মনের নয়নে  <br /> তিলোত্তমা বসু

মনের নয়নে
তিলোত্তমা বসু

নববর্ষ পাঠচক্র। গ্রন্থ- মন সারাইয়ের দোকান। অংশুমান কর। নাটমন্দির। ১০০ টাকা। আলোচনায় তিলোত্তমা বসু

মন । দুই অক্ষরের শব্দ হলেও এর বিস্তার অনন্তকেই হয়ত নির্দেশ করে । আলোর থেকেও বেশি জোরে ছুটতে পারে মন । মনই পারে জুড়ে দিতে । মনই পড়ে ভেঙে । মনে পড়ে । মনই মাঝি । বৈঠা তুলে নেয় হাতে । মন নিল যে বঁধু। মন দিল না তবু । এমনকি নয়নে তোমাকে দেখতে না পাওয়া গেলেও , মনের নয়নে নয়নে রয়েছ ঠিকই । এই আশ্চর্য মন নিয়েই কারবার কবির । তবে কবির মনই বা কেমন ? সে কি এক সোনার রেকাবি ? স্টফটিকের গেলাস ? কিংবা প্রত্নতাত্বিক গবেষণায় মাটি খুঁড়ে পাওয়া মৃত্পাত্র-ও ! সেই জন্যই কি এলিয়ট বলেছেন , ‘The poet’s mind is in fact a receptacle for seizing and storing up numberless feelings, phrases, images, which remain there until all the particles which can unite to form a new compound are present together.’ মন নিয়ে এমন তরো সব কথা ভাবতে ভাবতেই – অবাক কান্ড । দেখি ‘ মন সারাইয়ের দোকান ‘ । সাম্প্রতিকতম কবিতার বই অংশুমান করের ।

অংশুমানের কবিতার সঙ্গে পরিচয় নতুন নয় । পড়েছি ওঁর আগের বেশ কিছু কবিতার বই । পড়ে, একদম স্বতন্ত্র এক কাব্যভুবনে পড়েছি ঢুকে ।চারপাশের চেনা জগতের মধ্যে থেকেই হঠাৎ অনায়াসে তিনি গুপ্তধনের সন্ধান পেয়ে যান বুঝি । আচমকাই কেমন তুলে আনেন এক একটি স্বর্ণমুদ্রার মত কবিতা । হয়ত চোখের সামনেই ছিল । তবু তিনি দেখিয়ে না দিলে নজরেই আসত না । চেনা জগতের ভিতর থেকেই কেমন করে খুঁজে দেন আশ্চর্যকে । সত্যকে ।তবু এইটুকু বলেও পাঠকের যেন ঠিক তৃপ্তি হয়না । বলতে হয় তাঁর আবিষ্কৃত নতুন কাব্যভাষার কথা । এই ভাষাকে পরশমণিভাষা বললে অত্যুক্তি করা হয় না বোধহয় । কেননা সমস্ত মানুষই তাঁর কবিতাকে ছুঁতে পারবেন । তাঁর কবিতা পাঠককে ছুঁয়ে যায় অনায়াসে । কবিতা যিনি লেখেন তিনি যেমন অংশুমানের কবিতার রঙ মর্মে লাগাবেন , যিনি লেখেন না কবিতা , হয়ত পড়েনও না খুব একটা কবিতাকে , তিনিও ওঁর কবিতা পড়ে অনুভব করতে পারবেন । রাশিয়ান চিন্তক বাক্তিন প্রকাশ করেছিলেন তাঁর এক অমূল্য ভাবনা , ‘ Truth is not born , nor it is to be pound inside the head of an individual person.It is born between people collectively searching for truth , in the process of their dialogic interaction’ . অনেক মানুষের মনের পাশে থাকা কবিতা । তার অন্যতম কারণ সরলতা । কিনতু কোথাও তরলতা নেই । সহজ । তবে এ বুঝি সহজিয়া সাধনপথটিই । সর্বস্তরের পাঠককে অংশুমানের কবিতা ছুঁয়ে যাওয়ার ফলে অনেক চিন্তাস্রোত এসে মিশে যায় একসঙ্গে । কবিতার সাম্রাজ্য হয় বিস্তৃত । সত্য এই ।

তবে এই সাম্প্রতিকতম বইটি‘ যেন আগের পাঠঅভিজ্ঞতাকে কোথাও ছাপিয়ে গেছে । কেননা এই বইয়েই কবি জানিয়েছেন ,’ কবি একটি পেন্সিল / তাকে যত কাটবে / সে তত তীক্ষ্ণ হবে । ‘ এই তীক্ষতাই ‘মন সারানোর দোকানে’র সব থেকে বড় বিশেষত্ব । ছুরির ফলার ধারে কেটে যায় পাঠকের মন । মুগ্ধতা ঝরে । পরিসর স্বল্প । বক্তব্য তবু ছুঁতে পারে আকাশ ।

আধুনিকতা , উত্তর আধুনিকতা ,উত্তর – উপনিবেশবাদ ইত্যাদি নানা মুনির নানা মতের বিতর্কে না গিয়ে বলি , অংশুমানের কবিতা শহরের গা ঘেঁষে , সরস্বতী নদীর স্রোত বুকে নিয়ে মিশেছে সমুদ্রে । এই যেমন ধরা যাক ‘ধর্ম ‘ শব্দটি — কেমন যেন স্পর্শকাতর হয়ে পড়েছে আজকাল বড় বেশি । নানান জল ঘোলার হাত থেকে বাঁচাতে কবি প্রায় ‘ধর্ম’ শব্দটিতে হৃদয় প্রতিস্থাপন করেছেন । এই বইএর শুরুর কবিতাটির নামই ধর্ম । ’ রাষ্ট্রসঙ্ঘে মাইকের সামনে বক্তব্য রাখছেন নেতা । / টিভি ক্যামেরার সামনে বলছেন নগরপাল । /হট্টগোলে বলছে সবাই ।/ # আর ছোট্ট বোতামফুল ?/#/ সে কিছু বলছে না /#/ ফুটে আছে /” । ধর্ম আসলে এইই । যার যা স্বভাব তাইই ধর্ম । শব্দকে সারিয়ে তুলতে এসে কবি কি এই ভাবেই সরিয়ে দিলেন মন?

কবিতার নাম ‘মন ‘ : ‘ যেন অল্প একটু খুলে রাখা দরজা । / একবার উঁকি দিয়ে গেল একটা কুকুর । / উড়ে এল ঝরাপাতা । ধুলো । / আর এলো হাওয়া , এলো আলো . .. / ‘ মাত্র চার লাইনে এভাবে অনন্তকে ধরতে কবিই পারেন । পারেন , প্রতি শব্দে এসে যখন দাঁড়ান ব্রহ্ম স্বয়ং । ছড়িয়ে পড়ে ছোটো ছোটো কবিতার স্ফুলিঙ্গ । হাইকু রচনা মনেরই সংযমের সাধনা হয় তো । তেমনই কি কোনো ইঙ্গিত বহন করছে এই কবিতারাও ? উল্লিখিত এই কবিতাটিতে ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা বললেও আদতে কবি বার বার দূর থেকে দেখেন । মহাবিশ্বের প্রকান্ড সংসার । প্রকৃতি ।পরম শ্রদ্ধেয় শ্রী শঙ্খ ঘোষের ‘ দেখার দৃষ্টি ‘ প্রবন্ধটির কথা মনে পড়ে যায় । এই প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন ‘ আসল কথা হল চোখের উপর থেকে একটা পর্দা সরে যাওয়া , যে – কোনো ভাবেই হোক দেখাটাকে দৃষ্টি করে তোলা । ‘ এই বই পাঠ করতে করতে সেই দৃষ্টির সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে বইকি , — কবিতার নাম ‘ঘড়ি’ : ‘ শুধু হাড় ।/
পালক খসে খসে / দু’ডানা আজ যেন দুটি কাঁটা …/
মানুষকে বন্দি করতে গিয়ে /
বেচারা ঘড়ি /
নিজেই বন্দি হয়ে গেছে খাঁচায় । / ‘
সময় বুঝি মানুষকে হার- মানা- হার পরিয়ে দিয়েছে । মানুষের জয়যাত্রা কত দিকেই যে এগিয়ে চলেছে ! কেবল কবিতার দিকেই যদি দেখা যায় তবে তো বৈষ্ণব কবির ওই পংতিটি আজও সমান প্রযোজ্য – ‘ লাখ লাখ যুগ হিয়ে হিয়ে রাখনু / তবু হিয়া জুড়ন না গেল / “সময় তো কই মুছে দিতে পারেনি এই লেখা । সময় হেরে গেছে । ঘড়ি নিজেই বন্দি হয়েছে খাঁচায় । আর মন সারাতে এসে কবি তা টের পেয়ে যান । বাড়িয়ে দেন মনের জোর । মানুষকেই জয়ী ঘোষণা করেন ।

যাঁকে আবারো স্মরণ করি তিনি টি . এস .এলিয়ট, বলেন, ’The progress of an artist is a continuous self-sacrifice, a continual extinction of personality’। নিজেকে সরিয়ে রেখে জগৎকে সামনে নিয়ে আসা একটি আশ্চর্য গুণ , অংশুমানের কবিতায় যা বার বার দেখে আসছি –- ‘ পাঁচিল ছিল না , ছিল কাঁটাতার / কিনতু ছিল খটাস , ভাম , হায়েনা , শেয়াল / মাঝে মাঝে হানা দিত গৃহস্তের ঘরে , দিন কাটত ভয়ে ভয়ে । / তারপর হল পাঁচিল , লাগল কাঁটাতার / #/ এখন অবশ্য খটাস , ভাম , হায়েনা , শেয়াল / কিছুই নেই / তবু পাঁচিল , তবু কাঁটাতার । /#/জঙ্গল এখন ভয় পায় মানুষকে / ‘ — কিছু সত্য আছে যা রসতলের । কবি তাকেও দেখতে পান । সতর্ক করে যান যেন কোথাও , হে সভ্যতা ! মন সারাতে গেলে আগে যে খুঁজে পেতে হবে সঠিক পথ ।

এই মন সারাইয়ের দোকানে আছে প্রেম ,শব্দ, চাঁদ , ফুল ,ক্ষণ , গান । এরাই যে কবিতার প্রাণ । তিনটি দরদভরা মায়াবী লাইন পড়েছিলাম এ বইএর প্রবেশ কালেই । উৎসর্গ পাতায় । মনের ওষুধ বুঝি এই তিন লাইন — ‘ কী দিয়ে যে ভোলাই তোমায় / কাঁদছ একা একা ! / নেবে আমার দু’চার লাইন লেখা ? ‘ ।

তারপর আবার । আবারও দু লাইনের জাদু ।

চির বসন্তের দেশ থেকে আসে ভেসে – ‘’ কথা বলো ; ঠোঁট নয় , যা বলার বলে দেয় চোখ / বুঝে যায় সেই ছেলে , যাকে তুমি ডাকো ‘ ছোটোলোক’ /” এই দু লাইনে কি আশ্চর্য আবেদন । খুব চেনা প্রেমিকসত্বা । ঘরোয়া । তবু বড়ই অভিনব বলার ধরণ ।‘ ছোটলোক ‘ শব্দটি হচ্ছে চাবি এখেনে । মূল আকর্ষণ । দেখি খুব বেপরোয়া এক চাওয়ার শক্তি । যে শক্তির কাছে নত হয় ফুলে ভরা কদমের ডালও বুঝি । কিংবা ওই লেখাটি ! যেখানে বলছেন, ‘ শুনব না কারও কথা , হয়ে যাব হাওয়া / ইচ্ছে করলেই ছোঁব , এ টুকুই চাওয়া ‘ দেহ আর মন মিশে গিয়ে কেমন একাকার হয়ে উঠেছে বিকেলের ভিজে ভিজে রোদ । বৃষ্টিপরের আলো । ভাবনার আলো । মন কি এ ভাবেও সেরে ওঠে না ? কবির আনন্দভৈরবীতে তাল দিয়ে?

এই সব কবিতা , যা সমসময়কে ছুঁয়ে চিরসত্যের কাছে সমর্পিত , ব্যাক্তিগত থেকে
বহুমাত্রিক হয়ে ওঠে ক্রমে , যা আধুনিক অথচ স্মৃতির শিকড় প্রোথিত করে যায় ,আর এই সব কবিতার থেকেই ভেসে আসে মন-সারানিয়া জেনগানের টুং টাং নরম । তবে “ চুপ করে থাকা যে প্রতিবাদ , যা আসলে গভীর খাদের মতোই ভয়াবহ “ তখন শিখি । ভাবি এমন প্রতিবাদ জীবনে লাগবে কাজে ।

‘ পরানের গহীনে ‘ তাঁর ঘর । তা যেন খুব দুরেও নয় । কাছেও নয় তত । সে ঘর ভাঙা সহজ হবে না । কবির ঘর যে আশ্রয় আসলে । মনের । সেই ঘরের জানলা দিয়ে এসে পড়ল আলো । সাত রঙের আলো । অংশুমান করের একটি গদ্যের বইএর নাম ছিল ‘ সাদা কালোর সাত রঙ ‘ হঠাৎ মনে পড়ে গেল কেন ওই নাম ? হয়ত তাঁর আপাত সরল ভাষা আর গভীর দর্শনবোধের কথাই এর কারণ ।

এই বইয়ের প্রচ্ছদও বড় টানে । মনের রঙ কি নীল ? গাঢ় মধ্যরাত্রির নীল । চিন্তানদীর ঘন নীল । আবার শ্যামসুন্দরের চোখের তারার নীলভ্রমরারঙ । কবিতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কী অপূর্ব নীলের ব্যবহার করেছেন প্রচ্ছদ শিল্পী সৌরিশ মিত্র ! ‘ মন সারাইয়ের
দোকান’ সত্যিই ধরা দিয়েছে , ফুটে উঠেছে স্পষ্ট স্বপ্ননীল এক আবেশে ।

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)