
উচ্চাকা্ঙ্খা হোমেন বরগোহাঞি বাংলা অনুবাদ –বাসুদেব দাস
ছয়
একদিন একজন কুড়ি একুশ বছরের যুবক আমার কাছে এসে বলল–’ স্যার আমি একটা উপদেশ চেয়ে আপনার কাছে এসেছি।আমার বাড়ি নলবাড়ির একটি ভেতরের পিছিয়ে পড়া গ্রামে।বাড়ির আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ। চাষের জমি মাত্র দুই বিঘা আছে। সেই জমিতে হওয়া ধানে সারা বছরের মধ্যে এক মাসেরও খাবার জোটে না। কিন্তু এরকম দুরবস্থার মধ্যেও আমার পিতা এবং দাদা হাজিরার কাজ করে আমাকে বিএ পর্যন্ত পড়িয়েছে। আমি পড়াশোনায় কোনোদিনই চেষ্টার ত্রুটি করিনি;কখনও তিন বেলা খেতে না পেলেও পেটে গামছা বেঁধে হলেও পড়াশোনা করেছি । গত বছর আমি ইতিহাসে মেজর নিয়ে বি এ পাশ করেছি।আমাকে বিএ পাস করাতে গিয়ে পিতা সর্বস্বান্ত হয়েছে।তাই এম এ পড়ার প্রশ্নই উঠে না। এখন আমাকে কিছু একটা চাকরিতে ঢুকে পিতা এবং দাদার ঋণ পরিশোধ করতে হবে। সারা জীবন কখনোই পেট ভরে খেতে না পাওয়া আমার মাতা পিতা দাদা এবং বোনেরা এখন পরম আশায় তাকিয়ে আছে কেবল আমার মুখের দিকে; ওরা ভাবছে যে আমি বিএ পাস করেছি যখন ওদের দুঃখের দিন শেষ হতে আর দেরি নেই। কিন্তু ওদেরকে আমি যে কথাটা মুখ ফুটে বলতে পারিনি, সেই কথাটা আমি আজ আপনার কাছে বলতে দৌড়ে এসেছি। স্যার কথাটা হল এই যে আমাকে যদি একটা ভালো সরকারি চাকরি খুঁজতে হয়, তাহলে তার জন্য পরীক্ষা দিতে হবে, আর চাকরি পাবার জন্য পরীক্ষা উত্তীর্ণ হতে হলে আমাকে খুব পড়াশোনা করতে হবে। কিন্তু স্যার, আমার শরীর একশোটা অসুখের ভান্ডার।। আমার গলার অসু্খ, কানের অসুখ নাকের অসুখ। ডাক্তারের মতে সেই সব কোনো এক এলার্জির জন্য হওয়া অসুখ– যা সহজে আরোগ্য হওয়ার কোনো আশা নেই। সব সময় আমার এত বেশি মাথার ব্যথা হয় যে আমি চোখে ভালোভাবে দেখতে পাই না এবং বই পড়ায় মনোযোগ দিতে পারি না। আমার অসুখের তালিকা কিন্তু শেষ হয়নি। আমার সব সময় পেটের অসুখ হয়ে থাকে, বুক জ্বালা পোড়া করে, খাবার জিনিস হজম করতে পারি না। ডাক্তারের মতে গ্যাস্ট্রিকের অসুখ। এই সমস্ত ছাড়া আমার মন সবসময় বিষন্ন হয়ে থাকে, কিছু একটা অজানা আশঙ্কায় বুকটা ধড়ফড় করতে থাকে, রাতে ভালো ঘুম হয় না। ডাক্তারের মতে এটি একটি মানসিক তথা স্নায়বিক রোগ– Anxiety Neurosis। স্যার এতগুলি অসুখের চাপে আমি এভাবে ভেঙ্গে পড়েছি যে ভালোভাবে পড়াশোনা করে ক্যারিয়ার গড়া দূরের কথা,, বেঁচে থাকার সাহস নাই হয়ে গেছে।প্রায়ই আত্মহত্যার কথা ভাবি; কিন্তু কেবল আমার মুখের দিকে ব্যকুল আশায় তাকিয়ে থাকা পিতা-মাতা এবং ভাই-বোনদের করুণ মুখ গুলি সেই পথে এগিয়ে যাওয়ায় আমাকে বাধা দান করছে। … … স্যার, আমি চারপাশে অন্ধকার দেখছি,বেঁচে থাকার জন্য আমাকে কিছু একটা উপায় বলে দিন।’
যুবকটি প্রায় একই নিঃশ্বাসে তার দুঃখের কাহিনি বলে শেষ করে হঠাৎ নীরব হয়ে গেল। তার মুখ থেকে বের হওয়া প্রতিটি শব্দ আমি অখণ্ড মনোযোগে শুনছিলাম এবং সঙ্গে সঙ্গে অনেক কথা ভাবছিলাম। কিন্তু যুবকটির প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে আমি আরও অনেক কথা চিন্তা করে দেখার প্রয়োজন আছে বলে ভাবলাম। তার নীরবতার সমান অংশীদার হয়ে আমিও অনেকক্ষণ নীরব হয়ে রইলাম।
আমরা যখন ছেলে মেয়েদের তাদের ভবিষ্যৎটা গড়ার জন্য উপদেশ এবং প্রেরণা দিই, তখন আমরা প্রধানত তাদের স্বভাব চরিত্রের কথা ভেবেই কথাগুলি বলি। অর্থাৎ স্বতঃসিদ্ধ ভাবে এই কথা আমরা ধরে নিই যে ছেলে মেয়েরা তাদের ভবিষ্যৎটা উজ্জ্বল এবং সুন্দর করে গড়ে তোলার জন্য তাদের প্রথমত সৎ স্বভাব এবং সৎ চরিত্রের অধিকারী হতে চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু নানা রোগব্যাধি এবং ভগ্ন স্বাস্থ্য যে অনেক ছেলেমেয়ের উন্নতির পথে বড়ো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে সে কথা আমরা প্রায়ই মনে রাখি না। আমাদের মতো দরিদ্র দেশের ছেলেমেয়েদের জীবন অনাহার অর্ধাহার এবং অপুষ্টিতে অকালেই পঙ্গু করে ফেলে, কোনোমতে বেঁচে থাকার বাইরে অন্য কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষার কথা তারা মনে আনতে পারেনা। আমাদের দেশে এই ধরনের ছেলেমেয়েদের সংখ্যাই বোধ হয় বেশি হবে– যাদের একজন প্রতিনিধি হল ওপরে উল্লেখ করা যুবকটি। সাধারণ ছেলে মেয়েদের দেওয়ার মতো আমরা যদি তাদেরও গতানুগতিক মামুলি উপদেশ দিই, তাহলে সেটা হবে তাদের কাটা ঘায়ে নুন দেওয়ার মতো, তার দ্বারা তাদের কোনো উপকার হবে না। বরং আমরা তাদের এই অভয় বাণী শোনাতে হবে যে রোগ ব্যাধি এবং শারীরিক দুর্বলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে নিজের মনোবল অটুট রাখতে পাড়ার সমান বড়ো বীরত্ব অন্য কিছুতে নেই। আমরা তাদের এ কথা স্মরণ করিয়ে দিতে হবে যে প্রত্যেক মানুষের মধ্যে এরকম একটি শক্তি সুপ্ত হয়ে থাকে – যে শক্তির বলে মানুষ সমস্ত দুর্ভাগ্য এবং দুর্বলতাকে জয় করে সেই সবের ওপরে উঠতে পারে। মানুষকে কেবল নিজের চেষ্টায় সেই শক্তিকে জাগাতে পারতে হবে।
দীর্ঘ নীরবতা ভঙ্গ করে অবশেষে আমি তাকে বললাম –’ তোমার প্রশ্নের উত্তরে আমি তোমাকে একটা কাহিনি বলতে চাই। কাল্পনিক কাহিনি নয়। একজন সত্যিকারের মানুষের কাহিনি। সেই কাহিনিটি শুনে তুমি যদি তোমার দুর্ভাগ্যকে জয় করতে কোনো শিক্ষা এবং প্রেরণা পাও, তাহলে তুমি আমার কাছে আসাটা সার্থক হবে। কিন্তু আসল কাহিনিটা বলার আগে তার ভূমিকা হিসেবে আমি তোমাকে একটা অন্য কথা বলে নিতে চাই। কয়েকদিন আগে আমি টেলিভিশনে একটি ইংরেজি সিনেমা দেখেছিলাম। কোনো একটি কাজে দুই বন্ধু অরণ্যে গিয়েছিল। সেখানে একটি প্রকাণ্ড ভালুকের সঙ্গে তাঁদের সাক্ষাৎ হয়। তার রাজ্যে মানুষের অনুপ্রবেশ হচ্ছে দেখে ভালুকটির এত রাগ হল যে সে মানুষ দুজনকে মেরে ফেলার জন্য বদ্ধপরিকর হল। ভালুকটির হিংস্র মূর্তি দেখে বন্ধুদুটিও বুঝতে পারল যে ভালুকটাকে না মারলে তারা ভালুকটির কাছ থেকে প্রাণ নিয়ে ফিরে যেতে পারবে না। কিন্তু তাঁদের হাতে বন্দুক ছিল না, একটিমাত্র দা ছিল। ভালুকটির সঙ্গে তাঁদের মুখোমুখি যুদ্ধ হয়নি, দুই পক্ষই আক্রমণ করার জন্য সুযোগের খোঁজে অনেক সময় ধরে লুকোচুরি খেলছিল। বন্ধু দুজনের ভেতরে একজন ছিল দুর্বল প্রকৃতির ভীতু মানুষ। ভালুকের মূর্তি দেখে তাকে তার সঙ্গে সম্মুখ সমরে লিপ্ত হওয়া দূরের কথা, দূর থেকে ভালুকের গর্জণ শুনেই ভয়ে তার মূর্চ্ছা যাওয়ার উপক্রম হল। কিন্তু অন্যজন ছিল অত্যন্ত সাহসী এবং আত্মবিশ্বাসী মানুষ। সে দুর্বল বন্ধুটিকে বলল –’ আফ্রিকায় থাকার সময় নিরস্র মানুষকে খালি হাতে সিংহকে বধ করতে আমি নিজের চোখে দেখেছি। কাপুরুষ হাতে অস্ত্র থাকলেও শত্রুকে বধ করতে পারেনা, অন্যদিকে সাহসী মানুষ খালি হাতে ও শত্রুকে বধ করতে পারে। সাহসই তা্ঁর অস্ত্র। এখন তুমি বল –’ একজন মানুষ যে কাজটা করতে পারে, অন্য সমস্ত মানুষই সেই কাজটা করতে পারে।’
ভীত মানুষটি কুঁজো হয়ে মাটিতে বসেছিল। সাহসী মানুষটি একই কথা কয়েকবার বলতে থাকা সত্বেও ভয়াতুর মানুষটির মুখ থেকে অনেকক্ষণ পর্যন্ত কোনো শব্দই বের হল না। মানুষটি তখন একটি প্রকাণ্ড ধমক দিয়ে বলল–’ বল বলছি না, বল – ‘একজন মানুষ যে কাজটা করতে পারে, অন্য সমস্ত মানুষ সেই কাজ করতে পারে।’
ভীতু মানুষটি কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল –’ একজন মানুষ যে কাজ করতে পারে, অন্য সমস্ত মানুষ সেই কাজ করতে পারে।’
সাহসী মানুষটি চিৎকার করে বলল–’ এভাবে নয়, জোরে জোরে আর ও একবার বল–’ একজন মানুষ যে কাজ করতে পারে, অন্য সমস্ত মানুষ সেই কাজ করতে পারে।’
ভীতু মানুষটি মাটিতে সোজা হয়ে বসে আগের চেয়ে জোরে বলল –’ একজন মানুষ যে কাজ করতে পারে, অন্য সমস্ত মানুষই সেই কাজ করতে পারে।’
সাহসী মানুষটি তৃতীয় বারের জন্য বলল–’ কণ্ঠস্বর আরও উঁচুতে চড়িয়ে জোরে আর ও একবার বল–’ একজন মানুষ যে কাজ করতে পারে, অন্য সমস্ত মানুষ সেই কাজ করতে পারে।’
ভীতু মানুষটি কণ্ঠস্বর যতটা সম্ভব উঁচুতে চড়িয়ে বলল –’ একজন মানুষ যে কাজ করতে পারে, অন্য সমস্ত মানুষই সেই কাজ করতে পারে।’
তুমিও এ কথা সব সময় মনে রাখবে যে একজন মানুষ যে কাজ করতে পারে, অন্য সমস্ত মানুষ সেই কাজ করতে পারা উচিত।
এখন আমি তোমাকে বলতে চাওয়া আসল কাহিনিটা বলছি শোন।
তোমার অসুস্থতার তালিকাটা বেশ দীর্ঘ। কিন্তু তা সত্ত্বেও তুমি যে ইতিহাসে মেজর নিয়ে বিএ পাস করেছ, তা থেকেই বুঝতে পারা যায় যে তোমার অসুস্থতা তোমাকে যন্ত্রণা দিয়ে থাকলেও তোমাকে শয্যাশায়ী বা ধরাশায়ী করতে পারার মতো এতটা শক্তিশালী ছিল না। কিন্তু আমি যে মানুষটির কথা তোমাকে এখন বলতে যাচ্ছি তার অসুখ তাকে এতটাই কাবু করেছিল যে স্কুলে যেতে না পেরে সে লেখাপড়া অর্ধেক পথেই ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল। অর্থাৎ তোমার চেয়ে তার শারীরিক অবস্থা ছিল বহু গুণে বেশি খারাপ। কিন্তু এরকম একজন মানুষই কেবল নিজের অদম্য মনোবল এবং অপরাজেয় ইচ্ছা শক্তির সাহায্যে বিজ্ঞানের সাধনায় আত্মনিয়োগ করে সেই সময়ের ইংল্যান্ডের দুজন সর্বশ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিকের মধ্যে একজন হতে পেরেছিলেন। অন্যজন ছিলেন তার সমসাময়িক স্যার আইজ্যাক নিউটন। মানুষটার নাম ছিল জন ফ্লেমষ্টিদ।
১৬৪৬ খ্রিস্টাব্দের ১৯ আগস্ট ফ্লেমষ্টিদের জন্ম হয়েছিল। তাঁর বয়স যখন মাত্র তিন বছর, তখনই তার মায়ের মৃত্যু হয়েছিল। আর সুরা ব্যবসায়ী পিতা তার শিক্ষার জন্য যথেষ্ট যত্ন নিয়েছিল।ফ্লেমষ্টিদ স্কুলে পড়তে থাকা অবস্থায় একদিন একটি নদীতে স্নান করতে গিয়েছিলেন। তখন তাঁর বয়স চৌদ্দ বছর। নদীর জল ছিল বরফের মতো ঠান্ডা। স্নান করে উঠে আসার সঙ্গে সঙ্গে ফ্লেমষ্টিদ ভীষণ অসুস্থ অনুভব করতে লাগলেন। প্রথম অবস্থায় প্রত্যেকেই তাঁর অসুখটাকে সর্দি জ্বর বলে ভেবেছিল। কম বয়সী ছেলেমেয়েদের হঠাৎ খুব ঠাণ্ডা লাগলে বা সর্দি জ্বর হলে এক ধরনের মারাত্মক বীজাণু গলায় আক্রমণ করে টনসিল, ফেরিঞ্জ এবং লেরিঞ্জের নানাবিধ রোগের সৃষ্টি করে। ঠিক সময়ে বীজাণুর আক্রমণকে বাধা দিতে না পারলে বীজাণুগুলি কখনও হৃদপিণ্ড আক্রমণ করে দুরারোগ্য বাত– ব্যাধির সৃষ্টি করে। এই ধরনের বীজাণুর দ্বারা হৃদপিণ্ড আক্রান্ত হলে আজকের দিনেও কোনো সফল চিকিৎসা সম্ভব নয়, সেই সময় তার চিকিৎসা ছিল কল্পনারও অতীত। কিন্তু দুর্ভাগ্যের কথা যে ফ্লেমষ্টিদের ঠিক সেই অসুখটাই হল। অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বাত– ব্যাধি তাঁর সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পড়ল এবং গাঁটে গাঁটে ব্যথা হওয়ার জন্য তাঁর পক্ষে চলাফেরা করা অসম্ভব হয়ে পড়ল। তিনি স্কুল ছাড়তে বাধ্য হলেন। বিছানাই হল তার একমাত্র আশ্রয়। কিন্তু বিছানায় পড়ে থেকেও তার শান্তি ছিল না, কারণ মাথা থেকে পা পর্যন্ত তাঁর সর্ব শরীরে ছিল কেবল যন্ত্রণা।
তুমি কিছুক্ষণ আগে আমাকে বলেছিলে যে রোগের যন্ত্রণায় পাগল হয়ে তুমি মাঝেমধ্যে আত্মহত্যা করার কথা চিন্তা কর। তোমার শারীরিক অবস্থা এরকম নয় যে নড়াচড়া করার শক্তি হারিয়ে ফেলে এবং অসহ্য যন্ত্রণায় কাতর হয়ে তোমাকে দিনরাত বিছানায় শুয়ে থাকতে হচ্ছে। তাছাড়া যন্ত্রণার সাময়িক উপসম ঘটানোর জন্য আজকাল নানা ধরনের ঔষধ পাওয়া যায়। কিন্তু আজ থেকে সাড়ে তিনশত বছর আগের ইংল্যান্ডের কথা ভেবে দেখতো। তোমাকে আগেই বলেছি যে ফ্লেমষ্টিদের যে অসুখটা হয়েছিল সেই অসুখের চিকিৎসা সেই সময়ে সমগ্র পৃথিবীতে ছিল কল্পনারও অতীত। তথাপি ফ্লেমষ্টিদের পিতা স্টিফেন ফ্লেমষ্টিদ কোনোরকম চেষ্টা না করে সমস্ত আশা ত্যাগ করে ভাগ্যের ওপরে নির্ভর করে বসে ছিলেন না। সেই সময় হাতুড়ে ডাক্তারদের নিজেদের মতো করে এই রোগের চিকিৎসা করতেন আর ঝাঁড়ফুকই ছিল এই রোগের একমাত্র চিকিৎসা। ছেলের আরোগ্যের আশায় স্টিফেন ফ্লেমষ্টিদ এই সমস্ত কিছুই করতে বাকি রাখলেন না। কিন্তু সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ হল। ফ্লেমষ্টিদ বুঝতে পারলেন যে সর্বাঙ্গে অসহ্য ব্যথা অনুভব করে করে বিছানায় শুয়ে শুয়ে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া এখন তাঁর আর অন্য কিছু করার উপায় নেই। ফ্লেমষ্টিদ যদি তোমার মতো কাপুরুষ হতেন তাহলে তিনি নিশ্চয় তোমার মতো মাঝেমধ্যে আত্মহত্যার কথা চিন্তা করতেন। কিন্তু আত্মহত্যার কথা চিন্তা না করে তিনি কী করলেন?
তিনি বিছানায় শুয়ে শুয়ে বই পড়তে শুরু করলেন। তিনি এই বলে মনে মনে সংকল্প করলেন যে স্কুলে যেতে না পারার ক্ষতিপূরণ তিনি বাড়িতে বসে করে নেবেন, তিনি বিছানায় শুয়ে শুয়ে বই পড়েই নিজেকে শিক্ষিত করে তুলবেন। এভাবেই বই পড়ে থাকার সময় একদিন তাঁর হাতে এল ‘ গগন মন্ডল ‘ নামে একটি জ্যোতির্বিজ্ঞানের বই – যে বইটিতে এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত হওয়া গ্রহ নক্ষত্রের বর্ণনা দেওয়া হয়েছিল। বইটি পড়ে তিনি এত খুশি হলেন যে সেটি পড়ে থাকার সময়ই তিনি মনে মনে জ্যোতির্বিজ্ঞানী হওয়ার সংকল্প গ্রহণ করলেন। আরও বইপত্র সংগ্রহ করে তিনি গভীর মনোযোগের সঙ্গে পড়াশোনা করতে লাগলেন। কিন্তু এখন একটা কথা ভুলে গেলে চলবে না যে বই পড়ে পড়ে তিনি শারীরিক যন্ত্রণার কথা ভুলে থাকতে পারতেন না, এক মুহূর্তের জন্য যন্ত্রণা তাকে রেহাই দেয়নি। কিন্তু গভীর আধ্যাত্মিক বলে বলীয়ান হয়ে তিনি যন্ত্রণাকে উপেক্ষা করে জ্ঞানের সাধনায় মগ্ন হয়েছিলেন।
ফ্লেমষ্টিদ চৌদ্দ বছর বয়সে শয্যাশায়ী হয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানের বই পড়তে শুরু করেছিলেন। তার আট বছরের পরে অর্থাৎ তাঁর বাইশ বছর বয়সে ফ্লেমষ্টিদ নিজেকে একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হলেন। ১৬৬৮ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে একটি সূর্য গ্রহণ হয়েছিল। সেই সূর্য গ্রহণ পর্যবেক্ষণ করে তিনি একটি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ লিখলেন। প্রবন্ধটি প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই সময়ের বৈজ্ঞানিক মহল তাকে একজন সম্ভাবনা পূর্ণ জ্যোতির্বিজ্ঞানী হিসেবে স্বীকৃতি দান করলেন।
এরপর থেকে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পত্রপত্রিকায় একের পর এক তাঁর প্রবন্ধ প্রকাশিত হতে লাগল। রোগশয্যায় শুয়ে শুয়ে বিশাল গগন মণ্ডলে বিচরণ করে বেড়ানো এবং গ্রহ নক্ষত্রের রহস্য ভেদ করা তরুণ বিজ্ঞানীর প্রতিভার দ্বারা আকৃষ্ট হয়ে অনেক জ্ঞানী গুণী মানুষ তাকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে এলেন। ফ্লেমষ্টিদ কিন্তু শুধুমাত্র আকাশের বিষয়ে নতুন নতুন তথ্য আবিষ্কার করায় ক্ষান্ত রইলেন না। আবহাওয়া এবং সমুদ্রের জোয়ার ভাটার গতিপ্রকৃতির ও অধ্যয়ন করতে লাগলেন। তার এই সমস্ত অধ্যয়নের ফল সর্বসাধারণ মানুষের ব্যবহারিক জীবনেও নানা কাজে এল। এই সমস্ত কাজের দ্বারাই ফ্লেমষ্টিদ একটা সময়ে ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লসের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হলেন। ১৬৭৫ খ্রিস্টাব্দের একটি রাজকীয় আদেশের দ্বারা ফ্লেমষ্টিদকে ’ পর্যবেক্ষক জ্যোতির্বিজ্ঞানী ‘ হিসেবে নিযুক্ত করে তাকে একটা নতুন কাজের দায়িত্ব দেওয়া হল। সেই সময় সমুদ্রগামী নাবিকদের জাহাজের দিক নির্ণয় করার জন্য আকাশের গ্রহ নক্ষত্রের উপর নির্ভর করতে হত। বছরের বিভিন্ন সময় আকাশে গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থান শুদ্ধভাবে জানা থাকলে নাবিকদের পক্ষে দিক নির্ণয় করা কাজটা অধিক সহজ হয়। প্রহর গতিবিধি এবং নক্ষত্রের অবস্থানের বিষয়ে যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করে সেই সমস্ত লিপিবদ্ধ করার দায়িত্ব দেওয়া হল ফ্লেমষ্টিদকে। এই কাজ করার জন্য তাকে একটা মানমন্দির অর্থাৎ গ্রহ নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ করা গবেষণাগার স্থাপন করতে হল। ফ্লেমষ্টিদ একক প্রচেষ্টায় স্থাপন করা এই গ্ৰীণউইচ মান মন্দিরটি হল পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত এবং বৃহৎ মান মন্দির। এক প্রকারে দেখতে গেলে মহাকাশে মানুষের জয়যাত্রার সূচনা করেছিল এই মান মন্দির, এবং তাঁর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জন ফ্লেমষ্টিদ নামের একজন চির রুগ্ন পঙ্গু মানুষ। বাত-ব্যাধির দ্বারা আক্রান্ত হয়ে যে মানুষটি চলাফেরা করতে পারেন না বলে বাড়ি থেকে স্কুল যেতে পারতেন না, সেই মানুষটিই অর্জন করেছিলেন মহাকাশের বিচরণ করার ক্ষমতা। অবশ্য পায়ে হেঁটে বা মহাকাশযানে উড়ে তিনি আকাশে ঘুরে বেড়াননি, সেই কাজ তিনি করেছিলেন জ্ঞানের দৃষ্টির সাহায্যে।

