
দেবী প্রসাদ মিশ্রের কবিতা ভূমিকা ও অনুবাদ: বেবী সাউ
দেবী প্রসাদ মিশ্র হিন্দি ভাষার একজন কবি-গল্পকার-চিন্তক-চলচ্চিত্র নির্মাতা। দেবী প্রসাদ মিশ্র উত্তরপ্রদেশের প্রতাপগড় জেলার রামপুর কাশিহা গ্রামে তাঁর মাতামহের বাড়িতে, ১৯৫৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব কেটেছে গোয়ালিয়র, রেওয়া, এলাহাবাদে। বাবার চাকরির বদলির সূত্রে। এলাহাবাদ ইউনিভার্সিটি থেকে তিনি স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন। কিন্তু ইতিহাস নিয়ে স্নাতকোত্তর করার সময়, পড়াশোনা ছেড়ে দেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হল — জিধার কুছ নহি, প্রার্থনা কে শিল্প মে নহি এবং মনুষ্য হোনে কা সংস্মরণ। তিনি কবিতার জন্য 'ভারতভূষণ স্মৃতি সম্মান', 'শারদ বিল্লাউর সম্মান' এবং 'সংস্কৃতি সম্মান' এবং হেম জ্যোতিকাকে নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্রের জন্য 'জাতীয় পুরস্কার' পান। কিন্তু তিনি সরকারের ফ্যাসিবাদী মনোভাবের প্রতিবাদে, 'জাতীয় পুরস্কার' পরিত্যাগ করেন। দ্য ইলাস্ট্রেটেড উইকলি ১৯৯৩ সালে তাকে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্মরত ১৩ জন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে। তাঁর পরিচালিত 'সতত' ছবিটি কান শর্ট ফিল্ম কর্নারে অন্তর্ভুক্ত হয় এবং 'নিষ্ক্রমণ' ছবিটি ফ্রান্সের গোনেলা কোম্পানি বিশ্বব্যাপী প্রচার করার দায়িত্ব নেয়। এই দুটি চলচ্চিত্রই গুনা জেলার আদিবাসী শিশুদের চরিত্রে তৈরি। কবিতাগুলো সরাসরি হিন্দি ভাষা থেকে অনুবাদ করা হয়েছে।
১. এই জীবন
আমাকে আমার জীবনের অনেক দৃশ্য সম্পাদনা করতে হবে।
আমি চলচ্চিত্র সম্পাদককে বলেছিলাম —আমার জীবন সম্পাদনা করে, কিছু দৃশ্য মুছে দিন।
তিনি বললেন, ঠিক আছে। দুপুরের পর তোমার সিনেমা দেখতে বসবো। তুমি যা বলবে তা সরিয়ে ফেলব।
আমি বললাম, জীবনের সিনেমাকে ফিরে দেখাও তো কষ্টের!
২. শিল্পের সীমানা
অন্ধকারে ছুটে চলা ট্রেনের জানালায়, ক্যামেরা নিয়ে বসেছেন একজন।
পাশের লোকটা বললো, বাইরে তো খুব অন্ধকার।
ক্যামেরাওয়ালা লোকটি বলল, হ্যাঁ, খুবই অন্ধকার।
পাশের লোকটি বললো, শহর অন্ধকারে ডুবে আছে।
ক্যামেরাওয়ালা ওই ব্যক্তি জানান, এমনও হতে পারে কিছু মানুষ বন্যার ভেতরও ডুবন্ত থাকে কিন্তু বোঝা যায় না।
পাশের লোকটি বললো, হয়তো মানুষ আশার অন্ধকারে ডুবে থাকে। তখন ক্যামেরাওয়ালা লোকটি বলল, হ্যাঁ, এটা হতে পারে।
ক্যামেরা নিয়ে জানালার কাছে বসে থাকা লোকটা
অন্ধকারের ছবি
অন্ধকার থেকে তুলে আনছিলেন।
৩. গন্তব্য
জ্বালিয়ে দেওয়ার পরে যেরকম হয় বাসগুলো, ওটা ছিল ওরকম একটা বাস।
শেষ হওয়ার পর, সেভাবে মানুষ বেঁচে যায়, সেরকমই ছিল ওই বাসের যাত্রীরা।
বাসটি যেভাবে যাচ্ছিল, তাতে মনেই হচ্ছিল না বাসটি কোথাও যাচ্ছে!
যেভাবে লোকজন নামছিল, লাগছিল না তারা নামছে কিংবা ওখানেই ওদের নামবার ছিল।
আমাকে বাসের কন্ডাক্টর জিজ্ঞেস করলো, কোথায় নামবেন?আমি বললাম —সুবর্ণরেখায়।
কন্ডাক্টর বললো, ওটি একটি নদী এবং ঋত্বিক ঘটকের ফিল্ম।
নদী এবং ঋত্বিক ঘটকের সিনেমার আশেপাশেই নামিয়ে দিন,
আমি বললাম।
৪. মারা না যাওয়ার কারণ
জানি না কিভাবে, কিন্তু এমন হল,
আজ দুপুরের খাওয়ার পর আমার ঘুম পেল
আর মনে হল আমি মারা যাচ্ছি।
ঘুম ভেঙে গেল।
আমি জানালার দিকে গেলাম এবং ভাবলাম মৃত্যুর পর আর জানালার কাছে যাওয়া হবে না কিংবা বাইরের দিকে তাকাতেও পারব না। আমি অনুভব করলাম আমার মুখ ঘামে ভর্তি। তখন আমার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগদানকারীদের একটি তালিকা তৈরি করতে শুরু করলাম,
কিন্তু অনুভব করলাম আমি কোনও নাম সম্পর্কে নিশ্চিন্ত নই।
বারো তলায় থাকি। আমি লিফটের দিকে গেলাম এবং বুঝতে পারলাম আমার লাশ লিফটে নিয়ে যাওয়া খুবই কঠিন হবে।
মৃত্যুর পরে বিভিন্ন সমস্যা দেখার পর, সেদিন বিকেলে, আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, থাক, না মরাই ভালো!


অসাধারণ সব কবিতা। খুব ভালো লাগলো।