আমাদের প্রবীর রায়,ম্যাজিক লন্ঠন থেকে বন্দীকাল <br /> সুবীর সরকার

আমাদের প্রবীর রায়,ম্যাজিক লন্ঠন থেকে বন্দীকাল
সুবীর সরকার

প্রবীর রায়(১৯৫২_২০২১)

সদ্য প্রয়াত হয়েছেন কবি প্রবীর রায়।একেবারে আচমকা পাওয়া এই দুঃসংবাদ এখনো হতবাক করে রেখেছে আমাদের!একথা বিশ্বাস করতে পারছি না যে প্রবীর দা আর নেই।
এই তো মৃত্যুর মাত্র ৬ দিন আগে আমাকে ফোন করেছিলেন।কবিতা চাইলেন।একদিন আসতে বললেন “শ্যামলছায়ায়”।
প্রবীর দার সাথে আমার পরিচয় সেই ১৯৯১ সালে।জলপাইগুড়িতে।আমার জ্যেঠুর বাড়ি জলপাইগুড়ি।আমরা বলি জলশহর।বছরে ৫/৬ বার আমি জলপাই যেতাম।লেখালেখির কত বন্ধু,অগ্রজ পেয়েছিলাম ওখানে।
শুনতাম সুরজিৎ বসু, রাণী অশ্রুমতির গল্প।
ছিল হিংটিং।ছিলেন স্মরজিত বাগচী।
জলপাইগুড়িতে বন্ধুরা মিলে কত বেপরোয়া আড্ডাই
যে দিতাম সেই প্রথম যৌবনে।
দল বেঁধে চলে যেতাম শ্যামল সিংহ,বিজয় দে,সমর রায় চৌধুরীর কাছে। সঙ্গ পেতাম গৌতম গুহ রায়ের।
অতনু বন্দোপাধ্যায়,শুভ্র,নীলাদ্রি,নিঝুম,সুকান্ত,দেবাশিস কুন্ডু আর আমি মিলে তখন শুরু করেছি “এরকা” পত্রিকা।শুরু হয়েছে আমাদের “সংহত কবিতা আন্দোলন”।
আর প্রথম থেকেই পাশে পেয়ে গেছি আমরা কবি প্রবীর রায় কে।কবি স্বপন রায় কে।কবি বারীন ঘোষাল কে।
ইতিমধ্যে প্রবীর রায়ের লেখা “রাম্মামে লেখা কবিতাগুচ্ছ” পড়ে ফেলেছি।
এক নুতন কবিতা।এক নুতন দেখা।
ইতিমধ্যে প্রবীর রায় আমাদের দাদা,আমাদের তীব্র আবদারের একটা আশ্রয় হয়ে উঠেছেন।স্নেহের আদর পাচ্ছি রিতা বৌদির কাছেও।
এইভাবে বাংলা কবিতা নিয়ে নুতন স্বপ্ন দেখার মহড়া শুরু হয়ে গেছে আমাদের।
এর পর শুরু হয় আমাদের “শ্যামলছায়ার” আড্ডা।
পরবর্তীতে অতনু বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত “এখন বাংলা কবিতার কাগজ”_এর উদ্যোগে সারা বাংলা ভাষা জেনে গিয়েছিল এই “শ্যামলছায়ার” আড্ডার কথা।যা ছিল তরুণ কবিদের অনিবার্য এক ঠেক।
২.
প্রবীর রায়, মানে আমাদের প্রবীর দা ছিলেন তরুণ অক্ষরকর্মী আর শব্দ চাষিদের কাছে তীব্র এক স্নেহ আর আশ্রয়ের জায়গা।নির্ভরতার জায়গা।
সেই ১৯৯১ এর প্রবীর দা ২০২১ এও একই ছিলেন।
শারীরিক কারণে বাইরে যেতে পারতেন না সেভাবে।কিন্তু উৎসাহ ছিল তরুণের মত।নিয়মিত খবর নিতেন সবার।
সম্পাদনা করতেন “জল্প ই ওয়েব” পত্রিকা।
লেখা নির্বাচনে খুব সৎ খুব নিখুঁত ছিলেন তিনি।
৩.
৭০ দশকে বাংলা কবিতা লিখতে এসেছিলেন প্রবীর রায়।”মহাদিগন্ত” পত্রিকার নিয়মিত লেখক ছিলেন তিনি।সেই সূত্রে তার কবিতার সাথে পরিচয় ছিল আমাদের।
১৯৮০ তে প্রবীর দার প্রথম কবিতার বই “ম্যাজিক লন্ঠন” প্রকাশিত হয় আবর্ত প্রকাশনী থেকে।
আর ২০২১ এর জুলাইতে তার শেষ বই “বন্দীকাল”
প্রকাশিত হয় “এখন বাংলা কবিতার কাগজ” থেকে।
অবাক হয়ে যাই,একেবারে নিজের মতন করে নিরলস এই ৪১ বছরের জার্নি।
প্রবীর দা নিজের লেখা নিয়ে ভীষন খুঁতখুঁতে ছিলেন।নিজের পছন্দ না হলে প্রকাশ করতে দিতেন না সেই লেখা।
প্রবীর দা ছিলেন গুটিয়ে থাকা মানুষ।
প্রকাশের তেমন আকাঙ্খা, সভা সমিতি,খ্যাতির বাসনা প্রবীর দাকে তেমন তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় নি সেভাবে!
প্রবীর দা তার “কবিতা সমগ্র_১”(এখন বাংলা কবিতার কাগজ প্রকাশিত)_এ প্রবীর দা নিজেই জানিয়েছেন,১৯৭৮ পর্যন্ত লেখা কবিতাগুলি পছন্দ না হওয়ায় তিনি সেগুলি নষ্ট করে ফেলেছিলেন।
৪.
প্রবীর দা ছিলেন আমাদের আত্মীয়।আমরা যখন প্রথম যৌবনে ছিলাম তখন যেভাবে আশ্রয় দিয়েছিলেন;৫০ পেরিয়ে আসা আমাদেরকেও ঠিক সেভাবেই আগলে রেখেছিলেন।
খুব কম কবির জীবনে এমন অগ্রজ থাকেন!
প্রবীর দা নেই।কিন্তু প্রবীর দা আছেন আমাদের ঘিরেই।জলশহর আর শ্যামলছায়া জুড়ে জুড়ে কবি প্রবীর রায় আছেন।এই তো একটু ঝুঁকে পড়া পিঠ নিয়ে প্রবীর দা বলছেন_
“অথচ এখনও কিছু কাঁচঘরে মোমের পুতুলগুলো
একা একা বসে থাকে ঘোর লাগা চোখে”।
৫.
বিদায় লিখবো না।ভালোবাসা লিখলাম,প্রবীর দা।

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)