঝুলে থাকে মধ্যরাত, চোখের কোণে জমে থাকা ক্লান্তি কোনো অ্যালগরিদম মাপতে পারে না। হাতে ধরা কফি কাপের ঠান্ডা হয়ে যাওয়া আর ভবিষ্যতের অনিশ্চিত গ্রাফ— সব যেন মিলেমিশে একাকার।
মাঝপথে থেমে যাওয়া কোনো লিফটের মতো ঝুলে আছে আমাদের অস্তিত্ব, নেই ওপরে ওঠার ভরসা, নেই নিচে নামার মুক্তি। অফিসের কিউবিকেল বা জুম কলের স্কিন— কোথাও যেন খুঁজে পাওয়া যায় না নিজের আসল মুখ।
হাতে সময় আছে, তবু সময় খরচ হয়,
চারপাশে মানুষের ভিড়, অথচ নৈঃশব্দ্যেরা দেয় পাহাড়া। এই অস্থির সময়ে, এক মুঠো অক্সিজেনের খোঁজে আমরা শুধু হেঁটে যাই, নিজেদের ছায়াকেও অচেনা লাগে।
উৎসবের আলোয়
ঢাকে কাঠি পড়বে বলে
শহর এখন ইস্ত্রি করা নতুন শাড়ি।
কাশফুলেরা মাথা নাড়ে রাস্তার পাশে,
আমার ভেতরটা নড়ে না।
চারদিকে আলো। মণ্ডপে মণ্ডপে ভিড়।
তার মধ্যেই বুকের ভেতর একটা ফাঁকা চিলেকোঠা পড়ে আছে –
যেখানে জীবনের কোনো হিসেব মেলে না।
এইসব ভাবনার ভিড় ঠেলে
একটাই উষ্ণতা হাত বাড়ায়।
মহালয়ার ভোর,
রেডিওতে পুরনো হয়ে যাওয়া একটা গান,
ভাঙা ঘুমের ভেতর যেন তুমিই বাজো।
তুমি ষষ্ঠীর বোধনের মতো —
শান্ত অথচ দৃঢ়
সপ্তমীর সকালের রোদ্দুরের মতো পরিষ্কার।
অষ্টমীর অঞ্জলি তোমার নামেই।
নদী মোহনার জন্য অপেক্ষা করে,
প্রদীপ একটু হাওয়ার জন্য —
নিভে যেতে নয়,
আরও একটু জ্বলে উঠবে বলে।
এই ভিড়ে, এই আলোয়,
আমার সমস্ত দুশ্চিন্তা
তোমার কাঁধে মাথা রাখে।
চাইছি, এই রাতটা
নবমীর রাতের মতোই
একটু দেরিতে শেষ হোক।
(কবি রিয়া ঢোল বাংলা সাহিত্যের ছাত্রী। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে এম.এ. ও এম.ফিল. এবং রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচ.ডি. ডিগ্রি অর্জন করেন।
অধ্যাপনার সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ যোগ। তিনি অধ্যাপনা করেছেন সি.টি. কলেজ, শিবনাথ শাস্ত্রী কলেজ ও যোগেশ চন্দ্র চৌধুরী কলেজে। বর্তমানে তিনি নিউ আলিপুর কলেজে অধ্যাপনার কাজে নিযুক্ত আছেন।
এম.এ. পাঠকাল থেকেই বিভিন্ন সাহিত্য পত্র-পত্রিকায় কবিতা ও প্রবন্ধ লেখার সঙ্গে যুক্ত।
তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ দুটি — কবিতার বই ‘ইচ্ছেডানা’ এবং প্রবন্ধের বই ‘আশির কবিতা: এপার ওপার’।)

