
একটি বিশুদ্ধ বাসনা অথবা উপশম : উৎপলকুমার বসুর কবিতা সব্যসাচী মজুমদার
উৎপলকুমার বসুর জন্মদিনে আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য
বাংলা কবিতা দৈব আবহাওয়া থেকে নিস্তারের পর বহুমুখী হয়েছে। বলতে চাইছি, মধ্যযুগের একেবারে শেষ প্রান্ত থেকে বাংলা কবিতার বৈচিত্র্য অনেক বেশি বাড়তে থাকে। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজোত্তর সময়ে আমরা দেখতে পাচ্ছি লিরিক কবিতা কখনও টপিক্যাল, কখনও মেটাফিজিক্যাল, কখনও আবার বিশুদ্ধ কবিতাকে স্পর্শ করেছে। আমরা লক্ষ করেছি, বাংলা কবিতা কখনও ছন্দকে অবলম্বন করেছে, অন্তানুপ্রাসে বিশ্বাস করেছে; আবার ছন্দকে প্রচ্ছন্নে রেখে বলবার বিষয়কে নিরাভরণ করে তুলতে চেয়েছে।
এই বিচিত্র পর্যায়গুলিকে সবচাইতে বেশি খুঁজে পাওয়া যায় রবীন্দ্রনাথের কবিতায়, সবচেয়ে বেশি পরীক্ষা রয়েছে তাঁর কবিতায় — এ কথা আমরা অস্বীকার করতে পারি না। তারপরও বাংলা কবিতা বহুকৌণিক সম্ভাবনার বিবিধ স্তরকে স্পর্শ করতে করতে নিজেকে অতিক্রম করেছে। ভেঙেছে। হোমো সেন্ট্রিক যুগের অবসানের সময়েও সে অ্যালগোরিদমের ফাঁদ এড়িয়ে খুঁজে চলেছে রহস্যের বিবিধ বক্রগতিকে। এই সূত্রেই বাংলা ভাষায় বিশুদ্ধ কবিতার চিন্তাও প্রবেশ করে মূলত রবীন্দ্রনাথের হাত ধরেই। জীবনানন্দ দাশ তৎপরবর্তী সময়ের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও বিস্তৃত ধারক — এ কথা বলা আমাদের পক্ষে খুব অসম্ভব নয়। জীবনানন্দ পরবর্তী সময়ে এই ধারার অর্থাৎ বিশুদ্ধ কবিতার ধারার দু’টি গুরুত্বপূর্ণ নাম হিসেবে যদি আমরা আলোক সরকার এবং উৎপলকুমার বসুকে সাব্যস্ত করি , দেখব, কী অনায়াসে দুটি ভাষা একে অপরের থেকে আলাদা হয়ে গেছে। আলোক সরকারের দৃষ্টিতে যদি মুগ্ধ ও সহৃদয়তা থাকে; উৎপলকুমার বসু তবে তীর্যক, প্রশ্নময় অথচ নির্ভার।
উৎপলকুমার বসু রচিত কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ হল
,চৈত্রে রচিত কবিতা (১৯৬১),পুরী সিরিজ (১৯৬৪),আবার পুরী সিরিজ (১৯৭৮)
,লোচনদাস কারিগর (১৯৮২)খণ্ডবৈচিত্রের দিন (১৯৮৬),শ্রেষ্ঠ কবিতা ( ১৯৯১),সলমাজরির কাজ (১৯৯৫),পদ্যসংগ্রহ (১৯৯৬ ),কবিতাসংগ্রহ (১৯৯৬),কহবতীর নাচ (১৯৯৭),নাইট স্কুল (১৯৯৯),টুসু আমার চিন্তামণি (২০০০),পিয়া মন ভাবে প্রভৃতি।
লেখক জীবনের শুরুতে হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন উৎপলকুমার বসু। গ্রেফতারি পরোয়ানা পর্যন্ত জারি হয়। অবশ্য তৎপরবর্তী সময়ে হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক বোধহয় আর থাকেনি। যদিও, মনে হয় না তাঁর কবিতার সঙ্গে তথাকথিত হাংরি প্রোপাগান্ডার খুব বেশি সম্পর্ক ছিল। কিন্তু এ কথা অস্বীকার করা যায় না যে উৎপলকুমার হাংরি আন্দোলনের শুরুতে সংযুক্ত ছিলেন। তবুও শৈলেশ্বর ঘোষ তাঁর সম্পাদিত ‘ ক্ষুধার্ত ‘ সংকলনে না ভূমিকায়, না সংকলিত লেখাগুলির ভেতর কোথাও উৎপলকুমার বসুর উল্লেখ রাখেননি। এটা কিন্তু আশ্চর্যের বলেই মনে হয়।এবং আমরা একথা বলতে বিশেষ আপত্তি করব না যে, হাংরি জেনারেশনের আক্রমণ-প্রতি আক্রমণে পর্যবসিত প্রোপাগান্ডাময় ভুবন থেকে নিস্তার নিয়েছিলেন বলেই সম্ভবত তাঁর কবিতা বহুমুখীতা পেয়েছে, বহু মাত্রা পেয়েছে। এ কথার উদাহরণ হিসেবে আমরা আরও কয়েকটি নাম এক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারি— শক্তি চট্টোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার, শৈলেশ্বর ঘোষ প্রমুখ। প্রোপাগান্ডা থেকে বা নির্দিষ্ট চিন্তার মানচিত্র থেকে কবিতা লেখা বোধহয় সম্ভব হয় না। অন্তত সেটি বহুমাত্রার বিস্তার পায় না বলেই মনে হয় একটি মতের টপোগ্রাফিক্যাল সংকীর্ণতার জন্যেই বোধহয়।
“সামুদ্রিক মফস্বলে ফিরে চলো। সস্তা ও কোমল
তরিতরকারিময় ঐ দেশে। গাছের ছায়ায় বসে ভেবো এই।
তোমার তর্জনী ধরে এরো বেশি যাওয়া যাবে, শিশুর তর্জনী
আরো দূরে টেনে নাও, এমন-কি যে-দেশে এবার
অনাবৃষ্টি, অসম্ভব মহামারী, বেকারবিপ্লব,
চাষীদের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাদ্যরত রাজনীতিজ্ঞের দলে
ভিড়ে যাই, চলো, সময় বড়ই অল্প, তা’ছাড়া, যত দিন যায়
সময় ক্ষুদ্রতর, সে বামন, লাফিয়ে পিঠের
উপরে আরূঢ় হই, চলো, নইলে অনেক ছোট, মুর্খ ম্লান হয়ে
যাবে সে-ও। বামন ঘোড়ার পিঠে ন্যস্ত হয়ে কবিতার ব্যাখ্যা চেয়ো না ( পুরী সিরিজ ৮)
এই চেনা কবিতার উদ্ধৃত অংশের শেষ পঙক্তিটিকে নির্ভর করে এই আলোচনা অগ্রসর হতে চাইছে। ব্যখ্যা তারই হয়, যার প্রোপাগান্ডা থাকে, উদ্দেশ্য থাকে। কিন্তু, বিশুদ্ধ কবিতা তো উদ্দেশ্যহীন পরিশুদ্ধির কথা ভাবে। উৎপলকুমারের কবিতার মধ্যেই রয়েছে তাঁকে পড়বার পথনির্দেশ — এমন ব্যখ্যার দিকে যেতে না চাইলেও এই সূত্রে আমরা মনে করে নিতে পারি, কাকে বলে বিশুদ্ধ কবিতা,
pure poetry, message-free verse that is concerned with exploring the essential musical nature of the language rather than with conveying a narrative or having didactic purpose. ( Britanica )
এই সূত্রে আমরা কিংবা টি.এস. এলিয়টের ব্যখ্যাকে মনে রেখে যদি আমরা উৎপলকুমারের কবিতার কাছে আসি, তবে, এই অনুভব আমাদের স্পর্শ করবে যে, উৎপলকুমার বসু আমাদের কোথাও, কোনও সিদ্ধান্তে পৌছে দিচ্ছেন না। এই সিদ্ধান্তে পৌঁছন কবিতাকে যেমন লোকপ্রিয় করে তুলতে পারে, একই সঙ্গে সীমাবদ্ধ করে দিতেও সক্ষম। অপরপক্ষে আমরা লোকপ্রিয় অথচ বিশুদ্ধ কবিতার শর্ত পূরণ করছে , এমন রচনার বিশেষ উদাহরণ পাই না। কিন্তু, এই বিশুদ্ধ কবিতার উচ্চারণ কি পরবর্তী সময়ের পাঠককে তার পরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে কবিতাটিকে পড়ার অবকাশ তৈরি করে দেয় না ? যেভাবে পরবর্তী সময়ে একটি রচনা প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। কিন্তু, সিদ্ধান্ত একটি পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আরেকটি পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে বিশেষ সক্ষম নয় বলেই মনে হয়। এবং যে সমস্ত কারণে এই প্রবল ঘোলাটে একটা সময় পর্বে পাঠক নতুন করে উৎপলকুমার বসুর কবিতা পড়তে চাইছে। অনেকটা অবলম্বনের মতন,
“সেদিন ঝড়ের রাতে তুমি চাঁদ ডুবন্ত, একাকী দেখেছিলে লক্ষ ঢেউ জলে ভাঙে প্রতিচ্ছায়া — মেঘজটাজাল
খুলে যায় অন্যমনে | এত অলৌকিক অন্ধকার ঘিরেছিল চতুর্দিকে,
এত অলৌকিক বাতাসে মত্ততা যেন বলে গেল ‘কে খোলে
কপাট?
কে যায় বনের যাত্রী— ঝটিকায় তুমি কোথাকার ।’ আমি তখন নির্বাক থাকি | চন্দ্রাহত তোমার পূর্ণিমা
কখন দিগন্তে ডোবে আমি ততদিনে স্পষ্ট জেনে গেছি।”
( আবার পুরী সিরিজ : ২ )
এখানে একটি প্রশ্ন থাকতে পারে যে, বিশুদ্ধ কবিতা কি আদৌ প্রাসঙ্গিক গণমানুষের দৈনন্দিনের জান্তব জীবনে? তার চেয়ে কি যে শিল্প রচনা মানুষের জীবন যাপনের প্রতিকুলতা সম্পর্কে কথা বলছে, তার সমাধান সম্পর্কে ভাবছে — অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক নয় কি ! নিশ্চয়ই প্রাসঙ্গিক। কিন্তু, সেই একই প্রাসঙ্গিকতার চর্চা করে সমাজ বিজ্ঞান, রাজনৈতিক তত্ত্ব। তাহলে শিল্প আলাদা করে চিহ্নিত হবে কি করে ? নাকি শিল্পকে সমাজ ও রাজনীতি চর্চার একটা অংশ হিসেবে ভাবা হচ্ছে ? যদি ভাবা না হয়, তবে শিল্পকে সমকালিক হয়েও নির্দেশনামাহীন হতে হবে বলেই অনুমিত হয়। যে শিল্প নির্দেশ দেয়, সে আসলে শাসক হতে চাইছে, নির্দিষ্ট পরিধির ভেতরে নিজেকে সীমাবদ্ধ করে নিতে চাইছে। কিছুটা গিয়ে মিলিয়ে যেতে চাইছে। আর কবিতা বা শিল্পের যে কোনও আঙ্গিকই চায় পরবর্তী সময়েও প্রাসঙ্গিক থাকতে। সেটাই তার সীমাহীনতার শর্ত। বহুস্তরের শর্ত। এখানেই বিশুদ্ধ কবিতার আবেদন শুরু হয় বলেই মনে হয়। তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার এমন কিছু চিহ্নকে সে তুলে আনতে চায়, যারা অবিকল থাকতে পারে অনেকটা বিবর্তিত পরিস্থিতিতেও। আমরা যদি ফের্দিনাঁ দ্য স্যসুরকে মনে রেখে ভাবি যে, চিহ্নের বদল হয় না, তবে নিজের সময়ের মধ্যে মিশে থাকা অন্তর্ঘাতী ও মৌল চিহ্নকেই সন্ধান করে, ব্যবহার করে বিশুদ্ধ কবিতা বলেই মনে হয়। সেক্ষেত্রে আমরা জীবনানন্দ দাশের ‘ রাত্রি ‘ কবিতাটিকে মনে করতে করতে পড়ে ফেলব উৎপলকুমার বসুকে,
‘সুখ-দুঃখের সাথী, তুমি আমার সঙ্গে চলো।
বাতাস বইছে বেরিয়ে-পড়ার বাতাস, গাছের কাছে বলো আমার সঙ্গে বেরিয়ে পড়ুক, পথের কাছে বলো আমার ফিরতে অনেক রাত্রি হবে যেন অপেক্ষা না ক’রে সদর দরজা বন্ধ করে।
তুমি গাইতে পারো গান কিন্তু সে গান মহাশূন্যে মিলিয়ে যাবে। তুমি অনেক রূপকথা মাথার মধ্যে বয়ে বেড়াও-কাকে বলবে? শুনবে কারা?
শোয়ার আগেই ঘুমে ঢুলছে মানুষ-জন, পশু ও পাখি, চন্দ্র, তারা।
এমনি করেই জীবনভর কত সময় নষ্ট হল।
এবার সুখ-দুঃখের সাথী, তুমি অন্য কোথাও চলো।” ( সুখ দুঃখের সাথী)
এই আহ্বানটুকুই বিশুদ্ধ কবিতা।
উৎপলকুমার বসুর কবিতা কেবল এক রৈখিক উচ্চারণকে অবলম্বন করে গড়ে উঠেছে বা একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্নকে অনুসরণ করেছে — এই অভিযোগ আমরা করতে পারি না। কেননা, উৎপলকুমার বসুর কবিতা প্রথমাবধি পড়লে আমাদের বারবার চোখে পড়ে তাঁর বাগভঙ্গিমার বদল এবং ছন্দের বিবিধ ব্যবহার। আর এক্ষেত্রে একটি বড় দাবি করা যায় যে, প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি স্বতন্ত্র হতে চেয়েছিলেন প্রবল প্রভাব বিস্তারকারী জীবনানন্দ দাশের চাইতে। এবং শেষ পর্যন্ত আমারা নিঃসন্দেহ হতে পারি যে প্রায় একই ধারার চিন্তক হয়েও উৎপল তাঁর স্বাতন্ত্র্য নির্মাণ করতে পেরেছিলেন সর্বাতিশায়ী জীবনানন্দকে স্বীকার করেও। এই ধারণাটিও উৎপলকুমারের কবিতার ভেদন ক্ষমতা সম্পর্কে আমাদের ওয়াকিবহাল করে, সম্ভবত অনেকটা সম্যক ভাবেই করতে পারে।
উৎপলকুমার বসুর কবিতায় জাদু তার সমস্ত বাস্তবতা সমেত, বাস্তবতার অঙ্গ সমেত উপস্থাপিত হয়। সমাহিত অথচ সংশয়ে আচ্ছন্ন। আমাদের অগোচরে যে সমস্ত ঘটনা ঘটে যায় অবিরল, আমাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে চায়, তারাই উৎপলকুমারের কবিতা। একটি ডেটা সেন্ট্রিক যুগের প্রাক্কালে দাঁড়িয়ে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে বিধ্বস্ত আমাদের জীবনে উৎপলকুমার বসুর কবিতা হয়ে উঠতে পারে উপশম। এমন একটি অবস্থান, যা, আমাদের ধ্বস্ত জায়মানতার ভেতরেও একটি চিন্তার স্ফুলিঙ্গ দিতে পারে। যে অগ্নি দূরাগত হয়েছে আমাদের পাঠক জীবন থেকে, তারই এক লেলিহান উৎপলকুমার বসুর কবিতা —
“এক গবেষক বাণী চাইল। ভাবলাম বলি : আমার জীবনই
আমার বাণী। কিন্তু এটিও নাকি বলা হয়ে গেছে। অতএব
নিজস্ব ভঙ্গিতে, কিছুটা বিকৃত ভাবে, বিড় বিড় করি-
“দেখেছি পাহাড়। দেখে জটিল হয়েছি।”

