কার্ল মার্ক্স: মৃত্যুর গোপন ইস্তেহার… <br />  বেবী সাউ 

কার্ল মার্ক্স: মৃত্যুর গোপন ইস্তেহার…
বেবী সাউ 

কী কঠিন ঠান্ডা, এঙ্গেলস! কী গভীর নিস্তব্ধতার দিকে হেঁটে যাচ্ছে পৃথিবী! তবু দেখো, ডিসেম্বরের মৃত্যু ভুলে, জানুয়ারির মৃত্যু ভুলে, লন্ডনের রাজপথ নতুন চিন্তার উদ্রেক করছে! নতুন কিছুর জন্য অপেক্ষা করছে হয়ত! ভয়ঙ্কর সেই প্রলয় অথবা চির শান্তি! কিন্তু কীভাবে আসবে বিদ্রোহ কিংবা শান্তি! কীভাবে লিখিত হবে গোপন ইস্তেহার! মার্ক্সের বেঁচে ওঠার মতো তোমার কাছে কী তেমন কোনও ইস্তেহারের কাগজ আছে কিংবা উথাল-পাথাল প্রেম!

এই পৃথিবীকে কে বাঁচাবে?

কেউ না, একেবারেই কেউ না… তুমি এত নিশ্চিত এবং কঠোর কীভাবে হতে পারো ফ্রেডরিক! আমরা সকলেই একটা ঢালু চিন্তাভাবনা এবং পরিস্থিতিতে বাস করি। যতক্ষণ মিথ্যা আমাদের রক্ষা করছে, ততক্ষণ

আমাদের গড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগবে না। আজ অবশ্য এই জরাবহনকারী শরীরে কোনও আশা জন্মায় না। বরং বলতে পারো, আশা বিষের মতো কাজ করে। এটা বুঝতে, আমি আকাশচুম্বী ভবনের লাল এবং হলুদ আলোগুলোর দিকে তাকিয়ে আছি। হ্যাঁ হলুদ! ঠিক যেভাবে কারখানার বিষাক্ত ধোঁয়ার ভেতর ধুঁকতে থাকা দুটি চোখ হলুদ হয়ে যাচ্ছিল ক্রমশ!

এঙ্গেলস! এসময় তো বসন্ত নেমে আসার কথা ছিল শহরের পথে পথে। চেরিফুলের গন্ধে ভরে যাওয়া উচিত ছিল রাজপথের আনাচ-কানাচ! পৃথিবীর উচিত ছিল এতদিনে পালটে যাওয়ার! রোদের গভীরতায় আমাদের জেগে ওঠার সময় এখনও হয় নি বুঝি! এখনো কী আমাদের মানবিকগুণগুলোর জেগে ওঠার অবসর হয় নি? চেরিব্লুমসের হালকা গোলাপি এবং সাদার এই আশ্চর্যজনক মেলবন্ধন আমাদের কী আরেকবার হতাশা থেকে, মৃত্যুর গ্রাস থেকে জাগিয়ে তুলতে চাইছে না? চেরি অদ্ভুত এক ফুল এঙ্গেলস! দেখো, মার্চের গভীরে মার্চ করতে করতে কীভাবে শুকনো কর্কশ রাজপথগুলোকে সতেজতা এবং আনন্দে ভরে দিচ্ছে! যদি তুমি প্রবল ঠাণ্ডা উপেক্ষা করে বাইরে বেরিয়ে যাও এবং আমাকে এসে বিবৃত করো চেরিফুলে ভরে ওঠা শহরের জীবনযাত্রা, আমার এই রোগ জীর্ণ শীর্ণ শরীর খানিক শান্ত হয়!

এ বছর নিশ্চয়ই নতুন কিছু পরিবর্তন ঘটবে দুনিয়ার! পৃথিবী জেগে উঠবে! জেগে উঠবে শ্রমিক, কৃষক, সাধারণ অতি সাধারণ বস্তিবাসীরাও! তোমার কী মনে হয় ফ্রেডরিক, এতদিনে পৃথিবীর ঘরে ঘরে কী পৌঁছে গেছে দাস ক্যাপিটাল? মানুষ কী পেয়েছে তার পর্যাপ্ত মূল্য? তরুণদের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে ম্যানিফেস্টো হাতে রাজপথে নেমেছে তরুণীরা, বৃদ্ধা, উপেক্ষিত মানুষজনও! পৃথিবী মানুষের জন্য করে যেতে হবে… মানুষের বসবাসযোগ্য এক পৃথিবী!

তুমি এমনভাবে, এত নিরাসক্ত এবং অসহায়ভাবে আমার দিকে কেন তাকিয়ে আছ, জেনি? আমাকে কি তোমার দুর্বল, অসহায়, খিটখিটে এবং ব্যর্থ এক বৃদ্ধ বলে মনে হচ্ছে? নাকি আমি আজ গাট হয়ে এই আরামকেদারায় বসে আছি বলে, তুমি ভাবছ, আমি পুঁজিবাদী? আমাকে… আমাকে মাটিতে শুইয়ে দাও… মাটি হয়ে যাওয়ার আগে মা-টির গন্ধ নিতে দাও আমাকে…

বিষণ্ণ হও না এঙ্গেলস! মৃত্যুর পরেই তো সবাই বেশি বেশি করে জেগে ওঠে, ফ্রেডরিক! আলোচিত হয়! আমাদের ভাবনাগুলো নিয়ে তখন হয়তো বেশি বেশি ভাববে মানুষ… তাই না? তুমি আজকাল এত মৌন থাক কেন? দেখো, লন্ডনের এই রাজপথ কিন্তু আমাদের নতুন উদ্যমের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে! কিন্তু তোমার মধ্যে এত নিস্পৃহ ভাব কবে উদিত হল, ফ্রেডরিক!  তুমি কী আমার মেয়ে এবং জামাতাদের মৃত্যুর মতো কঠিন হয়ে উঠেছ? এত শীতল… ঠান্ডা! উত্তর দিচ্ছ না কেন?

এই দুনিয়া আশ্চর্য ইউটোপিয়া, ফ্রেডরিক! তুমি শুধু কল্পনার ভেতর ঢুকে পড়, দেখবে চারপাশটাও কেমন সত্য হয়ে উঠছে। জানো, গত রাতেও জেনি এসেছিল স্বপ্নে। ঠান্ডা অথচ উজ্জ্বল দুটো নীল চোখ নিয়ে নয়নতারার মতো চেয়ে ছিল অনেকক্ষণ আমার দিকে!

উফ! জেনি! তোমার প্রতিটি স্বপ্ন আমি পূরণ করতে চেয়েছিলাম। চেয়েছিলাম হাতে হাত রেখে একমাত্র তোমার কাছেই সবুজ একটি পাতা হয়ে উঠতে। যে পাতা তারুণ্যের উদ্ভাসে উদ্ভাসিত হয়ে থাকবে চিরকাল! তোমার জীবনে ঘটে যাওয়া এক একটি অপ্রিয় সত্যকে মুছে ফেলে সকালের টগবগে সূর্যের মতো স্নিগ্ধ এবং সুন্দর হয়ে উঠবে! তুমি নারী কিন্তু অধিক মর্যাদা পাবে একজন মানুষ হিসেবে! নারী এবং পুরুষ দু’জনেই হয়ে উঠবে মানুষ! এসব ভাবতে ভাবতে এত এত বিরুদ্ধতার ভেতর লড়তে লড়তে আমি যখন ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম… সবাই আমাকে ভাবিয়েছিল, ভাবতে বাধ্য করেছিল এ এক অবাস্তব ধারণা… আর আমি ক্রমশ পাগলের পথে এগিয়ে যাচ্ছিলাম… আর তখনই তুমি কেন এমন করে চাইলে আমাকে, জেনি? আমার উলট-পালট পৃথিবীর বুকে এগিয়ে দিলে তোমার শান্ত সহজ মাথা। আমি তোমাকে কী দেব! উলটে পরিপূর্ণ করে দিলে আমাকে! তুমিই হয়ে উঠলে আমার আশ্রয়! জেনি, আজকাল স্বপ্নে তোমার শান্ত অথচ কঠোর নীল চোখ কী ইশারা করে? এক অশান্ত পৃথিবীর? সমাজের? পুঁজিবাদের? যুদ্ধের? মানুষের হাতে মানুষের রক্তের? সাম্রাজ্যের?  আধিপত্যের? নাকি ভ্রম শুধুই ভ্রম! জেনি, তোমাকে আজকাল আমার সেই ইউটোপিয়া মনে হয়! যেন এখুনি তোমার সঙ্গে,  স্বপ্নে দেখা ছায়ামূর্তির সঙ্গে বেরিয়ে পড়ি দীর্ঘ পথে। আবার সেই তারুণ্যের উদ্দামে মেতে উঠি। স্বপ্ন দেখি… তোমাকে পড়ে শোনাই পৃথিবীর গভীরতম প্রেমের উপাখ্যানটি… তোমার জন্য রচনা করি আশ্চর্যতম একটি প্রেমের কবিতা! কিংবা বিদ্রোহের! জেনি, তুমি তো জানো, এই পৃথিবীর তামাম বিদ্রোহ আসলেই প্রেম থেকে জন্ম। ভালোবাসা ছাড়া কখনোই কোনো বিদ্রোহ ঘটিত হতে পারে না!

কিন্তু আজকাল? উফ! কী গভীর সত্য চারপাশে! মিথ্যের কী বিরাট আস্ফালন!

জেনি, অথচ আমরা জন্মেছি এক অদ্ভুত অস্ত্র নিয়ে— এই দুনিয়ায় শক্তি কখনোই শ্রেষ্ঠ হতে পারে না, যতই তার পুঁজি থাকুক, অস্ত্র থাকুক, গোলা বারুদ থাকুক না কেন… রাঢ় ভূমির সেই তেসু গাছের রঙের সঙ্গে পরিচয় হল যখন, যখন আমি ধীরে ধীরে তোমার ঘাড়ের চুল সরিয়ে হালকা চুম্বনের ছলে, আশ্চর্য এক দুনিয়ার প্রবেশ করতে করতে মনোরম  উপলব্ধির দিকে ঝুঁকে পড়েছিলাম…এই যে আমি, এই যে তুমি আর সাদা, লাল, বহুবর্ষজীবী ফুলের বৃষ্টি, এটাই আমার জীবনের বসন্ত! উফ! আর তেসু! কী তীব্র তীক্ষ্ণ লাল!

কিন্তু তুমি তো জানো জেনি, এই যুগ গণহত্যার, রক্ত ​​জমাট বাঁধা রোগের… শ্বাসরুদ্ধকর নিঃশ্বাসের পরেও বেঁচে থাকার বাধ্যবাধকতার….নিপীড়িত ও শোষিতদের… তবুও সেই অদ্ভুত অস্ত্র শক্তিশালী… সেই অস্ত্র যার নাম ভালোবাসা! তুমি তাকেও লাল রং দিলে?

আজ মার্চের চোদ্দ তারিখ…খানিকক্ষণ পরে সূর্য উদিত হবে পুবকোণ বরাবর! আমি তোমার স্বপ্ন ভেঙে আরেক স্বপ্নে ঢুকে যাব জেনি… ওরা সবাই আসবে… আমাকে বিছানা থেকে তুলে বসিয়ে দেবে আরামকেদারায়। আমাকে আমার শোক, কষ্ট, দুখ ভুলে যাওয়ার কথা বলবে। ডাক্তার এসে দেখে নেবেন আমার নাড়ি! ফ্রেডরিক এসে আমাকে বলবে—  চলুন নতুনভাবে সাজাই পালটে ফেলার ছক! আর আমার বৃদ্ধ, জরাগ্রস্ত, হতাশার ছায়ায় আমি গুলিয়ে ফেলব তোমার মৃত্যু,  মেয়ে-জামাইদের মৃত্যু! তোমাকেও জেনি! উফ! জেনি, জীবিতদের কাছে মৃত্যু এক আশ্চর্য গভীর যন্ত্রণা! এই যন্ত্রণা থেকে মুক্ত হতে চায় সবাই, কিন্তু… !

ফ্রেডরিক,  তুমি এসেছ? জানো, সেদিন মেয়ে আর জামাই-এর কবরখানা থেকে ফেরার সময় আমি আবার সেই বৃদ্ধ ভিক্ষুকটির কথা ভাবছিলাম। প্রতি মুহূর্তে আমরা যে করুণার নাটক করে যাচ্ছি, সেসব এড়িয়ে যেতে হবে! সবচেয়ে নিষ্ঠুর জিনিস হচ্ছে আমাদের করুণা। যে করুণা করছেন তিনি নিজেকে মহান এবং অহংকারী সাজিয়ে তুলছেন এবং যাকে করুণা করা হচ্ছে সে হয়ে পড়ছে দুর্বল এবং হীনমন্য! এই সীমারেখা মুছে ফেলতে হবে! সীমান্ত আঁকো! কিন্তু সীমারেখা নয়! অথচ, আমি সারাজীবন করুণাকে শ্রেষ্ঠ ভেবে এলাম! এই ভুল, এই ভুলের জন্য আমি কখনোই নিজেকে ক্ষমাযোগ্য করে তুলতে পারি না! কিছুতেই পারি না, মৃত্যু এড়াতে নিজেকে নিজে হত্যা করে গেছি বারবার! ফ্রেডরিক ভাবো, যদি করুণা না থাকত, তাহলে নিষ্ঠুরতা থাকত! আর দুর্বলের নিষ্ঠুরতা যন্ত্রণা এবং আঘাত থেকে বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করত তাকে!

ফ্রেডরিক, এটাকেও ইউটোপিয়া বলবে?  জানি…

আজ এতদিন পরে, কত কত ১৪ মার্চ পার করে এসে যখন দেখি, পৃথিবীর বুকে আরও গভীর হয়েছে ক্ষত! আরও আরও মিথ্যা চেতনার ভেতর ঢুকে পড়েছে শ্রম এবং শ্রমিক! জন্ম এবং মৃত্যু! গণতন্ত্র এবং… করুণা! দয়া!

মানুষ এত হিংস্র কেন? এত নির্মম? ওই ছোট্ট ছোট্ট শিশুদের উপর! এই চেরিফুলের মতো বাচ্চাদের কীভাবে ব্যবহার করছে রাষ্ট্রনায়ক! গণতান্ত্রিক দেশের নেতা, মন্ত্রী, আমলারা! জেফরি এপস্টেইনের জন্ম যখন হল তখন কী আমি মরে গেছিলাম এঙ্গেলস? এত বিপুল বিশাল বিশ্বে কেউ একজন এমন মানুষ ছিল না যে এসব আটকায়… তবে আমরা এতদিন কী করলাম ফ্রেডরিক? একটা মানুষও তৈরি হল না এতদিনে? বলো… বলো… চুপ থেকো না! এত হাস্যস্পদ বানিয়ে দিও না আমাকে!

আমি জানি, ধারণা এবং ধারণ-এর মধ্যে বিস্তর ফারাক! কিন্তু তা বলে, এভাবে মেরে ফেলবে ধারণাকে! এভাবে পণ্য হয়ে উঠবে শ্রম! এভাবে নিরূপিত হবে শিশু, নারী, নদী, মাটি, শস্য ও ফলন! শস্যের লোভে রাজপথে পথে জ্বলবে শস্যফলনকারীর লাশ! এবং কৃষকের আত্মহত্যা নিয়ে মৌন থাকবে সংবাদ মাধ্যমগুলি?

জেনি, আমি তোমাকে একদিন বলেছিলাম— এই পৃথিবীতে কিছু হারায় না। কোনও না কোনও ভাবে অতীত আবিষ্কৃত হয়! কোনও না কোনও ভাবে খুঁজে পাওয়া যাবে জীবাশ্ম! আর সেখান থেকেই আবার তৈরি হবে নতুন ইতিহাস। এভাবে নির্মূল কিংবা নির্মাণ কোনোটাই করা যায় না!

কিন্তু আজকাল আমি আমার নিজের মৃত্যুকে উপলব্ধি করি প্রবলভাবে! ঠিক যেমনটা করেছিলাম, ১৩ মার্চ রাতে! আমি দেখেছিলাম আমার পিতার আত্মাকে, তোমাকে এবং আমার মৃত সন্তান এবং প্রিয়জনদেরও…

আর তার ঠিক পরের দিন ১৪ই মার্চ…

কিন্তু তখন আমার কাছে মৃত্যু ছিল শারীরিক। সে মৃত্যু ছিল স্বপ্নমণ্ডিত। আমি আমার নশ্বর শরীরের বদলে অবিনশ্বর এক চেতনার জন্ম দেওয়ার স্বপ্নে মশগুল ছিলাম। নিজের মৃত্যু প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধি করছিলাম বটে! কিন্তু আমি দুঃখিত ছিলাম না। কেননা, আমি সেই অবিনশ্বর ধারণার জন্ম দিতে পেরেছিলাম এবং ভেবেছিলাম সেটাই নিশ্চিত রূপে আগামী পৃথিবীর মানচিত্র হতে চলেছে।

আমার জীবনের দীর্ঘ যাত্রায় একসময় মনে হয়েছিল আমি যেন দুটি পথ খুঁজে পেয়েছি। পথ কখনো কখনো আলাদা বলে মনে হলেও, গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায় একটা সময় একই দিকে গিয়ে মিশে যায়। ইতিহাসের অনেক বিতর্ক, অনেক মতাদর্শ, অনেক তর্ক—সবই যেন শেষ পর্যন্ত একটি বড় প্রশ্নচিহ্নের দিকে নিয়ে যাবে আমাদের। আমরা প্রশ্ন করবো… যুক্তি খুঁজব এবং প্রবলভাবে দেখার চেষ্টা করবো অবস্থানকে। যখন এসব ভাবলাম, দেখি আমি পথের শেষ প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছি। এবং তখনই হঠাৎ করে বুঝলাম— একটি পথই থেকে যায় শুধু…

এঙ্গেলস, মানুষ প্রায়ই নিশ্চিত থাকে, যে তার কাছে মানচিত্র আছে এবং সে দিক নির্ধারণ করতে পারে! এটাকেই আমি মিথ্যা প্রমাণ করতে চেয়েছিলাম। আমি তাদের আকাশে উড়তে থাকা পাখিদের দিকে তাকাতে বলেছিলাম… শুধু পাখিদের… আমি বোঝাতে চেয়েছিলাম মানচিত্র ভুলেও তারা কী দারুণ সত্য এবং সৎ!

আজকাল আমার মনে হয়, ইতিহাস অস্পষ্ট এবং অনির্দিষ্ট। কখনো কখনো এমনও মনে হয়েছে, আমরা যে সত্য খুঁজে পাই, তা যেন হিমবাহের নিচে দীর্ঘ সময় ধরে চাপা পড়ে থাকা সবুজ পাতার একটি ক্ষুদ্র টুকরোর মতো। বহু সময় পরে, বহু শ্রমের পরে, বহু বহু খননের সময় সেটি হঠাৎ দেখা দেয়। আর অনিচ্ছা সত্ত্বে ইতিহাস তার নগ্ন রূপ তুলে ধরে… শ্রমের, বঞ্চনার… প্রতিহিংসার…

ফ্রেডরিক, আজকাল আমার কী মনে হয় জানো, নীরবতার মধ্যেও ইতিহাস কাজ করে। এই যে দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিটি বসন্তে আমি চেরি গাছের ফুলগুলোর মসৃণ মৃত্যু এবং বেঁচে ওঠা দেখছি, শতাব্দী প্রাচীন বৃদ্ধ হয়ে উঠছে, তখন মনে হয়, কখনো কখনো নীরবতাই ভবিষ্যতের যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পারে। যখন মানুষ কথা বলা বন্ধ করে, তখন সে হয়তো নিজের ভেতরের সত্যের মুখোমুখি হয়! সেই সময় মনে হতে পারে, একটি সবুজ পাতার টুকরোও যেন একটি সবুজ ফুলের পাপড়ি হয়ে উঠতে পারে— অর্থাৎ ক্ষুদ্রতম সম্ভাবনাও নতুন অর্থ পেতে পারে। কল্পনা,  ভাবনা এবং ধারণা আমাদের ধারণক্ষম করে তোলে ফ্রেডরিক!  তোমার কী মনে হয় এত এত মৃত্যু-বসন্ত পেরিয়ে এসে?

জেনি, আবার তুমি এসে দাঁড়িয়েছ! আবার তুমি তোমার নীল চোখের দৃষ্টি ছড়িয়ে বুঝিয়ে দিতে চাইছ, আমার মৃত্যুর মসৃণতাকে? কিন্তু ভাবো জেনি, মানুষ প্রায়ই দেয়ালের উপর আঁকা কোনো চিহ্নকে মানচিত্র বলে মনে করে। কিন্তু আমি জানি, মানচিত্র  কাছে থাকা মানেই সব জায়গায় পৌঁছানো সম্ভব নয়। পৃথিবী এবং ইতিহাস তার চেয়েও জটিল। যদি কেবল মানচিত্রের সাহায্যেই সব জায়গায় পৌঁছানো যেত, তবে মানুষ অনেক আগেই সেই জায়গাটি খুঁজে পেত যেখানে তার এতদিনে পৌঁছে যাওয়া উচিত ছিল!

আজ ইতিহাসের বেঁচে ওঠা কঠিন! মানুষের গন্তব্যও ততটা স্পষ্ট নয়। তাই পথ চলতে চলতেই মানুষকে তার পথের অর্থ খুঁজে নিতে হয়। হয়তো সেই কারণেই আমি সবসময় বোঝাতে চেষ্টা করে গেছি, মানুষ নিজের ইতিহাস নিজেই তৈরি করে, যদিও সে তা তৈরি করে এমন এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে এবং সবটাই তার নিজের হাতে পুরোপুরি তৈরি নয়!

তবু… তবুও… এঙ্গেলস… আমাদের কাজ করে যাওয়া কি উচিত নয়? স্বপ্নের সাধনা ইত্যাদি ইত্যাদি বলে যতই গালাগাল তারা দিক কেন!

কিন্তু আজ, এত এত চেরি ফুলের মৃত্যুর পর ক্রমশ বুঝতে শিখেছি, সময় কোনো কিছুকে ঢেকে রাখার নিয়ম জানে না। মানুষ যতই ইতিহাসের ওপর পর্দা ফেলতে চায়, সময় ততই তার ভিতরের ক্ষতগুলো উন্মুক্ত করে দেয়। আমি বহু বছর ধরে একটি স্বপ্নের কথা বলে যাচ্ছি, একটি সমাজের কথা, যেখানে মানুষ মানুষকে শোষণ করবে না, যেখানে শ্রম হবে মুক্তির পথ! ভেবেছি উন্নয়নশীল দেশেগুলো উন্নতির দিকে এগিয়ে যাবে… তারা বুঝতে শিখবে মানুষ এবং শ্রমের মূল্যকে! অবশ্য বুঝেছেও, কিন্তু সম্পূর্ণ বিকৃত এবং উল্টো ভাবে! ফলে অনেকেই সেই স্বপ্নকে ইউটোপিয়া বলে ডেকেছে। আজ আবার যখন ১৪মার্চ এসে দাঁড়িয়েছে সূর্যের সকালে, ফ্যাকাশে রোদের চেহারা দেখে মনে হয়, সেই ইউটোপিয়া যেন এক বৃদ্ধ বৈদ্যের মতো—যে বহু পুরোনো ওষুধের থলি নিয়ে বসে আছে, মানুষের অসুখ সারানোর জন্য, অথচ কেউ আর তার কাছে আসে না… ফিরে তাকায় না… শুধু তাচ্ছিল্যের হাসি ছুঁড়ে দিয়ে গভীর অসুখের দিকে নিয়ে যায় পৃথিবীকে!

আমারও আজকাল কেমন যেন মনে হয় জেনি, সম্ভবত ইউটোপিয়া ভুল ধারণা ছিল আমার! কিংবা আমি তাকে ঠিকঠাক ধারণ করার কৌশল রপ্ত করানোর অভ্যাস করাতে পারি নি! আমি আজ এটাও মানি, একটি সম্ভাবনা, একটি আকাঙ্ক্ষা, যা কখনো পুরোপুরি সমাধান করা যায় না। কিন্তু তবুও আমি কখনোই তাকে শেষ পর্যন্ত বিশ্লেষণ করে, কাটাছেঁড়া করে ভেঙে ফেলতে চাইনি। স্বপ্নকে পুরোপুরি বিশ্লেষণ করলে তারা ভেঙে যায়। ঠিক যেমন তোমার আমার অস্তিত্ব অনস্তিত্বের বৈশিষ্ট্য! এই প্রকটভাবে প্রকাশ এবং মৃত্যু…

ফ্রেডরিক, জীবন যেন এক দীর্ঘ দৌড়। নির্বাসন থেকে নির্বাসনে, এক শহর থেকে অন্য শহরে। ট্রিয়ার, প্যারিস, ব্রাসেলস, লন্ডন—প্রতিটি শহর আমাকে কিছু দিয়েছে, আবার কিছু কেড়ে নিয়েছে। দৌড়াতে দৌড়াতে একসময় বুঝেছি—দৌড়ে চলাটাই একটা অবস্থা। মানুষ অনেক সময় গন্তব্যের জন্য নয়, কেবল দৌড়ে থাকার জন্যই দৌড়ায়। জেনি, তুমি তো বলেছিলেও, বসে থাকার চেয়ে দৌড়ে থাকা ভালো…

ইতিহাসের এই অন্তহীন গতির ভেতর এক মুহূর্তের জন্য যদি স্থিরতা আসে, তবে হয়তো আমি সেইসব শব্দ শুনতে পারব যেগুলো কখনো উচ্চারণ করা হয় না। সেইসব নীরব শব্দ, যেগুলো শ্রমিকদের নিঃশ্বাসে, বস্তির অন্ধকারে, অথবা কারখানার শব্দের ভিতরে লুকিয়ে থাকে। আমি আজকাল সেইসব স্পষ্ট শব্দ শুনি। প্রবল মেধাবী তরুণদের দেখি বারো টাকার ডেলিভারি বয় হয়ে যেতে! শ্রম ভালো কিন্তু শ্রমের অপচয়! দেখি, গিগ-এর প্রবল আধিপত্য! অ্যালগরিদমের জালে বন্দি এক অসহায় ব্যবস্থাকেও!

ঠিক তখনই তোমার প্রিয় মার্ক্স মৃত্যুর দিকে ঝুঁকে পড়ে জেনি…

ফ্রেডরিক, ঠিক তখনই আরামকেদারায় অতি যত্নে বসিয়ে রাখা তোমাদের প্রিয় বন্ধু, স্বজন মার্ক্সের ঘাড় হেলে যায় অক্সিজেনহীন হয়ে…

আমি একটি কঠিন সত্যের মুখোমুখি হয়েছি, সময়! কোনো শহরকে দীর্ঘদিন ধরে ভালোবাসা যায় না। শহরগুলোও আসলে মানুষের মতো বদলে যায়। আমরা যতই তাদের কল্পনার আলোয় সাজাই, একদিন তারা সেই কল্পনার বিরুদ্ধে বিদ্রূপ করে হা হা হো হো স্বরে হেসে ওঠে। যে শহর একসময় আশ্রয় ছিল, পরে তারা নির্বাসনের স্মৃতিতে পরিণত হয়েছে।

মানুষ আসলে অনেক কিছু থেকে পালাতে চায়। আর রাষ্ট্র আসলে সেই পলায়নপর নাগরিকদের রক্তচক্ষু দিয়ে বশে আনতে চায়। কিন্তু এখনও কী তেমন কোনও স্বপ্নদেখা মানুষ তৈরি হয়েছেন, যিনি চান, না জিনিসগুলো বদলে যাক! তখনই শুধু ১৪ই মার্চ মৃত্যু নয়, জন্ম হয়ে উঠবে!

জানি জেনি, আজকাল আমরা চাই না উষ্ণতা বাড়ুক, রং গাঢ় হোক, পাতা শুকিয়ে পড়ে যাক! আমরা চাই না সময় আমাদের হাতে জমে থাকা ফাটলগুলো প্রকাশ করে দিক আমাদের নগ্ন রূপকে। কিন্তু  পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দুর্বলতাগুলোও প্রকাশিত হয়ে পড়ে।

দেখো এঙ্গেলস ফ্রেডরিক, আমরা কেমন কঠিনভাবে মেনে নিতে, মানিয়ে নিতে শিখে গেছি! আর মানুষ নিজেরই তৈরি কাঠামোর বন্দি হয়ে পড়ছে! কেননা, সে নিজেকে ভয় পায়! সে যখন নিজের দিকে তাকায়, দেখে তার সীমাবদ্ধতা, তার ব্যর্থতা, অসম্পূর্ণ স্বপ্ন খিলখিল করে নগ্ন রূপকে চরমভাবে প্রকাশ করে ফেলে…

এটাই সত্য, জেনি!

এটা নির্মম বাস্তব!

মার্ক্সের মৃত্যু যতই তোমার লুকিয়ে রাখো না কেন দু’চারদিন… মার্ক্স সত্যি সত্যি মরে গেছে ১৪ মার্চের গভীর অপরাহ্নে… মার্চের রৌদ্রে ঝলসে যাওয়া চেরিগুলোর মতো… আর নগ্ন রাজপথ পিষে, মাড়িয়ে মিশিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে সবার অজান্তে…

আরামকেদারায় হেলে পড়া মৃত,  বৃদ্ধ,  জরাগ্রস্ত কার্ল মার্ক্স…

 

১৪ মার্চ, ২০২৬

 

 

 

 

 

CATEGORIES
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)
demon slauer rule 34 lena the plug leak amateurtrheesome.com cumming in milfs mouth mujer haciendo el amor a un hombre, belle delphine of leaked emma watson in porn xxxamat.com big booty in public hidden cam gay sex, sit on face porn g a y f o r i t forcedpornanal.com please screw my wife female celebrity sex tapes