
পেডিগ্রী অনির্বাণ কুণ্ডু
ইন্দ্রনীল ভেবেছিল এভাবেই ঝুলতে ঝুলতে বাকি রাস্তাটা যেতে হবে। শেষ পর্যন্ত মরিয়া হয়ে একে-তাকে গুঁতিয়ে যুদ্ধ করতে করতে ঠিক কামরার মাঝামাঝি পৌঁছে গেল ও। বনগাঁ লোকাল যখন সবে মধ্যমগ্রাম ছেড়েছে, প্রায় অলৌকিকভাবে জানালার পাশে একটা সিটও পেয়ে গেল! ব্যস, এবার নিশ্চিন্ত! এবার দিব্যি ঝিমোতে ঝিমোতে বনগাঁ অবধি চলে যাওয়া যাবে।
কামরার ভিতরে লোকের ভিড়ে ভ্যাপসা গরম, তার উপর পাখাটা বিকল, যাকে বলে গোদের উপর বিষফোঁড়া। ট্রেন ছুটতে থাকলে জানলা দিয়ে আসা হাওয়াটুকুই ভরসা।
বারাসাত পেরোতেই মনে হল যেন আরেকটা পৃথিবীতে ঢুকে পড়েছে। ছুটন্ত ধানক্ষেত, টালি বা টিনের চাল দেওয়া সব বাড়ি, সবজেটে জলে ভরা পুকুর, দূরে মোবাইলের টাওয়ার, জলের ট্যাঙ্ক পিছনে ফেলে যতই ও মফস্বলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, ততোই শহুরে ধূলিধুসরিত মনটা তরতাজা হয়ে উঠছে।
সৌরভের বিয়ের নিমন্ত্রণটা পাওয়ার পর থেকেই ইন্দ্রনীলের মনে এক আলাদা উচ্ছ্বাস কাজ করছিল। তার কলেজের দিনগুলোর সঙ্গী সৌরভ, শুধু তার ক্লাসমেট নয়, হোস্টেলে তার রুমমেটও বটে। কত আড্ডা, একসাথে কত রাতজাগা, পরীক্ষার পড়া, একসাথে কলকাতা চষে বেড়িয়েছে তারা। আজ সেই সৌরভ সংসারী হতে চলেছে! এতদিন পর আবার তারা একসঙ্গে হবে,… এই আনন্দে বিভোর ছিল ইন্দ্রনীল।
আজ বনগাঁ পৌঁছে সৌরভের বাড়িতে গিয়ে বিশ্রাম আর পুরোনো স্মৃতি রোমন্থন,… তারপর কাল দুপুরে গায়ে-হলুদ আর খাওয়াদাওয়া, বিকেলে বরযাত্রী হয়ে মেয়ের বাড়ি যাওয়া, কব্জি ডুবিয়ে ভোজ খেয়ে রাতে আসর জেগে হাসিঠাট্টা, গান করে মেয়ের বাড়ির লোকদের চমকে দেওয়া, তার দু’দিন পরে বৌভাতের ভুরিভোজ সেরে রাতের ট্রেনে কলকাতায় ফেরা…. সামনে কী কী দুরন্ত আকর্ষণ আসছে, সেগুলো মনের মধ্যে গুছিয়ে নিচ্ছিল ও। তিনরাতের এই ছোট্ট সফরটা শুধু বন্ধুর বিয়ে নয়, গতানুগতিক জীবনের বাইরে গিয়ে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার অজুহাত।
আর… সে ভাবছিল ভাস্বতীর কথা। ছয় বছর পূর্ণ হয়ে সাত বছরে পা দিল তাদের সম্পর্ক। বন্ধু সৌরভ তো সংসারী হতে চলল, এবার কি সেও ‘মহাজ্ঞানী মহাজনের’ পথে পা বাড়াবে? এবার বিয়ে করে নেবে ভাস্বতীকে?
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে ভাস্বতীর সাথে ইন্দ্রনীলের প্রথম দেখা। জেরক্সের দোকানে নোটস ফটোকপি করতে গিয়ে আলাপের শুরু। ইন্দ্রনীল ছিল রসায়নের ছাত্র, আর ভাস্বতীর বিষয় কমার্স। ভিন্ন দুই শাখার হলেও ওদের ক্যান্টিনে একসাথে চা খাওয়া, আড্ডার কোনো বাধা হয়ে ওঠেনি।
ধীরে ধীরে সম্পর্কটা অদৃশ্য সুতোয় জড়িয়ে গেল। অনেক বিকেলে ঢাকুরিয়া লেকের ধারে বসে গল্প, ভবিষ্যতের স্বপ্ন….এইসব সাধারণ কথাই অসাধারণ হয়ে উঠল। পরীক্ষার রেজাল্টের দিন এক অপরের জন্য অপেক্ষা, মনখারাপ হলে হঠাৎ অটো নিয়ে দেখা করতে চলে আসা…. সবকিছুতেই ছিল এক অদ্ভুত বোঝাপড়া। ভাস্বতীর শান্ত স্থিরতা আর ইন্দ্রনীলের অস্থির উচ্ছ্বাস পরস্পরকে সামলে নিত। ছ’টা বছর দেখতে দেখতে কেটে গেছে। বন্ধুত্ব থেকে এসেছে প্রেম, আর প্রেম থেকে এসেছে প্রতিশ্রুতি। আলাপ হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই ওরা বুঝতে পেরেছিল ওরা প্রণয়ী হতে চলেছে, কিন্তু কোনোদিন অফিসিয়ালি ‘আই লাভ ইউ’ বলার প্রয়োজন হয়নি। এখন তাদের সম্পর্কটা শুধু ভালোবাসা নয়, জীবনের স্বাভাবিক অভ্যাস, একজন ছাড়া অন্যজনের দিন অসম্পূর্ণ।
ওরা দুজনেই এখন প্রতিষ্ঠিত। ইন্দ্রনীল উত্তর কলকাতার একটি সরকারি কলেজের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর, ভাস্বতী রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে সরাসরি অফিসার হয়ে ঢুকেছে। সব ঠিকঠাকই চলছে। ওরা ভাবছে সামনে এপ্রিলের মধ্যেই বিয়ের দিনক্ষণ দেখবে।
হঠাৎ একটা কর্কশ চিৎকারে ইন্দ্রনীলের ধ্যানভঙ্গ হলো।
‘চানাচুর, মুড়ি, বাদাম, নিমকি খেয়ে দেখুন দাদারা!- ট্রেন চলছে, তার সাথে আপনাদের মুখও চলুক, খেতে খেতে যান, দশ টাকা, দশ টাকা, দশ টাকা’
ইন্দ্রনীল কৌতূহলী চোখে তাকাল। হকারটা প্রৌঢ়, ষাটের উপরে বয়স। পরনে ময়লা পাঞ্জাবি, পাজামা, গলার কাছটা ঘামের ভিজে গেছে, মাথায় চিরুনি না-ওঠা চুল। একটা বড় টিনের বাক্স গলায় বেল্ট দিয়ে পেটের সামনে ঝুলিয়ে সে পণ্যের নাম বলতে বলতে ভিড় ঠেলে এগোচ্ছে।
হঠাৎ ইন্দ্রনীলের বুকের ভেতরটা যেন খালি হয়ে গেল! ইন্দ্রনীল দেখেছে এই মুখ! মুখটা তার খুব চেনা লাগছে! লোকটা ভিড় ঠেলে এগিয়ে আসছে। গলায় টিনের বাক্স, ঘামে ভেজা পাঞ্জাবি, চোখের কোলে গাঢ় কালি। বয়স ষাটের ওপরে। হাঁটার মধ্যে জীবনযুদ্ধের ক্লান্তি, তবু পেটের দায়ে গলা ফাটিয়ে বিক্রি করে যাচ্ছে। ইন্দ্রনীল চিন্তা করছে,
এই মুখটা…! ওই চোয়ালের বাঁক, কপালের ডানদিকে একটা পুরোনো কাটা দাগ, টিকোলো নাক….এগুলো সে কোথায় যেন দেখেছে। কিন্তু কবে?… কোন সময়ে?… কোন পরিচয়ে? মনে করার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল ইন্দ্রনীল।
‘বাবু, কিছু নেবেন?’
ইন্দ্রনীল চমক ভেঙে তাকালো। হকার এখন ঠিক তার সামনে দাঁড়িয়ে। বোধহয় ইন্দ্রনীলকে তার দিকে অন্যমনস্ক চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে খরিদ্দার ভেবেছে। ভদ্রলোকের মুখে ক্লান্তি, কিন্তু দৃষ্টিতে ব্যবসায়ীসুলভ আগ্রহ।
‘আমি… ইয়ে মানে, দশ টাকার চানাচুর দিন’
হকার টিনের বাক্স থেকে খবরের কাগজের ঠোঙায় পেশাদারী হাতে চানাচুর ঢালতে লাগল।
‘বাবু, লঙ্কা পেয়াঁজ দেব নাকি?’
‘অ্যাঁ….হ্যাঁ, দিতে পারেন’
ইন্দ্রনীলের কপাল একইভাবে কুঁচকে আছে। ওর চোখ এখন মানুষটির হাতে। শুকনো চামড়া জায়গায় জায়গায় ফেটে গেছে, নখের ভেতর ময়লা। কোথায় দেখেছে এই মুখ? ধরা দিয়েও যেন দিচ্ছে না… নিজের উপর বিরক্ত লাগছিল ইন্দ্রনীলের।
‘এই নিন বাবু।’ চানাচুরের ঠোঙা বাড়িয়ে ধরলেন হকার তার দিকে।
ইন্দ্রনীল পকেট থেকে একটা দশ টাকার নোট বের করল। ভদ্রলোক টাকা নেওয়ার তার মুখের দিকে একবার দেখলেন। তারপর অন্যদিকে চলে গেলেন। একটা স্টপে ভদ্রলোক পাশের কামরায় চলে যেতেই বিদ্যুৎ চমকের মতো ওর মনে পড়ে গেল!
ভাস্বতীর বাড়িতে ফটো অ্যালবামে এই মুখ দেখেছে সে! বারাণসীতে, গ্যাংটকে, কেরলের এক হাউসবোটের ডেকে অনেক ছবিতে এই মানুষটিকে শার্ট প্যান্ট পরে, বিষন্ন চোখে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখেছে ও। ভদ্রলোক ভাস্বতীর বাবা!
কিন্তু…কিন্তু ভাস্বতী যে বলেছিল, ওর বাবা কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্চপদস্থ আধিকারিক! গুরগাঁও-এ থাকেন। সেই মানুষটি আজ ট্রেনের কামরায় চানাচুর বেচছে?
ইন্দ্রনীলের মাথার ভেতর হাজারো প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল। ভাস্বতী তবে মিথ্যে বলেছে? না কি ও নিজেই কিছু গুলিয়ে ফেলছে? না কি সত্যিই… মানুষের জীবন এভাবে বদলে যেতে পারে?
ওর মনে পড়ে গেল ভাস্বতী বারবার চাইছে রেজিস্ট্রি বিয়ে, সামাজিক বিয়েতে ওর যেন কোন আগ্রহ নেই। যতবার ওর বাড়িতে যেতে চেয়েছে ইন্দ্রনীল, বরাবরই বিশেষ আগ্রহ দেখায় নি ভাস্বতী। তাহলে বাবাকে চোখের আড়ালে রাখার জন্যই কি ভাস্বতীর এই পরিকল্পনা?
তবুও একদিন প্রায় জোর করেই ও হাজির হয়েছিল ভাস্বতীর বাড়িতে। সেদিন ভাস্বতীর বাবা বাড়িতে ছিলেন না, থাকার কথাও অবশ্য নয়। কারণ ভাস্বতীর বয়ান অনুসারে তার বাবার থাকার কথা গুরগাঁও। সেদিনই ওর মায়ের সাথে বসে অ্যালবামে দেখেছিল এই ফটোগুলো। ওর মাও তো কিছু বলেননি!
আজকের জানার পর কি কিছু বদলে যাবে? ভাস্বতীকে জিজ্ঞেস করবে? নাকি জিজ্ঞেস না করাই ভালো? নাকি এভাবে ভান করে যাবে যে কিছুই হয়নি? কিন্তু কী করে ভান করবে ও, যখন জেনে গেছে ওর প্রেমিকার বাবা ট্রেনের হকার!
ভাস্বতীর ওপর ভীষণ রাগ হচ্ছে ওর। ওর বাবার এই বাস্তবতা ভাস্বতী ওর থেকে লুকিয়ে রেখেছে!এত বড় সত্য ওকে জানালে না কেন? না কি এটা লজ্জা, এটা যন্ত্রণা, যা বলে ওঠা যায় না?
ট্রেন ছুটছে। মফস্বলের সবুজ স্পর্শে শহুরে মন তরতাজা হচ্ছিল ইন্দ্রনীলের। এখন সেই সবুজ আবার ধূসর হয়ে গেছে। ওর বুকের ভেতর একটা কালো মেঘ জমাট বেঁধে আছে।
একটা একটা করে স্টেশন যাচ্ছে আর ট্রেনের কামরা একটু একটু করে ফাঁকা হচ্ছে, কিছুক্ষণ পরেই ইন্দ্রনীল দেখল, সেই হকার ভদ্রলোক আবার তার পাশ দিয়ে যাচ্ছেন।
‘শুনছেন, আপনার সাথে একটু দরকার ছিল….’
‘আমার সাথে!’
‘হ্যাঁ, একটু যদি….’
ভদ্রলোক অবাক মুখে এগিয়ে এলেন।
‘আপনার নাম ধীরেন সমাদ্দার?’ ইন্দ্রনীল জিজ্ঞেস করল।
ভদ্রলোক থমকে গেলেন। চোখ ভরা শুধু বিস্ময়।
‘আপনি চেনেন আমায়? আমি তো আপনাকে দেখিনি কখনও।’
‘আমি ইন্দ্রনীল মজুমদার। ভাস্বতীর বন্ধু।’
ধীরেন সমাদ্দার প্রথমে কিছু বললেন না। তাঁর চোখ দুটো যেন স্থির হয়ে গেল। ট্রেন এখন অনেক খালি হয়ে এসেছে। ইন্দ্রনীলের উল্টোদিকের খালি সিটে বসলেন, টিনের বাক্সটা রাখলেন পায়ের কাছে।
‘ভাস্বতী, মানে আমার মেয়ের কথা বলছেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘ও কোনোদিন বলেনি তো তোমার নাম। ওর বন্ধু মানে… ওর কলেজের বন্ধু?’
‘হ্যাঁ’ ইন্দ্রনীল মাথা নিচু করল।
ধীরেনবাবু হঠাৎ কী ভেবে হাসলেন। সেই হাসিতে গর্ব, আর লুকোনো লজ্জা….দুটোই ছিল।
‘আজ অনেক বড় হয়েছে আমার মেয়ে। ব্যাংকে চাকরি করে। অনেক টাকা রোজগার করছে।
ইন্দ্রনীল স্থির হয়ে শুনছিল।
‘শপথ করেছিলাম, মেয়েকে যত দূর সম্ভব পড়াব। বিড়ি বানিয়ে, মুড়ি বানিয়ে পড়ালাম, শেষে হকারি করে পড়ালাম। কত কষ্ট, কত টাকা জমিয়েছি ট্রেনে ট্রেনে। ও মেধাবী ছিল, ওকে মানুষের মতো মানুষ করব বলেই বাঁচা। এখন তো ও বড় অফিসার। আমার স্বপ্ন সফল হয়েছে….’
গলা ধরে এলো তাঁর। চোখটা মুছে নিলেন হাতের পিছন দিয়ে। ইন্দ্রনীলের বুকের ভেতরটা যেন কেউ মুঠো করে চেপে ধরল। সে কিছু বলার আগেই ধীরেনবাবু বাক্সটা তুলে নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন।
‘আমায় নামতে হবে বাজার রোডে। তুমি ভালো থেকো বাবু।’
নেমে যাচ্ছিলেন। ইন্দ্রনীল পিছু ডাকল।
‘কাকু, আমি কী আপনার একটা ছবি তুলতে পারি?’
ধীরেনবাবু থমকে দাঁড়ালেন। মুখে আবার সেই হাসি, হতাশ আর গর্ব মাখা।
‘ছবি? কী হবে ছবি তুলে?’
‘আমার কাছে রাখব। ভাস্বতীকেও হয়তো দেখাব।’
ধীরেনবাবু স্থির হয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন। ইন্দ্রনীল মুঠোফোন বার করে ছবি তুলল। এই মানুষটি, যিনি জীবনভর হকারি করে মেয়েকে মানুষ করেছেন, তিনি দাঁড়িয়ে আছেন ট্রেনের কামরায়, চারপাশে হুড়োহুড়ি। কিন্তু তাঁর মুখে এক অদ্ভুত শান্তি।
বনগাঁ থেকে ফিরে পরদিনই দুপুরে ভাস্বতীর গাঙ্গুলিবাগানের বাড়ি গেল ইন্দ্রনীল। আগে থেকে ফোনে কিছুই জানায়নি ও। ঢুকতেই ইন্দ্রনীল দেখল, ভাস্বতী বাইরের ঘরে বসে তার মায়ের সঙ্গে কথা বলছে।
ইন্দ্রনীলকে হঠাৎ দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভাস্বতী অবাক হয়ে উঠল। ওর মুখটা কি একটু ফ্যাকাশে হয়ে উঠল?
‘আরে! তুমি? কিছু না বলে হঠাৎ?’
ইন্দ্রনীল হেসে বলল, ‘ভাবলাম একটু সারপ্রাইজ দেওয়া যাক।’
ভাস্বতীর মা স্নেহভরা গলায় বললেন,
‘এসো বাবা, এসো। কতদিন পর এলে! বসো, আমি চা করে আনি।’
‘না মাসিমা, এত কষ্ট করবেন না। আর এখন বসুন না… দুটো কথা বলি’
‘কষ্ট আবার কীসের? তোমাদের জন্যই তো ভালো কিছু করতে ইচ্ছে করে।’
ভাস্বতী মুচকি হেসে বলল, ‘শুধু কি চা খাওয়াবে ওকে, মা?’
‘ওমা সেকি? হবু জামাই ঘরে এলে তাকে শুধু চা খাইয়ে ছাড়ব? লুচি-আলুর দম না খাইয়া ছাড়ছি না।’
কথাটা শুনে তিনজনেই হেসে উঠল।
ইন্দ্রনীল সোফায় বসে চারদিকে তাকাল।
‘কাকু কোথায়?’
প্রশ্নটা শুনে ভাস্বতীর মুখে এক মুহূর্তের জন্য ছায়া নেমে এল। তবে দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
‘বাবা তো দিল্লী, এর মধ্যে ভুলে গেলি?’
‘ওহ্ হ্যাঁ, তাই তো…’
ভাস্বতীর মা বললেন, ‘তোমার বন্ধুর বিয়েটা কেমন হল বাবা?’
‘খুব ভালো। অনেকদিন পর কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হল।’
‘নিশ্চয় খুব আনন্দ করেছ?’
‘হ্যাঁ, অনেক।’
ওর মা আরও কিছুক্ষণ এটা সেটা নানা কথা বলে ইন্দ্রনীলের জন্য চা আনতে ভেতরে চলে গেলেন।
ভাস্বতী ইন্দ্রনীলের দিকে তাকিয়ে বলল,
‘তোমাকে কিন্তু আজ একটু অন্যরকম লাগছে। সব ঠিক আছে তো?’
ইন্দ্রনীল কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর মৃদু হেসে বলল,
‘হ্যাঁ, সব ঠিক আছে। আসলে অনেক কিছু নিয়ে ভাবছি আজকাল।
‘কী নিয়ে?
‘ভবিষ্যৎ নিয়ে… আমাদের বিয়ে নিয়ে।’
‘তোমার বনগাঁ সফর কেমন হলো সেটা বিস্তারিত বলো? বিয়ের গল্প শুনতে আমার হেব্বি লাগে’ ভাস্বতী চোখ নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল।
‘হুমম, হয়েছে…খারাপ নয়’
তারপরেই ইন্দ্রনীল বলল, ‘ট্রেনে তোমার বাবার সঙ্গে দেখা হল।’
মুহূর্তে সব নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ভাস্বতীর শরীর পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল। মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বেরুল না।
‘বনগাঁ লোকালে হকারি করেন উনি। চানাচুর, মুড়ি, নিমকি বিক্রি করেন, তাই না?’
ভাস্বতী টলে সামনে পড়ে যাচ্ছিল। ইন্দ্রনীল চট করে এগিয়ে গিয়ে তাকে ধরল, আস্তে করে সোফায় হেলান দিয়ে দিল। ইন্দ্রনীল দেখল ভাস্বতীর চোখ দিয়ে নীরবে জল গড়াচ্ছে।
‘জানতাম… একদিন তুমি ঠিকই জানতে পারবে।’
‘তবে কেন মিথ্যা বললে? গুরগাঁও, কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরি, এসবের কী দরকার ছিল?’
ভাস্বতী ভেঙে পড়া কণ্ঠে বলল, ‘তুমি জানো না কেমন লাগে। যখন প্রথম দেখা হয়, তুমি বলেছিলে তোমার বাবা ডাক্তার, বিরাট নাম করা মানুষ। আমি কী বলব? আমার বাবা ট্রেনে হকারি করেন? তুমি কী শুনলে আমাকে নিয়ে গর্ব করতে? নাকি লজ্জা পেতে?’
‘লজ্জা পেতাম না!’
‘পেতে! পেতে! যারা বড় ঘরের, তাদের কেউ বোঝে না। তোমার বাবা বিএমডাবলু চড়ে হাসপাতালে যান। আমার বাবা ট্রেনে চানাচুর বেচেন। আমি কতবার স্কুল থেকে ফিরে পাশের বাড়ির বন্ধুদের বলেছি বাবা গুরগাঁও থাকেন, মাসে একবার আসেন?’
ইন্দ্রনীল চুপ করে রইল। বাইরে তখন সন্ধ্যা নামছে।
‘আমি নিজেও একসময় ঘৃণা করতাম। ভাবতাম, বাবার এই কাজের জন্যই তো আমাদের লোকে নিচু চোখে দেখে। তারপর একদিন বুঝলাম, এই কাজ করেই তিনি আমাকে পড়িয়েছেন। ওই হকারি করার টাকাতেই আমার যাদবপুরে পড়া। তবু লজ্জা যায়নি। তোমাকে যখন ভালোবাসলাম, ভয় পেলাম। তুমি যদি জানতে পারে, যদি ছেড়ে দাও, ইন্দ্রনীল, তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচব না। সত্যিই বাঁচব না।’
‘তুমি তো এখন ব্যাংকে চাকরি পেয়ে গেছ, তাহলে ওঁকে এখনো হকারী করতে দিচ্ছ কেন?’
‘আমি বারণ করেছিলাম অনেকবার। কিন্তু বাবা বলল এতদিনের অভ্যাস… ছেড়ে দিলে অসুস্থ হয়ে পড়বেন’
‘বিয়ের পরে তো সবই প্রকাশ পেত। সেটা নিয়ে তুমি কি ভেবেছিলে?’
‘আমি ভেবেছিলাম….’ ভাস্বতী বলল, ‘রেজিস্ট্রি করে বিয়েটা সেরে নেব। বাবাকে যখন তোমার সামনে উপস্থিত করবো, বলবো তিনি সবে চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। এর মধ্যে বাবাকে রাজি করে নেব হকারি ছাড়তে।’
ইন্দ্রনীল চমৎকৃত হয়ে গেল!
‘ওই জন্যই কি তুমি তোমার মাকে আমার সাথে বেশি কথা বলতে দিতে চাও না? পাছে সবকিছু উনি বলে ফেলেন, তাই না?’
ভাস্বতী ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
‘আমি জানি। জানি আমি ভুল করেছি। কিন্তু এখন কী করব বলো? এখন তো আরও ভয় করে। এত বছর বাবাকে অস্বীকার করে এসেছি, এখন বাবা কি আমাকে মাফ করবেন?
ইন্দ্রনীল জানালার দিকে তাকাল। রাস্তার আলো জ্বলে উঠছে একে একে। তার ভেতরে কী যেন একটা ভাঙছে আর গড়ছে, একই সঙ্গে।
‘আমি জানি, সেই মানুষটি তোমাকে কতটা ভালোবাসেন। ট্রেনের ভিড়ে দাঁড়িয়ে তিনি গর্ব করে বলেছিলেন, তাঁর মেয়ে ব্যাংকে অফিসার। এই গর্বের জন্যই তিনি আজও বেঁচে।’
ভাস্বতী মাথা হেঁট করে কাঁদছিল। ইন্দ্রনীল ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল, তার পাশে বসল।
‘আমি জানি তুমি আসলে কী ভয়ে মিথ্যা বলেছ। তুমি ভয় পেয়েছিলে আমি তোমাকে ছেড়ে দেব। তাই না? অথচ যে মানুষটি সারাজীবন তোমার জন্য হকারি করেছেন, তিনিই এখানে সবচেয়ে বড় সম্মানের পাত্র।’
ভাস্বতী চোখ তুলে তাকাল। ভয়, প্রত্যাশা, অনুনয় মাখা সেই চোখ।
‘আমি স্ট্যাটাস এর কাঙাল, এ কথা তুমি ভাবলে কী করে? আমি তাঁকে অসম্মান করতে পারি না। আর তাঁকে সম্মান করতে গেলে তোমাকে ছাড়া উপায় নেই।’
ভাস্বতী ফুঁপিয়ে উঠে জড়িয়ে ধরল তাকে।
‘আমি বাবার কাছে যাব। কালই যাব। আর কখনও লুকোব না।’
ইন্দ্রনীল চুপ করে তার মাথায় হাত রাখল। সাত বছরের সম্পর্কে এই প্রথম বার সে ভাস্বতীকে এতটা নির্ভার হতে দেখল।
পরের দিন সকালে ভাস্বতী আর ইন্দ্রনীল বেরিয়ে পড়ল বনগাঁর ট্রেনে। লোকাল ট্রেনের তৃতীয় কামরায় ধীরেন সমাদ্দার তখনও হকারি করছেন। মেয়েকে প্রথমে খেয়াল করেন নি। ভাস্বতী এগিয়ে গিয়ে বাবা বলে ডাকল। ধীরেনবাবু চমকে উঠলেন।
ধীরেনবাবুর চোখ বিস্ফারিত, ‘মা, তুই এখানে?’
‘তোমার সাথে ইন্দ্রনীলের আলাপ করিয়ে দিতে এলাম।’
‘আরে বাবু! আবার দেখা হয়ে গেল?’
ইন্দ্রনীল হেসে বলল, ‘আজ আমার সাথে নতুন করে পরিচয় দিতে হবে ভাস্বতীকে… অন্য একটা পরিচয়।’
ভাস্বতী কাঁদতে কাঁদতে বাবার হাত ধরল।
‘বাবা, আমি ওর কাছে তোমার পরিচয় লুকিয়েছি। খুব ভুল করেছি।’
ধীরেনবাবু মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন।
‘পাগলি মেয়ে,’
ইন্দ্রনীল বলল, ‘কাকু, আমি ভাস্বতীকে বিয়ে করতে চাই। আপনি রাজি তো?’
ধীরেনবাবু হতভম্ব, ‘আমি হকার মানুষ, আপনারা কত মানী লোক…আমার মতের কী আর দাম বাবু?’
‘আপনার মতই সবচেয়ে বড় কাকু, আর আজ থেকে বাবু নয়…ইন্দ্রনীল’
ধীরেনবাবুর চোখে জল, ‘আমার মেয়েকে সুখে রাখবে তো?’
‘কথা দিলাম।’
আজ ইন্দ্রনীলের মনে অদ্ভুত শান্তি। ধীরেনবাবু অন্য কামরায় চলে যেতেই সে ভাস্বতীর হাত চেপে ধরল, ‘তোমার বাবা কিন্তু আমার কাছে হিরো।’
ভাস্বতী মৃদু হেসে বলল,’আজ থেকে আমি বাবার কথা কারোর কাছে লুকোব না।’
‘যে বাবা হকারি করে মেয়েকে অফিসার বানাতে পারেন তিনি কোনো আমলার চেয়ে কোনো অংশে কম নন’ বলল ইন্দ্রনীল।
ভাস্বতী আর ইন্দ্রনীল জানলার ধারের সিটে নিঃশব্দে বসে রইল। ভাস্বতী মাথা রাখল ওর কাঁধে। চারপাশের মানুষজন কিছু বুঝল কি না বলা যায় না, কিন্তু কেউ ওদের বিরক্ত করল না।

