যে কোনো একটি কবিতাই যখন চিনিয়ে দেয় কবিকে
তিলোত্তমা বসু

কবিতার নাম ‘ যখন আমরা হাসতাম ‘ । রাজলক্ষ্মী দেবীর ‘ ভাব ভাব কদমের ফুল ‘ বইটির পাতা উল্টোচ্ছিলাম । নাহ । ঠিক বলা হল না । বরং বলি চোখের দুজন ডুবুরি কবিতার সমুদ্রজলের অনেক গভীরে ক্রমশ নিমজ্জিত হচ্ছিল । প্রতি কবিতায় দেখা পাই কবিমনের নানা দিকের গতিবিধির সঙ্গে ।
পঞ্চাশের দশকের কবি রাজলক্ষ্মী দেবী । তাঁর সাবলীল কাব্যভাষায় লাবণ্যের ছটা । ছন্দের দোলায় তিনি মধুরভাবের দোলা লাগলেন আমার হৃদয়পেন্ডুলামে ।
পড়তে পড়তে একটি কবিতায় গেলাম থমকে । এমন সুন্দরের মুক্তো গড়িয়ে নামল ভিতরে যে মনে হল একটু লিখি । লিখে রাখি পাঠের অনুভূতিটুকু । হ্যাঁ , সেই কবিতাই হল ‘যখন আমরা হাসতাম ‘।
‘ অনিন্দ্য , তোমায় আমি যখন ভালোবাসতাম , / সামান্য সব কথা নিয়ে আমরা তখন হাসতাম । ‘ কবিতা এমন করে হল শুরু । বুঝলাম সেই ভালবাসা শেষ হয়নি । হয়নি বলেই আমি কবির’ যখন ভালোবাসতাম ‘ শব্দবন্ধকে বর্তমান কাল হিসেবে গণ্য করার সাহস দেখাই নিজের কাছে । ভালোবাসার অনুরণন থেকেই বুঝি রচিত এ কবিতা , এমনই মনে হতে থাকে । আর এই ভাবে কেমন করে অতীত এসে মিশে থাকে বর্তমানে – সময়কে নিয়ে আশ্চর্য ট্রাপিজের খেলা দেখি । এইভাবে । একটি কবিতায় ।
“ আমরা তখন হাসতাম কোনো কথা না নিয়ে , / আমরা তখন হাসতাম কোনো কথা বানিয়ে “/–
ভালোবাসা তো একটি অনুভূতি । অনুভূতিকে অঙ্কন করা হল । মাধ্যম অক্ষর । ছন্দের রঙ কেউ দেখেছে কখনো ? দেখা গেল এ কবিতায় তাও । ছন্দের রঙ ময়ূরকন্ঠী নাকি ? কখনো রক্তিম আভা । কখনো সোনালি ঝলক । নীল আভা । কেন না “ আমরা তখন হাসতাম আকাশ খুশি- নীল বলে । /আমরা তখন হাসতাম সকাল ঝিলমিল হলে “ । ভালোবাসা হলে , একজন নারী ও পুরুষের , তখন তো কোনো কারণই তেমন প্রয়জন হয় না আনন্দের । গোটা পৃথিবীটাই আলো । ঝিলমিল । কবিতার রিনরিন নীল জলধারায় জলতরঙ্গের বেজে ওঠা । নেচে ওঠা । “ রোদের চুড়োয় চড়তাম , / মেঘের গুঁড়োয় ঝরতাম ‘ / । আর পাঠক পেলেন ঝরে পড়া আলগা – নিবিড় , সতর্ক – আনমনা ,গহন- সহজ এক ভঙ্গীমা ।
তারপর এসে মিশল একটি বাঁক । না । এই বাঁকটির জন্যে নেই কোনো বিশেষ অনুচ্ছেদ । বাঁকটি এসে মিশে আছে যেমন হাসির ভিতরে মিশে থাকে দীর্ঘশ্বাস । “ অনিন্দ্য, — কী করে গেল সে সব দিন ফুরিয়ে ? / হাসির সেই চপল পাখি কখন দিলে উড়িয়ে ? / “ । খানিকটা আচমকাই বুঝি ঘনাল মেঘ ।
আলো নত হয়ে এল । কবি উচ্চারণ করলেন বেদনা । ক্ষোভ নয় । আর্তনাদ নয় । বড় স্বাভাবিক ভাবেই এই জানতে চাওয়া । তবু কোথায় যেন পাতা ঝরার শব্দ । আলো ম্লান হয়ে আসে । সজল হয়ে ওঠে দিগন্ত । পাঠকের মন ।
“যখন আদিগন্ত সুখ মুঠোর ভিতর ধরতাম ,– / হাসির পর হাসি সাজিয়ে তাসের ঘর গড়তাম ,–” এখানে “ সাজিয়ে” এবং “ তাসের ঘর “ এই শব্দদুটি যেন জলছাপের মতো । একটু পরেই মিলিয়ে যেতে পারে তবু কেমন নিয়তির এক টান বুঝি । বুঝে শুনেই তবু নিরুপায় ভেসে পড়া । অনিশ্চয়তায় ঝাঁপ দেওয়াই বুঝি ভালোবাসার অন্যতম ধর্ম । আর অনিশ্চয়তার মধ্যেই রয়েছে এমন এক বিচ্ছেদের আভাস যা সম্পর্কের প্রতি আকর্ষণকে আরো বাড়ায় । ‘ তাসের ঘর ‘ ই তখন সব থেকে আদরের আশ্রয় ।
যখন আমরা হাসতাম হৃদয়-ভরা আশা নিয়ে — / যখন আমরা হাসতাম হৃদয় ভালোবাসা নিয়ে / ‘ । ধীরে আশা মুছে যায় । আলো কমে আসে । ভালোবাসা কি হারিয়ে যেতে পারে তবু ? অতীতকালে পর্যবাসিত হয়ে যায় শেষ পর্যন্ত ? এখানেই মস্ত বড় জিজ্ঞাসা চিন্হ । যদি তাই হত তবে কি এই কবিতা লিখিত হত ? হয়ত না । শুধু আশাটুকু
অন্তর্নিহিত হয় । সফলতা আসে না । কোথাও একটা যতিচিন্হকে মেনে নিতেই হয় । তবু ‘ একটি হাসির , আনন্দের , মুক্তির স্বাদ তা যতই স্বল্প সময়ের হোক না কেন , তা যে বড়ই খাঁটি , সত্যি , তা বুঝিয়ে দেয় এই কবিতাটি । বিফলতা কখনো যেন অন্যরূপের সফলতাই আসলে । স্বীকৃতি না পেলেও প্রেম মরে যায় না । লিখিত হয় এমন একটি অনুরণন । অনুভূতি ধারণ করেন অক্ষরের শরীর ।
রাজলক্ষ্মীদেবীর কবিতায় সহজে কেমন অনন্তকে ছোঁয়া যায় এই ভাবে । নারীর কোমলতার সঙ্গে মিশে থাকে বলিষ্ঠ কলমের সুনিপুন মুন্সিয়ানা । খুব আধুনিক স্মার্ট তাঁর লেখা ।এক একটি কবিতাই যেন আলাদা আলাদা দিক আর দেখাকে বলে যায় । ‘ যখন আমরা হাসতাম’ একটি স্বতন্ত্র কবিতা অথচ রাজলক্ষ্মীদেবীর নিজস্ব ঘরানার ছাপ ষ্পষ্ট । যে কোনো একটি কবিতাই চিনিয়ে দেয় কবিকে যখন তখন সেই কবিকে জানাতে ইচ্ছে করে প্রণাম ।

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)