গণৎকার     জোয়াকিম মারিয়া মাশাদু দে আসিস (Joaquim Maria Machado de Assis) অনুবাদ- শীর্ষ মুখোপাধ্যায়

গণৎকার জোয়াকিম মারিয়া মাশাদু দে আসিস (Joaquim Maria Machado de Assis) অনুবাদ- শীর্ষ মুখোপাধ্যায়

Machado de Assis (১৮৩৯–১৯০৮) ব্রাজিলীয় সাহিত্যের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাশিল্পী এবং আধুনিক লাতিন আমেরিকান গদ্যের অন্যতম অগ্রদূত। তাঁর পূর্ণ নাম জোয়াকিম মারিয়া মাশাদো দি আশিস (Joaquim Maria Machado de Assis)। রিও ডি জেনেইরোর এক দরিদ্র পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর বাবা ছিলেন রংমিস্ত্রি, মা ছিলেন পর্তুগিজ বংশোদ্ভূত। শৈশবে দারিদ্র্য, বর্ণবৈষম্য এবং মৃগীরোগের মতো শারীরিক সমস্যার মধ্যেও তিনি আত্মশিক্ষায় নিজেকে গড়ে তোলেন। পরবর্তীকালে তিনি সাংবাদিক, কবি, ছোটগল্পকার, নাট্যকার, অনুবাদক এবং ঔপন্যাসিক হিসেবে অসামান্য খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি ব্রাজিলিয়ান একাডেমি অব লেটার্সের (Academia Brasileira de Letras) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। মাশাদো দি আশিসের সাহিত্যজীবনকে সাধারণত দুটি পর্বে ভাগ করা হয়। প্রথম পর্বে তিনি তুলনামূলকভাবে রোমান্টিক ও বাস্তবধর্মী উপন্যাস লিখলেও দ্বিতীয় পর্বে তাঁর রচনা এক অভিনব মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা, ব্যঙ্গ, বিদ্রূপ এবং দার্শনিক অনুসন্ধানের দিকে মোড় নেয়। এই পর্বের লেখাগুলিই তাঁকে বিশ্বসাহিত্যের প্রথম সারিতে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। তাঁর শ্রেষ্ঠ উপন্যাসগুলির মধ্যে The Posthumous Memoirs of Brás Cubas (Memórias Póstumas de Brás Cubas), Dom Casmurro, Quincas Borba, Esau and Jacob এবং Memorial de Aires বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। The Posthumous Memoirs of Brás Cubas-এ মৃত এক ব্যক্তি নিজের জীবনকাহিনি বর্ণনা করছে—এই অভিনব আখ্যানরীতি উনিশ শতকের সাহিত্যে ছিল অত্যন্ত ব্যতিক্রমী। Dom Casmurro উপন্যাসে বর্ণনাকারীর অবিশ্বস্ততা (unreliable narrator) এবং ঈর্ষা, স্মৃতি ও সত্যের অস্পষ্টতার যে বিশ্লেষণ দেখা যায়, তা আধুনিক উপন্যাসের পূর্বাভাস হিসেবে বিবেচিত হয়। ছোটগল্পেও তিনি সমান কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। "The Psychiatrist" (O Alienista), "The Fortune Teller", "Midnight Mass" প্রভৃতি গল্পে সমাজ, ক্ষমতা, মানসিকতা এবং মানবচরিত্রকে সূক্ষ্ম রসবোধ ও তীক্ষ্ণ বিদ্রূপের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করেছেন। মাশাদো দি আশিসের লেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য হল মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, আত্মবিদ্রূপ, সামাজিক ব্যঙ্গ, দার্শনিক সংশয় এবং আখ্যানের অভিনব নির্মাণ। তিনি প্রায়ই পাঠকের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন, কাহিনি ভেঙে মন্তব্য করেন, স্মৃতির ভঙ্গুরতা এবং সত্যের আপেক্ষিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর গদ্যে যেমন হাস্যরস আছে, তেমনি রয়েছে গভীর বিষাদ এবং মানবজীবনের জটিলতা সম্পর্কে এক নির্লিপ্ত অথচ সহানুভূতিশীল দৃষ্টি। দীর্ঘদিন ইউরোপীয় সাহিত্যের আড়ালে তাঁর গুরুত্ব কিছুটা চাপা পড়ে থাকলেও বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ থেকে বিশ্বজুড়ে তাঁর পুনর্মূল্যায়ন শুরু হয়। আজ তাঁকে শুধু ব্রাজিলের নয়, বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম মৌলিক ঔপন্যাসিক হিসেবে গণ্য করা হয়। জর্জ লুই বোর্হেস, সুসান সনট্যাগ, হ্যারল্ড ব্লুমসহ বহু সাহিত্যসমালোচক তাঁর রচনার মৌলিকতা ও আধুনিকতাকে বিশেষভাবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। মাশাদো দি আশিস প্রমাণ করেছিলেন যে বিশ্বমানের সাহিত্য রচনার জন্য ইউরোপীয় কেন্দ্রের অংশ হওয়া জরুরি নয়। ব্রাজিলের সমাজ, ইতিহাস ও মানুষের অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করেই তিনি এমন এক সাহিত্যভুবন নির্মাণ করেছিলেন, যা ভাষা ও দেশের সীমানা অতিক্রম করে আজও বিশ্বপাঠককে সমানভাবে আকর্ষণ করে।

গণৎকার

 

 

হ্যামলেট এক জায়গায় হোরেশিয়োকে বলেছিল, আমাদের দর্শন যতটুকু কল্পনা করতে পারে, তার চেয়ে ঢের বেশি রহস্য লুকিয়ে আছে এই স্বর্গ ও পৃথিবীতে। ১৮৬৯ সালের নভেম্বর মাসের এক শুক্রবারে সুন্দরী রিটা তার প্রেমিক ক্যামিলোকে প্রায় এই কথাই বোঝাতে চেয়েছিল, যখন আগের সন্ধ্যায় এক গণৎকারের কাছে যাওয়ার জন্য ক্যামিলো তাকে উপহাস করেছিল। পার্থক্য শুধু এই যে, রিটা শেক্সপিয়রের ভাষায় নয়, নিজের ভাষায় একই সত্য উচ্চারণ করেছিল।

—হাসো, হাসো। তোমাদের পুরুষদের স্বভাবই তো এ রকম। কোনো কিছুতেই বিশ্বাস নেই। কিন্তু শোনো, আমি সেখানে যেতেই তিনি আমার মুখ থেকে একটি কথাও বেরোনোর আগেই বলে দিলেন কেন আমি এসেছি। তাসগুলো সাজাতে শুরু করেই বললেন, ‘এই ভদ্রমহিলার মন একজন বিশেষ মানুষের দিকে ঝুঁকে আছে…।’ আমি স্বীকার করলাম, কথাটা সত্যি। তারপর তিনি নানা ভাবে তাস সাজিয়ে শেষে বললেন, আমি ভয় পাচ্ছি সেই মানুষটি আমাকে ভুলে যাবে। কিন্তু সে ভয়ের কোনো কারণ নেই।ক্যামিলো হেসে বলল,—তাহলে উনি ভুলই বলেছেন!

—ও কথা বলো না, ক্যামিলো। তুমি যদি জানতে, কী ভয় আর উৎকণ্ঠা নিয়ে আমি সেখানে গিয়েছিলাম! সবই তোমার জন্য। তুমি তো জানো। আগেও তোমাকে বলেছি। আমাকে নিয়ে হাসবে না, ঠাট্টা করবে না…

ক্যামিলো রিটার দুই হাত নিজের হাতে তুলে নিল। অনেকক্ষণ গভীর দৃষ্টিতে তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। সে শপথ করে বলল, সে রিটাকে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসে; রিটার এই সব আশঙ্কা নিছক শিশুসুলভ। তবু যদি কখনো তার মনে কোনো ভয় জন্মায়, তবে কোনো গণৎকারের কাছে নয়, সোজা তার কাছেই আসা উচিত। তারপর সে রিটাকে বকুনি দিয়ে বলল, এ ধরনের বাড়িতে যাওয়া মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ হয়নি। যদি ভিলেলা কোনোভাবে জানতে পারে, তাহলে…

—অসম্ভব! আমি ভেতরে ঢোকার সময় ভীষণ সাবধান ছিলাম।

—বাড়িটা কোথায়?

—এই কাছেই, গুয়ার্দা-ভেল্যা রাস্তায়। তখন আশেপাশে কেউই ছিল না। নিশ্চিন্ত থাকো। আমি এতটা বোকা নই।

ক্যামিলো আবার হেসে উঠল।

—সত্যিই তুমি এসব বিশ্বাস করো?

এই সময়েই রিটা যেন হ্যামলেটের সেই উক্তিটিকে দৈনন্দিন জীবনের ভাষায় অনুবাদ করল। সে তার প্রেমিককে বোঝাতে চাইল, এই পৃথিবীতে এমন অনেক সত্য এবং রহস্যময় ঘটনা আছে, যা যুক্তি দিয়ে সবসময় ব্যাখ্যা করা যায় না। যদি ক্যামিলো বিশ্বাস না-ই করে, তবে ধৈর্য ধরুক। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—গণৎকারিণী একটিও কথা না শুনেই সবকিছু জেনে ফেলেছিলেন। এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে? সবচেয়ে বড় কথা, এই মুহূর্তে তার সমস্ত দুশ্চিন্তা কেটে গেছে; সে এখন শান্ত, নিশ্চিন্ত।

ক্যামিলো কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। সে রিটার এই বিশ্বাসটুকু ভেঙে দিতে চাইল না। ছোটবেলায়, এমনকি কৈশোরেও, সেও নানা কুসংস্কারে বিশ্বাস করত। তার মা অজস্র অলৌকিক বিশ্বাস তার মনে গেঁথে দিয়েছিলেন। কিন্তু বিশ বছর বয়সে পৌঁছোতে পৌঁছোতে সেসব বিশ্বাস একে একে ঝরে গিয়েছিল। যেদিন সে এই সমস্ত পরগাছার মতো বিশ্বাসকে মন থেকে উপড়ে ফেলল, সেদিন ধর্মকেও সেই একই সংশয়ের মধ্যে এনে দাঁড় করাল—কারণ দুটিই তো মায়ের কাছ থেকেই পাওয়া। শেষ পর্যন্ত সে পৌঁছাল এক সর্বাত্মক অস্বীকারে। ক্যামিলো কোনো কিছুতেই বিশ্বাস করত না। কেন? সে নিজেও তার উত্তর দিতে পারত না। তার কাছে কোনো যুক্তি ছিল না; সে কেবল সবকিছুকেই অস্বীকার করে নিশ্চিন্ত ছিল। যদিও ‘অস্বীকার’ শব্দটিও পুরো সত্য নয়, কারণ অস্বীকারের মধ্যেও এক ধরনের স্বীকৃতি লুকিয়ে থাকে। আসলে সে নিজের অবিশ্বাসকে কোনো মতবাদে রূপ দেয়নি। জীবনের সেই অনন্ত রহস্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে শুধু কাঁধ ঝাঁকিয়ে নিজের পথে এগিয়ে যেত।

দুজনের বিদায় হল প্রফুল্ল মনেই। তবে ক্যামিলো ছিল রিটার চেয়ে বেশি আনন্দিত। রিটার আর কোনো সন্দেহ রইল না যে ক্যামিলো তাকে ভালোবাসে। আর ক্যামিলো শুধু এটুকুই বুঝল না যে রিটা তাকে গভীরভাবে ভালোবাসে, সে এটাও উপলব্ধি করল যে তার জন্য রিটা কতটা উদ্বিগ্ন—এমনকি সেই উদ্বেগেই সে গণৎকারিণীর কাছে পর্যন্ত ছুটে যেতে দ্বিধা করেনি। এ জন্য ক্যামিলো তাকে যতই বকুনি দিক না কেন, মনে মনে সে এই ভালোবাসায় গর্বিত না হয়ে পারল না। তাদের গোপন মিলনস্থল ছিল পুরোনো বার্বোনোস রাস্তায়, রিটারই জন্মপ্রদেশের এক মহিলার বাড়িতে। সেখান থেকে রিটা মাঙ্গেইরাস রাস্তা ধরে নিজের বাড়ি, বোটাফোগোর দিকে রওনা দিল। আর ক্যামিলো গুয়ার্দা-ভেল্যা রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কৌতূহলী চোখে খুঁজে নিতে লাগল সেই গণৎকারিণীর বাড়িটি।

ভিলেলা, ক্যামিলো আর রিটা—তিনটি নাম, একটি কাহিনি। কিন্তু এই কাহিনির সূচনা কীভাবে, তা এখনও বলা হয়নি। এবার সেই কথাই বলা যাক।

ভিলেলা আর ক্যামিলো ছিল ছেলেবেলার বন্ধু। ভিলেলা বিচার বিভাগের চাকরিতে যোগ দিয়েছিল। ক্যামিলোর বাবা চেয়েছিলেন ছেলে ডাক্তার হোক; কিন্তু বাবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে সে সরকারি চাকরিতে যোগ দেয়। অবশ্য তার আগেই বাবা মারা গিয়েছিলেন। কিছুদিন সে কোনো কাজই করেনি। পরে তার মা চেষ্টা করে তাকে একটি সরকারি দপ্তরে চাকরি পাইয়ে দেন। ১৮৬৯ সালের শুরুতে ভিলেলা প্রদেশ থেকে রিওতে ফিরে আসে। সেখানে সে এক সুন্দরী, কিন্তু অত্যন্ত সরল মেয়েকে বিয়ে করেছিল। বিচারকের চাকরি ছেড়ে সে আইনজীবী হিসেবে নতুন করে জীবন শুরু করার সিদ্ধান্ত নেয়। বোটাফোগোর কাছে তার জন্য একটি বাড়ির ব্যবস্থা করেছিল ক্যামিলোই, এবং বন্ধুকে আন্তরিকভাবে স্বাগতও জানিয়েছিল। —ইনিই কি সেই ভদ্রলোক?—হাসিমুখে ক্যামিলোর দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল রিটা।—আপনি কল্পনাই করতে পারবেন না, আমার স্বামী আপনাকে কতটা শ্রদ্ধা করেন। সারাক্ষণই আপনার কথা বলেন।

ক্যামিলো আর ভিলেলা পরস্পরের দিকে সস্নেহে তাকাল। তাদের বন্ধুত্ব ছিল অকৃত্রিম। পরে ক্যামিলো নিজের মনেই স্বীকার করেছিল, ভিলেলার চিঠিগুলিতে তার স্ত্রীর যে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা ছিল, বাস্তবে রিটা তার চেয়েও আকর্ষণীয়। তার চলাফেরায় ছিল স্বতঃস্ফূর্ত প্রাণচাঞ্চল্য, চোখে দীপ্তির ঝলক, আর ঠোঁটে ছিল এমন এক চঞ্চল, অনুসন্ধিৎসু অভিব্যক্তি, যা তাকে আরও মোহময় করে তুলত। বয়সে রিটা দুজনের চেয়ে সামান্য বড়—তার বয়স তিরিশ, ভিলেলার উনত্রিশ, আর ক্যামিলোর ছাব্বিশ। ভিলেলার গম্ভীর স্বভাব তাকে স্ত্রীর তুলনায় অনেক বেশি বয়স্ক বলে মনে করাত; অন্যদিকে নৈতিক বোধ ও বাস্তবজ্ঞান—দুই দিক থেকেই ক্যামিলো তখনও যেন একেবারে কাঁচা ছেলে। তার না ছিল অভিজ্ঞতা, না ছিল মানুষের মন বুঝে নেওয়ার সহজাত ক্ষমতা। ক্রমে তিনজনের মধ্যেই গভীর আন্তরিকতা গড়ে উঠল। কাছাকাছি থাকার ফলে সেই সম্পর্ক আরও নিবিড় হয়ে উঠতে সময় লাগল না। এর কিছুদিন পরেই ক্যামিলোর মা মারা গেলেন। সেই কঠিন বিপদের সময় ভিলেলা আর রিটা নিজেদের সত্যিকারের বন্ধু বলে প্রমাণ করলেন। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সমস্ত ব্যবস্থা, গির্জার ধর্মীয় আচার এবং মৃতার অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজের দায়িত্ব ভিলেলা নিজের কাঁধে তুলে নিল। আর রিটা যে সান্ত্বনা দিল, তার চেয়ে আন্তরিক সান্ত্বনা আর কেউ দিতে পারত না। ক্যামিলো কখনও বুঝতেই পারেনি, ঠিক কোন মুহূর্তে রিটার সঙ্গে তার এই আন্তরিকতা প্রেমে পরিণত হল। শুধু এটুকু সে জানত, রিটার পাশে সময় কাটাতে তার অসম্ভব ভালো লাগত। কখনও মনে হত, সে যেন তার আত্মার সেবিকা; কখনও বা প্রায় আপন বোনের মতো। কিন্তু তারও ঊর্ধ্বে, রিটা ছিল এক সুন্দরী নারী। তার নারীত্বের মৃদু সুবাস, তার উপস্থিতির উষ্ণতা, তার চারপাশের অদৃশ্য আকর্ষণ—এসবই ক্যামিলোকে অদম্য টানে টেনে নিয়ে যেত। মনে হত, এই সৌরভকে যেন নিজের অস্তিত্বের সঙ্গে মিশিয়ে নিতে পারে। তারা একই বই পড়ত, একসঙ্গে নাটক দেখতে যেত, কখনও দীর্ঘক্ষণ হাঁটত। ক্যামিলো রিটাকে তাস খেলা আর দাবা শিখিয়েছিল। সন্ধ্যার পর তারা খেলতও—রিটা খুব একটা ভালো খেলতে পারত না, আর ক্যামিলোও ইচ্ছে করেই নিজের দক্ষতা আড়াল করত, যাতে খেলাটা সমানে সমান থাকে। এগুলো ছিল তাদের সম্পর্কের বাইরের দিক। কিন্তু এর আড়ালে ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছিল আরও গভীর এক ঘনিষ্ঠতা। রিটার লাজুক চোখ বারবার ক্যামিলোর চোখে এসে আশ্রয় খুঁজত; নিজের স্বামীর দিকে তাকানোর আগেই যেন তার দৃষ্টির কাছে নীরব পরামর্শ চাইত। হঠাৎ ছুঁয়ে যাওয়া শীতল আঙুলের স্পর্শ, অকারণ নৈকট্য, অদ্ভুত এক নীরব বোঝাপড়া—এসব মিলিয়ে তাদের সম্পর্ক এক নতুন রূপ নিতে শুরু করল।

এক জন্মদিনে ভিলেলা তাকে উপহার দিয়েছিল দামি একটি ছড়ি। আর রিটার উপহার ছিল তাড়াহুড়ো করে পেন্সিলে লেখা, অত্যন্ত সাধারণ একটি শুভেচ্ছাপত্র। সেই সামান্য চিঠিটিই যেন প্রথমবার ক্যামিলোকে নিজের হৃদয়ের ভাষা পড়তে শিখিয়েছিল। সে বারবার চিঠিটির দিকে তাকিয়ে থাকত, চোখ সরাতে পারত না। কথাগুলো ছিল একেবারেই সাধারণ—তবু সাধারণ কথার মধ্যেও কখনও কখনও অসাধারণ সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে; অন্তত এমন এক মাধুর্য, যা হৃদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করে। প্রিয় মানুষের পাশে বসে প্রথম যে জীর্ণ ঘোড়ার গাড়িতে চড়েছিলে, সেটিও তখন অ্যাপোলোর রথের চেয়ে কম মহিমান্বিত বলে মনে হয় না। মানুষ এমনই; আর তার অনুভূতিগুলিও তেমনই বিস্ময়কর। ক্যামিলো আন্তরিকভাবেই এই সম্পর্ক থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে চেয়েছিল, কিন্তু তখন আর তা তার সাধ্যের মধ্যে ছিল না। রিটা যেন এক মোহিনী সাপের মতো ধীরে ধীরে তাকে নিজের বেষ্টনীর মধ্যে জড়িয়ে ফেলেছিল। তার আলিঙ্গন ক্রমশ আরও শক্ত হয়ে উঠছিল, যেন হাড় পর্যন্ত গুঁড়িয়ে দিতে চায়; তার চুম্বন যেন বিষদাঁতের দংশনের মতো ক্যামিলোর সমস্ত সত্তায় ছড়িয়ে দিচ্ছিল এক অমোঘ নেশা। ক্যামিলো ছিল সম্পূর্ণ অসহায়, সম্পূর্ণ পরাভূত। বিরক্তি, ভয়, অনুশোচনা, কামনা—সব মিলেমিশে তার মনে এক অদ্ভুত আলোড়ন তুলেছিল। কিন্তু সেই অন্তর্দ্বন্দ্ব দীর্ঘস্থায়ী হল না। জয় এল দ্রুত, আর সেই জয়ের উন্মাদনা ছিল মাতাল করে দেওয়ার মতো। সমস্ত নৈতিক সংকোচকে বিদায় জানিয়ে তারা নিজেদের নিয়তির কাছে আত্মসমর্পণ করল। এখন আর কোনো দ্বিধা ছিল না; যেন জুতোটি ঠিক পায়ের মাপেই তৈরি। হাত ধরাধরি করে তারা জীবনের পথে এগিয়ে চলল—ঘাসের ওপর, নুড়িপাথরের পথের ওপর—হাসতে হাসতে, আনন্দে। একমাত্র যন্ত্রণা ছিল, যখন তারা একে অপরের কাছ থেকে দূরে থাকতে বাধ্য হত। আর ভিলেলা? স্ত্রীর প্রতি তার অগাধ বিশ্বাস এবং বন্ধুর প্রতি তার অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা আগের মতোই অটুট রইল। কিন্তু একদিন ক্যামিলোর কাছে একটি বেনামি চিঠি এসে পৌঁছাল। সেখানে তাকে নীতিহীন, বিশ্বাসঘাতক বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল এবং সতর্ক করা হয়েছিল যে তার গোপন সম্পর্কের কথা নাকি সকলেরই জানা। চিঠি পড়ে ক্যামিলো আতঙ্কিত হয়ে উঠল। সন্দেহ এড়ানোর জন্য সে ভিলেলার বাড়িতে যাওয়া কমিয়ে দিল। ভিলেলা একদিন তার দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণ জানতে চাইলে ক্যামিলো অজুহাত দিল, এক তরুণীর সঙ্গে সামান্য প্রেমালাপের কারণে সে ব্যস্ত ছিল। সরলতা ধীরে ধীরে কৌশলে পরিণত হল। তার অনুপস্থিতি ক্রমশ দীর্ঘতর হতে লাগল, তারপর একসময় সে ভিলেলার বাড়িতে যাওয়াই প্রায় বন্ধ করে দিল। হয়তো এর মধ্যে সামান্য আত্মসম্মানবোধও কাজ করছিল—বন্ধুর প্রতি নিজের ঋণ যেন কিছুটা কমে, আর নিজের অপরাধও যেন ততটা নিকৃষ্ট বলে না মনে হয়। এই সময়েই উৎকণ্ঠিত ও অনিশ্চিত রিটা ছুটে গিয়েছিল সেই গণৎকারিণীর কাছে। ক্যামিলোর আচরণের প্রকৃত কারণ জানতে চেয়েছিল সে। আমরা ইতিমধ্যেই দেখেছি, গণৎকারিণী তার সমস্ত দুশ্চিন্তা দূর করে দিয়েছিল, আর ক্যামিলো তাকে এমন কাজ করার জন্য বকাঝকা করেছিল। কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল। এর মধ্যে ক্যামিলো আরও দু-তিনটি বেনামি চিঠি পেল। সেগুলোর ভাষায় এমন তীব্র রাগ আর হিংসা ছিল যে, মনে হয়নি সেগুলো নৈতিকতার খাতিরে লেখা। বরং মনে হয়েছিল, কোনো ঈর্ষান্বিত প্রতিদ্বন্দ্বীই সেগুলো লিখেছে। রিটাও এই ধারণার সঙ্গে একমত হল। নিজের ভাষায় সে বলল—সদ্‌গুণ অলস এবং কৃপণ; সে সময় কিংবা কাগজ কোনোটাই অপচয় করে না। অপচয় করে কেবল স্বার্থপরতাই—সে-ই সবসময় সতর্ক, সক্রিয় এবং উদার। তবু এতে ক্যামিলোর উদ্বেগ কমল না। এখন তার ভয় হতে লাগল, যদি সেই অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি ভিলেলাকে সব জানিয়ে দেয়! তাহলে যে বিপর্যয় নেমে আসবে, তা আর ঠেকানো যাবে না। রিটাও স্বীকার করল, সে আশঙ্কা একেবারে অমূলক নয়।

—বেশ, তা হলে আমাকে চিঠিগুলোর খামগুলো দাও,—রিটা বলল।—ভিলেলার নামে যে সব চিঠি আসে, সেগুলোর হাতের লেখার সঙ্গে আমি মিলিয়ে দেখব। যদি কোনো লেখার সঙ্গে এই বেনামি চিঠিগুলোর মিল পাই, তবে সেই চিঠি আমি লুকিয়ে ফেলব, ছিঁড়ে ফেলব।

কিন্তু তেমন কোনো চিঠি আর এল না। তবে অল্পদিনের মধ্যেই ভিলেলার আচরণে পরিবর্তন দেখা দিল। সে ক্রমশ গম্ভীর হয়ে উঠল, খুব কম কথা বলতে লাগল, যেন কোনো অদৃশ্য দুশ্চিন্তা তাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে। রিটা তৎক্ষণাৎ এই পরিবর্তনের কথা ক্যামিলোকে জানাল। দুজনে বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে আলোচনা করল। রিটার মত ছিল, ক্যামিলোর আবার ভিলেলার বাড়িতে যাওয়া শুরু করা উচিত। হয়তো ভিলেলা কোনো ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক সমস্যায় পড়েছে এবং বন্ধুর কাছে তা খুলে বলবে। কিন্তু ক্যামিলো এতে রাজি হল না। এত মাস পর হঠাৎ সেখানে যাওয়া মানে বেনামি চিঠিগুলোর অভিযোগকেই যেন সত্যি বলে প্রতিষ্ঠা করা। তার মতে, আরও কয়েক সপ্তাহ অত্যন্ত সাবধানে থাকা উচিত। আপাতত একে অপরের সঙ্গে দেখা না করাই শ্রেয়। প্রয়োজনে কীভাবে যোগাযোগ করবে, সেই ব্যবস্থা ঠিক করে তারা বিদায় নিল—দুজনেরই চোখে জল। পরের দিন দুপুরের কিছু পরে নিজের দপ্তরে বসে ক্যামিলো ভিলেলার একটি চিঠি পেল। তাতে লেখা—“অবিলম্বে আমাদের বাড়িতে চলে এসো। খুব জরুরি কথা আছে, তোমার সঙ্গে এখনই দেখা করা দরকার।” চিঠি পড়েই ক্যামিলো আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। কিন্তু রাস্তায় বেরোতেই হঠাৎ তার মনে প্রশ্ন জাগল—ভিলেলা যদি সত্যিই জরুরি কথা বলতে চাইত, তা হলে তাকে নিজের অফিসে ডাকাই তো স্বাভাবিক ছিল। বাড়িতে কেন? নিশ্চয়ই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর। তাছাড়া, সত্যিই কি না সে জানে না, কিন্তু তার মনে হল চিঠির অক্ষরগুলো যেন কাঁপা হাতে লেখা। আগের রাতে রিটার বলা কথাগুলোর সঙ্গে সে এই সবকিছুর যোগসূত্র খুঁজে দেখতে লাগল। সে আবার চিঠির দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে পড়ল—“অবিলম্বে আমাদের বাড়িতে চলে এসো। খুব জরুরি কথা আছে, তোমার সঙ্গে এখনই দেখা করা দরকার।”

মুহূর্তের মধ্যে তার কল্পনায় এক ভয়ঙ্কর নাটকের চূড়ান্ত দৃশ্য ভেসে উঠল। রিটা ভয়ে কুঁকড়ে কাঁদছে; ভিলেলা ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে কলম হাতে এই চিঠি লিখেছে; তার দৃঢ় বিশ্বাস, ক্যামিলো নিজেই ছুটে আসবে, আর দরজায় পা রাখামাত্র সে তাকে হত্যা করবে। ভয়ে ক্যামিলোর সারা শরীর শিউরে উঠল। তারপরই নিজের কল্পনার ওপর একরকম দুর্বল হাসি ফুটল তার মুখে। কিন্তু ফিরে যাওয়ার কথা তার মনেই এল না। যে-ই হোক, যা-ই ঘটুক, এখন আর পিছু হটার উপায় নেই। পথে যেতে যেতে তার মনে হল, আগে নিজের বাসায় একবার ঢুঁ মেরে গেলে কেমন হয়? হয়তো রিটার কোনো বার্তা এসে পৌঁছেছে, যা সমস্ত রহস্যের সমাধান করে দেবে। কিন্তু সেখানে গিয়ে সে কিছুই পেল না—না কোনো চিঠি, না কোনো মানুষ।

আবার রাস্তায় ফিরে আসতেই তার মনে সন্দেহ আরও প্রবল হয়ে উঠল। নিশ্চয়ই তাদের সম্পর্ক ধরা পড়ে গেছে। সেই বেনামি চিঠিগুলোর লেখকই ভিলেলার কাছে সব ফাঁস করে দিয়েছে। হয়তো এই মুহূর্তে ভিলেলা সব জেনে গেছে। কোনো কারণ ছাড়াই এতদিন তার বাড়িতে যাওয়া বন্ধ করে দেওয়া, সেই দুর্বল অজুহাত—সবই তো অভিযোগগুলোর সত্যতা প্রমাণ করে।

ক্যামিলো দ্রুত পায়ে হাঁটতে লাগল। উৎকণ্ঠায় তার মন অস্থির, শরীর স্নায়ুচাপে টানটান। সে আর চিঠিটি খুলে পড়ল না, কিন্তু তার প্রতিটি শব্দ যেন চোখের সামনে ভেসে বেড়াতে লাগল। কখনও আবার মনে হতে লাগল, যেন ভিলেলার নিজের কণ্ঠস্বরই তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলছে—

“অবিলম্বে আমাদের বাড়িতে চলে এসো। খুব জরুরি কথা আছে, তোমার সঙ্গে এখনই দেখা করা দরকার।”

ভিলেলার কণ্ঠে উচ্চারিত এই কথাগুলো যেন আরও রহস্যময়, আরও ভয়ংকর হয়ে উঠল।

এখনই এসো…

কেন?

তখন প্রায় একটা বাজতে চলেছে। প্রতি মুহূর্তে ক্যামিলোর অস্থিরতা বেড়ে চলল। যা ঘটতে পারে, সে যেন তা এত স্পষ্টভাবে কল্পনা করতে লাগল যে, কল্পনা আর বাস্তবের মধ্যে পার্থক্যই মুছে যেতে লাগল। হ্যাঁ, সে ভয় পেয়েছিল—প্রচণ্ড ভয়। একবার তার মনে হল, সঙ্গে একটা অস্ত্র নিলে কেমন হয়! যদি কিছু না-ও ঘটে, তবু সাবধান থাকলে ক্ষতি কী? কিন্তু পরক্ষণেই নিজের এই ভাবনায় সে লজ্জিত হয়ে পড়ল। নিজেকেই ধিক্কার দিয়ে দ্রুত পা বাড়াল কারিওকা স্কোয়ারের দিকে। সেখানে পৌঁছে একটি ঘোড়ার গাড়িতে উঠে কোচোয়ানকে বলল——যত জোরে পারো চালাও!

মনে মনে সে বলল, “যত তাড়াতাড়ি পৌঁছই ততই ভালো। এই অনিশ্চয়তা আর সহ্য হচ্ছে না।”

কিন্তু ঘোড়ার খুরের টগবগ শব্দ যেন তার উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিল। সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে, আর বিপদও ক্রমশ কাছে এগিয়ে আসছে।

গুয়ার্দা-ভেল্যা রাস্তার প্রায় শেষ প্রান্তে পৌঁছতেই গাড়িটি থেমে গেল। সামনে একটি ভাঙা ঘোড়ার গাড়ি রাস্তা আটকে রেখেছে। ক্যামিলো চারদিকে তাকিয়ে বুঝল, অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।

পাঁচ মিনিট কেটে গেল। হঠাৎ তার চোখ পড়ল বাঁদিকে। ঠিক তার গাড়ির পাশেই সেই বাড়ি—যেখানে একদিন রিটা গণৎকারিণীর কাছে গিয়েছিল।

জীবনে আর কোনো সময় সে এত প্রবলভাবে ভাগ্যগণনায় বিশ্বাস করতে চায়নি।

সে ভালো করে তাকাল। আশ্চর্যের বিষয়, রাস্তার অন্য সব বাড়ির জানালা খোলা, লোকজন ভিড় করে বাইরে তাকিয়ে কী ঘটেছে তা দেখছে। অথচ এই বাড়িটির জানালা-দরজা সব বন্ধ। যেন পৃথিবীর কোলাহল থেকে বিচ্ছিন্ন, নির্বিকার নিয়তির নিজেরই এক নীরব আবাস।

ক্যামিলো গাড়ির আসনে হেলান দিয়ে বসল, যেন বাড়িটিকে আর দেখতে না হয়। কিন্তু তার উত্তেজনা তখন চরমে। মনের বহু গভীরে চাপা পড়ে থাকা শৈশবের স্মৃতি, মায়ের শেখানো কুসংস্কার, বহুদিন আগে বিস্মৃত অলৌকিক বিশ্বাস—সব আবার জেগে উঠতে লাগল।

কোচোয়ান অন্য রাস্তা দিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিল। ক্যামিলো মাথা নেড়ে বলল—না, অপেক্ষা করো। তারপর আবার অদ্ভুত এক আকর্ষণে সে সেই বাড়িটার দিকে তাকাল।

হঠাৎ নিজের ওপরই তার হাসি পেল। সে কি সত্যিই গণৎকারিণীর কাছে যাবে? এই ভাবনাই যেন হাস্যকর। কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে হল, ধূসর রঙের বিশাল দুটি ডানা মেলে সেই রহস্যময় নারী যেন আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে। কখনও মিলিয়ে যাচ্ছে, কখনও আবার ফিরে আসছে, ক্রমশ তাকে ঘিরে বৃত্ত ছোট করে উড়ে আসছে…

এদিকে রাস্তায় লোকজন চিৎকার করছে।

—এইবার! ঠেলো!

—আরও জোরে!

—হ্যাঁ, হয়ে গেছে!

কিছুক্ষণের মধ্যেই রাস্তা পরিষ্কার হয়ে গেল।

ক্যামিলো চোখ বন্ধ করে অন্য কিছু ভাবতে চাইল। কিন্তু ভিলেলার কণ্ঠস্বর যেন আবার কানের কাছে ভেসে এল—

“অবিলম্বে চলে এসো…”

তার সামনে আবার সেই রক্তাক্ত নাটকের দৃশ্য ফুটে উঠল। শরীর কেঁপে উঠল তার। মনে হল, বাড়িটা যেন তাকিয়েই আছে তার দিকে। তার পা দুটো অজান্তেই নড়ে উঠল, যেন গাড়ি থেকে নেমে ভেতরে ঢুকে পড়বে। তার চোখের সামনে যেন একটি ঘন, অস্বচ্ছ পর্দা নেমে এল।

সে দ্রুত ভাবতে লাগল—এই পৃথিবীতে কত কিছুই তো মানুষের বোধের বাইরে। মায়ের কণ্ঠস্বর যেন আবার কানে ভেসে এল, শৈশবের কত অলৌকিক ঘটনার গল্প শোনাচ্ছে। আর তারই সঙ্গে বারবার প্রতিধ্বনিত হতে লাগল ডেনমার্কের রাজপুত্র হ্যামলেটের সেই অমর উক্তি—

“হোরেশিয়ো, স্বর্গে ও পৃথিবীতে এমন অনেক কিছুই আছে, যার কল্পনাও আমাদের দর্শন করতে পারে না।”

শেষ পর্যন্ত তার মনে একটিই প্রশ্ন জাগল—যদি একবার গিয়েই দেখি, তাতে আর হারাব কী? ক্যামিলো এক লাফে গাড়ি থেকে নেমে গণৎকারিণীর বাড়ির দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। কোচোয়ানকে অপেক্ষা করতে বলে সে তাড়াতাড়ি ভেতরে ঢুকে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল। সিঁড়িঘরে আলো প্রায় ছিল না বললেই চলে। অসংখ্য মানুষের পায়ের ঘষায় সিঁড়ির ধাপ ক্ষয়ে গিয়েছে, রেলিং মসৃণ আর আঠালো হয়ে উঠেছে। কিন্তু সেদিকে তার কোনো খেয়ালই ছিল না। সে দ্রুত উপরে উঠে দরজায় কড়া নাড়ল। কোনো সাড়া না পেয়ে ফিরে যাওয়ার জন্য ঘুরতেই আবার থেমে গেল। এখন আর ফিরে যাওয়ার সময় নেই। কৌতূহল তার রক্তে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে, বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন যেন হাতুড়ির আঘাতের মতো বাজছে। সে আবার দরজার কাছে ফিরে এসে একবার, দু-বার, তিনবার কড়া নাড়ল।

অবশেষে দরজা খুলে এক নারী বেরিয়ে এল। সেই গণৎকারিণী।

ক্যামিলো জানাল, সে ভাগ্য গণনা করাতে এসেছে। মহিলা তাকে ভেতরে আসতে বললেন। তারপর আরও অন্ধকার, আরও ভাঙাচোরা একটি সরু সিঁড়ি বেয়ে দুজনে উঠল চিলেকোঠায়। ওপরে একটি ছোট্ট ঘর, যার একমাত্র ক্ষুদ্র জানলা দিয়ে সামান্য আলো ঢুকছিল। পুরোনো আসবাব, বিবর্ণ দেয়াল, চারদিকে দারিদ্র্যের ছাপ—সব মিলিয়ে ঘরটি আরামদায়ক তো নয়ই, বরং সেই মহিলার রহস্যময় ভাবমূর্তিকেই যেন আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছিল।

গণৎকারিণী তাকে টেবিলের সামনে বসতে বললেন। তিনি নিজে জানলার দিকে পিঠ দিয়ে বিপরীত পাশে বসলেন, যাতে বাইরে থেকে আসা সামান্য আলো সরাসরি ক্যামিলোর মুখে পড়ে। তারপর একটি ড্রয়ার খুলে বহু ব্যবহারে জীর্ণ, ময়লা তাসের একটি প্যাকেট বের করলেন। দ্রুত হাতে তাসগুলো মেশাতে মেশাতে তিনি ক্যামিলোর দিকে তাকিয়ে রইলেন—সরাসরি নয়, চোখের কোণ দিয়ে, যেন মানুষটিকে ভেদ করে পড়ে নিতে চাইছেন। বয়স হবে চল্লিশের কাছাকাছি; ইতালীয় বংশোদ্ভূত, রোগা, শ্যামবর্ণ, আর তার বড় বড় তীক্ষ্ণ চোখে ছিল অদ্ভুত এক ধূর্ত দীপ্তি।

তিনি টেবিলের ওপর তিনটি তাস রেখে বললেন,

—আগে দেখা যাক, আপনাকে এখানে কী নিয়ে এসেছে। আপনি সদ্য একটা প্রচণ্ড মানসিক আঘাত পেয়েছেন… এবং ভীষণ ভয় পাচ্ছেন।

ক্যামিলো বিস্ময়ে মাথা নাড়ল।

—আর আপনি জানতে চান,—মহিলা আবার বললেন,—আপনার কোনো অমঙ্গল ঘটবে কি না…

উত্তেজিত গলায় ক্যামিলো বলে উঠল,

—আমার… আর তার।

গণৎকারিণী শুধু বললেন,

—একটু অপেক্ষা করুন।

তিনি আবার তাসগুলো তুলে নিলেন। লম্বা, সরু আঙুলে, অপরিষ্কার দীর্ঘ নখের ফাঁকে তাসগুলো একবার, দু-বার, তিনবার ভালো করে মিশিয়ে আবার বিছিয়ে দিলেন। উৎকণ্ঠায় ক্যামিলোর চোখ তার হাতের প্রতিটি নড়াচড়া অনুসরণ করছে।

কিছুক্ষণ পরে তিনি বললেন,

—তাস যা বলছে…

ক্যামিলো প্রায় ঝুঁকে পড়ল, যেন একটি শব্দও হারাতে না চায়।  তারপর গণৎকারিণী শান্ত স্বরে জানালেন—ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। আপনারও কিছু হবে না, ওই মহিলারও না। তৃতীয় ব্যক্তি কিছুই জানেন না। তবে খুব সাবধানে থাকতে হবে। ঈর্ষা আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা আপনাদের চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

তিনি তাদের প্রেমের কথা বললেন, রিটার সৌন্দর্যের কথা বললেন…

ক্যামিলো বিস্ময়ে নির্বাক হয়ে গেল। গণৎকারিণী কথা শেষ করে তাসগুলো আবার গুছিয়ে ড্রয়ারে তুলে তালা দিলেন।

ক্যামিলো কৃতজ্ঞতায় তার হাত চেপে ধরে বলল,—আপনি আমার মনকে শান্তি ফিরিয়ে দিলেন।

মহিলা হেসে উঠে দাঁড়ালেন।

—যান,—তিনি বললেন,—যান, ragazzo innamorato—প্রেমে পড়া তরুণ।

এই বলে তিনি স্নেহভরে তর্জনী দিয়ে ক্যামিলোর মাথায় আলতো স্পর্শ করলেন। ক্যামিলোর মনে হল, যেন প্রাচীন কোনো ভবিষ্যদ্বক্ত্রী তাকে আশীর্বাদ করলেন। সেও উঠে দাঁড়াল।

এদিকে গণৎকারিণী পাশের টেবিলে রাখা কিশমিশের থালা থেকে এক গোছা তুলে খেতে শুরু করেছেন। তার দাঁত ছিল দুধের মতো সাদা, আর নখগুলো তার সম্পূর্ণ বিপরীত—কালচে ও অপরিষ্কার। এমন সাধারণ কাজের মধ্যেও তার নিজস্ব এক অদ্ভুত ব্যক্তিত্ব ছিল।

ক্যামিলো তখন ভাবছে, কত পারিশ্রমিক দেওয়া উচিত। সে জানে না, এই মহিলার প্রাপ্য কত।

অবশেষে মানিব্যাগ বের করে বলল,

—কিশমিশও তো কিনতে হয়। বলুন, কত দেব?

গণৎকারিণী মুচকি হেসে উত্তর দিলেন,

—আপনার হৃদয় যা বলে।

ক্যামিলো দশ মিলরেইসের একটি নোট এগিয়ে দিল। মহিলার চোখ চকচক করে উঠল। তার সাধারণ পারিশ্রমিক ছিল মাত্র দুই মিলরেইস।

তিনি বললেন,—সহজেই বুঝতে পারছি, আপনি সেই ভদ্রমহিলাকে খুব ভালোবাসেন। আর ভালোবাসবেনই বা না কেন? তিনিও আপনাকে গভীরভাবে ভালোবাসেন। এখন নিশ্চিন্ত মনে যান। ভয় পাবেন না। তবে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় সাবধানে—খুব অন্ধকার। আর আপনার টুপিটা নিতে ভুলবেন না।

নোটটি ইতিমধ্যে নিজের পকেটে রেখে তিনি হাসিমুখে ক্যামিলোর সঙ্গে সিঁড়ি পর্যন্ত এলেন। নিচে এসে ক্যামিলো বিদায় জানিয়ে দ্রুত রাস্তায় নেমে গেল। আর গণৎকারিণী মোটা পারিশ্রমিক পেয়ে খুশিমনে একটি নৌকার গান গুনগুন করতে করতে আবার চিলেকোঠার ঘরে ফিরে গেলেন।

গাড়িটি তখনও অপেক্ষা করছিল। রাস্তা পরিষ্কার হয়ে গেছে। ক্যামিলো উঠে বসতেই কোচোয়ান ঘোড়াকে চাবুক মেরে দ্রুত এগিয়ে দিল।

এখন যেন ক্যামিলোর কাছে সবকিছুই বদলে গেছে। পৃথিবী হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। আকাশ আরও নির্মল, পথচারীদের মুখ আরও হাসিখুশি। কিছুক্ষণ আগের আতঙ্কের কথা ভেবে সে নিজেই হেসে ফেলল। ভিলেলার চিঠির ভাষা এখন তার কাছে একেবারেই স্বাভাবিক ও আন্তরিক বলে মনে হচ্ছে। এতক্ষণ সে কী করে ওই কথাগুলোর মধ্যে মৃত্যুর হুমকি দেখতে পেল? বরং এখন তার মনে হল, চিঠিটি সত্যিই জরুরি ছিল, আর এত দেরি করে সে ভুলই করেছে। হয়তো কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজেই তাকে ডাকা হয়েছে।

সে কোচোয়ানকে চিৎকার করে বলল,

—আরও জোরে! আরও জোরে!

দেরি হওয়ার একটা বিশ্বাসযোগ্য অজুহাতও সে মনে মনে তৈরি করতে লাগল। এমনকি ভাবল, এই সুযোগে আবার ভিলেলার পরিবারের সঙ্গে আগের মতো ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও ফিরিয়ে আনবে।

কিন্তু তার এই সব পরিকল্পনার সঙ্গে সঙ্গে গণৎকারিণীর কথাগুলোও বারবার মনে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। তিনি তো তার আসার কারণ ঠিকই ধরেছিলেন; তার মনের অবস্থাও বুঝেছিলেন; এমনকি তৃতীয় ব্যক্তির অস্তিত্বও জেনে গিয়েছিলেন। তা হলে বাকি কথাগুলোই বা মিথ্যা হবে কেন? বর্তমান যদি তিনি দেখতে পারেন, তবে ভবিষ্যৎও কি তার অজানা?

এই ভাবনা ধীরে ধীরে তার শৈশবের বিস্মৃত কুসংস্কারগুলোকে আবার জীবন্ত করে তুলল। রহস্য যেন লোহার নখর দিয়ে তার মনকে চেপে ধরল। কখনও নিজের ওপর হাসি পেল, কখনও আবার সেই হাসির মধ্যেই অস্বস্তি ফিরে এল। কিন্তু গণৎকারিণীর আশ্বাস, তার তাস, তার সংক্ষিপ্ত অথচ দৃঢ় বাক্য, বিদায়ের সময় বলা—“যাও, প্রেমে পড়া তরুণ”—এবং সেই সুরেলা গুনগুনানি—সব মিলিয়ে ক্যামিলোর মনে নতুন এক বিশ্বাসের জন্ম দিল।

তার হৃদয় তখন আনন্দে ভরে গেছে। অতীতের সুখস্মৃতি আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন একাকার হয়ে তার ভেতরে ঢেউ তুলছে। গ্লোরিয়া রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে সে দূরের সমুদ্রের দিকে তাকাল—যেখানে আকাশ আর জল অনন্ত আলিঙ্গনে মিলেছে। সেই দৃশ্য তার কাছে ভবিষ্যৎকেও তেমনই দীর্ঘ, অফুরন্ত আর সীমাহীন বলে মনে করাল।

ভিলেলার বাড়ি আর দূরে নয়। মুহূর্তের মধ্যেই সে পৌঁছে গেল। লোহার বাগানের ফটক ঠেলে ভেতরে ঢুকল। বাড়ির চারপাশে অস্বাভাবিক নীরবতা। ছয়টি পাথরের সিঁড়ি এক লাফে উঠে দরজায় কড়া নাড়তেই দরজা খুলে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে ভিলেলা।

—দেরি হয়ে গেল, ক্ষমা করো। তার আগে আসা সম্ভব ছিল না। কী হয়েছে?

ভিলেলা কোনো উত্তর দিল না। তার মুখ বিকৃত, চোখে ভয়ঙ্কর কঠোরতা। সে শুধু ইশারায় ক্যামিলোকে ভেতরে আসতে বলল।

ঘরে পা রাখতেই ক্যামিলোর বুক ফেটে এক আর্তনাদ বেরিয়ে এল। সোফার ওপর রিটা পড়ে আছে—রক্তের পুকুরে নিথর, মৃত। পরের মুহূর্তেই ভিলেলা ঝাঁপিয়ে পড়ে ক্যামিলোর গলা চেপে ধরল। তারপর পরপর দুটি গুলির শব্দ। মেঝের ওপর লুটিয়ে পড়ল ক্যামিলোর নিথর দেহ।

CATEGORIES
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)
demon slauer rule 34 lena the plug leak amateurtrheesome.com cumming in milfs mouth mujer haciendo el amor a un hombre, belle delphine of leaked emma watson in porn xxxamat.com big booty in public hidden cam gay sex, sit on face porn g a y f o r i t forcedpornanal.com please screw my wife female celebrity sex tapes