চিন্তার চিহ্নমালা ৬ <br /> সন্মাত্রানন্দ

চিন্তার চিহ্নমালা ৬
সন্মাত্রানন্দ

‘শোনা কথা’-শীর্ষক গত অধ্যায়ে যা লিখেছিলাম, সে প্রসঙ্গে একজন মেধাবিনী আমাকে প্রশ্ন করেছিলেনঃ ‘অতিকথনের এরকম অভ্যেস হচ্ছে কেন আমাদের? ক্রমাগত আত্মনির্মাণের ইচ্ছে? সে একরকম দুর্বলতাই তো! ধৈর্যের অভাব? তাও সবল কিছু নয়। নাকি নিজের থেকে নিজে ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন হচ্ছি আমরা? ভয় পাচ্ছি, নিজের একাকিত্বের মুখোমুখি হতে, তাই ক্রমাগত কথা রচনা করছি?’ চিন্তার চিহ্নমালা। ষষ্ঠ পর্ব লিখলেন সন্মাত্রানন্দ।

আগের পর্বগুলি পড়তে ক্লিক করুন —–> (১), (২), (৩), (৪), (৫)

কেন এত কথা, কথা কথা…?

পাহাড়ি জায়গায় স্থাপিত একটি আশ্রমে বিকেলের দিকে পৌঁছে ঘণ্টা চারেকের মধ্যে সেই আশ্রমের বাগান, অফিস, খাওয়ার ঘর, প্রার্থনালয়, গোশালা এবং অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দেখে ফেলে নিজের অস্থায়ী আস্তানায় রাত্রি সাড়ে আটটা নাগাদ ফিরে এসে আমার মনে হয়েছিল, এখানকার মানুষজন সকলেই খুব জোরে কথা বলেন এবং খুব বেশি কথা বলেন। অথচ এঁদের সঙ্গে আগে আমি সমতলে শহরে বাজারে যখন দ্যাখা করেছি, তখন এঁরাই মৃদু স্বরে এবং অল্প কথায় বাগ্‌বিনিময় করেছেন প্রত্যেকেই। তাহলে এখন সেই স্বল্পবাকরীতি থেকে বহু শব্দ চয়ন এবং অনুচ্চ গ্রাম থেকে উচ্চ গ্রামে কণ্ঠস্বরের উন্নয়নের এবংবিধ প্রবণতার কারণ কী, তা আমাকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছিল। তখন রাত্রি হয়েছে; নিশাচর পাখীদের ডানার স্ফুটমান শব্দ ছাড়া অন্য শব্দ নেই, অনেক রাত অবধি সেই নির্জন ঘরটির শব্দহীন বারান্দায় অন্ধকারে বসে থেকে থেকে এমনটা হওয়ার একটা সম্ভাব্য কারণ আমি টের পেয়েছিলাম। হয়তো একান্তভাবেই তা আমার নিজেরই মনে হওয়া। তবু নিজের কাছে আমাকে সৎ থাকতে হবে। চিন্তায় এবং তা প্রকাশ করায়।

আমার মনে হয়েছিল, এই নিঃশব্দ নির্জন প্রকৃতিকে এখানে আগত মানুষ সহ্য করতে পারছেন না। আর তা পারছেন না বলেই পাহাড়ি এই পরিবেশের নৈঃশব্দ্যের শূন্যতাকে তাঁরা অসচেতনভাবে ভরে তুলতে চাইছেন শব্দ দিয়ে। যতক্ষণ তাঁরা পারেন, যতটা তাঁরা পারেন, ভরে দিতে চাইছেন উচ্চারণের তীব্রতায়। বলাই বাহুল্য, এ চেষ্টা ব্যর্থ হতে বাধ্য। অনাদি কাল হতে কত কথার স্রোত, কত ঘোষ বর্ণ, কত অঘোষ বর্ণ যে হারিয়ে গেল প্রকৃতির এই নৈঃশব্দ্যের অতলান্ত গর্ভে, তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু যেটা আমাকে খুব আলোড়িত করল, তা হচ্ছে মানুষের এই অসচেতন প্রবণতা; শব্দ দিয়ে নিঃশব্দকে আক্রমণ করার এই বিচিত্র মৌলবাদ।

কিন্তু এমনটা তো নয়, সেই নির্জন আশ্রমের নিরীহ আশ্রমিকরাই এ প্রবণতার শিকার। ব্যস্ত জনপদে বসবাসকারী আমরাও তো এই একই প্রবণতায় ডুবে থাকি স্বসৃষ্ট শব্দের অরণ্যে; সেসব শব্দ অধিকাংশই অপ্রয়োজনে উচ্চারিত এবং প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি জোর গলায় ঘোষিত। আমরাও অনেক জোরে বলি এবং অনেক বেশি বলে থাকি। নির্জন স্থানে মানুষ না হয় নৈঃশব্দ্যের প্রতিপক্ষতা করতে গিয়ে অনেক কথার অবতারণা করে, কিন্তু নগরজীবন—যেখানে নৈঃশব্দ্য প্রায় নেই, সেখানে তাহলে কার প্রতিপক্ষতা করছি আমরা?

অনেক কথা বলার বিপদ এই, যিনি কথা বলছেন, যদি তাঁর কথা রেকর্ড করে রাখা হয় অর্থাৎ বক্তা যদি হন সেলেব এবং শ্রোতা যদি হন সাংবাদিক, তাহলে সেসব কথাকে কালানুক্রমিকভাবে সাজালে প্রচুর পরস্পরবিরোধিতা ধরা পড়ে। আর সেই পরস্পরবিরোধিতা খুঁজবার জন্য খুব বড়ো কালপরিসরের প্রয়োজন হয় না। সেলেবদের কথা সকালে যেমন, সন্ধ্যায় তার বিরুদ্ধ। শুনতে শুনতে মানুষও বুঝে গেছে, স্ববিরোধ না থাকলে সেলেব হয় না। শুধু সেলেব্রিটিই নয়, অনেক-কথা-বলা আমাদের মতো অতি সাধারণ মানুষেরও এই একই সঙ্কট। চারপাশের স্বজনবর্গের কাছে, এমনকি নিজের কাছেও নিজে ক্রমশ ধাঁধায় পরিণত হচ্ছি আমরা এমন বহু কথার জালে জড়িয়ে। কিন্তু এত কথার কারণ কী? কী সেই কারণ, যার জন্য আমরা এত বেশি করে শব্দমৃগয়ায় মেতে রয়েছি রাতদিন?

প্রায় প্রতিদিনই এমন অজস্র মানুষের সঙ্গে আমার দেখা হয়, যাদের সঙ্গে দুমিনিট কথা বলার পরেই আমি বুঝে যাই, এখানে মুখ না খোলাই শ্রেয়। কারণ, যিনি আমার উল্টোদিকে আছেন, তিনি একটানা কথা বলতেই চাইছেন, তাঁর এখন কথা শোনাবার দশা, প্রশ্ন করে যে উত্তর শোনার মতো আগ্রহ আছে তাঁর, তা মনে হয় না। অন্যকে এঁরা কথা বলার সুযোগই দেন না, একটানা কথা কথা কথাই বলে চলেন এঁরা। নিজেই প্রশ্ন করেন, নিজেই উত্তর দেন একবিন্দু না থেমে। এমনটা হওয়ার কারণ কী?

কারণ খুব মারাত্মক। ভালো করে দেখলে বোঝা যায়, এই ধরনের মানুষের মনে একটা ভীষণ ভয় কাজ করে। তাঁর এমন মনে হয়, যেকোনো সময় অন্যরা তাঁকে থামিয়ে দিতে পারে, তাঁর কথার বিরোধিতা করতে পারে। হয়তো তিনিও মুকুলিত শৈশবে স্বতঃস্ফুর্তভাবেই কথা বলতেন, থামতেন, উত্তরের অপেক্ষা করতেন। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে তাঁর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আঘাত পেয়ে জানতে হয়েছে, তাঁর প্রত্যেকটি চিন্তার বিরোধীপক্ষ আছে এবং কথা বলা মাত্রই তাঁর বিরোধীরা তাঁকে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবেন হাটে, বাজারে, অফিসে, আদালতে, পথে, ঘাটে সর্বত্র। অর্থাৎ তিনি জেনেছেন, তাঁকে সহ্য করা হবে না। তখন উল্টোমুখে তিনিও ভাবতে শুরু করেছেন, তবে আমিই বা কেন অন্যদের সহ্য করব? অতএব অন্যরা মুখ খোলার আগেই আমার যা বলার তা আমাকে এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলতে হবে এবং বলা শেষ হলেই আর এক বিন্দু সময় নষ্ট না করে সেখান থেকে কেটে পড়তে হবে। এইভাবে সারাদিন এখানে ওখানে সবখানে কথা কথা কথা বলে দিনান্তে ঘরে ফিরে এসে তিনি এই আত্মপ্রসাদে প্রসন্ন হয়ে ভাবতে পারেন, যাক! আমাকে কেউ কোথাও আজ থামিয়ে দিতে পারেনি। আমি আমার কথা প্রতিবাদহীনভাবে শুনিয়ে দিয়ে আসতে পেরেছি সক্কলকে।

কিন্তু এই আত্মপ্রসাদ নিতান্তই বায়বীয়। আমি কাউকে আমার বিরোধিতা করার সুযোগ দিইনি মানেই সকল বিরোধিতার মৃত্যু হয়েছে, এমন তো নয়! বরং, উল্টোটাই সত্যি। বিরোধিতা যেখানে ছিল, সেখানেই আছে এবং অন্যকে আমি কথা বলতে সুযোগ দিইনি বলেই, নিজের অবস্থান বারবার শব্দ শব্দ শব্দ দিয়ে এত স্পষ্ট করে এসেছি বলেই, সেই বিরোধিতা আরও বেড়ে উঠেছে। নৈঃশব্দ্যের ভিতর বেড়ে উঠেছে বিরোধিতার পাহাড় আমার অজান্তেই।

এটা একটা মানসিক অসুখ। এবং এই অসুখের কারণ এক প্রকার ভয়। প্রতিপক্ষতার ভয়।

কিন্তু ধরা যাক, সমস্ত জনসংযোগ কেউ ছিন্ন করে দিলেন। খুব প্রয়োজন ছাড়া কারও সঙ্গেই আর বাগ্‌বিনিময় করছেন না। সেক্ষেত্রে কি এই কথার ট্রেন থেমে যায়?

এটা নিয়ে পরীক্ষা করার সুযোগ আমি পেয়েছি সাম্প্রতিক কালের প্যানেডেমিকে ঘোষিত লকডাউনে। আমি যেহেতু একা আত্মীয়-স্বজনহীন মানুষ এবং থাকি একেবারে একলা একটা ঘরে, অন্তত তিন মাস এ পরীক্ষা নিজের ওপর চালানোর আমি সুযোগ পেলাম। খুব প্রয়োজন ছাড়া দুয়েকমিনিটের বেশি ফোনও আমি ধরিনি। এইভাবে একা থেকে থেকে, প্রায় কোনো মানুষের সঙ্গেই তিন মাসের বেশি কথা না বলে আমি দেখলাম। একথা ঠিক, সেই অবস্থায় আমার বাগ্‌যন্ত্র সম্পূর্ণ নীরব, কিন্তু আমার মন? আমার মন দেখলাম ঘুমের সময়টুকু ছাড়া বাকি সময় অবিরত কথা বলে চলেছে, কখনও নিজের সঙ্গে, কখনও কাল্পনিক চরিত্র তৈরি করে। আগের থেকে বহুগুণ বেশি কথা বলছে আমার মন। সে একটানা বকছে, তর্ক করছে, গল্প বলছে, গালাগাল দিচ্ছে, প্রশংসা করছে, ঘুমিয়ে পড়ছে। আবার ঘুম থেকে উঠে বকবক শুরু করেছে। ‘অবসর নাই তার? নাই তার শান্তির সময়?’

ফলত, খুব স্বাভাবিকভাবেই আমার মনে এই প্রশ্ন এল, এই যে সম্পূর্ণ জনহীন ব্রাত্য জীবন, যেখানে কোনো অন্যতা নেই, কথা শোনাবার একটি মানুষও নেই আমার পাশে বা সামনে, এই অবস্থাতেও মন কথা বলছে কাকে প্রতিপক্ষ ধরে নিয়ে? নির্জন মানুষের প্রতিপক্ষ কোত্থেকে আসছে? কেন মন চুপ করে যাচ্ছে না? বিরতিবিহীনভাবে বকে চলেছে কী উদ্দেশ্যে?

মনে হল, আমি আসলে মনে মনে এত কথা বলছি নিজেকে সহ্য করতে পারছি না বলেই। আসলে আমি যা, আমার সেই আদিম অস্তিত্ব প্রকৃতই নীরব। সেই অস্তিত্ব মূক, তার কোনো ভাষা নেই। আমার সেই নির্ভাষ সত্তার বিরোধিতা করবার জন্যই, তাকে কাউন্টার করবার জন্যই আমি কথার তাজমহল গড়ে চলেছি অহরহ মনে মনে।

কিন্তু আমার প্রকৃত সত্তা বা আদিম অস্তিত্ব যাই বলি না কেন, তা যে নীরব বা নির্ভাষ, এটা প্রমাণ হল কীভাবে? অন্তত তিনটি অবস্থার কথা আমি এখানে বলতে পারি, যে অবস্থায় আমি থাকি কিন্তু কোনো শব্দ থাকে না, এমনকি কোনো চিন্তাও থাকে না। তার থেকে এটাই প্রমাণ হয়, আমি শব্দ ছাড়াও থাকতে পারি, চিন্তা ছাড়াও থাকতে পারি, আমার সেই থাকাথাকি—সবরকম বলাবলি বা ভাবাভাবির থেকে মুক্ত। তাহলে আমার সেই ‘থাকা’কে আমি নিঃশব্দ, নির্ভাষ, নির্ভাবনা বলতেই পারি।

কিন্তু কী সেই তিনটে অবস্থা?

এক, যখন মানুষ অজ্ঞান হয়ে যায়। অজ্ঞান হওয়ার অভিজ্ঞতা থাকলে, এটা সহজেই বুঝবেন আপনারা। অ্যানাস্থেসিয়া দিয়ে অজ্ঞান করা হলে প্রথমে অদ্ভুত কিছু ছবি, অদ্ভুত কিছু অভিজ্ঞতা হয়। যেন কত রঙের বল চোখের সামনে ঘুরছে, কোথায় যেন গড়িয়ে পড়ছি, এইসব। কিন্তু তারপর যখন অজ্ঞান হয়ে গেলাম, তখন আর ওসব কিছুই নেই। কোনো আকার নেই, কোনো চিন্তা নেই, কোনো মানসিক দর্শন বা ভিশনই নেই। কিন্তু তখন তো আমি বেঁচে আছি, টিকে আছি। শুধু সংজ্ঞা নেই আমার, এইমাত্র।

দুই, গভীর ঘুমের মধ্যে। প্রতি রাত্রেই প্রায় আমরা এ অবস্থায় যাই। যখন স্বপ্ন দেখি না, স্রেফ গভীর ঘুমে ডুবে থাকি। একে বলে ‘সুষুপ্তি’। এ অবস্থায় বাইরের জগতের জ্ঞান হয় না, সে বলাই বাহুল্য। এমনকি ভেতরেও কোনো অনুভূতি থাকে না। কোনো স্বপ্ন দেখছি না এ অবস্থায়, কিছু চিন্তাও করছি না। এমনকি আমি যে আছি, এই বোধও থাকে না তখন। অথচ আমি তো আছি তখন! না থাকলে আর ওই সুষুপ্ত অবস্থা থেকে তারপর জেগে উঠছে কে?

এই অবস্থাটা ভারি সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন যাজ্ঞবল্ক্য নামে একটি চরিত্র বৃহদারণ্যক উপনিষদেঃ

‘আকাশে উড়তে উড়তে কোনো বাজপাখি বা কোনো ঈগল যেমন ক্লান্ত হয়ে যায়, শ্রান্ত ডানা প্রসারিত করে ফিরে আসে নীড়ে, তেমনই এই সত্তা জাগ্রৎ ও স্বপ্নের অভিজ্ঞতার পর ফিরে আসে এই সুষুপ্তিদশায়, যেখানে সে ঘুমিয়ে পড়ে, কিছুই চায় না আর, কোনো স্বপ্নও আর দেখে না…’

‘সব পাখি ঘরে আসে, সব নদী, ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন…’

প্রায় অনুবাদ, তাই না?

জীবনানন্দের কবিতার প্রসঙ্গ মুলতুবি থাক এখন। যেকথাটা বলছিলাম, এই সুষুপ্তি অবস্থায় কোনো বাসনা, কোনো অনুভব, কোনো স্বপ্নও নেই; কিন্তু আমি আছি। না থাকলে আবার জেগে উঠছে কে?

তিন, আরেকটা অবস্থা আছে। তাকে বলে ‘সমাধি’। এ অবস্থায় পূর্ণ সংজ্ঞা আছে, কিন্তু কোনো চিন্তা নেই, ফলত কোনো শব্দ বা ভাষাও নেই। শব্দ আর অর্থ, ভাষা আর ভাব পার্বতী-পরমেশ্বরের মতই সম্পৃক্ত। চিন্তা না থাকলে শব্দও থাকবে না। সমাধি-অবস্থায় চিন্তা ও ভাষা নেই, কিন্তু পূর্ণ জ্ঞান আছে। সেজন্যেই এ অবস্থা ‘সুষুপ্তি’র সম্পূর্ণ উলটো। সুষুপ্তিতে কোনো জ্ঞানই থাকে না। এই সমাধি-অবস্থা আমাদের প্রায়শই হয়নি। কিন্তু এর কথা আমরা উপনিষদে শুনেছি। যেহেতু এই অবস্থায় চিন্তার অনুপ্রবেশ নেই, ফলত এর বর্ণনা ‘ইতি-ইতি’ ভাষায় দেওয়া সম্ভব নয়। খুব বেশি হলে ‘নেতি-নেতি’ করে বলা যায়। আর সেই বলতে গিয়ে কী মজার বিপদেই না পড়েছেন কেনোপনিষদের কবিঃ

“শ্রোত্রের শ্রোত্র সেই, চোখের সে চোখ, মনের সে মন, বাকের বাক, প্রাণের সে প্রাণ।…সেখানে চোখ যায় না, বাক যায় না, মন-বুদ্ধি সেখানে যেতে অক্ষম। তাই সে বস্তু ‘এমন এমন’—এভাবে বলা যায় না, তাকে কেমন করে যে অন্য আচার্যরা উপদেশ করে থাকেন, আমি তা জানি না। জ্ঞানের বিষয় সে নয়, জ্ঞানের অবিষয়ও সে হতে পারে না…”

শুধু উপনিষদেই নয়, এ অবস্থার কথা বৌদ্ধ শাস্ত্রে আছে, খ্রিস্টিয় শাস্ত্রে আছে, ঐস্লামিক বা সুফি অধ্যাত্মচেতনাতেও এর উল্লেখ। সমাধি, এপিফ্যানি, সটোরি — নানারকম নাম।

আপনি একে না মানতেই পারেন, যেহেতু আপনার এমন হয়নি। সেক্ষেত্রে আপনার এখনও অবধি যা যা হয়নি, অথচ অন্যের হয়েছে বলে অন্যরা বলছে, সেগুলোও মানবেন না আজ থেকে তাহলে। নিজের অনুভবটুকুকেই সত্য বলে স্বীকার করে অন্য সবার অনুভবকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করাকেই কিন্তু ‘মৌলবাদ’ বলা হয়!

সে যাকগে যাক। এখন আগের কথা চলুক। প্রধানত এই তিন অবস্থা থেকে একটা কথা বেশ পরিষ্কার হচ্ছে। সেই কথাটা হচ্ছে, চিন্তা ছাড়াও, শব্দ বা ভাষা ব্যতিরেকেও আমার অস্তিত্ব বিলুপ্ত হচ্ছে না। এবং সেই অস্তিত্ব শব্দহীন, ভাষাহীন—নীরব। ‘সমাধি’-অবস্থা না মানলেও ‘অজ্ঞান’-অবস্থা বা ‘সুষুপ্তি’-অবস্থা থেকে সেটা প্রমাণ হয়।

তার মানে এই নয় যে, আমি কাউকে অজ্ঞান হয়ে যেতে বলছি বা ঘুমিয়ে থাকতে বলছি। আমি এই উদাহরণগুলো টেনে এনেছি, শুধু এটুকুই প্রমাণ করার জন্য যে, আমাদের আসল যে সত্তা, তা ভাষাহীন, তা মূক।

এই নির্ভাষ, নিঃশব্দ আমাদের আসল সত্তাকে আমরা সহ্য করতে পারছি না। কেন পারছি না? কেননা তাকে মেনে নিলে আমাদের ‘অস্তিত্ব’ই থাকবে না আর, আমাদের এমন অমূলক ভয় আছে। তাই এই নিঃশব্দকে আমরা কাউন্টার করতে চাইছি শব্দ দিয়ে। হয় অবিরত মনে মনে কথা বলে চলেছি, নয়তো মুখে মুখে উচ্চারণ করে চলেছি শব্দাবলী। যথেষ্ট জোরে জোরে এবং অনেক বেশি বেশি।

‘শোনা কথা’-শীর্ষক গত অধ্যায়ে যা লিখেছিলাম, সে প্রসঙ্গে একজন মেধাবিনী আমাকে প্রশ্ন করেছিলেনঃ ‘অতিকথনের এরকম অভ্যেস হচ্ছে কেন আমাদের? ক্রমাগত আত্মনির্মাণের ইচ্ছে? সে একরকম দুর্বলতাই তো! ধৈর্যের অভাব? তাও সবল কিছু নয়। নাকি নিজের থেকে নিজে ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন হচ্ছি আমরা? ভয় পাচ্ছি, নিজের একাকিত্বের মুখোমুখি হতে, তাই ক্রমাগত কথা রচনা করছি?’

লক্ষণীয়, তাঁর প্রশ্নের মধ্যেই তিনি অনেকগুলো সম্ভাব্য উত্তর রেখে দিয়েছেন। সেই উত্তরগুলোর সঙ্গে আমি অনেকটাই একমত। কিন্তু সেগুলোর আসল কারণ কী, তা আমি যেমন বুঝেছি, তা লিখলাম। সেই আসল কারণ এই ভয়। নিজের নিঃশব্দ সত্তাকে মেনে নেওয়ার ভয়। নিজেকে হারিয়ে ফেলার অমূলক ভয়। ‘অমূলক’ বললাম, কেননা ওই নিঃশব্দ সত্তাই তো আমার আসল ‘আমি’। কাজেই, নিজেকে হারিয়ে ফেলা নয়, বরং নিজেকে ফিরে পাওয়াই যাবে সেখানে।

এই অমূলক ভয় ক্রমাগত বাড়ছে। আর যতই সেই ভয় বাড়ছে, আমরা ততই কথা বলে চলেছি। একা-একা অথবা অন্যের সঙ্গে। অথচ যতটুকু না হলে নয়, যতটুকু বলা আমার দায়িত্ব, সেটুকু সাঙ্গ হলে আমাদের ফিরে আসাই তো ভালো নিজের কাছে! যেখানে এক নিরবয়ব অন্ধকারের শান্তি আছে, যেখানে নিজেরই মুখোমুখি বসতে পারি আমরা, একাত্মও হতে পারি একান্তে, জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’ আসলে তো তাঁর আত্মসত্তা ছাড়া আর কিছু নয়।

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (8)
  • comment-avatar
    পাপড়ি গঙ্গোপাধ্যায় 5 years

    গভীর চিন্তার প্রতিফলন।

    • comment-avatar
      Sanmatrananda 5 years

      ধন্যবাদ। আপনি আমার নমস্কার নেবেন।

      • comment-avatar
        পাপড়ি গঙ্গোপাধ্যায় 5 years

        প্রতিটি সংখ্যাই পড়ছি। কমেন্ট সব সময় পড়ছে না কেন বুঝতে পারছি না।কখনও সাক্ষাতে বা দূরভাষে কিছু আলোচনার ইচ্ছে রয়েছে।আপনার ইমেল এড্রেস পেলে মেলেও কথা বলা যেত

        • comment-avatar
          Sanmatrananda 5 years

          আমার ফোন নম্বর হিন্দোল আপনাকে দিয়েছেন শুনেছি। ফোনে কথা হতে পারে।

  • comment-avatar

    ন’ ঘন্টা অজ্ঞান ছিলাম একবার। একটি অপারেশনের সময়। জীবনে গভীর প্রশান্তির ওই সময়টি ভুলতে পারি না। চোখ খুলেছি যখন, মনে হল, কী অনিঃশেষ শান্তি আর সুস্থিতি আমাকে শমিত করে গেল। শরীরের যন্ত্রণা সে প্রশমনের কাছে হেরে যায়। বাইরে, প্রিয়জনেরা তখন সাশ্রু। আমি বেঁচে আছি। আমি প্রাণ ফিরে পাচ্ছি। আর আমি ভাবছি, তবে কি মৃত্যু এত সুন্দর? এত শান্তির? এত হিরণ্ময় নৈশব্দের?

    আমার নমস্কার জানবেন।

    • comment-avatar

      আশ্চর্য! এক অনুভূতি হয়েছিল আমারও।
      কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট অপারেশনের পর যখন জ্ঞান ফিরল।
      বড় ভাল বললেন।

    • comment-avatar
      Sanmatrananda 5 years

      আমার অনুমান মৃত্যুপূর্ব যন্ত্রণাটিই খুব কষ্টের। কিন্তু তারপর অপরিসীম শান্তি। আমি ঠিক জানি না। আপনি আমার নমস্কার নেবেন।

      • comment-avatar
        দোয়েলপাখি দাশগুপ্ত 5 years

        ” হে প্রেম, হে নৈঃশব্দ্য”

  • demon slauer rule 34 lena the plug leak amateurtrheesome.com cumming in milfs mouth mujer haciendo el amor a un hombre, belle delphine of leaked emma watson in porn xxxamat.com big booty in public hidden cam gay sex, sit on face porn g a y f o r i t forcedpornanal.com please screw my wife female celebrity sex tapes