রাষ্ট্র-অতি রাষ্ট্র, নাগরিক-অনাগরিক, ফ্যাতাড়ুরা – একটি কষ্টকল্পিত মনোলগ <br />  জয়ন্ত ভট্টাচার্য

রাষ্ট্র-অতি রাষ্ট্র, নাগরিক-অনাগরিক, ফ্যাতাড়ুরা – একটি কষ্টকল্পিত মনোলগ
জয়ন্ত ভট্টাচার্য

" হয় তুমি ভারতীয়, নয় তুমি ভারতীয় নও। মানে তুমি আধুনিক, থুড়ি, বর্তমান রাষ্ট্রের নিয়ম-টিয়ম মানো তো? আমাদের আধুনিক গণতন্ত্রের প্রথম যুগে মানে ইউরোপে যখন এলায়িত সামন্ত রাজ্য/রাষ্ট্রগুলো নতুন করে জুড়ে এবং বিন্যস্ত হয়ে ধীরে ধীরে আধুনিক শিল্পনির্ভর জাতীয় রাষ্ট্র হয়ে উঠছে সেসময় থেকেই তো অস্তিত্বের অন্যসব স্তর তলিয়ে যাচ্ছে, ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে নাগরিক সত্তার মাঝে। একটি নির্দিষ্ট ভুখণ্ড নিয়ে, তার নিজস্ব আইনকানুন নিয়ে একটি রাষ্ট্র – বহুলাংশেই জনমতের উপরে ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে (যাকে এখন অ্যাকাডেমিক জগতের ভাষায় বলে “manufacturing consent”)। আরো একধাপ এগিয়ে আবার আমার আপনার মতো কোন অর্বাচীন, অকালপক্ক, অর্ধশিক্ষিত দেখে এর মাঝে hegemony তথা মান্যতা নিয়ে টিঁকে থাকবার নানা রকমের কৃৎ-কৌশল রয়েছে। কৃৎ-কৌশল রয়েছে রাষ্ট্রের অতিরাষ্ট্রের হয়ে ওঠার চারিত্র্যলক্ষণের মধ্যে আছে ক্রমশ ঘৃণাকে সামাজিক-সাংস্কৃতিকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া – শব্দে, চিত্রকল্পে, প্রাত্যহিক সংলাপে। হিংসাকে আকর্ষণীয় প্রদর্শনী করে তুলতে হবে (spectacularized violence)। ধীরে ধীরে এগুলোকে সহনীয় করে তোলা। নিজের নিয়মেই সহনীয় হয়েও যায়। যাকে পছন্দ করিনা তাকে ‘দানব’ বানিয়ে দাও (demonization), শিক্ষা থেকে থেকে সরিয়ে দাও প্রশ্ন করার সাহস, উৎসাহ এবং পরিসর। শিক্ষকেরা হয়ে যাক educational managers, ছাত্রের মাঝে “কেন?”-র প্রবাহ তৈরি করার কোন জ্ঞানভিক্ষু নয়। একটি সংস্কৃতির জন্ম হবে যার ভিত্তি হবে কেবল তাৎক্ষণিকতা-নির্ভর, শুধুমাত্র বর্তমানকে চিনি বুঝি যাপন করি, অন্য কিছু নয়। অতীতের এবং ইতিহাসের পুনর্নিমাণ হবে। সমাজের অন্ধকার জগৎ, যাদেরকে চালু ভাষায় লুম্পেন বলা হয়) আলোয় আসার, রাজপথের দখল নেবার, ক্ষমতার বৃত্তের সাথে সংস্থাপিত থাকার গৌরব অর্জন করবে।"

(বিধিসম্মত অসংলগ্ন সতর্কীকরণ – শুরুতেই বলা ভালো এরকম সতর্কীকরণ অনেকটা ধূমপান নিয়ে বিধিসম্মত সতর্কীকরণের মতো। গয়লানী উপযুক্ত পরিমাণ দুগ্ধ সরবরাহ করতে পারেনি। শুধু তাই নয়, পাড়ার মোড়ে অহিফেনের গুলির যে দুটি দোকান ছিলো সে দুটোও সরকারি নিয়মকানুনের প্যাঁচে দমবন্ধ হয়ে মারা গেছে। আমার আবার “পাতা” বা “তামাক” চলেনা, গুরুদেব বারণ করেছেন। ফলে জৈষ্ঠ্যের এই ভরা গরমে কিছু অসংলগ্নতা ঢুকে পড়েছে কথার মাঝে, বলার মাঝে। কি আর করি! দস্তয়েভস্কির উপন্যাসের চরিত্রদের মধ্যে ঘুরে ঘুরে আসা “brain fever”-এ আক্রান্ত হবার মতো দশা। দস্তয়েভস্কির চরিত্রেরা অনেক কিছু মনে করতে পারেনা, ফলে বেনিফিট অব ডাউট পেয়ে যায়, স্মৃতিহরণ ঘটে।

আমারও কি তেমন কিছু হল? ভয়ে ভয়ে আছি। প্রয়োজনে বেনিফিট অব ডাউট দিয়ে দেবেন আর কি!)

Engrafted মডার্নিটির যে যাত্রা ১৯৪৭ পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রিক উদ্যোগে শুরু হয়েছিল সেখানে সবাই মানে সমস্ত ভারতবাসী হয়ে উঠলো নাগরিক, খানিকটা হঠাৎ করেই। লক্ষ্যণীয় যে জাতি-রাষ্ট্র হিসেবে যে ব্রিটিশ জাত প্রায় ৩৫০ বছর ধরে ধীরে ধীরে একটু একটু করে গড়ে উঠেছে ভারত সেসমস্ত ধাপ অতিক্রম করার জন্য পেয়েছে কয়েক দশক মাত্র। ফলে ইংল্যান্ড সহ ইউরোপের গুরুত্বপুর্ণ দেশগুলোতে যেভাবে ঐতিহাসিকভাবে প্রথমে ব্যক্তির অভ্যুদয়, পরবর্তীতে রাষ্ট্রের সাথে নাগরিকের সহাবস্থান, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং সমাজ জীবনে ধর্ম-নির্লিপ্ততার (secularism) যে পরিসর তৈরি হয়েছে তা ভারতে হয়নি। যেভাবে শ্রমিক তথা মার্ক্সের ধারণানুযায়ী সর্বাহারা শ্রেণীর এবং পুঁজির সাথে শ্রমের টানাপোড়েন থেকেছে বিভিন্ন স্তরে, যেভাবে দেশগত ভিন্নতা থাকা সত্বেও বিভিন্ন সামাজিক ও শ্রেণী সম্পর্কের মানুষের একটি পাব্লিক ডিসকোর্সের পরিসর তৈরি হয়েছে, যেভাবে চার্চ এবং রাষ্ট্র পৃথক হয়েছে, যেভাবে সমাজ জীবন থেকে অপসৃত হয়ে ধর্মানুগত্য ব্যক্তিগত রুচি এবং পরিসরের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ঐতিহাসিকভাবে সেসব তো এখানে হয়নি। বিভিন্ন সামন্ত রাজ্যে বিভক্ত ভারত নামের ভৌগলিক ভুখন্ডে সামন্ত রাজা, উদীয়মান বৃহৎ শিল্পপতি শ্রেণী, ব্যবসায়ী, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ এবং ওকালতি ও ডাক্তারির মতো বিভিন্ন স্বাধীন পেশার ব্যক্তিদের উপনিবেশের বিরুদ্ধে ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থে রাজনৈতিক এবং সামরিক সংগ্রামের বিভিন্ন সফলতা ও ব্যর্থতার চিহ্ন বহন করেছে ১৯৪৭ পরবর্তী স্বাধীন ভারতবর্ষ। এধরনের বিভিন্ন সময়-চিহ্নের স্থায়ী ছাপ নিয়ে যে রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং একক ব্যক্তির একক ভোটাধিকার চালু হলো সেগুলো মূলত সমাজের উপরের স্তরের ক্ষমতা চিহ্ন। এরকম এক ঐতিহাসিকতায় প্রধানত কৃষিসম্পর্কে আবদ্ধ শতকরা ৮০ ভাগ মানুষকে নিয়ে গড়ে ওঠা নতুন ভারতীয় জাতি-রাষ্ট্রে মডার্নিটি বা আধুনিকতা প্রকৃত অর্থে engrafted হয়ে যায়, ঐতিহাসিকভাবে সামাজিক পরিবর্তন ও গতিশীলতার (social and historical dynamics) নিয়মে জন্ম নেয় না। রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যক্তি-সমাজ-কৌম-রাষ্ট্র-নাগরিকতার যে সম্পর্ক নতুন করে রচিত হয় ১৯৪৭ পরবর্তী ভারতবর্ষে তা প্রায়-সম্পূর্ণ ব্রিটিশ রাজনৈতিক সংবিধানের ধারায় তৈরি হওয়া। বিশেষ করে আমরা যদি দুটি বিষয় একবার স্মরণ করে নিতে পারি – (১) ভারতের উপনিবেশ-বিরোধী আন্দোলনের প্রধান মুখ স্বয়ং গান্ধী তাঁর নিজের জীবনের ক্ষেত্রে একাধিকবার দুটি passion-এর কথা বলেছেন। প্রথমটি হল ব্রিটিশ সংবিধান (Pax Britannica-ও বটে) এবং দ্বিতীয়টি নার্সিং বা শুশ্রুষা। (২) প্রধানত শিল্প বিপ্লবোত্তর ইউরোপে সমাজ এবং কৌমের ধারণা খসে গেছে প্রায় ৩০০ বছর জুড়ে। নাগরিক ও রাষ্ট্রের মাঝে সরাসরি সম্পর্ক – অধিকার এবং কর্তব্যের বাঁধনে, cash nexus-এর প্রবল উপস্থিতিতে। এখানে মধ্যস্থতাকারী কোন সামাজিক পরিসর নেই, যা আছে তা নাগরিক পরিসর বা সিভিল স্পেস। ডেমোক্রাসির স্বর্ণযুগে কিংবা সামাজিক পরিসরের সবল, জোরালো উপস্থিতির সময় আধুনিকতা নির্মিত নাগরিকতার ভাষ্য ছাড়াও আরও অনেক স্বর, কণ্ঠ, আত্মপ্রকাশ করে – indiscernible থেকে discernible হয়ে ওঠে, invisibility থেকে visibility-র স্তরে উঠে আসে। বিখ্যাত উদাহরণ হিসেবে ১৯৬০-৭০-এর দশকের প্যারিসের ছাত্র বিদ্রোহ বা আমেরিকায় ভিয়েতনাম বিরোধী আন্দোলনের কথা কিংবা সাম্প্রতিক কালের “অন্য এক পৃথিবী সম্ভব” বা “occupy Wall Street” আন্দোলনের কথা স্মরণ করা যেতে পারে। এরকম একটা পরিসরে নাগরিক হবার ধারণার সাথে নাগরিক না-হবার কিংবা অ-নাগরিকের ধারণাও সামাজিকভাবে মান্যতা, গ্রাহ্যতা পায়। বহু ভাষ্যের নির্মাণ হতে থাকে।

কিন্তু সমগ্র রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রক্রিয়াটাই যদি ভিন্নধর্মী হয়? যদি জাতি-রাষ্ট্র তৈরিই হয় প্রভুত্বকারী সামন্ত রাজা ও এর উপযোগী পরিব্যাপ্ত মানসিকতা, কৃষি শ্রম, শিল্পীয় শ্রম, শিক্ষিত জায়মান নাগরিক সমাজ, বৃহৎ পুঁজি এবং জাতীয়তাবাদের উত্তুঙ্গ পর্বে গড়ে ওঠা ছোট বা স্বাধীন পুঁজির মধ্যেকার অসংখ্য বাস্তব দ্বন্দ্বকে অমীমাংসিত রেখে? যদি গড়ে ওঠে জাতিস্বত্তার প্রশ্নকে সমাধানের আওতায় না এনে? Integer বা পূর্ণসংখ্যা না হয়ে, কোন ত্রৈরাশিক বা ভগ্নাংশ কিংবা অ-নাগরিক হয়ে কেউ থাকতে পারেনা। আধুনিকতার একটি এবং একমাত্র ভাষ্যেই এদের শিক্ষিত করে তুলতে হবে। রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে প্রবণতাটি সবসময়েই কেন্দ্রাভিমুখী। প্রান্ত এখানে প্রান্তিক, কখনো ব্রাত্যও বটে। অসংখ্য দ্বন্ব অমীমাংসিত রেখে জাতি-রাষ্ট্র হিসেবে ভারত গড়ে ওঠার এক অসামান্য চলমান চরিত্র (দলিলও বলা যেতে পারে) সতীনাথ ভাদুড়ীর সৃষ্টি ঢোঁড়াই। এরকম দলেই পড়বে আমার মতো সুশীল, সুবোধ, গোপাল-বালক গোছের মানুষজন।

যাহোক, ঢোঁড়াই বড়ো মুশকিলে পড়ছিলো ওর জীবনটাকে নিয়ে। জীবনের বিভিন্ন পর্বে তাৎমাটুলির ঢোঁড়াই ধীরে ধীরে বুঝেছে, আত্মস্থ করেছে অজানা সব অভিজ্ঞতা – “অদ্ভুত জিনিস এই ‘বোট’। হঠাৎ টাকা পেলে লোকের ইজ্জৎ বাড়ে, এর অভিজ্ঞতা ঢোঁড়াইয়ের জীবনে হয়ে গিয়েছে। বোটও সেই রকম রাতারাতি লোকের ইজ্জৎ বাড়িয়ে দেয়, কেবল যে বোট দেবে তার নয়, সারা গাঁয়ের।” ঢোঁড়াইয়ের ইজ্জৎ সারা গাঁয়ের ইজ্জৎ হয়ে যায়। “বোটের” সুতোয় রাষ্ট্রের সাথে বাঁধা পড়ে একক ঢোঁড়াই, তখনো নাগরিক হয়ে উঠেছে কিনা স্পষ্ট নয়। কিন্তু তার অস্তিত্বের সাথে জড়িয়ে থাকে তার গ্রাম অর্থাৎ ব্যক্তি-সমাজ-কৌম-রাষ্ট্র-নাগরিকতার এক আখ্যান রয়ে যাচ্ছে আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রের দিকে এগিয়ে চলা নতুন ভারতবর্ষের মধ্যে। “বলান্টিয়ারদের” দয়ায় নগণ্য ঢোঁড়াই “রামরাজ্য কায়েম করবার কাজে, কাঠবেড়ালীর কর্তব্যটুকু করবার সুযোগ পেয়ে গেল।” তার মননে বা psyche-তে যোগসূত্র তৈরি হল ঢোঁড়াই আর “মহাৎমাজীর” সাথে – imagined communities। আধুনিকতার নতুন কেন্দ্রীভূত রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রিক ডিসকোর্সে ঢুকে পড়ছে ঢোঁড়াইয়ের মতো প্রান্তিক মানুষ ও অঞ্চল – নিজস্ব সমাজ ও কৌম বোধ নিয়ে। এটা ব্রিটিশের জগতে জন্ম নেওয়া ইউরোপীয় আধুনিকতার চেহারা নয়, এর অবস্থান আধুনিকতার চেনা ডিসকোর্সের বাইরে। ঢোঁড়াইয়ের অন্য এক যাত্রা শুরু হয়। “এই নিঃসীম রিক্ত জগৎটার মধ্যে ‘পাক্কী’ না কী নামের যেন একটা অপরিচিত রাস্তা দিয়ে সে চলছে।” আধুনিক ভারতের “পাক্কী” রাস্তার বাঁকে ঢোঁড়াই – ভারতের উন্নয়নের কুল চিহ্ন (insignia)। কিন্তু তার নাগরিকতার মধ্যে রয়ে যায় ভগ্নাংশের উপাদান, যদিও রাষ্ট্র তাকে গ্রহণ করবে একক integer হিসেবেই। রাষ্ট্রের জন্মলগ্নেই রয়ে গেলো অন্তর্লীন বিরোধ। ইটি আব্রাহাম অল্প কথায় সমস্যাটাকে এভাবে বুঝেছেন – “Within these new spaces, a logic different from the representation of India as ‘traditional’ was meant to operate. These new spaces would be rationalized, scientifically ordered spaces filled with individuals who, having shed personal religious or sectarian loyalties would identify primarily as a modern man – in a word, ‘Indian’.” (The Making of the Indian Atomic Bomb, p. 21) নিজের সত্তা, অস্তিত্বকে অস্বীকার করে, ভগ্নাংশকে অন্তর্লীন রেখে ঢোঁড়াইয়ের মতো অগণন মানুষের আধুনিক রাষ্ট্রের উপযোগী integer হয়ে ওঠার সংকট প্রসারিত হতে থাকবে সামাজিক বিভিন্ন স্তরে।

ইউরোপীয় আধুনিকতার ভাষ্য, যা আমাদের দেশে ১৯৪৭ পরবর্তী সময়ে অনুসৃত হচ্ছিল, তার উপাদানের মাঝে (matrix) নিহিত যুক্তি অনুসরণ করে আমরা বুঝতে পারলাম আমাদের মতো নাগরিকদের ধরা হবে একেকটি integer বা পূর্ণ সংখ্যা হিসেবে। এখানে ভগ্নাংশের কোন জায়গা নেই। উদো-বুধোর ত্রৈরাশিক না ভগ্নাংশ, এসব ভাবার কোন অবকাশই নেই। মণিপুরী বা কাশ্মিরী বলে আবার আলাদা কিছু হয় নাকি? এগুলো তো ভগ্নাংশ। পূর্ণসংখ্যা ভারতীয় নয়।

এরকম এক social psyche তৈরির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হল ভাষা এবং disciplinary time তথা শৃঙ্খলাবদ্ধ সময়। আবার পূর্ণ সংখ্যা পজিটিভ বা ইতিবাচক হতে পারে, যেমন স্থিতধী, প্রজ্ঞাবতী-প্রজ্ঞাবান সব নাগরিক। পূর্ণ সংখ্যা নেগেটিভও (নেতিবাচক) হতে পারে। ভাবুন দেখি নেগেটিভ পূর্ণ সংখ্যার কি ভারী একখানা দল। শুরু করি যদি গোরখপুরের শিশু বিশেষজ্ঞ ডঃ কাফিল খানের কথা দিয়ে – সরকারি হাসপাতালে অক্সিজেন সরবরাহ না থাকার ফলে কতগুলো বাচ্চা স্রেফ মরে গেলো, নিজের গাঁটের পয়সা দিয়ে গাড়ির তেল পুড়িয়ে বাইরে থেকে অক্সিজেন জোগাড় করে ডাক্তারবাবু বাঁচালেন অনেকগুলো প্রাণ, তারপরে ৮ মাস জেল খাটলেন যেন ওঁর জন্যই অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা করা যায়নি এমনটা আর কি। আমাদের স্মৃতিতে আসছে কি একটু একটু এ ইতিহাস? এখানেও তো আবার অন্য বিপদ আছে, ইংরেজিতে যাকে বলে numbing of collective consciousness – বিবশ হয়ে যাওয়া সম্মিলিত সংবেদনশীলতা, যাকে বলে historical and social amnesia – ঐতিহাসিক আর সামাজিক বিস্মরণ। এই বিস্মরণের জোরেই কিনা ডঃ খানের ভাই যে “অজ্ঞাত পরিচয়” দুষ্কৃতির হাতে মারা গেলো সে কথা বোধ করি আমরা বেমালুম ভুলে গেছি। পূর্ণ সংখ্যা মানে পজিটিভ পূর্ণসংখ্যা – একখানা গোটা, আস্ত নাগরিক। কিন্তু নেগেটিভ পূর্ণসংখ্যারা কেমন অদ্ভুতভাবে পৃথিবী থেকে, মনুষ্য সমাজ থেকে একে একে খসে পড়তে থাকে – কখনো গৌরি লঙ্কেশ নামে, কখনো কালবুর্গী, কখনো আখলাক, কখনো আসিফা, কখনো পানেসার। কি লম্বা মিছিল দেখুন। আমিও দেখি। কিন্তু তাতে হয়েছেটা কি? কি আর হবে! আমাদের যাপিত সময়ের জাগ্রত বিবেক শঙ্খ ঘোষ স্মরণ করিয়ে দেন – “আর সব উন্নয়ন পরিত্রাণ ঘূর্ণমান অগণ্য বিপণি দেশ জুড়ে / যা দেয় তা নেবার যোগ্য নয় / আমাদের চেতনাই ক্রমে অস্পষ্ট করে সাহায্যের হাত ….. লোকে ভুলে যেতে চায়, সহজেই ভোলে।” স্মরণ করিয়ে দেন – “বেঁধেছ বেশ করেছ / কী এমন মস্ত ক্ষতি / গারদে বয়েস গেল / তাছাড়া গতরখানাও / বাবুদের কব্জা হলো / হলো তো বেশ, তাতে কি / বাবুদের লজ্জা হলো?” হলো কি সত্যিই? এসবের মাঝে নিঃসারে গণ পরিসরের যতটুকু স্থান রয়েছে, তার রাজনৈতিক চরিত্রের masculinization তথা পৌরুষীকরণ ঘটেছে, নৈতিকতার প্রশ্নগুলোকে অল্প অল্প করে দিনের শেষে ঘুমের দেশে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে (ethical tranquilization)।

কী বিচিত্র বিষয় ভেবে দেখি একবার! নাগরিক-অনাগরিক, ভারতপ্রেমী-রাষ্ট্রদ্রোহী, হিন্দী-অহিন্দী, কেন্দ্রের ভারত-প্রান্তের ভারত, আলোর ভারত-আলো-আঁধারির ভারত, ক্ষমতার ভারত-ক্ষমতাহীনের ভারত, ক্রিকেটের ভারত-ডাংগুলির ভারত, টেনিসের ভারত-গোল্লা ছুটের ভারত, কমপ্লানের ভারত-ডিম খেতে চাওয়া মিড ডে মিলের ভারত! উফ, মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে। এত্তো এত্তো ভারতকে মনে রাখতে হবে? সবাইকে প্রকাশ করতে হবে “তোমারই প্রকাশ হোক”-এর মতো পজিটিভ পূর্ণ সংখ্যা দিয়ে? আমার পরিচালক রাষ্ট্র তো সে কথাই বলছে। আমাদের কি আর নেগেটিভ সংখ্যা হবার – এরকম দলভারী মিছিল দেখার পরেও – কোন “সদিচ্ছা” আছে বা থাকতে পারে। “আমরা তো অল্পে খুশি / কি হবে দুঃখ করে / আমাদের দিন চলে যায় / সাধারণ ভাত কাপড়ে!”

হয় তুমি ভারতীয়, নয় তুমি ভারতীয় নও। মানে তুমি আধুনিক, থুড়ি, বর্তমান রাষ্ট্রের নিয়ম-টিয়ম মানো তো? আমাদের আধুনিক গণতন্ত্রের প্রথম যুগে মানে ইউরোপে যখন এলায়িত সামন্ত রাজ্য/রাষ্ট্রগুলো নতুন করে জুড়ে এবং বিন্যস্ত হয়ে ধীরে ধীরে আধুনিক শিল্পনির্ভর জাতীয় রাষ্ট্র হয়ে উঠছে সেসময় থেকেই তো অস্তিত্বের অন্যসব স্তর তলিয়ে যাচ্ছে, ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে নাগরিক সত্তার মাঝে। একটি নির্দিষ্ট ভুখণ্ড নিয়ে, তার নিজস্ব আইনকানুন নিয়ে একটি রাষ্ট্র – বহুলাংশেই জনমতের উপরে ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে (যাকে এখন অ্যাকাডেমিক জগতের ভাষায় বলে “manufacturing consent”)। আরো একধাপ এগিয়ে আবার আমার আপনার মতো কোন অর্বাচীন, অকালপক্ক, অর্ধশিক্ষিত দেখে এর মাঝে hegemony তথা মান্যতা নিয়ে টিঁকে থাকবার নানা রকমের কৃৎ-কৌশল রয়েছে। কৃৎ-কৌশল রয়েছে রাষ্ট্রের অতিরাষ্ট্রের হয়ে ওঠার চারিত্র্যলক্ষণের মধ্যে আছে ক্রমশ ঘৃণাকে সামাজিক-সাংস্কৃতিকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া – শব্দে, চিত্রকল্পে, প্রাত্যহিক সংলাপে। হিংসাকে আকর্ষণীয় প্রদর্শনী করে তুলতে হবে (spectacularized violence)। ধীরে ধীরে এগুলোকে সহনীয় করে তোলা। নিজের নিয়মেই সহনীয় হয়েও যায়। যাকে পছন্দ করিনা তাকে ‘দানব’ বানিয়ে দাও (demonization), শিক্ষা থেকে থেকে সরিয়ে দাও প্রশ্ন করার সাহস, উৎসাহ এবং পরিসর। শিক্ষকেরা হয়ে যাক educational managers, ছাত্রের মাঝে “কেন?”-র প্রবাহ তৈরি করার কোন জ্ঞানভিক্ষু নয়। একটি সংস্কৃতির জন্ম হবে যার ভিত্তি হবে কেবল তাৎক্ষণিকতা-নির্ভর, শুধুমাত্র বর্তমানকে চিনি বুঝি যাপন করি, অন্য কিছু নয়। অতীতের এবং ইতিহাসের পুনর্নিমাণ হবে। সমাজের অন্ধকার জগৎ, যাদেরকে চালু ভাষায় লুম্পেন বলা হয়) আলোয় আসার, রাজপথের দখল নেবার, ক্ষমতার বৃত্তের সাথে সংস্থাপিত থাকার গৌরব অর্জন করবে।

সমধর্মী কিন্তু ভিন্ন এক পরিস্থিতিতে, ভিন্ন এক প্রেক্ষিতে ফ্রানজ ফ্যানঁ (Frantz Fanon) লিখেছিলেন তাঁর The Wretched of the Earth পুস্তকে। তিনি দেখেছিলেন – “The very same people who had it constantly drummed into them that the only language they understood was that of force, now decide to express themselves with force.” এরকম এক সময়ে ফ্যাতাড়ুরা আর অন্তর্ঘাত ঘটাতে পারেনা। এরা নিজেরাই রাষ্ট্রের জন্ম দেওয়া অন্তর্ঘাতের অংশীদার হয়ে যায়। এর হিংসা আর শক্তি প্রদর্শনের extra-judiciary, extra-state হাতিয়ার হয়ে ওঠে নিঃসাড়ে। এরা “নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে”-র সৌম্যকান্তি পাগল চরিত্রটির মতো দুর্বোধ্য “গ্যাৎচরেৎশালা” উচ্চারণ করেনা। এরা স্পষ্ট ভাষায় হিংসা-ঘৃণা-হিংস্রতা-পেশির ভাষা উচ্চারণ করে। ভাষার চিহ্ন এঁকে দেয় “অপরের” শরীরে। পার্টি এবং রাষ্ট্রের ভেদরেখা মুছে যেতে থাকে। আমাদের বোঝা রাজনীতির চেনা ছকে ঠিক এই গল্পগুলো তৈরি হচ্ছেনা। ঘটনাচক্রে এখানে আক্রান্ত হয়েছেন বেচারা বিদ্যাসাগর। তিনি এই চলমান ঘূর্ণাবর্তের মধ্যে পড়ে গেছেন।

রাজনৈতিক লুম্পেনিকরণ বহুদিন ধরেই আমাদের রাজনৈতিক সমাজে চলছে। কিন্তু এই তীব্রতায় এবং সর্বব্যাপী চেহারায় ছিলনা। সে অর্থে বর্তমান লুম্পেনিকরণ অভূতপূর্ব। আমাদের বিবেক, মনন, চেতনা বিদ্ধ হলেও, রক্তাক্ত হলেও আমরা মেনে নিয়েছি বা মান্যতা দিতে বাধ্য হয়েছি। এখানে রাষ্ট্র শুধু অতিরাষ্ট্রের আচরণ করছে তাই নয়। সমস্ত গণতান্ত্রিক পদ্ধতিকে পাশ কাটিয়ে লুম্পেনদের হাতে সেই ক্ষমতা তুলে দেওয়া হচ্ছে যেখানে রুনু গুহনিয়োগীর প্রয়োজন পড়েনা। কারণ তাকেও তো একটা নামকাওয়াস্তে বিচারের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

এখানে সেসবের বালাই নেই। পার্টি এবং এদের লালিত extra-judiciary and -democratic institutions লুম্পেনরাজ ঘোষিতভাবে সমাজের চলন, নীতি, নৈতিকতা, ব্যক্তি জীবনের প্রতিটি পরিসর – সবকিছু নির্ধারণ করবে।

অঁরি জিরো (Giroux) তাঁর একটি লেখায় আবেগঘন আবেদন রেখেছেন – “The current fight against a nascent fascism across the globe is not only a struggle over economic structures or the commanding heights of corporate power. It is also a struggle over visions, ideas, consciousness, and the power to shift the culture itself.”

আমাদের ভারতে তৃতীয় পরিসর আরও সঙ্কুচিত হবে, হচ্ছে। বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙ্গার ঘটনা “চোখে আঙ্গুল দাদা!” বেচারা ধর্ম-নির্লিপ্ত, মানুষকে নিয়ে বেঁচে থাকা বিদ্যাসাগর। তুমি কে? ইতিহাসের তো পুনর্লিখন চলছে। অনেক নতুন বীর আর শহীদ গড়ে উঠবে। তোমার সামনে নেচে-কুঁদে বেড়াবে। বাঙ্গালী, বাংলা তথা ভারত বর্তমানের প্রয়োজনেই তোমাকে ভুলে যাবে। নতুন ইতিহাস গড়ে উঠছে!

তবে এই “নতুন” ইতিহাসের মাঝে অন্তর্ঘাত ঘটিয়ে “নো ভোট টু বিজেপি” বা রেড ভলান্টিয়ারদের প্রচেষ্টা তৃতীয় পরিসরের বাস্তব দিগন্ত উন্মোচিত করছে। একে বাঁচাতে হবে।

বর্তমান সময়ের দাবী!

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (12)
  • comment-avatar
    পার্থ দে 2 weeks

    চাবুক

  • comment-avatar
    Soumya Panigrahi 2 weeks

    very thoughtful…my concerns: How many of us are ready to read and understand it. Still, this is a very important analysis of what were are and where we are currently…a little drop of light in the abyss of darkness . .

  • comment-avatar
    Rathindranath Kundu 2 weeks

    যথেষ্ট ভাল লিখেছ। বিষয়টি মনোযোগ সহকারে পড়লে মনের ভেতরের আরেকটি মানুষ খুব গভীরভাবে কেঁপে ওঠে।
    লেখাটির জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ।

  • comment-avatar
    উৎপল ঘোষ 2 weeks

    আপনি ডাক্তার না রাষ্ট্রবিজ্ঞানী,,,,,,,, অসাধারণ, আপনিও অসাধারণ।

  • comment-avatar
    Goutam Chakraborty 2 weeks

    অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লেখা। সাধারণের বোঝার জন্য অত্যন্ত কঠিন। সমাজের বিশিষ্ট জনের কাছে শেয়ার করার জন্য অনুমতি চাইলাম। সাধারণ মানুষ যেহেতু সমাজবদলের মূল কারিগর তাই তাদের বোঝার মতো করে কিছু লেখাও খুব জরুরী। খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষ তাদের মধ্যে যারা একটু আধটু পড়তে চায় তাদের জন্য লেখকের সংখ্যা বড়ই কম। বিষয়টা আমাকে বড়ই ভাবায়

  • comment-avatar
    সুকুমার ভট্টাচার্য্য 1 week

    কশাঘাত নিজেকেই করতে হচ্ছে।
    রাষ্ট্র, রাজনীতি, আইন, সমাজ- সব কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে।
    ডঃ জয়ন্ত ভট্টাচার্য সব কিছু তো স্পষ্ট করে লিখেছেন।
    তবে ইতিবাচক মন আমার এখনও নষ্ট হয় নি।
    আশায় আছি নতুন করে বাঁচবার জন্য।

  • comment-avatar
    সুশান্ত পাল 1 week

    স্বৈরাচার কখনও একমাত্র বলপ্রয়োগে সফল হতে পারে না। তারও গণমনস্তত্ত্বের সমর্থন ভিত্তি আছে। কৌম নেই বলেই অনেক আখ্যান হারাতে বসেছে। কল্পনা বা অপরতার আখ্যান। তাই নাগরিক পরিসরে শাসকের পছন্দানুযায়ী একমাত্রিক আখ্যান দখলদারি কায়েম করতে প্রচেষ্টা চালায়। একটু সহজও হয়। তাই,দুর্বৃত্তায়ন,ধর্মীয়বিদ্বেষ সামাজিকের সমর্থন পেয়েছে অচিরেই। আবার নতুন নতুন আখ্যান। সমস্যা হল, আখ্যানের শাসক নিয়ন্ত্রিত অর্থ আমরা বিশ্বাস করি। signifier আর signified-এর মাঝে আমাদের মস্তিষ্কটাই নেই,যেখানে প্রতিরূপ ভেসে ওঠে,নতুন অপর এক ব্যঞ্জনা,সহযোগ,সংযোগ বা প্রত্যাখ্যান সহ। এই তৃতীয় পরিসরটা হল কৌম চেতনার যৌথতার সংস্কৃতি। মৃত এই সময়ে অসংখ্য একক,সাংগঠনিক ও রেড ভলিন্টির্য়াসদের উদ্যোগ এই অপর মাত্রা। হাল না ছাড়ার।

    স্যার,লেখায় আপনি সময় সমাজ ধরতে চান। সবসময়। এ লেখাও ব্যতিক্রম নয়। নির্দেশক আর নির্দেশিতের মাঝে আপনার লেখা এসে দাঁড়ায়। থামতে বলে। মোহাবিষ্ট হতে নিষেধ করে প্রশ্ন করতে বলে। আপনি লিখুন। আরও লিখুন।

  • comment-avatar
    debalina 1 week

    আপনার লেখা পড়ে বারবার সমৃদ্ধ হই এবার ও হলাম ।প্রতিটা কথা সত্যি। কিন্তু আমরা কী এই অসময় থেকে বেরোতে পারব না এ জীবনে কে জানে

  • comment-avatar
    Chandana Datta 1 week

    Khubi valo likhechhis eta r alda kore balar abokash rakhena.Sotyi manus aaj kon jaygay darea achhe seta ki adou amra bujhi? Sadharon manuske bojhabar jonyo tor ei prochesta akta baro social work.Katojon er marmartho bujhbe Janina kintu ei lekhonir laraita khubi joruri.Tui akhon samaj bigganir mato kaj korchhis.Govirvabe lekhata porle sotyi nijer vitorer itibachok dikgulo baro besi jagroto hay. Aj tor lekha pore bojha jay Rashtro – Rajniti r tar kshamotayoner ottachare ba bala valo”KHELAY” sadharon manuser ostitotai prosner mukhe.Tui jeta chokhe angul dea dekhea dichhis seta dakhanor lokero baro avab.Vabe hayto anekei kintu thik mato bujhte pare na.Janina kabe sotyi sab srenir manuser valo din asbe !! Tobu khub kam holeo kichhu manuser kaj dekhe monehay samajer purotai netibachok nay,itibachok diktao sesh hoa jayni.Valo thakis.

  • comment-avatar
    Sayak Datta 1 week

    বেশ ভালো লেখা।