সুদেষ্ণা ঘোষ-এর কবিতাগুচ্ছ

অসম্ভব গল্প ৬

এর আর কোনও শেষ নেই জানি।
তবুও?
এভাবে কাঁপছ তুমি? এভাবে গুঁড়িয়ে যাচ্ছ?
দেখো আদরে-আদরে ভেসে যায় উন্মত্ত জ্যোৎস্নার সব আগল
দেখো বিনা ভূমিকায় উজাড় হয়ে যায় রাতের অচেনা খোয়াব
কিন্তু রাস্তায়-রাস্তায় কেউ ভারী পা ফেলে হাঁটছে নিঃশব্দে।
রাস্তায়-রাস্তায় কেউ…শশশশ

ঘুমের মধ্যে কেঁপে উঠছে দেবদারু।
ঘুমের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে পোষ-না-মানা জল…
তোমার তেষ্টা মেটে
আমার ডানাভাঙা দেবদূত?

অসম্ভব গল্প ৭

ধরো, ভবিষ্যতে কেউ যদি জিজ্ঞেস করে, তখন?
তা হলে শুধু এক বেয়াড়়ারকম নির্জন চিলেকোঠার কথা বলতে পারি।
নিরুপায় শ্যান্ডেলিয়ারের রাত-জাগার কথাও তোলা যেতে পারে কখনও।
কিন্তু কুয়াশার এই নীলচে লন্ঠনকে কেন তুমি চোখ রাঙাবে? কেন চিরকাল?

বরং এসব ছেড়ে মৃত রাজপথের কথাই বেশি জরুরি
জোরে-জোরে বাজতে থাক ট্রেনের ধড়ফড়ে হুইসল
কাচের এপার থেকে স্পষ্ট শোনা যাক শ্বাসের শব্দ…
এফোঁড়-ওফোঁড দিন-রাতের উত্তেজক গল্প এযাত্রা তোলাই থাকল।

অসম্ভব গল্প ৮

আমি অনেকবার স্বপ্নে দেখেছি,
অন্ধকার এলিভেটর হু হু করে নেমে যাচ্ছে পাতালের দিকে
সারারাত ধরে জ্বলছে-নিভছে নীলগাড়ির উদ্ধত হেডলাইট
আর কালিম্পঙের জানলা দিয়ে পাগলের মতো ঘরে ঢুকছে মেলোড্রামাটিক মেঘ

কিন্তু সব শিহরনের শেষেই অবসাদ আসে।
তাই সব বানানো কথা একদিন, একদিন ক্লান্ত হবে।
খুব দ্রুত জ্বলতে গিয়ে নেমে যাবে অপমানের তীব্র চোখ
কুয়াশার ওপার থেকে হেসে উঠবে অ-জাত সন্তান।

আর চৌকাঠ ঠান্ডা পায়ে পেরিয়ে ঝড়ের আঙুল চেপে ধরবে তুমি?

অসম্ভব গল্প ৯

একটা সময় ছিল যখন তুমি দিন নেই রাত নেই
খালি অস্ত্রদের ধারালো করার কথা বলতে।
একটা সময় ছিল যখন আঁচড়হীন পাতার সামনে দাঁড়াতাম
সে একটুও দেরি না করে নখদাঁত দিয়ে আমায় ফালাফালা করে দিত।

এখন ওর সঙ্গে-সঙ্গে আমি অনেকটা পথ পেরিয়েছি।
না চাইতেও কিছুটা সখ্য হয়েছে। কিছুটা শান্ত হয়েছে।
মাঝে-মাঝে ওর চোখে নিবিড় চোখ রেখে হালকা শিস দিই
বুঝতে পারি, বিপন্ন লেজ আছড়ানো ছাড়া ওর কিছু করার নেই।
তবে মনে-মনে সুযোগের অপেক্ষায় থাকে ঠিক।
তাই সেদিন একটু আলগা পেতেই আমাকে তুলে নিয়ে মুখ বেঁধে
হু হু করে উল্কার মতো নেমে যাচ্ছিল বিপন্ন এক হেমন্তকালীন সুড়ঙ্গে।

আমি শুধু দেখলাম তোমায়।
সবটা দেখেও কিছু করলে না।
সব দেখেও তোমার রুক্ষ চুলে ভরা মুখ নিচু করা,
তোমার দ্বিধাহীন শানে ঝলসে ওঠা দুপুর একবারও স্থির হল না।

অসম্ভব ১০

তুমি বলতে আমার সব লেখা তুমি পড়েছ অন্ধকার জানলার ওপাশে বসে
আমি ভাবতাম তা হলে যে আমার পুরস্কারের আশা ছিল না কোনও, সব মিথ্যে?
তখন থেকেই তোমায় একটা আবছা ফোটোর কথা বলতে চেয়েছি

কিন্তু তার বদলে বলে চলেছি
অনেকদিন আগে এক অসামান্য রুক্ষ গাছের শরীরে আদরের হাত রেখেছিলাম
অনেকদিন আগে দুপুরের রোদে গনগনে বালি পেরিয়ে কতটা হেঁটেছিলাম সমুদ্রের দিকে
অনেকদিন আগে ফুটো হওয়া কাঠের বাড়িতে বৃষ্টির ভয়ে শিউরে উঠেছি সারারাত
অনেকদিন আগে বললে বিশ্বাস করবে না এক উঁচু বাড়ির ছাদে টানা জ্বলতে থাকা লাল আলোকে সান্ত্বনা দিয়ে উজাড় হয়ে গেছি

কিন্তু ভোরে সবুজ বনের মধ্যে ঝাঁকুনিতে ঘুম ভাঙে
ভুলে যেতে ইচ্ছে করে এই রাতজাগা ভয়ানক ট্রেনজার্নির পর
আমাদের জন্য অপেক্ষায় কী মমতাময় বধ্যভূমি
তাই রোজ ঘুম থেকে উঠেই মনে করিয়ে দিই
অনেক পুরনো প্রায় না চিনতে পারা বিবর্ণ ফোটোর কথা

নাকি তুমি এত কান্নার ভিতর কিচ্ছু দেখতে পাও না, বলো তো!

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)