
পিয়াল রায়-এর কবিতাগুচ্ছ
তিলকমঞ্জরী
১)
শেষ! এক কথায় এভাবেই শেষ হয় সব?
যেভাবে শুরুর শুরু, সেভাবেই হত্যা উৎসব?
কেঁদে কেঁদে অন্ধ যে চোখ তাকে আর সান্ত্বনা কী দেব?
যদি পারো শ্যাম, অপেক্ষার আর্তিটুকু ভেবো
কত দীর্ঘ ছিল পথ, ঝড়জল, কাঁটার পাহাড়
একান্ত জুড়ে ঘর সাজানো ছিল যেন কার
তবু শেষরক্ষা হল কই? থেমে গেল সাধের কিঙ্কিণী
ডুবু ডুবু জলে ভেসে গেল রাইকমলিনী
এল না ময়ূরপঙ্খী কোনো, এল বিচ্ছেদের চিঠি
এই কি বিচার শ্যাম? প্রেমের নিয়তি?
যাবে যাও, যেখানে তোমার ভালো লাগে
জেনে যাও সত্যিটা তবে চলে যাওয়ার আগে
এই পৃথিবী, এই আকাশ শ্যামময় হয়ে যার সদা
সেই রাই, কিশোরী আমার, তোমাকেই চেয়ে সর্বদা
জ্বেলেছে সন্ধ্যাদীপ, বাজিয়েছে শাঁখ,
আলপনা দিয়ে দোরে বিনিদ্র কাটিয়েছে রাত
শুধু একটা ডাক, একটা ডাক দিয়ে যদি শ্যামরায়
নিয়ে যায় দূর কোনো তৃপ্তযমুনায়
সব প্রেম নিমেষে মিথ্যে করে চলে যেতে চাও?
যাও শ্যাম, তাই যাও, আনন্দযাপন করো অন্য কোথাও
এভাবে বংশীধারী , সত্যিই যদি চলে যেতে পারো
নিশ্চিতই জেনো বাঁশির ওই সপ্তজাদুসুরে
কোনোদিন কোনো চোখ আর কাঁদবে না কারো
২)
সারাদিন যেমন-তেমন, রাত একা জাগে
যে চেয়েছে তোমাকে তার অন্ধঅনুরাগে
শিশির জমা হয় ; জমা হয় ব্যথার ফুলকারি
তুমি ভুলে যেতে পারো ; আমি কি তা পারি?
বিরহ মধুর এমন আজন্ম পুড়ছে চৌকাঠে
আদরে যে রাগ ফুটেছিল তার সকরুণ ঠাঁটে
ঢেকে যায় জ্যোৎস্নারাশিমূল। রুনঝুনতি নূপুর
বাজে আনন্দহিল্লোলে… বাজে মায়ার দুপুর
চুয়া চন্দনে ঢেকে রাখি কপাল আমার
কেউ যাতে দেখে না ফেলে বৃষ্টি লাগাতার
যদি কেউ দেখে ফেলে অকাল অসুখ
ছি ছি! সে বড় লজ্জার কথা…
কলঙ্ক রসকলি; কলঙ্ক অলঙ্কার করে
রাধারানী ডুবে থাকেন কৃষ্ণময় ঝড়ে
৩)
তোমার গোপন দাও শ্যাম, বিলাস ছুঁতে চাই
বলো কোন গলির মোড়ে আমি তোমার দেখা পাই
দেখ আজ আকাশ কেমন কৃষ্ণরঙে ঢাকা
এ তো তোমারই বৈভব — তোমার দিব্যাভা
এই মেঘ, এই জলসিঞ্চিত অপরূপ লাবণ্যধারা
ভিজিয়েছে বনস্থলী, ঘাসপথ, তুলসীর চারা
হে কোমলনয়ন, তুমি কি সত্যিই দৃষ্টিহীন হলে?
সত্যি হল তাইই লোকে যে কথা প্রতিদিন বলে?
নিষ্ঠুর মুরলী তোমার স্বভাবে কোপনতাপ্রিয়
প্রেমের ছলায় প্রাণ নিলে কিশোরীরও
তাই বুঝি ধুলো দিলে হৃদয়ের চোখে?
নিপুণ লুকোলে গিয়ে অমর্ত্যলোকে?
দেখলে না পৃথিবীর প্রেমময় রূপ
স্মিতাননা কলঙ্কিনী রাধানন্দস্বরূপ?
আমি তা পারিনি। রাধারক্ত শরীরে আমার
কৃষ্ণনামের স্রোতে বয়ে চলা প্রতিটা কণার
অপেক্ষা আর অপেক্ষা। এ যেন অপেক্ষার চর
একা একা বসে ভেজে বাদলে ঝরঝর
পদ্মবুকে চন্দ্রশোভা, বলো কতক্ষণে
দেখাটুকু পাবো আমার কৃষ্ণমোহনের?
৪)
বুকের ভিতর ফুরিয়ে আসে বাতাস, অন্ধকার নামে
নিঃশব্দে পুড়ে যায় কুঞ্জগৃহে ঝরে পড়া ফুল
তুমি নেই শ্যাম, কাঁসরঘণ্টা বাজে না বৃন্দাবনে
ঋতু আসে, ঋতু যায়, অস্ফুট মনের মুকুল
দেখ, বর্ষা এল, জলকণা পরিপূর্ণ মেঘের শরীর
চাতক পাখির মতো আকুল যে বনভূমি ছিল
তারও শাখায় পাতায় রতিসুখ বাতাসে ও জলে
শুধুমাত্র রাধারাণী একা। অন্তরে বৈধব্যদশা।
অভিসারিকা যেতে চেয়েছিল প্রিয় আলিঙ্গনে
অথচ কোথায় গেলে তাকে বিচ্ছেদে ফেলে
কোন আদরিনীগৃহে কাটিয়েছ বর্ষার রাত?
কাছে টেনে মুখচুম্বন, প্রিয় উষ্ণ সম্ভাবনাসকল
গোপন স্পন্দনে কার রাত কাটিয়ে এলে?
ভালোবেসে ফুল নেবে তুমি, কাঁটা নেবে শুধু রাধারাণী
তোমার কাপট্য শ্যাম, জানি, জানি, সবটুকু জানি
৫)
ও বাঁশি ফেলে দাও শ্যাম,
যে বাঁশি ভুল সুরে বেজে ভুলেছে রাধাকে
সে বাঁশি প্রতারক। সে বাঁশি কপট।
মিথ্যেই তোমাকে লোকে প্রেমিক নামে ডাকে।
যাকে তুমি চলে যাওয়া বলো
সে তোমার গভীরে বসে আছে সুখে—
এ সত্যি যদি বুঝতে না পারো গোকুলতনয়,
নিজেকে ভাসিয়ে দাও যমুনার বুকে
ভালোবাসা চেনোনি তুমি তাই
এই ব্রজভূমি, পূন্যভূমি তোমার দেশ না
যে দেশের প্রতি ধূলিকণা জানে রাধার ভ্রূলতাবিন্যাস
সে চোখেও মিটল না তোমার তৃষ্ণা!
৬)
এত করে ডাকি তাকে এত করে আদরে জড়াই
তবু কোন পাপে কে জানে তাকেই হারাই
ওই রাজরূপ নিয়ে কী করব তার
যদি না পারি নিতে সিদ্ধ অধিকার
যদি না পারি নিতে বেদ, পুরাণাদি
শিশুমনে খেলা করা শান্ত আবাদি
শান্ত হও ত্রিলোকশোভন, শান্ত করো তেজ
এখানে রেখেছি প্রেম, দিপ্য আমেজ
দেখ বর্ষা সমাগত, আগুন ঝরছে ধারাপাতে
দূরত্ব নিভিয়ে এস সর্বাঙ্গ রাতে —
নিরাশ্রয় করি শোক, বিষাদের সর্ব ক্ষুদ্রতা
উপশমে হাত রাখি — আত্মীয়তার
পেরেছ রাখতে জমা মূল্যবান খনি?
তোমার জন্য করুণা হয় শ্যাম,
মোহের বিপরীতে প্রেম রাখতে শেখোনি

