
সূর্যাস্তের অন্যান্য রঙ অরুন্ধতী ভট্টাচার্য
রাণাঘাট লোকাল পায়রাডাঙা স্টেশন ছাড়িয়ে দুপাশের সুবিস্তীর্ণ ধানক্ষেতের মধ্যে দিয়ে ধীর গতিতে এগিয়ে মিশন গেট পেরোতেই বৃষ্টির অঝোর বর্ষণ থেমে গিয়ে বাতাসের স্মিত অনুদ্বেল প্রবাহে কামরার গুমোট ভাব অদৃশ্য হয়ে গেল। কলকাতার বিপরীতমুখী এই ট্রেনের যাত্রাপথ শেষ হয়ে এসেছে, যাত্রী সংখ্যা নিতান্তই কম, স্টেশন তখন আগতপ্রায়। উৎপল জায়গা ছেড়ে উঠে দরজার দিকে এগিয়ে গেল, ডানদিক না বাঁদিক, কোনদিকের দরজায় প্ল্যাটফর্ম পড়বে জানা নেই, তাই সে মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে রইল। সে জীবনে প্রথমবার এই ট্রেনে উঠেছে, তাই জানে না যে রাণাঘাট লোকাল বরাবর ৬নং প্ল্যাটফর্মে ঢোকে আর তাই স্টেশন পড়ে ডান দিকে। ব্যস্ততার কিছু নেই, ট্রেনের মন্থর গতি আলস্য ছড়িয়ে রেখেছে চারপাশে, মন্থরতা শেষ হয়ে সম্পূর্ণ থেমে গেলে নেমে যেতে হবে। তারপর জি আর পির গেট দিয়ে বেরিয়ে একটা রিক্সা নিয়ে বলতে হবে ছোটবাজার, চার কি পাঁচ মিনিটের পথ, ছোটবাজারের মোড় থেকে ডানদিকে ঘুরে কয়েকটা বাড়ির পর একটা সাদা রঙের বিরাট বড় দোতলা বাড়ির ঠিক উল্টোদিকের বাড়ি। একটা কাগজের টুকরোয় লেখা আছে এই নির্দেশ। সেইমতো ছোটবাজারের মোড়ে যখন সে পৌঁছাল আশেপাশের কোনও বাড়ির একটা জানলাও খোলা নেই। বর্ষার ছায়াচ্ছন্ন দুপুরে পাড়ার সবাই সুপ্তিমগ্ন। সামনে তাকালেই দেখা যাচ্ছে সাদা বাড়িটা, সে বাড়িরও দরজা-জানলা-লোহার গেট সবই বন্ধ। তার উল্টোদিকে, হ্যাঁ, একটা বাড়ি আছে ঠিকই, কিন্তু সে বাড়ির ছাদ ফুঁড়ে একটা বড় যজ্ঞি ডুমুর গাছ অনেক উঁচু পর্যন্ত ডালপালা প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে আছে। এ বাড়িতে কি কেউ থাকে? তখনই চোখে পড়ল, একমাত্র এই বাড়িরই একটা জানলার একটা কপাট খোলা।
বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়াতেই ডুমুর গাছ অধিকৃত ঘরের পাশের একটি কালো রঙের বড় কাঠের দরজা খুলে গেল। একজন অতিবৃদ্ধ মানুষ বেরিয়ে এসে ভাঙা কোমরের উপরের অংশটি সোজা করার চেষ্টায় এক অদ্ভুত তির্যক ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে ডান হাতের পাতা ভুরুর উপরে আড়াআড়ি ধরে ওকে নিরীক্ষণ করল এবং তারপর ভেতরে ডাকল। দরজা দিয়ে ঢুকেই একটা সরু গলিপথ, যার একধারে একটি নর্দমার উপর সমান আকারের ইঁট সারি দিয়ে নিখুঁত ভাবে চাপা দেওয়া। বৃদ্ধের পিছন পিছন গলি পেরিয়ে ডানদিকে ঘুরে বিস্তৃত খোলা রোয়াকের এক ধারে পাশাপাশি থাকা দুটি ঘরের প্রথমটায় ঢুকে দেখল এই ঘরেরই একটি জানলার একটি কপাট খোলা, কারণ অন্য কপাটটা ভেঙে গেছে এবং গরাদের সঙ্গে তাকে কাতার দড়ি দিয়ে চিরদিনের মতো বেঁধে দেওয়া হয়েছে। তাকে একটা তক্তপোষের উপর বসিয়ে রেখে বৃদ্ধ বাইরে চলে গেল। কয়েক মুহূর্ত পরে ঘরে ঢুকল একটি মেয়ে। তার পরণে কালোর উপর সাদা গোল গোল ববি প্রিন্টের ছাপা শাড়ি আর হাতে একটি ডিসের উপর গরম চায়ের কাপ। উৎপল তার দিকে তাকাতে প্রথমেই চোখে পড়ল ডান চোখের গভীর কালো এক নিষ্পলক দৃষ্টি। সে জানে মেয়ের একটি চোখ পাথরের, তবুও সেটি দেখার কৌতূহল তার দৃষ্টিকে বোধহয় একটু বেশিক্ষণ আকৃষ্ট করে রেখেছিল। মেয়েটি তা বুঝতে পেরে চোখ নামাল ও সেই নির্দিষ্ট চোখটিতে হাত দিয়ে বলল, ‘আমার এই চোখটা নেই।’
উৎপল একটু কুন্ঠিত হয়ে উত্তর দিল, ‘আমি জানি।’
তখনই আবার ঝেঁপে বৃষ্টি এল আর বৃদ্ধ মানুষটি বাইরের রোয়াক থেকে ঘরে ঢুকে পড়ল। তার হাতে একটা কাঠের বারকোষে অনেকগুলো পেতলের মাদুলি ও লাল রঙের মোটা সুতো। ঘরের মধ্যে তক্তপোষ ছাড়া আর কোনও বসার জায়গা নেই, তার দুই প্রান্তে এরা দুজন বসে, তাহলে কোথায় বসবে, কোথায়ই বা থালাটা রাখবে, বুঝতে না পেরে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে পাশের ঘর আর এই ঘরের মাঝের একটা ভেজানো দরজা ঠেলে ওই ঘরে চলে গিয়ে আবার দরজাটা ভেজিয়ে দিল। সামান্য যে সময়ের জন্য দরজাটা খুলে গিয়েছিল তার মধ্যেই উৎপলের নজরে পড়ল সে ঘরের আরেকটি তক্তপোষ এবং তার উপরে টাঙানো ব্যবহারের প্রায় অযোগ্য একটি ছেঁড়া ও ময়লা মশারি। মেয়েটি ওর নজর অনুসরণ করছিল। সে বলল, ‘মা শুয়ে আছে।’
উৎপল জিজ্ঞাসা করল, ‘ওনার কি শরীর খারাপ?’
- ‘হ্যাঁ, হাঁপানির টানটা একটু বেড়েছে।’
- ‘আমি কি অসময়ে এসে পড়লাম?’
- ‘না, না, মায়ের এরকম প্রায়ই হয়।’
তখনই অন্য ঘর থেকে বৃদ্ধের গলার স্বর ভেসে এল, ‘টুলু, তোর মা ডাকছে।’ উৎপল লক্ষ্য করল, মেয়েটির মুখের সহজ কমনীয় ভাব অন্তর্হিত হয়ে কঠিন হয়ে উঠল এবং সে মাঝের ভেজানো দরজা ঠেলে পাশের ঘরে চলে গেল। উৎপল যেখানে বসেছিল সেখান থেকে রাস্তার দিকের আধখানা খোলা জানলা দিয়ে বাইরেটা দেখা যাচ্ছে না, তাই সে ঘরের মধ্যে কি আছে দেখতে লাগল। মাঝের দরজার একপাশে রাখা আছে দুটি ট্রাঙ্ক একটার উপর আরেকটা বসানো আর অন্য পাশে একটা আলনা। দেওয়ালে অনেকগুলো পেরেক লাগানো আছে, তার মধ্যে মাত্র একটাতেই ঝুলছে ফ্রেমে বাঁধানো বালক কৃষ্ণের ছবি, সাদা ধবধবে একটা গরুর গায়ে হেলান দিয়ে বাঁশি বাজাচ্ছে। আর দরজা দিয়ে বাইরের রোয়াকের যে সামান্য অংশ দেখা যাচ্ছে তাতে রয়েছে এক লোহার বালতি ভর্তি জল, তার পাশে একটা মগ ও একটা বাটিতে উনুনের ছাই, বাসন মাজার জায়গা হবে হয়তো। এই সামান্য উপকরণ দেখতে যে সময়টুকু লাগল তার মধ্যেই ফিরে এল টুলু ও তারপর তারা কথা বলতে শুরু করল। টুলু বলল তাদের বাড়ির একটু দূর দিয়ে যে নদী বয়ে গেছে তার কথা, বর্ষায় ভিজে ভিজে টিউশনি করতে যাওয়া আর সন্ধ্যেবেলায় বিবিধ ভারতীতে ‘মনের মত গান মনে রাখা কথা’ শোনার কথা। উৎপল বলল আসার পথে ট্রেনের ধীর গতির কথা, নিঃঝুম দুপুরে ঘুমন্ত পাড়া আবিষ্কারের কথা, তার ছেলের দুষ্টুমি আর স্ত্রীর মৃত্যুর কথা। টুলু মাঝখানে আরেকবার শুধু উঠে গিয়েছিল, একটা কাঁসার রেকাবিতে নিয়ে এসেছিল দুটি মিষ্টি। উৎপল খাওয়া শেষ করে ঘড়ি দেখল, পাঁচটা দশ। পরের ট্রেন পাঁচটা চল্লিশের রাণাঘাট লোকাল। এবার তাকে উঠতে হবে। টুলু বলল, ‘চলুন, একটা রিক্সা ডেকে দিই।’
সদর দরজার বাইরে আসতেই উৎপল অবাক হয়ে দেখল গোটা শহর একসঙ্গে জেগে উঠেছে। রাস্তার উল্টোদিকে্র সাদা দোতলা বাড়ির একটি প্রসারিত অংশে সার দেওয়া তিনটি দোকানঘর, প্রথমে অ্যালুমিনিয়ামের বাসনের দোকান, তারপরে একটা ছোট দর্জির দোকান আর তার পাশে একটা মুদিখানা। সব দোকান খুলে গেছে। একটু দূরে ছোটবাজারের মোড়ের একটা দোকান থেকে মাইকে ভেসে আসছে হিন্দি গান। আর ডানদিকের একটা মিষ্টির দোকানে উনুনে আঁচ দিয়ে তার পাশে বসে একজন সিঙাড়ার খোলের মধ্যে পুর ভরছে। রাস্তা দিয়ে ঘন ঘন সাইকেল যাচ্ছে, একটা পর একটা রিক্সা যাচ্ছে সওয়ারি নিয়ে। সাইকেল ও রিক্সার ঘন্টির আওয়াজে ভরে গেছে চারপাশ। অথচ বাড়ির মধ্যে বসে সে কিছুই টের পায়নি; যেন এক নিস্তব্ধ উপত্যকার মধ্যে থেকে সহসা ছিটকে এসে পড়েছে এই জনবহুল শহরে। ততক্ষণে টুলু একটা খালি রিক্সা ডেকেছে। তাতে উঠে বসার আগে তার দিকে ফিরে তাকাল উৎপল, বাইরের বৃষ্টি-ভাঙা হলুদ আলোর হালকা আভা এসে পৌঁচেছে সেই মুখে, তার বাঁ চোখে সদ্য জেগে ওঠা উজ্জ্বলতা আর ডান চোখে তখনও জড়িয়ে রয়েছে ঘরের ভেতরের আবছায়া নৈঃশব্দ। সে বলল, ‘এ বিয়েতে আমার কোনও আপত্তি নেই।’
কথাটা বলেই সে রিক্সায় উঠে বসল। টুলু ভেবে পেল না কি উত্তর দেবে। রিক্সায় বসার পর উৎপল আবারও কিছু বলল, কিন্তু ঠিক তখনই পাশ দিয়ে সাইকেল করে দুটো ছেলে যেতে যেতে খুব জোরে হেসে উঠল, টুলু কিছু শুনতে পেল না। সে জিজ্ঞাসা করল, ‘কি বলছেন?’ উৎপল আবার কিছু বলল, এবারে উল্টোদিকের বাসনের দোকানে বস্তা থেকে বাসন ঢালার আওয়াজ হল, কিছুই শোনা গেল না। টুলু শুধু দেখল রিক্সাটা এগিয়ে যাচ্ছে আর উৎপল তার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ছে। সে চলে গেল। তার চলে যাওয়ার যে পথটা মোড়ের মাথা পর্যন্ত বিস্তৃত টুলু আরও খানিকক্ষণ সেই শূণ্য পথটার দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগল, উত্তর দেওয়া হল না। তারপর পেছন ফিরে দরজা দিয়ে ঢুকতে যাবে, দেখল বাড়ির পাশের গলির মুখে দাঁড়িয়ে নির্মলা মাসিমা। ওকে জিজ্ঞাসা করল, ‘কে এসেছিল রে, টুলু?’
টুলুর তখন পা-দুটো কাঁপছে আর কানের মধ্যে কি-সব যেন ভোঁ ভোঁ করছে। ওর একটুও কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। কোনও মতে উত্তর দিল, ‘আমার বন্ধু।’
- ‘কোথা থেকে এসেছিল?’
- ‘কলকাতা থেকে।’
তারপরে ঘরে ঢুকেই এসে বসল ওই বিছানায়। কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল উৎপলের বসার জায়গাটায় – এই, ঠিক এইখানে বসেছিল সে। পাশের ঘর থেকে মা ডাকছে, কিন্তু ও সাড়া দিতে চাইল না। কিছুই করতে ইচ্ছে করছে না। সে শুয়ে পড়ল। মা সমানে ডেকে যাচ্ছে আর সে দেওয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে আছে। সাড়া না পেয়ে বাবা এঘরে এল। মায়ের হরলিক্স খাওয়ার সময় হয়েছে, জানতে চাইছে কখন স্টোভ ধরাবে, তাহলে এক কাপ চাও যেন সে করে ওই সঙ্গে। আর ঘরে আটা নেই, নারাণের দোকান থেকে ধারে আনতে হবে। আর আজ কেরোসিন তেল দিচ্ছে, সেটাও ধারে আনতে হবে, তাড়াতাড়ি না গেলে পাওয়া যাবে না। টুলু অনেক কষ্টে উঠে বসল, স্টোভ ধরাতে হবে, জল গরম করতে হবে, চা করতে হবে, দোকানে যেতে হবে, পা-দুটো যেন বড্ড ভারি লাগছে আজ।
২
নির্মলা মাসিমা গলির মোড় ছেড়ে যেতে পারছে না। তার অপেক্ষা, টুলু কখন আবার বেরোবে, কখন আরও ভালো করে তার কাছ থেকে জেনে নেওয়া যাবে কলকাতা থেকে আগত বন্ধুর সম্পূর্ণ ইতিহাস। তখন এল মাধুরী। টুলুদের বাড়ির পেছনে যে টিনের চাল দেওয়া দুটি ঘরের নিবাস রয়েছে সে সেখানকার বাসিন্দা। ওদের সঙ্গে টুলুদের ঝগড়া। ওদের বাড়ির আমগাছের ডাল অযাচিতভাবে টুলুদের রান্নাঘরের ছাদে বিছিয়ে রেখেছে তার পাতার ঐশ্বর্য। সেই পাতা জমে স্তুপীকৃত আকার নিয়েছে, বৃষ্টির স্রোত বেরিয়ে যাওয়ার পথ পাচ্ছে না। তবুও ওরা সে ডাল কাটবে না। তাই নিয়েই ঝগড়া্ এবং যার পরিণতিতে দু’বাড়ির কথা বন্ধ। মাধুরীকে দেখে নির্মলা মাসিমা ঔৎসুক্য নিবারণের একটা প্রত্যক্ষ উৎস হাতে পেল। জিজ্ঞাসা করল টুলুদের বাড়িতে কলকাতা থেকে যে বন্ধু এসেছিল তাকে ওরা কেউ দেখেছে কিনা। মাধুরী তো অবাক, ওদের বাড়ি আবার কে আসবে? আত্মীয়-স্বজন পর্যন্ত কেউ আসে না, তায় আবার বন্ধু-বান্ধব। সে তার ঈষৎ মঙ্গোলীয় ধরণের মুখাবয়বে বিশেষ একটি ভঙ্গী করে বলল, ‘বন্ধু না ছাই, দেখো গে কোন পিরীতের লোক।’
এ উত্তর কৌতূহল নিরসনের বদলে অধিক আগ্রহের সূচনা করল। কিন্তু নির্মলা মাসিমা আর বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারছে না, দুটো হাঁটুই বাতে পর্যুদস্ত, এইটুকু দাঁড়াতেই ব্যথাটা হাঁটু ছাড়িয়ে কোমরের দিকে উঠছে। অগত্যা ধীরে ধীরে গলি দিয়ে হাঁটতে শুরু করল। সামনে এগিয়ে গলি যেখানে ডাইনে মোড় নিয়েছে তার দুটো বাড়ির পরেই তার বাড়ি। ওই মোড়ে এসে দেখল তপনের মা বাড়ির দরজা দিয়ে বেরিয়ে সামনের বাগানের মধ্যে দিয়ে এদিকেই আসছে। এই গলির বাসিন্দারা রাস্তার আলো-বাতাস থেকে নির্বাসিত হয়ে থাকে বলে বাড়ির মেয়ে-বউরা বিকেল হলেই গুটিগুটি পায়ে গলির মুখে বড় রাস্তার ধারে এসে দাঁড়িয়ে থাকে আর প্রতিদিনই কিছু না কিছু আগ্রহ ও আনন্দের উপকরণ খুঁজে পায়। তাকে খুঁড়িয়ে হাঁটতে দেখে তপনের মা জিজ্ঞাসা করল, ‘কি দিদি, বাতের ব্যথা বেড়েছে বুঝি?’ নির্মলা মাসিমা তখন বাতের ব্যথায় আর আগ্রহী নয়, সে যে অচেনা মানুষটিকে একটু আগে টুলুদের বাড়ি থেকে বের হতে দেখেছে তার সবিস্তার বর্ণনা দিয়ে বলল টুলু তাকে নিজে মুখে বলেছে যে সে তার কলকাতার বন্ধু। তপনের মা তো শুনে অবাক, টুলুর কি করে কলকাতায় বন্ধু হয়। পাড়ার দু’জন মাত্র লোকের কলকাতায় যোগাযোগ আছে, এক, রাস্তার ওপর ওই সাদা দোতলা বাড়ির মেয়ের বিয়ে হয়েছে সেখানে আর দুই, তপনের বাবা, সে কলকাতায় চাকরি করে। তাও তো তাদের বাড়িতে কলকাতা থেকে বন্ধু আসে না। তপনদের বাড়ির এক তলার ভাড়াটে বাঙাল বউ বাগানের এক কোনে কলতলায় বাসন মাজতে মাজতে ওদের কথা শুনছিল। সে এবার তপনের মাকে বলল, কদিন আগেও নাকি একটা ছেলে এসেছিল টুলুদের বাড়ি। কে জিজ্ঞাসা করাতে টুলু বলেছিল ওর বাবার কাছে মাদুলি নিতে এসেছে লাইনের ওপার থেকে। পাড়া-ঘরে দু’-চারজন টুলুর বাবা কুনির কাছে যায় জলপড়া-তেলপড়া নিতে, তাই বলে এত নাম-ডাক নেই যে দূর-দূরান্ত থেকে লোক আসবে। তাহলে তো আর ওদের ভাতের অভাব থাকত না। এই অকাট্য যুক্তির সামনে দাঁড়িয়ে নির্মলা মাসিমার সন্দেহ আরো একটু মাথা তুলল আর তখনই মনে হল টুলুর কথা বলার ধরণের মধ্যেও যেন অন্য কিছুর ইঙ্গিত ছিল। টুলুকে যখন জিজ্ঞাসা করেছিল কে এসেছে, সে কেমন তাড়াহুড়ো করে উত্তর দিয়েছিল, যেন কথাটা এড়িয়ে যেতে চাইছিল, আর উত্তর দিয়ে একটুও দাঁড়ায়নি, সোজা বাড়ির ভেতর ঢুকে গিয়েছিল। এই সব কথাই সে বলল তপনের মাকে আর বাঙাল বউকে। তারপর আর সে দাঁড়াতে পারল না, হাঁটুটা খুব কনকন করছে, সে ডান দিকের রাস্তা ধরে বাড়ি চলে গেল। তখন সেখানে এল পাগলী স্বপ্নার বিধবা বউদি। এপাড়ার সব বউদেরই পরিচয় তাদের সন্তানের নামে। এই বধূটিরও কয়েকটি সন্তান আছে, কিন্তু বাড়িতে একটি পাগল মেয়ে থাকায় এবং এ পাড়ায় ওই একটি মাত্র মানুষ পাগল হওয়ায় তাদের বাড়ির সকলেরই পরিচয় সেই পাগলের সূত্রে। তপনের মা তাকে সব ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়ার পর একটু হতাশ হওয়ার ভঙ্গীতে বলল, ‘বেঁচে থাকলে আরও কত কি দেখতে হবে, আরও কত কি শুনতে হবে।’ তার মতো পাগলী স্বপ্নার বিধবা বউদিও গোটা ব্যাপারটার মধ্যে একটা অবৈধ সম্পর্কের গন্ধ পেল যা তারা কোনওভাবেই একা একা গলাধঃকরণ করতে পারল না। পাগলী স্বপ্নার বউদি পরামর্শ দিল ব্যাপারটা ধনা-মনার মাকে জানানো দরকার। তিনি পাড়ার মহিলাদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ এবং সব খবরাখবর রাখেন। তখন দরজার আগলটা বাইরে থেকে তুলে দিয়ে, মাথার ঘোমটা আরেকটু বেশি টেনে দিয়ে তপনের মা গেল গলির শেষ প্রান্তে ধনা-মনাদের বাড়ি।
৩
বাড়ির কাজ সেরে টুলু গেল নদীর ধারে, ওপারের টিউশনিতে যেতে হবে। শহরের পশ্চিম দিকে বয়ে যাওয়া এই নদী পার হওয়ার সময় প্রতিদিন সূর্যাস্ত হয়। যেদিন টুলু সময়ের আগে পৌঁছয়, সেদিন সূর্যাস্ত আগে হয়, আর যেদিন তার দেরি হয়, সেদিন সূর্যও দেরিতে পাটে বসে। তাই রোজ সে সূর্যাস্ত দেখে আর ডুবে যাওয়ার সময়ে যে লাল আভা ছড়িয়ে পড়ে আকাশময়, তা টুলুর মধ্যে এক বিষাদের জন্ম দেয়। পরের দিন টিউশনিতে যাওয়ার আগে পর্যন্ত সেই বিষন্নতা তাকে ঘিরে রাখে। তারপর নৌকায় উঠে আবার নতুন বিষাদে আক্রান্ত হয়। এমনটাই ঘটে তার জীবনে। কিন্তু আজ আকাশের সেই লাল রঙের পাশে আরও কয়েকটা রঙ সে দেখতে পেল। শেষ সূর্যের রক্তিম আভার পাশে তারাও ওই আকাশের গায়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। সে হতবাক হয়ে পশ্চিমাকাশে চেয়ে রইল। নৌকা কখন ওপারে পৌঁছে গেছে তার খেয়াল পর্যন্ত হয়নি। মাঝি ডাকতে তার সাড় ফেরে ও নিচে নামে। ওপারে মাটির রাস্তা। সে রাস্তা দিয়ে হাঁটে আর ফিরে ফিরে আকাশের দিকে তাকায়। তখনও কত রঙ একটার সঙ্গে আরেকটা মিলে সামিয়ানার মতো আকাশে ছেয়ে রয়েছে। সে ভাবল, অন্য দিন তো কই এত রঙের মেলা থাকে না। রঙ দেখতে দেখতে সে পৌঁছে গেল সুতপা বউদির বাড়ি তার মেয়েকে পড়াতে।
সুতপা বউদি তার জন্যই সাগ্রহে অপেক্ষা করছিল। সে আসতেই তাকে নিজের ঘরে ডেকে নিয়ে গেল। উৎপলের সঙ্গে সে-ই টুলুর বিয়ের সম্বন্ধ ঠিক করেছে। তার ভায়ের সহকর্মী উৎপল, স্ত্রী মারা যাওয়ার পর সন্তানের দেখাশোনার জন্য আবার বিয়ে করতে চেয়েছে শুনে সে টুলুর কথা বলেছিল, যার পরিণতিতে টুলুর বত্রিশ বছরের জীবনে এরকম একটি অভাবনীয় পরিস্থিতির উদয় হয়েছে। উৎপলের শর্ত ছিল সে আগে মেয়ে দেখবে, উভয় পক্ষের পছন্দ হলে তবেই পরিবারের লোকের সঙ্গে কথা হবে, কারণ দ্বিতীয় পক্ষের বিয়েতে সে সাধারণ-স্বাভাবিক সামাজিকতার মধ্যে যেতে চায় না। এমনকি বিয়েটাও হবে একেবারেই ঘরোয়া ভাবে, বিয়েসুলভ কোনও অতিরঞ্জন যেন না থাকে। সুতপা বউদি বুঝতে পেরেছিল এই সমস্ত দিকের বিচারে টুলু আদর্শ পাত্রী, শুধু তার অন্ধত্ব যদি বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। কিন্তু যখন শুনল যে দেখতে এসেই উৎপল কথা দিয়ে গেছে, তখন এই বিয়েতে যে আর কোনও বাধা থাকবে না তা সে সহজেই অনুমান করতে পারল। তবুও সে টুলুকে সাবধান করে দিল, বিয়ের কথা যেন ঘুনাক্ষরেও বাইরের কাউকে না জানায়। কিন্তু টুলুর ভয় বাইরের মানুষকে নিয়ে নয়, বরং ঠিক বিপরীতে তার সবচেয়ে কাছের মানুষ মা-বাবাকে নিয়ে। এই মুহূর্তে টুলুই তাদের একমাত্র ভরসাস্থল। তারই টিউশনির টাকায় সংসার চলে, সে রান্না করে দিলে তবে দুটো খেতে পায়, সে ডাক্তার ডেকে আনলে তবে হাঁপানির টান কমে। তবে কেন তারা টুলুর বিয়ে দিতে রাজি হবে? সুতপা বউদি তাকে আশ্বস্ত করে, সব ঠিক হয়ে যাবে, সে নিজে যাবে তার বাবা-মার সঙ্গে কথা বলতে।
উৎপল এসেছিল এক শনিবারে, আর আজ বুধবার। প্রথম দু’ দিন এক অদ্ভুত আচ্ছন্নতার মধ্যে কাটিয়েছে সে। কিন্তু বুধবারের সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরে উপলব্ধি করল এক অভর ক্লান্তি। অত্যধিক আশংকা থেকে যে ক্লান্তির জন্ম হয়, তাই। সুতপা বউদি মা-বাবার সঙ্গে কথা বলায় তারা সোৎসাহে না হলেও মেনে নিয়েছে। সব দিক দিয়ে সব কিছু এত মসৃণভাবে সম্পন্ন হচ্ছে যে টুলুর মনে ভয় এসে বাসা বাঁধছে। এত সহজে এত বড় ঘটনা ঘটে যাবে তার জীবনে, একথা মানতে সে ভয় পাচ্ছে। বিপর্যয়ের আভাস যেন ঈশাণ কোনে পুঞ্জিভূত। যে কোনও ভাবে বিপর্যয় আসতে পারে, কিন্তু কোন পথে তা সে জানে না। কেননা তার অভিজ্ঞতা বলছে কোনও কাজ করার আগে যে যে পথে অন্তরায় আসতে পারে বলে সে আগে থেকে সতর্ক হয়ে যায়, ঘটনা ঘটার সময় ঠিক তার বাইরে অন্য কোনও কারণে তার সেই কাজ পন্ড হয়। দিন যত এগোচ্ছে ততই সে নিঃসন্দেহ হয়ে উঠছে যে অঘটন কিছু একটা ঘটবে আর সে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে।
পরের সপ্তাহের বৃহষ্পতিবারে সুতপা বউদি জানাল সামনের রবিবার উৎপলের মাসতুতো বোন ও ভগ্নীপতি এখানে এক আত্মীয়ের বাড়ি নিমন্ত্রণে আসছে, তাই তাদের সঙ্গে দেখা করে বিয়ের দিন ঠিক করে যাবে। কথাটা শুনে টুলু দিশাহীন হয়ে পড়ল। তার ওই ভাঙা, নোংরা বাড়িতে কি করে এমন অতিথির আপ্যায়ন করবে সে! বিছানায় পাতার মতো একটা আস্ত চাদর নেই, চা দেওয়ার মতো ভদ্র কাপ-প্লেট নেই, ভালো খাবার দেওয়ার মতো হাতে টাকা নেই। উৎপলের কাছে সংসারের প্রকৃত স্বরূপ সে লুকিয়ে রাখতে চায়নি। তাই সে যখন এসেছিল তাকে কিছু গোপন করতে হয়নি। কিন্তু এই মানুষগুলো তো তার ভবিষ্যতের আত্মীয় হতে চলেছে, তাদের কাছে কি করে নিজের দীনতাকে হাট করে মেলে ধরবে? সব চেয়ে বড় কথা, যে বাবা-মা বহু বছর যাবৎ সামাজিকতার প্রান্তসীমায় বাস করছে তারা কি পারবে কলকাতার মানুষদের সঙ্গে সভ্যতার পরিমার্জনা বজায় রাখতে? বেশি দেরি নেই, মাত্র তিন দিন সময় আছে হাতে, এর মধ্যেই সব জোগাড় করতে হবে। প্রথমেই যে যে জিনিষ প্রয়োজন কিন্তু ঘরে নেই বা থাকলেও বাইরের মানুষের সামনে বের করার উপযুক্ত নয় তার একটা তালিকা তৈরি করল। সে তালিকায় রয়েছে বিছানার চাদর, বালিশের ওয়াড়, টেবিল ক্লথ, জানলার পরদা, চায়ের কাপ-প্লেট, জলখাবারের স্টিলের থালা, কাচের গ্লাস ও একটা টেবিল ফ্যান। তারপর সে প্রতিটা জিনিষের পাশে লিখে রাখল বিভিন্ন পরিচিত মানুষদের নাম, যাদের কাছ থেকে ওই জিনিষগুলো এক দিনের জন্য চেয়ে আনবে। বাইরের লোকের সামনে পড়ার মতো মা-বাবার কোনও কাপড় পর্যন্ত নেই, মায়ের কাপড় জোগাড় করা সম্ভব হলেও বাবার ধুতি চেয়ে আনা মুশকিল। ঢাকেশ্বরী বস্ত্রালয়ের মালিকের মেয়েকে সে পড়ায়, সেখান থেকে এখন ধারে কিনে আনবে বলে ঠিক করল, পরের দু’মাসের মাইনে থেকে শোধ দিয়ে দেবে।
পরের দিন সকালের টিউশনি সেরে ফেরার পথে এক বন্ধুর কাছে বিছানার চাদর ও বালিশের ওয়াড় চাইল, বলল কলকাতা থেকে এক দূর সম্পর্কের বোন-ভগ্নীপতি আসবে। সে জিনিষগুলো ওর হাতে দিয়ে বলল, ‘কয়েকদিন আগেও তো কলকাতা থেকে তোমার কে একজন এসেছিল, তাই না?’ টুলু একটু অবাক হল, এত তাড়াতাড়ি এত দূর খবর পৌঁছে যায় দেখে তার হাসিই পেল, তবে কথাটায় বিশেষ আমল দিল না। তার মন তখন জ্ঞাত-অজ্ঞাত সমস্ত প্রতিকূলতাকে মেপে নিচ্ছে আর তাদের সঙ্গে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। পাড়ায় কারুর কাছে কোনও জিনিষ চাইতে পারবে না, তাহলে বহু প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। তাই বিকেলে পাশের পাড়ার একজনের বাড়ি থেকে কয়েকটা ভালো কাপ-প্লেট চেয়ে আনল। আশ্চর্যজনকভাবে তারাও জিজ্ঞেস করল সেদিন বাড়িতে কে এসেছিল, কোথা থেকে এসেছিল। টুলু বাধ্য হয়ে বলল কলকাতা থেকে বন্ধু এসেছিল, এ ছাড়া অন্য কোনও উত্তর দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। যাই হোক, এখন তার দরকার একটা টেবিল ফ্যান জোগাড় করা। বাকি সব জিনিষ আর কিছু টাকা দিয়েছে সুতপা বউদি। তখন সে গেল রেলবাজারে গনেশদার দোকানে, ওখানে ফ্যান ভাড়া পাওয়া যায়। সে একটা টেবিল ফ্যান চাইতে গনেশদা হেসে বলল, ‘কি, কলকাতা থেকে আবার লোক আসবে বুঝি?’ টুলু এবার বুঝতে পারল উৎপলের আসার খবর প্রকৃতই বহু দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।
৪
রবিবার সকালে টুলু যখন বাড়ি পরিষ্কারের শেষ পর্বের কাজ সারছে তখন দরজায় কড়া নড়ল। টুলু চমকে উঠল, তবে কি তারা এসে গেল। তারপর ঘড়ি দেখল, সাড়ে দশটা বাজে। না, এত তাড়াতাড়ি কলকাতা থেকে আসা সম্ভব নয়। তাছাড়া তারা তো বলেই দিয়েছে দুপুরে নেমন্তন্ন খেয়ে বিকেলে আসবে। নিশ্চিন্ত মনে সে দরজা খুলে দিল এবং অবাক হয়ে দেখল উল্টোদিকের সাদা বড় বাড়ির উকিলবাবু এবং পাড়ার আরো দুজন মান্যগন্য ব্যক্তি দাঁড়িয়ে রয়েছেন। এঁরা আগে কোনওদিন তাদের বাড়ি এঁরা আসেননি, রাস্তায় দেখা হলে তার সঙ্গে বা তার বাবার সঙ্গে কথা পর্যন্ত বলেন না। তাঁরা কেন এসেছেন বাড়িতে? উকিলবাবু প্রথমে কথা বললেন, তার গলার স্বর গমগম করে উঠল। হলে সিনেমা শুরুর আগে সরকারি বিজ্ঞাপনে যে ভাষ্য দেয় অনেকটা তার মতো গম্ভীর সে আওয়াজ। তিনি টুলুর বাবার সঙ্গে দেখা করতে চাইলেন। টুলু শশব্যস্ত হয়ে তাঁদের ঘরে ডাকল, কিন্তু তাঁরা ঢুকলেন না। টুলুর বাবা বাইরে এল। তখন তাঁদের মধ্যে খুব সংক্ষিপ্ত একটা বাক্যালাপ হল, যার মূল বিষয় হচ্ছে এই বাড়িতে কলকাতা থেকে বিভিন্ন পুরুষদের যাতায়াত করতে দেখা যাচ্ছে যা পাড়ার অন্যান্য ভদ্র বাড়ির আবহাওয়ার জন্য ক্ষতিকর। বাবা সামনের দিকে নুয়ে পড়ে, এক হাতের মধ্যে অন্য হাত নিয়ে কচলাতে কচলাতে, অতি ক্ষীন স্বরে তাঁদের ভুল ভাঙানোর চেষ্টা করতে গিয়ে ‘না, মানে, টুলুর বিয়ে’ – এই অবধি বলতেই উকিলের একজন সহকারী বেশ রাগত স্বরে তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আপনি মেয়ের বিয়ে দেবেন, না তাকে দিয়ে রোজগার করাবেন সেটা আপনার ব্যাপার, কিন্তু এই পাড়ায় থাকতে হলে ভদ্রভাবে থাকতে হবে, ওসব নষ্টামো করতে হলে অন্য পাড়ায় উঠে যান।’
বাবা এবং মায়ের সমস্ত আক্রোশ গিয়ে পড়ল টুলুর উপর। তাদের মতে, বত্রিশ বছর বয়সে বিয়ের লোভ হলে নাকি এমনই অপমানিত হতে হয়, যে সম্মানটুকু বেঁচে ছিল সেটাও জলাঞ্জলি দিতে হয়। টুলু একদৃষ্টে কিছুক্ষণ মাটির দিকে তাকিয়ে রইল, ভাবল, সত্য যুগ হলে নিশ্চয়ই ধরণী দ্বিধা হতেন। তখন শুধু এই কথাটা ভেবে শক্তি সঞ্চয় করল যে বিয়ের পরে তো সবাই আসল সত্যিটা জানতে পারবে। তারপর সে ঘরের বাকি কাজ সারল, বাবা-মাকে খাইয়ে নিজে খেয়ে নিল, একটা ভালো কাপড় পরে মুখে স্নো-পাউডার মেখে জানলার ধারে বসে রইল। কে জানে কখন তারা চলে আসবে, আগে থেকে প্রস্তুত থাকাই ভালো।
সেদিন বিকেল গেল, সন্ধ্যে হল, তারপর রাত্রি, কিন্তু কেউ এল না। টুলু অনেকগুলো সম্ভাবনার কথা ভাবলঃ শরীর খারাপ, ট্রেন গন্ডগোল, জরুরী কাজ পড়ে যাওয়া, এমনকি বাড়ি না চিনতে পারা পর্যন্ত। কিন্তু কোনওটাই তাকে শান্ত করতে পারল না। পরের দিন বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষা না করে সকালের টিউশনি সেরেই ছুটে গেল সুতপা বউদির কাছে। ওরা আসেনি শুনে বউদি অবাক হল, কিন্তু ভাইয়ের কাছ থেকে খবর না আসা পর্যন্ত সে কিছুই বলতে পারবে না। পাঁচদিন পরে সেই খবর এল। সুতপা বউদি নিজে টুলুর বাড়ি এসে খবরটা দিয়ে গেল। উৎপলের মাসতুতো বোন-ভগ্নীপতি সেই রবিবার এখানে এসেছিল, কিন্তু যে বাড়িতে এসেছিল তারাই তাদের জানিয়েছে যে মেয়ের চরিত্র ভালো নয়, প্রায়শই কলকাতা থেকে ছেলেরা আসে বাড়িতে। তাই তারা সেখান থেকেই ফিরে যায়। টুলু অনুমান করেছিল কিছু একটা ঘটবে এবং অন্যান্য বহুবারের মতো এক্ষেত্রেও তার পূর্বানুমানের সবকটি পথের বাইরে অন্য এক অভাবনীয় পথেই অন্তরায় আবির্ভূত হল। সে এক ধরণের স্বস্তি বোধ করল; পুরোন অবস্থানে ফিরে যাওয়ার স্বস্তি। শুধু মাঝখান থেকে কদিনের জন্য সূর্যাস্তের লাল রঙের বাইরে আরও কিছু রঙ সে দেখতে পেয়েছিল।

