গোলদিঘির আড্ডা <br />  গৌতম চৌধুরী

গোলদিঘির আড্ডা
গৌতম চৌধুরী

 

উনিশ শতকের শেষ লগ্নের কলকেতা। গোলদিঘি অঞ্চলে তিনটি নবযুবক আড্ডা মারছে। হাতে দু-একটি বইখাতা

 

যুবক ১।। লোকটার সাহস ছিল বলতে হবে। বলেন কিনা I despise Ram? আর রাবণকে বললেন Grand fellow!

যুবক ২।। মনে হয়, খ্রিস্টান ছিলেন বলেই পেরেছিলেন

যুবক ৩।। ধুস্‌ এটা কী বললি? রাজনারয়ায়ণ বসুকে একটা চিঠিতে পরিষ্কার লিখেছলেন, I must tell you, my dear fellow, that though, as a jolly Christian youth, I don’t care a pin’s head for Hiduism, I love the grand mythology of our ancestors. It is full of poetry. A fellow with an inventive head can manufacture the most beautiful things out of it

যুবক ১।। বাপ রে! একেবারে গড়গড় ক’রে বলে দিলি?

যুবক ২।। এমনি এমনি কি আর এত নাম্বার পায়, পরীক্ষার খাতায় কোটেশন দিতে ওস্তাদ

যুবক ৩।। [লাজুক হেসে] কী যে বলিস! তবে, কৃত্তিবাস বাংলায় লিখে দেওয়ার পর রামায়ণ তো আম-বাঙালি নাহোক ৫০০ বছর ধ’রে পড়ছে। the most beautiful things out of it কিন্তু মধুসূদনই বানালেন। [যুবক ১-এর বইয়ের দিকে আঙুল দিখিয়ে] নতুন মলাট দেওয়া এটা কী বই রে?

যুবক ১।। রবিবাবুর একটা নতুন ধরনের লেখা – পঞ্চভূত। এই তো গেল অঘ্রানে বেরিয়েছে

 

এমন সময়ে একজন কাগজবিক্রেতা আওয়াজ তুলতে তুলতে তাদের দিকে এগিয়ে আসে

 

বিক্রেতা।। সাধনা সাধনা সাধনা। এক টাকা এক টাকা এক টাকা। প্রকাশিত হোল সাধনা। রবিবাবুর সাধনা। একসাথে একেবারে ৩টি সংখ্যা। মাত্র কয়েক কপি আছে। সাধনা সাধনা

 

হাঁক শুনে তারা এগিয়ে আসে। একজন বলে –

 

যুবক ১।। নতুন সাধনা বেরিয়ে গেল? ভাদ্র মাস থাকতে থাকতেই বেরোল দেখছি। দেখি দেখি (হাতে তুলে নেয়)

বিক্রেতা।। হ্যাঁ, এবারে তিন সংখ্যা একসাথে – ভাদ্র আশ্বিন কার্তিক ১৩০২

যুবক ২।। দেখি দেখি (হাতে তুলে নেয়)। বাঃ, এ তো বেশ হৃষ্টপুষ্ট হয়েছে এবারের সংখ্যা

বিক্রেতা।। হুম, ২৫৬ পৃষ্ঠার কাগজ

যুবক ৩।। এবার তো  দুর্গাপুজো শুরু হচ্ছে ৯ই আশ্বিন। কাজেই ভাদ্র-আশ্বিন একসঙ্গেই বেরবার কথা। কিন্তু কার্তিকটাও জুড়ে দিল কেন!  রবিবাবু কি বন্ধ ক’রে দেবেন নাকি এত ভালো কাগজটা! তা, কত দাম করেছে এবার?

বিক্রেতা।। ঐ তো এক টাকা।

যুবক ১।। থাক্‌, এখন টাকা নেই। পরে নেব

বিক্রেতা।। নিলে এক আনা ছাড় দিয়ে দেব

যুবক ২।। পুরো ১৪ আনাই নিন না

বিক্রেতা।। না ভাই, আমার আর কিছু থাকবে না তাহলে। ঠিক আছে, আরও দু’ পয়সা বাদ দিন, ঐ সাড়ে চোদ্দ আনা দেবেন ’খন

যুবক ২।। দিয়ে দিন, এ সংখ্যা কি ছাড়া যায়? (দাম দেয়) এই তো রবিবাবুর গল্প – অতিথি। ও, বিদ্যাসাগর চরিতও রয়েছে দেখছি। এইটা উনি পড়েছিলেন এমারেল্ড থিয়েটারে। খুব বৃষ্টি হচ্ছিল সেদিন, বিদ্যাসাগরের মৃত্যুস্মরণদিবস ছিল, শ্রাবণ মাসে। গিয়েছলাম শুনতে

যুবক ৩।। আমি আবার কাগজ হাতে পেলেই সবার আগে পড়ি রবিবাবুর ছোট ছোট টুকরো গদ্যগুলো। দেশ-বিদেশের কতকিছু যে জানা যায়! (দাম দেয়)

যুবক ১।। হ্যাঁ হ্যাঁ, বুঝেছি, ঐ যে – সাময়িক সার সংগ্রহ। আমি আবার ওগুলো সবার শেষে পড়ি। সব কি আর ওঁর নিজের লেখা?

যুবক ৩।। আরে, রবিবাবুর লেখা পড়লেই চেনা যায়। দেখি, এবারে কী লিখেছেন? (পাতা উল্টিয়ে) হুম, এই তো, লেখার নাম – নূতন সংস্করণ। (খানিকটা মনে মনে পড়ে) এই যে দ্যাখো, এসব লাইন কি রবিবাবু ছাড়া আর কারও কলম দিয়ে বেরবে? শোনো –

‘নব্য হিন্দুদের বিশেষ সমস্যা উপস্থিত হইয়াছে। তাঁহারা ঊনবিংশ শতাব্দীর নূতন জ্ঞান উপার্জন করিয়া, পুরাতনের প্রতি ভক্তি ও ভালোবাসা হারান নাই বটে, কিন্তু রুচির পরিবর্তন হওয়াতে তাঁহারা উহাকে অধুনাতনের সঞ্চিত মলিন আবরণশুদ্ধ গ্রহণ করিতে বড়োই কুণ্ঠিত।’

তারপর? (চোখ বুলোতে বুলোতে) উঁ… উঁ… উঁ… হুঁ …

‘সম্প্রতি বোম্বাই অঞ্চলের একদল নব্য হিন্দু এই সমস্যা মীমাংসার যেরূপ উপায় স্থির করিয়াছেন তাহা পাঠকদের বিবেচনার নিমিত্ত বিবৃত করা যাইতেছে।’

যুবক ১।। বোম্বাইতে আবার কী হোল!

যুবক ৩।। এই যে, এইখানে – ‘রাম-নবমীর দিনে রামকে দেবতারূপে পূজা করায়, দেবাধিদেব পরমেশ্বরের মহিমা ও ভারতের শ্রেষ্ঠ মহাকাব্যের সাহিত্য-মর্যাদা যুগপৎ খর্ব হওয়াতে তাঁহারা বিশেষ ব্যথিত হইয়াছেন’।

যুবক ১।। বোঝো, রামকে দেবতা বলে পুজো করলে ঈশ্বরের মহিমাও খাটো হচ্ছে, আবার রামায়ণের সাহিত্য-মর্যাদাও নষ্ট হচ্ছে। রামায়ণের সাহিত্যমূল্যের পয়েন্টটা কিন্তু আগে সেভাবে ভেবে দেখিনি। তারপর ঐ নব্যরা কী করল?

যুবক ৩।। ‘কিন্তু রাম-নবমীর দিন উৎসবে যোগ না দিয়া প্রচলিত কুসংস্কারে গালি দিয়া তাঁহারা কোনো সান্ত্বনা অনুভব করেন না। সুতরাং তাঁহারা স্থির করিয়াছেন যে, উক্ত শুভদিবস উপলক্ষে উৎসবক্ষেত্রে সকলে উপস্থিত হইয়া, ভোজনাদি আমোদপ্রমোদরূপ উৎসবের বাহ্য অঙ্গের পরে, কথকতা কীর্তন প্রভৃতির দ্বারা রামায়ণের কবিত্ব-রসাস্বাদন করিবেন এবং প্রবন্ধপাঠ ও আলোচনাদির দ্বারা উহার সাহিত্যনৈপুণ্য ও নীতি-মহত্ত্ব উপলব্ধি করিবেন।’

যুবক ২।। ‘ভোজনাদি আমোদপ্রমোদ’। বাঃ, ভোজনটা যে বাদ দেয় নি, সেটা বেশ ভালো!

যুবক ১।। তার মানে, দাঁড়াল এই যে, ধর্মের রামের বদলে সাহিত্যের রামায়ণকে নিয়ে উৎসব। মারাঠি তরুণেরা তবে হালফিল এইসব কাণ্ড করছে?

যুবক ২।। দ্যাখো গিয়ে, ওসব দু’চার জনের ব্যাপার

যুবক ১।। অন্তত কিছু মানুষ তো নতুন ক’রে ভাবুক। তা, রবিবাবু কি শুধু এই খবরটুকুই দিয়েছেন? নিজে কিছু কমেন্ট করেন নি?

যুবক ৩।। কমেন্ট? কমেন্ট?  হ্যাঁ, এই যে একেবারে শেষে লিখছেন – ‘বোম্বাইয়ের নব্য হিন্দু সম্প্রদায় এইরূপে উৎসব ও পবিত্র দিবসকে উপযুক্ত অনুষ্ঠানের দ্বারা সজীব করিয়া তুলিবার চেষ্টা করিয়াছেন এবং তাঁহাদের ক্ষুদ্র দলের মধ্যে অনেকটা কৃতকার্যও হইয়াছেন।’ হুম, ঠিকই বলেছ, দলটা ক্ষুদ্র। যাক, লেখাটা শেষ করছেন এইভাবে – ‘উল্লিখিত সমস্যার এইরূপ সুন্দর মীমাংসা আমাদের দেশে প্রচলিত হইবার উপযুক্ত। আমাদেরও প্রত্যেক শুভকার্যের সহিত যে-সকল সুরুচিবিরুদ্ধ ও অপ্রীতিকর প্রথা জড়িত আছে তাহা পরিত্যাগ করিলে নব্য হিন্দুরা নব উৎসাহে সেগুলিতে যোগ দিতে পারেন।’

যুবক ১।। তার মানে রামনবমীর দিন রামকে অবতার বানিয়ে এইভাবে মাতামাতি করাটা, যেটা বোম্বাইতে চালু আছে, সেটা একটা ‘সুরুচিবিরুদ্ধ ও অপ্রীতিকর প্রথা’। এটাই রবিবাবুর মত – তাই তো?

যুবক ২।। তাবলে ভাবিস না, রাম যে বাল্মীকির হাতে গড়া একটা সাহিত্যিক চরিত্র, এই আইডিয়াটা বোম্বাই থেকে রবিবাবুর আজকের আমদানি। কবে, সেই বিশ বছর বয়সেই একবার লিখেছিলেন না, বাল্মীকি যখন রামের চরিত্র সৃষ্টিতে ডুবে ছিলেন, তখন তিনি নিজেই রাম হয়ে গিয়েছিলেন। নিজের ভাবে নিজেই মোহিত। সব শিল্পী সাহিত্যিকেরই নাকি এমনটাই হয়। নিজের সুর শুনে নিজেই মুগ্ধ হয়ে পড়েন। কী যেন লেখাটার নাম!

যুবক ৩।। একেই বোধ হয় বলে আত্মোপলব্ধি। রবিবাবু এত লেখেন, সব লেখা মনে রাখা কি চাট্টিখানি কথা? আর একটা কী যেন লেখায় পড়েছিলাম, রামের গুণবর্ণনা ক’রে বাল্মীকি বলেছিলেন, ভালো লোককে আমরা ভালোবাসি। তারপর মনে আছে এইভাবে বলেছিলেন, এই মান্ধাতা আমলের তত্ত্ব প্রচার করার জন্য সাতকাণ্ড রামায়ণ লেখার কোনও দরকার ছিল না। ‘কিন্তু ভালো যে কত ভালো, মানে ভালোকে যে কত ভালো লাগে, তা সাতকাণ্ড রামায়ণেই প্রকাশ করা যায়।’

যুবক ১।। আসলে রবিবাবু আগাগোড়াই রামায়ণকে একটা মহৎ সাহিত্য হিসেবে দেখেছেন। এই যে পঞ্চভূত বইটা পড়ছি [বইটি দেখিয়ে] তার একটা লেখায় দেখছি একেকটা চরিত্র রামায়ণ নিয়ে তাদের একেক রকম ব্যাখ্যা দিচ্ছে। যেমন সমীর বলছে, রাজার ঘরে জন্মেও অনেকে দুঃখ পায় – এটাকেই যদি রামায়ণের সারকথা বলা হয়, তবে সেটা এমন কিছু একটা নতুন বার্তা নয়। আবার স্রোতস্বিনীর মতামত একেবারে উলটো। সে বলছে, রাজার ঘরেও জন্মেও এই যে সারা জীবন রাম-সীতাকে দুঃখ-সংকট ব্যাধের মতো তাড়া ক’রে ফিরল… দাঁড়া এই জায়গাটা দেখে পড়ছি। [বই থেকে নির্দিষ্ট পাতাটি বার ক’রে, পড়ে] এই যে, ‘সংসারের এই অত্যন্ত সম্ভবপর, মানবাদৃষ্টের এই অত্যন্ত পুরাতন দুঃখকাহিনীতেই পাঠকের চিত্ত আকৃষ্ট এবং আর্দ্র হইয়াছে।’

যুবক ২।। মোদ্দা কথা হল, এ কোনও দেবতার গল্প নয়, মানুষেরই গল্প। আর মানুষের গল্প বলেই হাজার বছর ধরে তা আমাদের চোখে জল আনছে, আমাদের ভালো লাগছে

যুবক ৩।। বোঝা যাচ্ছে, অনেক দিন ধরেই রবিবাবু এইভাবে ভাবছেন। অমন একটা মানবিক কাব্যের নায়ককে খামখা ঠাকুর-দেবতা বানিয়ে নাচানাচি করাটা আদিখ্যেতা। কাজেই বোম্বাইয়ের ছেলেপুলেরা যখন সেটা বুঝে পালটা একটা কিছু করলেন, রবিবাবু সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে স্বাগত জানালেন। যাক, আমাদের এখানে তো ঐসব রামনবমী ফামনবমী নেই

যুবক ২।। রামনবমী নেই তো কী আছে, আরও কত কিছু আছে! পদে পদে হাঁচি কাশি টিকটিকি, গঙ্গাসাগরে সন্তান বিসর্জন, নাই কথায় ১০১ পাঁঠাবলি, নিচু জাত উঁচু জাত – চোখ মেলে তাকালেই রাশি রাশি ঐ কী যেন? ‘সুরুচিবিরুদ্ধ ও অপ্রীতিকর প্রথা’। একদল তো আর্য আর্য ক’রে হেঁচকি তুলে মরেই যাচ্ছে। পড়েছ তো রবিবাবুর আর্য ও অনার্য কৌতুক নকশাটা?

যুবক ১।। আরে ঐ নকশার চিন্তামণির রোলে তো একবার অ্যাক্টো করেছিলাম, ইসকুলে ফার্স্ট ক্লাসে পড়ার সময় প্রাইজ ডিস্ট্রিবিউশনের অনুষ্ঠানে। সেই যে চিন্তামণি কুণ্ডু যখন বলছে  (অভিনয় করার ভঙ্গিতে বলে) –

‘হাই তোলবার সময় তুড়ি দেওয়া কেন? সেও ম্যাগ্‌নেটিজ্‌ম্‌। উত্তানবায়ুর সঙ্গে আধানশক্তির যোগ হয়ে যখন ভৌতিক বলে পরিচালিত নিধানশক্তি স্বশক্তির প্রভাবে প্রাণ কারণ এবং ধারণ এই তিনটেকে অতিক্রম করতে থাকে তখন সত্ত্ব রজ এবং তম এই তিনেরই ব্যতিক্রমদশা ঘটে। এমন সময়ে মধ্যমা এবং বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠের ঘর্ষণ-জনিত বায়ব তাপের কারণভূত স্নায়ব তাপ সৌর তাপের সঙ্গে মিলিত হয়ে জীবদেহের ভৌতিক তাপের আত্যন্তিক প্রলয়দশা ঘটতে দেয় না। একে বিজ্ঞান বলে না তো কাকে বিজ্ঞান বলে? অথচ আমাদের আর্য ঋষিগণ ডারুয়িনের কোনো গ্রন্থই পড়েন নি!’

এই ডায়ালগটা যখন বলতাম, তাছাড়া আরও অনেক জায়গায়, হাসির হররা উঠত। রবিবাবু আর্যামির একেবারে ভূত ভাগিয়ে ছেড়েছেন

যুবক ২।। তারপরেও এইসব চিন্তামণি কুণ্ডুর মতো আর্যদের সংখ্যা তো বাংলাদেশে কিছু কম নয়। কবে দেখবে তাঁদের পিছু পিছু রামনবমীর ধুমধাড়াক্কাও একদিন এখানে এসে জাঁকিয়ে বসবে!

যুবক ১।। যাক্‌ গে, ততদিনে আমরা সব মরেহেজে যাব

যুবক ৩।। তারপর রবিবাবুর এইসব লেখাপত্তর তো রইলই

বিক্রেতা।। (এতক্ষণ চুপ ক’রে বাকিদের আলাপ শুনছিল) দেখবেন, এরকম আরও কত লিখবেন। (হেসে) আর না লিখলে, আমরাই বা বিক্রি করব কী

যুবক ১।। হ্যাঁ, সবে তো চৌঁতিরিশ বছর বয়স

যুবক ২।। তাহলে বলছিস, বাইরে থেকে শনি এলে এই রবিকে দিয়েই ঠেকিয়ে দেবে বাঙালি?

যুবক ৩।। ইচ্ছে থাকা চাই, মন থাকা চাই

 

 

 

CATEGORIES
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)
demon slauer rule 34 lena the plug leak amateurtrheesome.com cumming in milfs mouth mujer haciendo el amor a un hombre, belle delphine of leaked emma watson in porn xxxamat.com big booty in public hidden cam gay sex, sit on face porn g a y f o r i t forcedpornanal.com please screw my wife female celebrity sex tapes