
উচ্চারণের চেয়ে নীরবতা বেশি
চৈতালী চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায়
বেবী সাউ
কবি চৈতালী চট্টোপাধ্যায়ের জন্মদিনে আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য
মা আসছে। শাদা হবে রক্তমাখা মন।
খুনজখমের গায়ে জ্যোৎস্না পড়বে।
গলি দিয়ে ঢুকছে যে সশস্ত্র কলোনি,
মেন রাস্তায়, ভদ্র ফ্ল্যাটবাড়ি হয়ে বেরিয়ে আসবে।
খিদে নেই, তেষ্টা নেই, দেবতা ও দেবকন্যারা ঘুরছে পথে।
মাইকে মাইকে গান। কেউ কাউকে কুনজর দেবে না।
নিউজপ্রিন্টে শুধু আলো-আলো অক্ষর, আর, ঢাক বাজছে!
মা আসছে। কল্পকথা। তবু দেখ ঘরদোর চন্দনের বাস ছাড়ছে কেমন
(একটি মতিচ্ছন্ন কবিতা, চৈতালী চট্টোপাধ্যায়)
চৈতালী চট্টোপাধ্যায় সমকালীন বাংলা কবিতায় নারীর অভিজ্ঞতাকে প্রতিবাদের ভাষায়, কখনও ব্যক্তিগত স্মৃতি ও শরীরের গোপন ব্যাকরণে, ইতিহাস, পৌরাণিক অনুষঙ্গ এবং নাগরিক জীবনের ভাঙাচোরা বাস্তব চিত্রের সঙ্গে মিলিয়ে মিশিয়ে এক স্বতন্ত্র কাব্যভাষা নির্মাণ করেছেন। আশির দশকে বাংলা কবিতায় যে কয়েকজন কবি ভাষা, অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গির নতুন বিন্যাস ঘটিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে চৈতালী চট্টোপাধ্যায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। তাঁর কবিতায় ব্যক্তিগত জীবন সমষ্টিগত নারী-অভিজ্ঞতার এক রূপকে পরিণত হয়েছে। প্রেম কখনও রোমান্টিক আবেগে গণ্ডিবন্ধ না থেকে সম্পর্কের ভেতর ঢুকে পড়েছে ক্ষমতার রাজনীতি, দেশ, বিদ্রোহ এমনকি নারীর আত্মপরিচয়ও। আর শরীর হয়ে উঠেছে ভাষা, স্মৃতি এবং ইতিহাসের বহনকারী এক জটিল ভৌগোলিক ম্যানচিত্র। এই কারণেই তাঁর কবিতা পড়লে ভাষার গঠন, চিত্রকল্পের বিন্যাস, নৈঃশব্দ্যের ব্যবহার এবং প্রতীকের বহুস্তরীয় অর্থও সমান গুরুত্ব নিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়।
চৈতালী চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার প্রথম বৈশিষ্ট্য তাঁর ভাষা। কম কথার ভেতর দিয়ে সমগ্র সত্ত্কে কীভাবে নাড়িয়ে দেওয়া যায় তাঁর কবিতা পড়লে বোঝা যায়। বাংলা কবিতায় নারী-অভিজ্ঞতা নিয়ে অনেক কবিই লিখেছেন। চৈতালী চট্টোপাধ্যায় ভাষাকে এমনভাবে ব্যবহার করেন, যেখানে শব্দের চেয়ে শব্দের ফাঁক, বাক্যের চেয়ে অসমাপ্ত বাক্য, উচ্চারণের চেয়ে নীরবতা বেশি অর্থবহ হয়ে ওঠে। তাঁর কবিতায় ভাষা আশ্চর্য এক ম্যাজি- রিওলিজমের সন্ধান দেয়। আশ্চর্য গভীর দর্শনের দিকে নিয়ে যায়। তিনি আশ্চর্য এক ছন্দ নির্মাণ করেন। দৈনন্দিনকতার ভেতরে হাঁটতে গিয়েও থামিয়ে দিতে পারে সেই ছন্দ। এবং কবিতাকে আরও ঘন গভীর করে তোলে। সাধারণ শব্দও তাঁর কবিতায় এসে বহুস্তরীয় প্রতীকে রূপান্তরিত হয়। রান্নাঘর, জানলা, জল, কাপড়, আয়না, চুল, ঘর, দরজা কিংবা শহরের মেট্রোস্টেশন, নাগরিক যাপনের ভেতর একাকীত্ব, ভিড়ের ভেতর একা হয়ে ওঠা —এই সমস্ত দৈনন্দিন উপাদান তাঁর কবিতায় অস্তিত্ব, স্মৃতি, নিঃসঙ্গতা এবং প্রতিরোধের রূপক হয়ে ওঠে। যেমন তাঁর এই কবিতাটি—
“জ্বলছে নিভছে চোখ।
রক্ত পড়ছে,দেখা যায়।
এ এমন–
খিদে পেলে জল খেয়ে শুয়ে পড়লে,
তাও দেখা যায়!
শোকের আগের দিন
গ্যাসবেলুনের মতো আনন্দ উড়ে যাচ্ছে,
ক্যামেরা দেখেছে।
দুর্ভিক্ষ,অসুখ যত,শাদাকালো হয়ে উঠে আসে।
মৃত্যু ধরা আছে লেন্সে।সেনবাবুদের রঙচঙে বিবাহবার্ষিকীটিও!
খোলাখুলি,সব।
শালবনে প্রেম হচ্ছিল। পরে, ধর্ষণ ছিল।
সে ফুটেজ, মুছে দিয়েছে কেউ।
কোথায় যে কী লুকোবো,দিশা পাই না…
পাছে ছবি ওঠে,
মন শুধু আরো মন দিয়ে ঢেকে রাখে
খুব দ্রুত জ্বালানি ফুরিয়ে আসছে,
সেই বেদনাকে (সি সি টিভি কিংবা শেষের কবিতা)
কবি চৈতালী চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য তাঁর নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি। তবে এই নারীবাদ স্লোগানধর্মী নয়। তিনি নারীবাদ মানে শুধু পুরুষ-বিরোধিতাকে গুরুত্ব না দিয়ে, ক্ষমতার কাঠামোকে প্রশ্ন করেন। তাঁর কবিতায় নারী উপেক্ষিতা , প্রতিবাদী, প্রেমিকা, মা, কখনও শ্রমজীবী, সবচেয়ে ওপরে একজন নিঃসঙ্গ একলা একজন মানুষ। এই বহুমাত্রিক নারীচরিত্র বাংলা কবিতায় নতুনভাবে নিয়ে এসেছেন তাঁর নিপুণ কাব্যভাষার মধ্য দিয়ে। তিনি দেখান সমাজের আরোপিত পরিচয়ের বাইরে একজন নারীর নিজস্ব আত্মপরিচয় কতখানি জটিল এবং কতখানি সংগ্রামসাপেক্ষ।
তাঁর কবিতার মধ্য দিয়ে শরীরের নতুন পাঠ করি আমরা । বাংলা কবিতায় শরীর নিয়ে লেখার একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। কিন্তু চৈতালী চট্টোপাধ্যায় শরীরকে সৌন্দর্যের বিষয় করে দেখান না। শরীর তাঁর কাছে স্মৃতির ভাণ্ডার, আঘাতের ইতিহাস, প্রেমের মানচিত্র এবং ভাষার উৎস। ফলে তাঁর কবিতায় শরীর হয়ে ওঠে রাজনৈতিক, সামাজিক, দার্শনিক এক বিষয় হিসেবে প্রতিফলিত হয়। হয়ে ওঠে অভিজ্ঞতার গভীরতম নথিপত্রের মতো। তাঁর কবিতায় নগরচেতনা আরেকটি বিষয় হিসেবে আসে। কলকাতা, মেট্রো, স্টেশন, ব্যারিকেড, মিছিল, ফুটপাত কবিতায় ঘটনাপ্রবাহকে ছেড়ে মানসিক টানাপোড়েন অবস্থা হয়ে দাঁড়ায়। শহরের ভিড়, মেট্রো, রাস্তা, বিজ্ঞাপন, ফ্ল্যাট, একাকিত্ব, দ্রুতগতির জীবন—সবকিছু মিলিয়ে তিনি আধুনিক নাগরিক মানুষের বিচ্ছিন্নতাকে ধরতে চান তিনি। প্রকৃতি ও শহর পরস্পরের বিপরীতে দাঁড়িয়ে নতুন অভিধান তৈরি করে। তৈরি করে মানসিক দ্বন্দ্ব। আর এই দ্বন্দ্বই তাঁর কবিতাকে সমকালীন বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত করে। যেমন—
“এই হাওয়া চৈত্রের দিক থেকে উড়ে এসে
নীলষষ্ঠিতে পৌঁছোল।
তারপর বিরহসকাশে চলে গেল।
এ বিরহ মানুষের জন্য নয়।জল খেতে না পাওয়ার।
এ বিরহ প্রেমের জন্য নয়। অন্ধকারে, গেঁথে-থাকা উজ্জ্বলতার।
এ বিরহ তোমার-আমার নয়,জেল-খাটা নিরীহের ফিরে আসবার।
এ বিরহ মৃত্যুর জন্যও নয়,
যে রয়েছে বেঁচে তার থেকে,দূরে চলে যাওয়া শুশ্রূষার।
হাওয়া ঘাম মুছে মুছে দিল (হাওয়া)”
চৈতালীর কবিতায় অতীত কোনও নস্টালজিয়া নয়। স্মৃতি ফিরে আসে ক্ষত হয়ে, পুনর্নির্মাণের উপাদান হিসেবে। ব্যক্তিগত স্মৃতি, পারিবারিক স্মৃতি, সামাজিক স্মৃতি এবং ঐতিহাসিক স্মৃতিগুলো সব একসঙ্গে মিশে তাঁর কবিতা হয়ে ওঠে বর্তমানের দলিল, সময়ের স্তরবিন্যাস হয়ে ওঠে। তিনি পৌরাণিক চরিত্রকে অপরিবর্তিতভাবে গ্রহণ না করে সীতা, দ্রৌপদী, রাধা কিংবা অন্য নারীমূর্তিরা তাঁর কবিতায় সমকালীন নারীর অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। এই পুনঃপাঠের মধ্য দিয়ে তিনি ইতিহাস ও পৌরাণিক কাহিনিকে বর্তমানের ভাষায় অনুবাদ করেন। সম্পর্কের মধ্যে যে ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা কাজ করে, সেই দিকটিও তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ধরেছেন। কবি চৈতালী চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় মৃত্যুচেতনা আছে, কিন্তু তা হতাশাবাদ হয়ে ওঠে না। মৃত্যু তাঁকে জীবনের মূল্য বুঝতে শেখায়। ক্ষয়, বিচ্ছেদ, হারিয়ে যাওয়া মানুষ, ভেঙে যাওয়া সম্পর্ক তাঁর কবিতায় বারবার ফিরে আসে। কিন্তু সেই অন্ধকারের মধ্যেও তিনি আলো খোঁজেন।
চিত্রকল্প নির্মাণে চৈতালী চট্টোপাধ্যায় অত্যন্ত স্বতন্ত্র। তাঁর কবিতায় দৃশ্যমান এবং অদৃশ্য জগত পাশাপাশি চলে। একটি সাধারণ দৃশ্য হঠাৎই অতিবাস্তব হয়ে ওঠে। জল, পাখি, ধুলো, কাপড়, ঘুম, জানলা, আয়না, সিঁড়ি—এসব উপাদান তাঁর কবিতায় এসে নতুন অর্থ অর্জন করে। তাঁর চিত্রকল্প কখনও সিনেম্যাটিক, কখনও চিত্রকলার মতো স্থির, কখনও আবার স্বপ্নের মতো ভাসমান।
ভাষার অর্থনৈতিক ব্যবহারও তাঁর কবিতার একটি বড় শক্তি। অল্প শব্দে তিনি গভীর অনুভূতি প্রকাশ করতে পারেন। অপ্রয়োজনীয় অলংকার বা দীর্ঘ বর্ণনা এড়িয়ে তিনি সংযমী ভঙ্গিতে কবিতা নির্মাণ করেন। এই সংযমই তাঁর কবিতাকে আরও তীক্ষ্ণ করে তোলে। পাঠককে তিনি প্রস্তুত অর্থ দেন না; বরং অর্থ নির্মাণের কাজে অংশ নিতে আহ্বান করেন।
বাংলা কবিতার ইতিহাসে চৈতালী চট্টোপাধ্যায় যখন লেখালিখির জগতে আসেন, নারীকণ্ঠ ক্রমশ উঠে এলেও অনেক সীমাবদ্ধতা ছিল। সেখান থেকেই তিনি নিজের স্বর নির্মাণ করেছেন। তিনি সাহিত্যিক গোষ্ঠীর অনুকরণ করেননি কিন্তু সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নও থাকেননি। জীবনানন্দ, শক্তি, শঙ্খ, জয় গোস্বামী-পরবর্তী বাংলা কবিতার নানা অভিজ্ঞতা আত্মস্থ করেও তিনি নিজের আলাদা ভাষা তৈরি করেছেন।
চৈতালী চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা একবার পড়ে শেষ করা যায় না। প্রতিটি পাঠে নতুন অর্থ উন্মোচিত হয়। এর কারণ তাঁর কবিতা বহুমাত্রিক। একটি কবিতা একই সঙ্গে ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং দার্শনিক স্তরে কাজ করে।
আজকের বাংলা কবিতার পাঠক যখন নতুন ভাষা, নতুন অভিজ্ঞতা এবং নতুন দৃষ্টিভঙ্গি খোঁজেন, তখন চৈতালী চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা সেই প্রত্যাশা পূরণ করে। তিনি দেখিয়েছেন, কবিতা কেবল সৌন্দর্যের ভাষা নয়; প্রতিবাদের ভাষা, আত্মঅন্বেষণের ভাষা, স্মৃতির ভাষা এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভাষাও হতে পারে। তাঁর কাব্যজগৎ আমাদের শেখায় যে দৈনন্দিন জীবনের সামান্যতম ঘটনাও গভীর কবিতায় রূপান্তরিত হতে পারে, যদি তাকে দেখার চোখ থাকে। সেই দৃষ্টিই তাঁর কবিতার সবচেয়ে বড় শক্তি। সমকালীন বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদান এই কারণেই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ—তিনি নারীর অভিজ্ঞতাকে সর্বজনীন মানবিক অভিজ্ঞতার উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন, ভাষাকে দিয়েছেন নতুন ব্যাকরণ, আর বাংলা কবিতাকে উপহার দিয়েছেন এমন এক কাব্যভাষা, যা একই সঙ্গে সংবেদনশীল, বুদ্ধিদীপ্ত, প্রতীকসমৃদ্ধ এবং গভীরভাবে মানবিক।
দু্র্নীতির পাশে বমি রেখেছিলাম।
হাসপাতালগুলোর উঠোনে ডাঁই-করা আবর্জনা,আর,
ধর্ষণের পাশে,রক্ত বসিয়েছিলাম।
গাছে গাছে থোকা থোকা জনকল্যাণ ফুটে আছে।
যারা শুঁকছে,ভেঙেচুরে যাচ্ছে মুখচোখ…
কিংবা, পাগলের প্রলাপ বকছে।
দেখা হোক বা না হোক,
ফেরা হোক বা না হোক কাছে,
মনে রেখো আমার কথা!
মনে রেখো, ঠাণ্ডা ছেলেমেয়েদের জন্য কিছু আগুনের ব্যবস্থা আনতে গিয়ে
একদিন পুড়ে গেছিলাম (রাষ্ট্র)
বমি’ ঘৃণা, বিতৃষ্ণা ও নৈতিক প্রত্যাখ্যানের প্রতীক। কবি বলতে চান, দুর্নীতি এতটাই জঘন্য যে তার প্রতি মানুষের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত ঘৃণা। কবি দেখিয়েছেন দুর্নীতি, স্বাস্থ্যব্যবস্থার অবক্ষয়, নারীর প্রতি হিংস্র মনোভাব। রাষ্ট্রের ভণ্ড “জনকল্যাণ”-নীতি এবং প্রতিবাদী মানুষের আত্মত্যাগকে শক্তিশালী প্রতীক ও ব্যঙ্গের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন তিনি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে যারা মানুষের মধ্যে প্রতিবাদের আগুন জ্বালাতে চান, তাদেরই প্রায়শই রাষ্ট্র দমন করে। আমরা জানি, চৈতালী চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় রাজনীতি দলীয় অবস্থান হয়ে থাকে না। সরাসরি রাজনৈতিক স্লোগানের আকারে উপস্থিতও হয় না। ক্ষমতা, লিঙ্গ, ভাষা, শরীর, রাষ্ট্র এবং নাগরিক অস্তিত্বের সূক্ষ্ম সম্পর্কগুলিকে উন্মোচনের মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক চেতনা প্রকাশিত হয়। তাঁর কবিতায় আমরা পাই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও রাজনৈতিক। মানুষের শরীর, সম্পর্ক, শ্রম, স্মৃতি এবং নীরবতা—সবই কোনও না কোনও ক্ষমতা-কাঠামোর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সেই অর্থে চৈতালীর কবিতা আধুনিক নারীবাদী রাজনৈতিক কবিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে ।
তাঁর কবিতায় আমরা আশ্চর্য হয়ে দেখি, নারী মানেই সামাজিক নিয়ন্ত্রণ, ধর্মীয় বিধিনিষেধ, পারিবারিক শাসন এবং পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার সংঘর্ষক্ষেত্র । শরীর তাঁর কবিতায় এক ধরনের রাজনৈতিক মানচিত্রে পরিণত হয়। নারীর নীরবতা, গৃহস্থালির অদৃশ্য শ্রম, মাতৃত্ব, যৌনতা কিংবা বার্ধক্য—সবই তাঁর কবিতায় রাজনৈতিক তাৎপর্য লাভ করে। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল গৃহের রাজনীতি। বাংলা কবিতায় দীর্ঘদিন ধরে ঘরকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে দেখানো হলেও চৈতালী দেখান, ঘরও ক্ষমতার একটি প্রতিষ্ঠান। রান্নাঘর, বিছানা, জানলা, আলমারি, কাপড় শুকোনোর দড়ি, আয়না—এইসব গৃহস্থালির উপকরণ তাঁর কবিতায় নিছক বস্তুরূপে থাকে না; এগুলি নারীর বন্দিত্ব, শ্রম, স্মৃতি এবং প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠে। তাঁর কবিতায় ঘর ব্যক্তিগত না থেকে রাজনৈতিক পরিসর হয়ে ওঠে ।
চৈতালীর কবিতায় রাষ্ট্রের উপস্থিতি প্রত্যক্ষ আসে না হয়তো কিন্তু তা অনুভবযোগ্য। নাগরিক জীবনের ভয়, অনিশ্চয়তা, বিচ্ছিন্নতা, নজরদারি, শহরের যান্ত্রিকতা, ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতা এবং মানুষের একাকিত্ব তাঁর কবিতায় রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত আধুনিকতার সমালোচনায় পরিণত হয়। তিনি ক্ষমতার স্বরূপকে প্রশ্ন করেন। এই কারণেই তাঁর রাজনৈতিক কবিতা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন অর্থ ধারণ করতে পারে।
এই কারণে চৈতালী চট্টোপাধ্যায়ের কবিতাকে মাইক্রো-পলিটিক্সের কবিতা বলা যায়। এখানে বড় রাজনৈতিক ঘটনাগুলির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে মানুষের দৈনন্দিন জীবন। মিশেল ফুকো যে ক্ষমতার সূক্ষ্ম, সর্বব্যাপী উপস্থিতির কথা বলেছেন, চৈতালীর কবিতায় তার এক সাহিত্যিক প্রতিফলন দেখা যায়। একই সঙ্গে তাঁর কবিতায় সিমোন দ্য বোভোয়ার, জুডিথ বাটলার বা সমকালীন নারীবাদী তত্ত্বের সঙ্গে সংলাপ তৈরি করারও সুযোগ রয়েছে, যদিও তিনি তাত্ত্বিক ভাষায় নয়, কবিতার নিজস্ব ভাষায় এই প্রশ্নগুলি তুলে ধরেন। তাঁর কবিতার রাজনীতি মূলত মানুষের স্বাধীনতার রাজনীতি। সেখানে নারী-পুরুষের সমতা, ব্যক্তির মর্যাদা, স্মৃতির অধিকার, ভাষার স্বাধীনতা এবং ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার সাহস—এইসবই কেন্দ্রীয় মূল্যবোধ।
প্রকৃতি তাঁর কবিতার আসে একটি আধ্যাত্মিক উপাদান হয়ে। জল, বৃষ্টি, গাছ, পাখি, নদী, চাঁদ, বাতাস তাঁর কবিতার অন্তর্জগতকে খুলে দেয়। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তাঁর কবিতায় দ্বৈত না থেকে একাত্ম হয়ে ওঠে। এই দৃষ্টিভঙ্গি উপনিষদের ‘সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম’ ধারণার কথা মনে করিয়ে দেয়। তাঁর কবিতায় প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ মানে নিজের ভেতরের সত্তার সঙ্গে সংযোগ তৈরি করে। তাঁর কবিতায় শোক থাকলেও তা কখনও সম্পূর্ণ হতাশায় পর্যবসিত হয় না। ক্ষয় এবং পুনর্গঠন, বিচ্ছেদ এবং প্রত্যাবর্তন—এই দ্বৈতবোধের মধ্যেই তিনি মানবমনের, অস্তিত্বের অর্থ খোঁজেন। চৈতালী চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা জীবনের অন্তর্জগত, স্মৃতি, প্রেম, নিঃসঙ্গতা ও আত্ম-অন্বেষণের এক পর্যটনক্ষেত্র, অভিজ্ঞতা বিষয় হয়ে ওঠে । তাঁর কবিতা ব্যক্তি-অস্তিত্বের সংকটকে সার্বজনীন বোধে রূপান্তরিত করে এবং পাঠককে নিজের ভেতরের জগৎকে নতুনভাবে আবিষ্কার করতে উদ্বুদ্ধ করে।
“আমাকে প্রেতিনী মনে হয় না তোমার?
আমার যাপনে তুমি কত না নিয়ম ঢেলেছ!
হাওয়ামোরগের মতো, বাতাস বইয়ে দাও, আমি বিপরীতে ঝুঁটি রাখি।
যেমন চেয়েছ,শব্দ শাসনে ঢাকি।
চোখ বুজে থাকি।
তবু টের পেয়ে যাই ঠিক,
গা-ভর্তি, হাসপাতালের গন্ধ নিয়ে
চার নম্বর পুলে বেঁকে যাচ্ছ।
রাতে,ঘুমঘোর।,তুলো ও জ্যোৎস্না পাশে, শুয়ে আছ আজ।
সুসুম্না,ইড়া,পিঙ্গলা,চঞ্চল হয় আর,
সব দেখে ফেলি…
বলো,আমাকে প্রেতিনী মনে হয় না তোমার? (একটা ভূতুড়ে কবিতা)”

