রিলকের চিঠি ও আত্মজিজ্ঞাসা <br /> রঞ্জিতা চট্টোপাধ্যায়

রিলকের চিঠি ও আত্মজিজ্ঞাসা
রঞ্জিতা চট্টোপাধ্যায়

"এই আত্মজিজ্ঞাসা থেকেই জন্ম নেয় খোঁজ। আর সেই খোঁজ থেকেই চলা। তীর্থযাত্রা। মনের মানুষটি কোথায় ? কোথায় পাব তারে ? এ প্রশ্ন থেকেই নিজের শিল্পীসত্তার গভীরে পৌঁছন। ক্ষ্যাপা খুঁজে ফেরে পরশপাথর। কোথায় যেন এক হয়ে যায় জার্মান কবি আর বাংলার বাউলদের দর্শনের মূলকথাটি। শিকড়ের সঙ্গে দুর্বল সম্পর্ক হলে গাছ সহজেই ছিন্নমূল হয়ে পড়ে। তখন তার অস্তিত্বের সংকট। অনুজপ্রতিম কবিকে অস্তিত্বের সংকটকালে কি করা যায় তার পরামর্শ দিয়েছেন রিলকে তা ভাবীকালের কাছে চিত্তের বিক্ষুব্ধতার নিরাময়ের উপায় হয়ে উঠেছে..."

“Being an artist means, not reckoning and counting , but ripening like the tree which does not force its sap and stands confident in the storms of spring without the fear that after them may come no summer .” Rainer Maria Rilke / Letters To A Young Poet

পৃথিবী এখনো অতিমারীর কবলমুক্ত নয়। রোগ আর মৃত্যু প্রতিনিয়ত আমাদের নাড়া দিয়ে চলেছে। তবে মারী আক্রান্ত পৃথিবীতে বসন্ত এসেছে। মহা সমারোহেই এসেছে। আমেরিকাতে বসন্ত মানেই স্কুলে এক সপ্তাহের বসন্তাবকাশ। পাড়ি দিলাম উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ার Humboldt County তে। নিবিড় অরণ্যের মাঝে স্বজন হারানোর ব্যাথা উপশমের খোঁজে।

প্রায় সাড়ে তিনশো মাইল উত্তরে Portland আর তিনশো মাইল দক্ষিণে San Francisco . এই দুই মেট্রোপলিটন শহরের মাঝে Humboldt County বসে আছে প্রকৃতির আদিম ও অকৃত্রিম রূপ নিয়ে। বনভূমি তাই বিস্মিত করে আমার মতো পর্যটককে। এ বিস্ময় শুধু আমার একার নয়। এ বহু মানুষের সম্মিলিত বিস্ময়। হাজার বছর ধরে চলেছে এই বিস্মিত হওয়ার পালা। আমাদের পূর্বপুরুষেরাও ঠিক একইভাবে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়েছিল এই বনস্পতিদের দিকে। দুহাতের বেষ্টনীতে বুঝতে চেয়েছিল গাছগুলির সুবৃহৎ কাণ্ডের রহস্য। Californian Redwoods . বিশাল বিশাল গাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।Redwood National Park এর সংরক্ষিত বিস্তারে Lady Bird Johnson Grove এর পায়ে চলা পথ ফার্ন বিছানো। নরম পায়ে পায়ে চলা। অরণ্য যেন আদর করে ডাকছে। মাথার ওপরে সবুজের চাঁদোয়া। তারই ফাঁকে ফাঁকে কোথাও কোথাও একচিলতে রোদ এসে পড়েছে। প্রায় নিস্তব্ধ বনভূমি। পাখপাখালির কলকাকলী তেমন শোনা যায় না। হাওয়ার শনশনানি পর্যন্ত নেই। বিশাল গাছগুলি ধ্যানমগ্ন তপস্বীর মতো বিরাজমান। কোন কোনটার উচ্চতা প্রায় সাড়ে তিনশো ফুট বা তারও বেশী। কেউ বা অতি প্রাচীন। হাজারো ওঠাপড়ার নীরব সাক্ষী। মাটির অনেক গভীরে প্রোথিত তাদের শিকড়। শিকড়ের আত্মশক্তিতে স্থিত এসব গাছেরা। ভয়হীন। বহু বসন্তঝড় পার হয়ে আজও আকাশপানে অটুট তাদের চলা। নিস্পন্দ মৌনতার মধ্যেও স্পষ্ট অনুভূত হয় প্রাণের স্পন্দন। যে বনভূমিতে দাঁড়িয়ে আছে সুবিশাল এইসব বৃক্ষরাজি তার অনতিদূরে উপকূলে আছড়ে পড়ছে মহাসাগর। সাগরের চঞ্চলতার বিপ্রতীপে আদিম গাছেদের শিরা উপশিরায় সংহত যুগান্তরের প্রাণশক্তি। শিকড়ের আত্মশক্তিতে ঝড়ঝঞ্ঝা পার হয়ে দাঁড়িয়ে আছে অনন্তকাল। জীবনের কত পরিবর্তনের সাক্ষী। আপাতদৃষ্টিতে এখানে সবকিছু স্থির। কিন্তু স্থবির নয়। আমরা হেঁটে চলেছি মহা মহিমময় শান্ত মহীরুহের পাশ দিয়ে। পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে জীবনের অবিরাম স্রোত। আর আক্ষরিক অর্থেই আকাশচুম্বী এইসব গাছেদের দেখতে দেখতে , তাদের মধ্যে দিয়ে চলতে চলতে নিজের মুখোমুখি দাঁড়ানোর সুযোগ পাওয়া গেল।

নিজের প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়ার সময় হল। যেসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় নেই বনানীর নিস্তব্ধতায় তারা ভিড় করে এল। ক্ষতি নেই। আপাতত প্রশ্নগুলোকেই লালন করা। সে কি অর্থহীন ? মোটেই নয়। রিলকে সাহেব এমনটাই বলে গেছেন। আসলে এই লেখাটি এক অন্য ভ্রমণের গল্প। কেমন করে যেন দুই ভ্রমণের মেলবন্ধন ঘটে গেলো। হয়তো প্রায়শঃই হয় এমন। জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গী থেকে দেখলে বলতে হয় স্নায়ুতন্তু কোনভাবে উজ্জীবিত হলে তা চারপাশের অন্য স্নায়ুতন্তুগুলিকে ছুঁতে চায়। আর এভাবেই নাকি গড়ে ওঠে বেশ শক্তপোক্ত স্নায়ু কলোনি। এক ভাবনা থেকে আর এক ভাবনায় যে চলমানতা সেও তো প্রাণের চলা। ওই গাছেদেরই মতো। আর চলতে চলতেই পথে দেখা হয় অজস্র প্রশ্নের সঙ্গে।

১৯০২ সাল। শরৎকাল। Franz Xaver Kappus নামে এক তরুণ Wiener-Neustadt এর মিলিটারি একাডেমির পার্কে এক প্রাচীন চেস্টনাট গাছের নিচে বসে বই পড়ছেন নিজের মনে। তাঁর অধ্যাপকদের মধ্যে একজন ছিলেন যিনি সেনাবাহিনীতে কর্মরত নন। তাঁর নাম Parson Horacek .বইতে এমনই মগ্ন Kappus যে যখন এই দয়ালু ও বিদ্বান অধ্যাপকটি তাঁর পাশে এসে বসলেন তিনি টেরই পেলেন না। ছাত্রের হাত থেকে বইটি নিয়ে প্রচ্ছদটি দেখলেন। বইয়ের শিরোনাম দেখে মাথা নাড়তে লাগলেন অধ্যাপক। “Poems of Rainer Maria Rilke” ?যেন নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করলেন। তারপর দূরে তাকিয়ে স্বগতোক্তির মতো করে বললেন , “আমাদের ছাত্র Rene Rilke তাহলে এখন কবি হয়েছে !” সে প্রায় পনেরো বছরেরও বেশী আগের কথা। সেনাবাহিনীর অফিসার হবে এই আশায় Rilke র মা বাবা তাঁকে পাঠিয়েছিলেন Sankt Polten এর Lower Military স্কুলে। হোরাসিক আজও স্পষ্ট মনে করতে পারেন রোগা , চুপচাপ আর আত্মমগ্ন প্রকৃতির সেই ছেলেটির কথা। মিলিটারি প্রশিক্ষণের কঠিন নিয়মনীতি অসীম ধৈর্যের সঙ্গে সে পালন করে চলতো। চারবছর পর অন্যান্যদের সঙ্গে সেও গেল মিলিটারি কলেজে। কিন্তু সেখানে শৃঙ্খলার নিগড় সহ্য হল না তার স্বাস্থ্যে। তার বাবা মা তাকে নিয়ে চলে গেলেন প্রাগে নিজেদের কাছে। বাকী পড়াশোনা সে বাড়ী থেকে শেষ করবে এই ছিল পরিকল্পনা। Rene Rilke নামের ছাত্রটির বিষয়ে এটুকুই জানা আছে অধ্যাপকের। Kappus এর তখন মাত্র উনিশ বছর বয়স। যে পেশা তাকে বেছে নিতে হচ্ছে আর সে যা ভাবে এই দুইয়ের অবস্থান দুই বিপরীত মেরুতে। দ্বন্দ্বে আকীর্ণ মন নিয়ে সেই মুহূর্তেই সে ঠিক করে ফেলেছে যে নিজের লেখা কবিতাগুচ্ছ সে পাঠাবে যে কবির বই সে পড়ছে তাঁকেই। কবিতাগুলি সম্বন্ধে মতামত জানতে চেয়ে। পাঠাল সে। সেইসঙ্গে লিখল একটি চিঠি। সে চিঠিতে উজাড় করে দিল নিজের অশান্তি , উদ্বেগ , দ্বিধা , সংশয় আর বেদনা। বেশ কয়েক সপ্তাহ অপেক্ষার পর একদিন তার হাতে এল একটি ভারী নীল খাম। সেই শুরু। তারপর থেকে ১৯০৮ সাল পর্যন্ত চলেছে Franz Kappus আর Rainer Maria Rilke র চিঠিপত্রের আদানপ্রদান। তার থেকে দশটি চিঠি নিয়ে প্রকাশিত হল একটি সংকলন। সে বই একটি যুগান্তকারী ক্লাসিকের মর্যাদা পেয়েছে আজ। Rainer Maria Rilke র “Letters To A Young Poet ” কবি ও শিল্পীদের এক ধর্মগ্রন্থের মতো। এই ধর্মের আবেদন কোন নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিল্পীকে হতে হবে ওই গাছেদের মতো। আত্নশক্তিতে স্থিত। সৃজনশীলতা সাময়িকভাবে অবরুদ্ধ হয়ে পড়লে শান্ত অপেক্ষায় কাটাতে হবে দিনগুলি।

” Be patient toward all that is unsolved in your heart and to try to love the questions themselves like locked rooms and like books that are written in a very foreign tongue. Do not now seek the answers, which cannot be given you because you would not be able to live them. And the point is, to live everything. Live the questions now. Perhaps you will then gradually, without noticing it, live along some distant day into the answer.”

পৃথিবীর যে কোন দেশের, যে কোন ভাষার শিল্পীর কাছে এই সংশয় , এই আত্মজিজ্ঞাসা গুরুত্বপূর্ণ। এই আত্মজিজ্ঞাসা থেকেই জন্ম নেয় খোঁজ। আর সেই খোঁজ থেকেই চলা। তীর্থযাত্রা। মনের মানুষটি কোথায় ? কোথায় পাব তারে ? এ প্রশ্ন থেকেই নিজের শিল্পীসত্তার গভীরে পৌঁছন। ক্ষ্যাপা খুঁজে ফেরে পরশপাথর। কোথায় যেন এক হয়ে যায় জার্মান কবি আর বাংলার বাউলদের দর্শনের মূলকথাটি। শিকড়ের সঙ্গে দুর্বল সম্পর্ক হলে গাছ সহজেই ছিন্নমূল হয়ে পড়ে। তখন তার অস্তিত্বের সংকট। অনুজপ্রতিম কবিকে অস্তিত্বের সংকটকালে কি করা যায় তার পরামর্শ দিয়েছেন রিলকে তা ভাবীকালের কাছে চিত্তের বিক্ষুব্ধতার নিরাময়ের উপায় হয়ে উঠেছে । সৃষ্টিশীলতার আলোকহীন অন্ধকার দিনগুলি একজন শিল্পীর জীবনে যে কত প্রয়োজনীয় সেকথা বলেছেন তিনি তাঁর চিঠিগুলিতে। যখন বাইরের আলো নিভে যায় তখনই তো অন্তর্লোকে অনুসন্ধানের প্রশস্ত সময়। মাটির গহনে, অন্ধকারে , বীজের রূপান্তর চলে। একদিন সেই বীজ বৃক্ষরূপে আত্মপ্রকাশ করে। শিল্পীমনের অন্ধকারাচ্ছন্ন অবস্থা তাই নতুন প্রস্তুতির অন্য নাম। ১৯০৪ সালের ১২ই আগস্ট একটি চিঠিতে রিলকে লিখলেন,

” The more still, more patient and more open we are when we are sad, so much deeper and so much the more unswervingly does the new go into us , so much the better do we make it ours, so much the more will it be our destiny, and when on some later day it happens(that is steps forth out of us to others), we shall feel in our inmost selves akin and near to it. And that is necessary.”

এ সংশয় শুধু যে শিল্পী বা কবির জীবনেই আসে তা তো নয়। সব মানুষের জীবনেই কোন না কোন সময়ে তরুণ কবি Kappus এর মতো দ্বন্দ্ব আসে। আঁধার ঘরেই রাজাধিরাজের আগমনের প্রতীক্ষায় রত রাণী সুদর্শনা । রাই ধৈর্য্যং রহু ধৈর্য্যং। ঝড় বাদলের আঁধার রাত পার হয়ে তবেই মিলনের মধুর উপলব্ধি । ‘ তিমিরময় নিবিড় নিশা /নাহি রে নাহি দিশা ‘ -দিশাহীন , বিভ্রান্ত এ সময়। মানুষ তার ব্যক্তিগত জীবনে ও বৃহত্তর পরিসরে নানা দুর্যোগ আর ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন। এমন সময়ে যখন পড়ি,

“So you must not be frightened ….if a sadness rises up before you larger than any you have ever seen; if a restiveness, like light and cloud-shadows, passes over your hands and over all you do. You must think that something is happening with you, that life has not forgotten you, that it holds you in its hand; it will not let you fall. Why do you want to shut out of your life any agitation, any pain, any melancholy, since you really do not know what these states are working upon you?”

তখন বিভ্রান্তি দূর করার জন্য মন ব্যাকুল হয় না। বরং মনে আশ্বাস ফিরে আসে যে রাত্রির তপস্যা একদিন শেষ হবে। নতুন দিনের আলো ফুটে উঠবে। .কেমন হবে সেই নতুন দিন ? তার উত্তর নাই বা পাওয়া গেল এই মুহূর্তে। আপাততঃ প্রশ্নটা নিয়েই বেঁচে থাকা। প্রশ্নই জীবনের চালিকাশক্তি।
মূল জার্মান ভাষা পড়ার মতো আমার ব্যুৎপত্তি নেই। M . D . Herter Norton কৃত ইংরাজী অনুবাদ তাই আমার মতো পাঠকের ভরসা। চটি বই। কিন্তু শতাব্দী পার করেও এ বই প্রজ্ঞা আর সুগভীর এক জীবনবোধের সঞ্চার করে। বস্তুবাদী সভ্যতার যুগে অনিশ্চয়তাকে, নির্জনতাকে আঁকড়ে ধরে আত্মদীপের আলোয় চলার যে পথনির্দেশ পাই চিঠিগুলিতে তা মনে করিয়ে দেয় সদ্যপ্রয়াত কবি শঙ্খ ঘোষের কবিতার কথা। নিজের কবিসত্তার প্রতি সৎ থাকার যে পরামর্শ Rilke দিয়েছেন Kappus কে সেই সততার উজ্বল প্রতিফলন তাঁর কবিতায়।

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (4)
  • comment-avatar
    তপনজ্যোতি মিত্র 2 weeks

    রঞ্জিতার এই অসাধারণ লেখাটি পড়লাম, মনের গহন থেকে উঠে আসা যে গাঢ় অনুভূতিমালা কবি রিলকে অনুভব করে আর এক কবিকে জানিয়ে ছিলেন, রঞ্জিতা তাঁর লেখনীতে  সেগুলি তুলে ধরলেন, ঠিকই ত জীবন আমাদের ধারণ করে থাকে, পড়ে যেতে দেয় না |

  • comment-avatar
    ইন্দ্রাণী দত্ত 2 weeks

    রঞ্জিতা চট্টোপাধ্যায়ের প্রবন্ধটি অভিনব। শুরু হয়েছে লেখকের ব্যক্তিগত শোক, ভ্রমণের অনুষঙ্গে আর সমাপ্তিতে লেখক আর পাঠক একত্রে ঘুরে এলেন গোটা দুনিয়া; স্বল্প পরিসর অথচ অলীক এই ভ্রমণে ছুঁয়ে গেলেন রিলকে, তাঁর আলোচিত বইটি , ঊদ্ধৃতি সমূহ, রাণী সুদর্শনা, কবি শঙ্খ ঘোষকে। যেন জলাশয়ে প্রতিফলিত হল অনন্ত আকাশ।
    যেহেতু ব্যক্তিগত শোক, যেহেতু রিলকে, যেহেতু অরণ্য, গোটা লেখাটিতে জলছাপের মত রয়ে গেল লাইন কটি ঃ
    “There rose a tree. O pure transcendence!
    O Orpheus sings! O tall tree in the ear!
    And all was silent. Yet still in this silence
    proceeded new beginning, sign and transformation”.
    -সনেট্স টু ওর্ফিউস

  • comment-avatar
    Chinmoy Guha 1 week

    অসম্ভব সুন্দর। উপকৃত হলাম।

  • comment-avatar
    S K Mukhopadhyay 1 week

    আলোকিত হলাম