ভারতের সমাজজীবনে জাতের সমস্যা – মার্ক্স, গান্ধী এবং আম্বেদকর <br /> জয়ন্ত ভট্টাচার্য

ভারতের সমাজজীবনে জাতের সমস্যা – মার্ক্স, গান্ধী এবং আম্বেদকর
জয়ন্ত ভট্টাচার্য

General Report on Public Instruction (GRPI) 1849-50 থেকে শুরুতেই জানা যাচ্ছে হিন্দুদের মধ্যে বিভিন্ন জাতের ছাত্ররা ছিলেন – ব্রাহ্মণ ১৫, বৈদ্য ৮, কায়স্থ ২৪, তাঁতী ৩, নাপিত ৪, কামার ২, এবং কৈবর্ত্য ৩ জন। একটি নোটে জানানো হয়েছিল সেশনের শুরুতে ছাত্রের সংখ্যা ছিল ১২০ জন। পরবর্তীতে এর মধ্যে ২ জন মারা যান, ১১ জন কলেজ ছেড়ে যান এবং ১২ জনকে অনিয়মিত হবার দরুন কলেজ থেকে নাম কেটে দেওয়া হয়। (GRPI 1849-50, পৃঃ ১২০)
এরপরে GRPI (1850-51)-এর রিপোর্ট থেকে জানা যায় এই শিক্ষাবর্ষে বিভিন্ন বিভাগ মিলে ১১৯ জন ছাত্র ভর্তি হয়েছে। দেশীয় ছাত্রদের মধ্যে ৯ জন মুসলমান। বাকিরা হিন্দু। তাদের মধ্যে জাতের বিভাজন ছিল – ব্রাহ্মণ – ২৩, বৈদ্য – ৮, কায়স্থ – ৩২, তাঁতী – ৪, ক্ষৌরকার – ২, বেণিয়া – ৬, কৈবর্ত – ২, তিলি – ১, সদগোপ – ১ মোদক – ১। কলেজে ক্লাস করার জন্য ঘড়ির সময় ধরে আসা, নিয়মিত ক্লাসে হাজিরা দেওয়া এবং শিক্ষাক্রমের নিয়ম মেনে প্রশ্নপত্রের উত্তর ও নিয়মিত পাঠাভ্যাস তৈরি করা সবকিছুর সম্মিলিত ফল হিসেবে জন্ম নিল আধুনিকতার উপযোগী এক নতুন শৃঙ্খলা এবং প্রশাসনিকতার নিয়মাবলী (discipline and governance)।
খেয়াল করলে বুঝবো, “caste” তথা জাত বিভাজন অক্ষত রইল। একে ছাত্রদের সংখ্যানুপাতে বিচার করে বার্ষিক রিপোর্টে পেশও করা হল। কিন্তু গ্রামীণ বা চলে-আসা ভারতীয় সমাজের ধরনে বিষয়টিকে উচ্চ-নীচ সামাজিক প্রভেদ হিসেবে আর বিচার করা হচ্ছেনা। এক নতুন “সেকুলার সোশ্যাল হায়েরার্কি” তৈরি হল। এর অভ্যন্তরে জাত বিষয়টি বহাল তবিয়তে বেঁচে রইল, কিন্তু একটি রোপিত আধুনিকতা বা “এনগ্র্যাফটেড মডার্নিটি”র চাদর একে পরিয়ে দেওয়া হল। মেডিক্যাল কলেজ সহ হিন্দু কলেজ বা হুগলী মহসিন কলেজের মতো উচ্চশিক্ষার যে নামী প্রতিষ্ঠানগুলো তৈরি হল তার অঘোষিত বাতাবরণ রচিত হল যে জাত আর প্রধান পরিচয় নয়। কিন্তু শিক্ষাঙ্গনের বাইরে প্রশস্ত আঙ্গিনায় কাঠামোটি অটুট রইল।
আরও দুয়েকটি বিষয় লক্ষ্যণীয় – (১) অনেক ছাত্রকেই কলেজে পৌঁছুনোর জন্য যাতায়াতে দৈনিক ১২ থেকে ১৬ মাইল পথ রোজ হাঁটতে হত (এখন আমাদের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে), এবং (২) যে গ্রামে ছাত্ররা থাকত সেখানে সঠিক সময় বলে দেবার কেউ নেই, কোন উপায় নেই। সহজভাবে বললে, মেডিক্যাল কলেজ ও হিন্দু কলেজকে কেন্দ্র করে যে নাগরিক ও সভ্য কলকাতা গড়ে উঠছে তার সাথে ৬ বা ৮ মাইল দূরের জনপদের, যা তখনো গ্রাম, চরিত্রগত পার্থক্য বিস্তর। Clock-time-কে কেন্দ্র করে এই ছাত্রদের সাথে শিক্ষা তথা রাষ্ট্রের নতুন সম্পর্ক জন্ম নিচ্ছে, নির্ণীত হচ্ছে। নাগরিক হয়ে উঠছে ছাত্ররা। অথচ এই ছাত্রদের উৎসস্থল গ্রামগুলো এই clock-time-এ বাঁধা পড়েনি। রাষ্ট্রের সাথে বন্ধন দুর্বল। নাগরিকত্ব গড়ে উঠছে এমনটাও বলা সঙ্গত হবেনা। সে কলকাতার মধ্যে একাধিক কলকাতা ছিল।
আমরা নজর করব, একটি সেকুলার পাঠক্রমের মধ্য দিয়ে ছাত্ররা রাষ্ট্রের ঈপ্সিত অনুগত, সুশীল, বাধ্য এবং শৃঙ্খলাপরায়ন নাগরিক হবার পাঠ গ্রহণ করলেও যখন কলেজের রিপোর্ট পেশ করা হচ্ছে তখন খুব পরিষ্কার ভাষায় ছাত্রদের জাতিগত বিন্যাস আলোচিত হচ্ছে। সেকুলার শিক্ষার মাঝে কম্বলে চাপা দেবার মতো করে জাত তথা caste-এর প্রসঙ্গ স্পষ্টভাবে উৎকীর্ণ হয়ে থাকছে। Caste এবং সেকুলারিটির মধ্যেকার এই টানাপোড়েন নিয়েই ভারতীয় সমাজ বিবর্তিত হয়েছে। এশিয়ার প্রথম মেডিক্যাল কলেজ তথা ক্যালকাটা মেডিক্যাল কলেজ এ ঘটনার ক্ষেত্রে একটি চোখে-আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেবার মতো উদাহরণ।
এজন্য মেডিক্যাল কলেজের এবং আধুনিক মেডিক্যাল শিক্ষার ইতিহাস শুধু চার দেওয়ালের মধ্যে আবদ্ধ কোন শিক্ষাদানের ইতিহাস নয়। এ ইতিহাস নতুন রাষ্ট্রের উপযোগী নতুন নাগরিক তথা সিটিজেন তৈরির ইতিহাস (রাজা-প্রজার ইতিহাসকে অতিক্রম করে)। পরবর্তীতে সমগ্র ভারত জুড়ে ডিসপেনসারি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে governance-এর (সমাজবিজ্ঞানী পার্থ চট্টোপাধ্যায় একে ‘প্রশাসনিকতা’ বলেছেন) নতুন টেকনিক ছড়িয়ে পড়েছে বিস্তৃত সমাজজীবনে। আধুনিক রাষ্ট্রের চৌহদ্দির বাইরে বিপুল জনতা ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের মেডিক্যাল নজরদারির আওতায় চলে এল। শুধু তাই নয়, এরা ক্রমাগত আধুনিক হাইজিন, স্যানিটেশন এবং হেলথ প্রোগ্রামগুলোর technique আয়ত্ত ও আত্মীভুত করে নিল। নতুন অর্থ নিয়ে আধুনিক রাষ্ট্র মানুষের চেতনায় স্থান পেল।
এই বার্ষিক রিপোর্টের “Conduct of the Students of Hindustani Class” অংশে জানানো হল “several of them were engaged in a riot with persons on the outside of the College walls, which led to the interference of the police, by whom ten of the pupils were seized and taken before the Magistrate, who punished all of them by fines.” (পৃঃ ৮৬) এরকম “বিপজ্জনক” ঘটনার প্রেক্ষিতে কাউন্সিল অফ এডুকেশন হস্তক্ষেপ করে এবং তদন্তের পরে ৬ জন স্টাইপেন্ডিয়ারি ছাত্র এবং ৪ জন ফ্রি ছাত্র “were dismissed from the school.” এ ঘটনা বাধ্য, অনুগত, সুশীল নাগরিক তৈরির ক্ষেত্রে এমন অশনি সংকেত বহন করেছিল যে লন্ডন থেকে প্রকাশিত The Medical Times and Gazette: A Journal of Medical Science, Literature, Criticism, and News (New Series, vol. 5, July 3 to December 25, 1852)-এও গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল। “Bengal Medical College” শীর্ষক সংক্ষিপ্ত রিপোর্টে বলা হল – “It appears necessary to enforce a strict discipline in the school, as towards the end of the session some the students were engaged in a riot with persons outside the College walls, which led to the interference of the police, whom ten of the pupils were seized and taken before the magistrate, who punished them all of them by fines.” (Medical Times and Gazette, পৃঃ ২৫) এর আগেও আমরা ছাত্রদের তরফে উপনিবেশিক সিস্টেমের subversion করার ঘটনা দেখেছি – সিস্টেম যতই বাইরের আবর্জনাময় “নেটিভ পরিবেশ” থেকে আলাদা করে ধুয়েমুছে পরিচ্ছন্ন নাগরিক তৈরির চেষ্টা করুক না কেন। এটাই সমাজের আভ্যন্তরীন গতিময়তা, জনসমাজের ধারা।
আমরা Rules and Rugulations (১৮৪৯)-এ দেখেছি ভারতীয় রোগীদের খাদ্যের জন্য যেখানে দৈনিক বরাদ্দ ১ আনা, ইউরোপীয় রোগীদের ক্ষেত্রে সে বরাদ্দ দৈনিক ৪ আনা। এখানেও দেখতে পাচ্ছি – ১০০ জন ইউরোপীয় রোগীর জন্য মাসিক খাদ্য বরাদ্দ ৭০০ টাকা, অথচ ২৫০ জন ভারতীয় রোগীর জন্য সে বরাদ্দ ৩০০ টাকা।
তথাকথিত সেক্যুলার মেডিসিনের মধ্যেও জাতিগত বা বর্ণবৈষম্য প্রকটভাবে চোখে পড়ে এবং সেটা এখনও আছে। এজন্য গবেষকদের একাংশের ব্যাখায় একে “racial medicine” বললে অত্যুক্তি হয়না। বিশেষ করে কোভিডের সময়ে আমেরিকা এবং ইউরোপে এটা ভীষণ প্রকট হয়ে এসেছে। এদেশে প্রচ্ছন্ন থেকেছে, কিংবা আমরা কোন কথা বলিনি। তাহলে মোদ্দা ব্যাপার হল, ভারতের বিশেষ পটভূমিতে একদিকে জাতের বিভাজন (casteism), অন্যদিকে বর্ণবিভাজন (racism) দুটি সামাজিক বিষয়ই একসঙ্গে জুড়ে গেল।
এখানে ভেবে দেখা দরকার, যেসব ছাত্ররা (সংখ্যায় অনেক কম) সুযোগ, শিক্ষা এবং মেধার জোরে মেডিক্যাল কলেজে উচ্চবর্ণের ছাত্রদের সাথে এক পংক্তিতে বসে লেখাপড়া শিখছে তাদের মাঝে ভিন্ন একটি প্রবণতাও কাজ করে থাকতে পারে।
ভারতীয় সমাজতাত্ত্বিক এম এস শ্রীনিবাস একে “Sanskritization”/”Westernization”-এর ধারণা দিয়ে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন (“A Note on Sanskritization and Westernization”, The Far Eastern Quarterly, Vol. 15, No. 4 (Aug., 1956), pp. 481-496) । তাঁর পর্যবেক্ষণে – “The caste system is far from a rigid system in which the position of each component caste is fixed for all time. Movement has always been possible, and especially so in the middle regions of the hierarchy. A low caste was able, in a generation or two, to rise to a higher position in the hierarchy by adopting vegetarianism and teetotalism, and by Sanskritizing its ritual and pantheon. In short, it took over, as far as possible, the customs, rites, and beliefs of the Brahmins, and the adoption of the Brahminic way of life by a low caste seems to have been frequent, though theoretically forbidden. This process has been called “Sanskritization” … in preference to “Brahminization”…”
এরপরে আরও পরিষ্কার করে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন – “Economic betterment thus seems to lead to the Sanskritization of the customs and way of life of a group. Sometimes a group may start by acquiring political power and this may lead to economic betterment and Sanskritization. This does not mean, however, that economic betterment must necessarily lead to Sanskritization. What is important is the collective desire to rise high in the esteem of friends and neighbors, and this should be followed by the adoption of the methods by which the status of a group is raised.”
যদিও আরেক প্রখ্যাত সমাজতাত্ত্বিক পার্থ চট্টোপাধ্যায় শ্রীনিবাসের এ ধারণাকে ভিন্নভাবে দেখেছেন। পার্থ বলছেন – “এই প্রক্রিয়ায় দেখা যেত যে নিম্নতর জাতি উচ্চজাতির আচার-ব্যবহার আদব-কায়দা অনুকরণ করে দাবি জানাচ্ছে, আমরা মোটেই নিকৃষ্ট নই, ধর্মাচরণের ক্ষেত্রে আমরা উচ্চজাতিরই সমান। এই দাবির সঙ্গে যুক্ত থাকত নবলব্ধ আর্থিক বা রাজনৈতিক ক্ষমতা যার জোরে সেই জাতি, বা তার নেতৃস্থানীয় অংশ, ধর্মাচারের ক্ষেত্রেও অধিকতর মর্যাদার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করত … ফলে ‘সংস্কৃতায়ন’ প্রক্রিয়ার মধ্যেও প্রকাশ পেত উচ্চনীচের সংঘাত।” (“জাত-জাতি-জাতীয়তাবাদ”, ইতিহাসের উত্তরাধিকার, আনন্দ, ২০০৯, পৃঃ ৮৮) এ লেখাতেই পরে তিনি খানিকটা পরিহাসছলে বলছেন – “এখন কিন্তু উলটোটাই দেখা যায় বেশি। সরকারি তালিকায় কে কত নীচে বসবে, তারই প্রতিযোগিতা চলছে।” (পৃঃ ৮৯)
বিবেক কুমার সাম্প্রতিক সময়ে পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে দেখিয়েছেন – “২০০৯-১০ সাল পর্যন্ত ২৪টি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুমোদিত ১,৬৮৮টি প্রফেসর পদের মধ্যে মাত্র ২৯ জন প্রফেসর এবং ৩,২৯৮টি অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর পদের মধ্যে মাত্র ৯০ জন অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ছিলেন category-র। শতকরা হিসেবে এ সংখ্যা যথাক্রমে ২.৭৩% এবং ৪.৪%, যেখানে সাংবিধানিকভাবে SC-দের জন্য সংরক্ষণ ১৫% হওয়া বাধ্যতামূলক।
উচ্চতর শিক্ষার বহিষ্কারক চরিত্র (exclusive) আরও পরিষ্কার হয়ে যায় যখন আমরা দেখি যে SC এবং ST ক্যাটিগরিতে থাকা ছাত্রের শতকরা হিসেব যথাক্রমে ১৩.৫% এবং ৪%। এটা প্রমাণ করে যে আমাদের উচ্চতর শিক্ষার কাঠামোটি বহত্ব-বর্জিত।” (“Discrimination on Campuses of Higher Learning: A Perspective from Below”, EPW, ফেব্রুয়ারি ৬, ২০১৬, পৃঃ ১২-১৫)
আরও সাম্প্রতিক সময়ে ৪টি স্বীকৃত সংস্থার (Forum Against Oppression of Women, Forum for Medical Ethics Society, Medico Friend Circle, Peoples’ Union of Civil Liberties, Maharashtra) যৌথ উদ্যোগে প্রস্তুত “The Steady Drumbeat of Institutional Casteismঃ Recognize Respond Redress” শিরোনামের ফাইনাল রিপোর্টে (২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১) বলা হয়েছে – “জাতের ক্রমোচ্চ শ্রেণীবিভাগ (hierarchy) এবং ব্রাহ্মণ আধিপত্যের ওপরে প্রতিষ্ঠিত হিন্দুধর্ম নিরন্তর সক্রিয় প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সামাজিকভাবে এই জাতের বিভাজনকে চিরস্থায়ী হিসেবে রাখার জন্য, যাতে “হেজেমনিক” মতাদর্শগত ক্ষমতাকে ভারতীয় সমাজের ওপরে রক্ষিত হয়। ভিন্ন জাতের মধ্যে বিবাহ (যাকে আম্বেদকর বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন “exogamous marriage” হিসেবে) ২০১১ সালে ছিল মাত্র ৫.৮২%, এবং চার দশকে এই প্রবণতার কোন ঊর্ধমুখী চিত্র দেখা যায়নি।”
রিপোর্টটিতে আরও বলা হয়েছে – “অধিকাংশ মেডিক্যাল কলেজে দুটি গ্রুপের ছাত্র দেখা যায় – একদল আসে প্রাধান্যকারী ও প্রভাবশালী জাতগুলো থেকে এবং অন্যান্যরা প্রান্তিক জাতের ও ট্রাইবের … প্রান্তিক জাতের এবং সমাজের ছাত্রদেরকে সামাজিক হায়েরার্কির ক্ষেত্রে ‘তাদের অবস্থান’ বুঝিয়ে দেওয়া হয় এবং এটা সাধারণ প্র্যাকটিস যে তাদের মধ্যে হীনমন্যতা জন্ম নেয়, তাদের নিজেদেরকে অযোগ্য মনে হয়। এই প্রবণতার পরিধি হচ্ছে একদিকে এই ছাত্রদের বারংবার মনে করিয়ে দেওয়া যে তারা এই ইন্সটিটিউশনের একেবারেই অনুপযুক্ত, অন্যদিকে তাদেরকে বারংবার খোলাখুলি বলা হয় যে কলেজ ক্যান্টিন এবং মেসে তারা যে মানের খাবার পাচ্ছে তার জন্য তাদেরকে কৃতজ্ঞ থাকতে হবে।” (পৃঃ ৪৬-৪৭)
কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রকের তরফে ২০১৯ সালে লোকসভায় পেশ করা হিসেব অনু্যায়ী দেখা যাচ্ছে, ২৩টি আইআইটিতে ৬,০৪৩ জন ফ্যাকাল্টি সদস্যের মধ্যে ১৪৯ জন SC, এবং ২১ জন ST – মোট ফ্যাকাল্টি সংখ্যার ৩%-এরও কম। একই ছবি দেখতে পাওয়া যাবে সর্বভারতীয় ১৩টি ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট (IIMs) এবং দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে।
এমনকি এইমস-এর মতো মর্যাদাশালী আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সুবিদিত মেডিক্যাল শিক্ষার প্রতিষ্ঠানে এই জাত-বিভাজনের গুরুত্ব উপলব্ধি করে ২০০৭ সালে প্রোফেসর থোরাট কমিটির রিপোর্ট পেশ করা হয়। সে রিপোর্টে রেকমেন্ড করা হয় – “The Committee recommends that the AIIMS should set up a special office called “Equal Opportunity Office” to deal with all the issues relating to SC, ST and OBC students. This office should implement the remedial coaching programs and other schemes for the SC/ST students. It should also serve as an office which will address the grievances of SC/ST students and also other problems. It should be headed by a senior faculty and supported by one more faculty with proper supporting staff and funding.” (পূর্বোক্ত, পৃঃ ৯৯)
ল্যান্সেট-এর মতো মান্য মেডিক্যাল জার্নালে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে “The health of India: a future that must be devoid of caste” (নভেম্বর ২৯, ২০১৪)। এ প্রতিবেদনে বলা হয় – “This ingrained inequality has led to tacit acceptance of the caste system, which has created, among other challenges, a preventable epidemic of mortality among women and children. Indeed, many of India’s health indicators fare poorly in comparison with its neighbouring countries and economic peers.” (পৃঃ ১৯০১)
ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নাল (Global Health)-এ প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে (“Is health politically irrelevant? Experimental evidence during a global pandemic”, ২৫ অক্টোবর, ২০২০, পৃঃ ১-৮) বলা হয় – “ভারতের জাতপাত ব্যবস্থা একটি ‘disabling myth’ যা নারী এবং শিশুদের ক্ষেত্রে প্রতিরোধযোগ্য এবং ন্যায়পরায়তাহীন মৃত্যুহারের দ্যোতক … সবচেয়ে ধনী ৯৩% মানুষ পরিষ্কার করার জন্য সাবান এবং জল ব্যবহার করতে পারে, যেখানে সবচেয়ে নীচের দিকে থাকা ২৫% মানুষও এগুলোর নাগাল পায়না। সবচেয়ে কম সম্পদ থাকা নীচের তলার মানুষের প্রতি ৫ জনের মধ্যে ১ জনও জল, সাবান এবং অন্যান্য পরিচ্ছন্ন হবার উপাদান থেকে বঞ্চিত। উঁচু জাতির মানুষেরা প্রাধান্যপূর্ণভাবে ধনী (57% of the upper castes are in the richest two quintiles), যেখানে শিডিউলড ট্রাইবদের ৭০% এবং শিডিউলড কাস্টদের ৫০% belong to the lowest two quintiles.”
এখানে গান্ধী-শিষ্য নির্মলকুমার বসুর মন্তব্য প্রাসঙ্গিক। বসু লিখছেন – “হিন্দুরা যে কোনও কালে, কামার, কুমার, স্যাকরা, ব্যবসায়ী, চাষী সকলকে লইয়া একটা যৌথ পরিবার গড়িবার চেষ্টা করিয়াছিলেন, যে পরিবারের মধ্যে সকলের আয় সম্মিলিত হইয়া অবশেষে বিভিন্ন ব্যক্তিবিশেষের প্রয়োজনমতো ব্যয়িত হইত, শাস্ত্রগ্রন্থে কোথাও তাহার প্রমাণ নাই।” (“হিন্দু সোশ্যালিজম”, বাঙালির সাম্যবাদ চর্চা, সম্পাঃ শিপ্রা সরকার, অনমিত্র দাস, আনন্দ, ২০১৯, পৃঃ ১৮৭)
ঐতিহাসিক হিতেশরঞ্জন সান্যাল “স্বরাজ” নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলছেন – “প্রথম বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে স্বদেশী আন্দোলনের সময় (১৯০৫-১৯১১) বিভিন্ন রাজনৈতিক কাজকর্মে ও অরবিন্দ ঘোষ প্রমুখ নেতৃবৃন্দের রচনায় সার্বভৌমিকতা অর্থে স্বরাজের তাৎপর্য স্পষ্ট, আরও প্রসারিত হয়। বিদেশী শাসন, পণ্য, শিক্ষা ও ধ্যানধারণার পরিবর্তে স্বদেশী চালাইবার যে চেষ্টা এই সময় হইয়াছিল তাহার লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক, আর্থিক ও সাংস্কৃতিক পর্যায়ে ভারতীয় সার্বভৌমিকতা প্রতিষ্ঠা।” (স্বরাজের পথে, প্যাপিরাস, ২০১৪, পৃঃ ১) নজর করলে বুঝবো, এই প্রকল্পের মধ্যে অস্পৃশ্য বা দলিত শ্রেণীর কোন অবস্থান নেই।
এরকম সামগ্রিকতার মধ্যে নৈবদ্যের ওপরে বাতাসার মতো করে “প্রদর্শনী” হিসেবে রয়েছেন ১ জন দলিত শ্রেণীর রাষ্ট্রপতি এবং ২ জন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি – কে জি বালাকৃষ্ণন এবং ভূষণ রামকৃষ্ণ গাভাই।
প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায়, ঐতিহাসিক দীপেশ চক্রবর্তী জুটমিলের শ্রমিকদের নিয়ে তাঁর গবেষণা গ্রন্থ Rethinking Working-Class History – Bengal 1890-1940 (১৯৮৯)-এ দেখিয়েছেন – আমরা শ্রমিক শ্রেণী বলতে ইউরোপীয় ধারণায় যে সংহত, খানিকটা সমসত্ত্বও বটে এবং একধরনের সামাজিক লক্ষ্য নিয়ে গঠিত শ্রেণী বা ক্লাসের কথা ভাবি সেরকমটা ভারতের প্রেক্ষিতে হুবহু খাপ খায়না – “The close and contradictory existence of a religious, and potentially divisive, outlook and an antiemployer, and hence potentially uniting, mentality was thus characteristic of the collective public acts of the jute-mill work force.” (পৃঃ ১৯৪)

ভারতে জাতের বৈষম্য – মার্ক্স, গান্ধী এবং আম্বেদকর
ফরাসি সমাজতাত্ত্বিক লুই দুমোঁর অধুনা ক্ল্যাসিক গ্রন্থ Homo Hierarchicus: Caste System and Its Implication ১৯৬৭ সালে ফরাসী ভাষায় (১৯৭০ সালে প্রথম ইংরেজি সংস্করণ) প্রকাশিত হয়। এ গ্রন্থটি ভারতের জাত-ভিত্তিক সমাজব্যবস্থা বোঝার জন্য একটি অত্যাবশ্যক গ্রন্থ। বইয়ের শিরোনাম লক্ষ্যণীয় – হোমো হায়েরির্কাস (নীচু থেকে উঁচুতে থাকবন্দী মানুষ)।
গ্রন্থের শুরুতেই তিনি জানান – “আমাদের সামাজিক ব্যবস্থা থেকে জাতভিত্তিক ব্যবস্থা মূল ভাবাদর্শের দিক থেকে এতটাই পৃথক যে আধুনিক পাঠকেরা নিঃসন্দেহে এ বইটি সম্পূর্ণ পাঠ করার তাগিদ খুব সামান্যই অনুভব করবে।” এখানে পাঠকেরা খেয়াল করবেন “আমাদের সামাজিক ব্যবস্থা” শব্দবন্ধ। অর্থাৎ ইউরোপীয় সমাজের আভ্যন্তরীণ বিকাশের সাথে ভারতের সমাজ কাঠামোর পার্থক্য খুব প্রকট। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানাচ্ছেন – “এত জাতের উপস্থিতি আমাদের একটি মৌলিক সামাজিক শিক্ষা দেয় – হায়েরার্কি। আমরা আধুনিক সমাজে এর বিপরীত নীতিসমূহ গ্রহণ করেছি।” (পৃঃ ২)
দুমোঁর ধারণায় – “আধুনিক সমাজের বিপরীতে ট্র্যাডিশনাল বা ঐতিহ্যাশ্রয়ী সমাজে সাম্য এবং স্বাধীনতার (ইক্যুয়ালিটি এবং লিবার্টি) একেবারে অজানা। এবং সংক্ষেপে বললে, ব্যক্তির ধারণাও অজানা।” (পৃঃ ৮) এবং “জাত কোন কুলুঙ্গি (niche) বা বিভাগ (block) নয়, কিন্তু সাধারণত অনেক subcaste-এর উপভাগে বিভক্ত, অন্তত গোড়ার স্তরে”। (পৃঃ ৬১)
আর বেশি প্রলম্বিত না করে অল্পকথায় বলা যায়, ভারতের মতো সমাজে ব্যক্তি নেই, আছে জাতি, সাম্য নেই, আছে উচ্চনীচের ভেদ, প্রতিযোগিতা নেই, আছে পারস্পরিক নির্ভরতা। (পার্থ চট্টোপাধ্যায়, পূর্বোক্ত, পৃঃ ৯১)
আমরা এবারে দেখতে চাইব, সমাজ গঠনের এই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান নিয়ে মার্ক্সের কি ধারণা ছিল। পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বয়ানে এসবের সংক্ষিপ্ত এবং প্রায়-পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা আমরা জেনে নেব। পার্থ বলছেন – “ভারতবর্ষ নিয়ে পড়াশোনা কিংবা লেখার সময় মার্কস-এর চিন্তায় একটাই মূল প্রশ্ন ছিলঃ ভারতীয় সমাজের ঐতিহাসিক অগ্রগতির সম্ভাবনা কী, কোন পথে সে অগ্রগতি সম্ভব, সে পথে বাধা কোথায়? বিশ্ব-ইতিহাসের ক্রমবিকাশের যে ছক তিনি ইউরোপের সমাজবিবর্তনের ধারা থেকে আবিষ্কার করতে চাইছিলেন, বলা বাহুল্য সেই ছকের সঙ্গে মিলিয়েই ভারতবর্ষ নিয়ে এই প্রশ্ন জেগেছিল তাঁর মনে। কিন্তু উনিশ শতকের মধ্যভাগে বসে ইউরোপের ইতিহাসের সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে প্রাচ্যের সমাজব্যবস্থার ক্ষেত্রে নানা রকম বৈসাদৃশ্যই প্রধানত চোখে পড়েছিল ইউরোপীয় পণ্ডিতদের – মার্কস-এরও। মার্কসের ক্ষেত্রে যেটা লক্ষ্যণীয় সেটা হল যে মার্কস-এর চিন্তা কিন্তু এক জায়গায় থেমে থাকেনি। ১৮৫০-এর দশক থেকে তাঁর শেষ জীবনে ১৮৮১-৮২ পর্যন্ত এ বিষয়ে মার্কস যতই খোঁজখবর করেছেন, ততই পশ্চিম ইউরোপে পুঁজিবাদী বিকাশের ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে তিনি সচেতন হয়েছেন, অন্যদিকে প্রাচ্য-সমাজের বিবর্তনের স্বকীয় রূপগুলি সম্পর্কেও তাঁর ধারণা স্পষ্টতর হয়েহে। এই প্রসঙ্গে এশিয়ার দেশগুলিতে, বিশেষ করে ভারতবর্ষে, ঔপনিবেশিক অনুপ্রবেশের ঐতিহাসিক তাৎপর্য নিয়ে তাঁর মতামতও মৌলিকভাবে পালটে গেছে।” (“বাঙ্গালার গ্রাম-সমাজ সম্পর্কে কার্ল মার্কস”, পূর্বোক্ত, পৃঃ ১০১)
১৮৪৬ সালে মার্ক্সের প্রথম প্রকাশিত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ The German Ideology প্রকাশিত হয়। একটি সুবৃহৎ গ্রন্থ। এ গ্রন্থে তিনি বলেন – “legislation may perpetuate land ownership in certain families, or allocate labour as a hereditary privilege, thus consolidating it into a caste system. In all these cases, and they have all occurred in history, it seems that distribution is not regulated and determined by production but, on the contrary, production by distribution.” (লরেন্স অ্যান্ড উইশার্ট সংস্করণ, ১৯৭৪, পৃঃ ১৩৬) বোঝা যাচ্ছে, এসময় থেকেই জাত তথা caste-এর বিষয়টি সম্ভবত তাঁকে ভাবাচ্ছিল।
১৮৫৩ সালের জুন মাসে নিউ-ইয়র্ক ডেইলি ট্রিবিউন-এর জন্য লন্ডনে বসে মার্ক্স যখন “The British Rule in India” লিখছেন তখন অবধি তাঁর চিন্তায় ছিল ব্রিটিশের মারফৎ ধনতান্ত্রিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার static তথা নিশ্চল ভারতীয় সমাজের মধ্যেকার সম্পর্কগুলোর ক্ষেত্রে পরিবর্তন ঘটাবে। সেসময়ে তিনি লিখছেন – “এটা সত্য যে ইংল্যান্ড ভারতে একটি সামাজিক বিপ্লব ঘটাচ্ছে, যদিও কেবলমাত্র নিজেদের হীনতম স্বার্থ থেকে এবং নির্বোধের মতো এগুলোকে বল পূর্বক বলবৎ করছে। কিন্তু সেটা প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হল, এশিয়ার সামাজিক অবস্থার মূলগত বিপ্লব ছাড়া মানবজাতি কি এর লক্ষ্যের দিকে পৌঁছতে পারবে? যদি তা না হয়, ইংল্যান্ড যত অপরাধই করুক না কেন সে ইতিহাসের অসচেতন হাতিয়ার হিসেবে এই বিপ্লব ঘটানোর কাজটি করছে।”
এ প্রবন্ধেই তিনি লিখলেন – “অবৈধ ব্রিটিশ অনুপ্রবেশকারীরা ভারতের তাঁত শিল্প ভেঙ্গে দিয়েছে এবং চরকাকে ধ্বংস করেছে। ইউরোপের বাজার থেকে ইংল্যান্ড প্রথমে ভারতীয় তুলোকে তাড়িয়ে দিয়েছে, তারপরে ইংল্যান্ডের পাকানো সুতো (twist) ভারতের বাজারে আমদানি করেছে। এবং সবশেষে, তুলোর মাতৃভূমি-তুল্য সমস্ত দেশের বাজার নিজেদের তুলো দিয়ে প্লাবিত করেছে। ১৮১৮ থেকে ১৮৩৬ সালের মধ্যে গ্রেট ব্রিটেন থেকে ভারতে পাকানো তুলোর রপ্তানি ৫,২০০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯২৪ সালে ভারতে ব্রিটিশ মসলিনের বড় জোর ১,০০০,০০০ গজ ছিল, ১৯৩৭ ব্রিটেন থেকে রপ্তানি করা মসলিনের পরিমাণ বেড়ে ৬৪,০০০,০০০ গজেরও বেশি হয়েছে। কিন্তু একই সময়ে ঢাকার (মসলিন উৎপাদনের মূল কেন্দ্র) জনসংখ্যা হ্রাস পেয়েছে ১৫০,০০০ থেকে ২০,০০০-এ। ভারতের যে শহরগুলো তাদের বস্ত্রশিল্পের জন্য এতদিন সুপ্রসিদ্ধ ছিল সেগুলোর এভাবে শুকিয়ে যাওয়াকেও সবচেয়ে খারাপ পরিণতি বলা যাবেনা। আরও খারাপ হচ্ছে, ব্রিটিশের বাষ্পশক্তি এবং বিজ্ঞান ভারতের সমগ্র ভূমি থেকে কৃষি এবং উৎপাদন শিল্পের যে সমন্বয় ছিল তাকে উৎখাত করে দিয়েছে।”
সমাজ বিপ্লবের তথা মৌলিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির অসীম সম্ভাবনা নিয়ে সম্ভবত তাঁর সমকালে অন্য কোন চিন্তাবিদ এত গভীরভাবে ভাবেননি। তবে মনে হয় এসময় মার্ক্সের ধারণায় ছিল যে আবহমান কাল ধরে চলে আসা ভারতের সমাজ জীবনে যেখানে একই ব্যক্তি একইসাথে কৃষক ও উৎপাদক, এই কাঠামোটি ভেঙ্গে গিয়ে নতুন শ্রেণীর (class) উদ্ভব হবে ইতিহাসের নতুন চালিকাশক্তি হিসেবে। তখনও পর্যন্ত জাতের (caste) প্রশ্ন তাঁকে সেভাবে ভাবায়নি। কিন্তু caste থেকে class-এ উত্তরণ/রূপান্তর হবে এরকম কোন তত্ত্বও তাঁর তত্ত্বায়নে পাওয়া যাবেনা।
এরপরে ১৮৫৩ সালের জুলাইয়ের শেষ দিকে একই পত্রিকায় লিখলেন “The Future Results of British Rule in India”। এ লেখায় তিনি জানালেন – “ওরা (ইংরেজরা) দেশীয় শিল্পকে উপড়ে ফেলে দেশীয় জনসমাজকে ভেঙ্গে দিয়েছে, এবং সমাজের যাকিছু মহান এবং উচ্চভূমিতে ছিল, সমস্তকিছুকে সমতল করে দিয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে এদের শাসনকালের যে পাতাগুলো লেখা হচ্ছে তাতে ধ্বংসের কাহিনীর বাইরে প্রায় আর কিছু নেই। পুনরুজ্জীবনের কোন চিহ্নরেখা এই ধ্বংসস্তুপের মধ্য থেকে প্রায় দেখাই যাচ্ছেনা। তা সত্ত্বেও এটা শুরু হয়েছে।”
১৮৭৭ সালের নভেম্বর মাসে “OTECHESTVENN!YE ZAPISKI” (ইংরেজিতে Annals of the Fatherland) পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলীর কাছে একটি চিঠিতে লেখেন – “ভীষণভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ ঘটনাসমূহ যেগুলো বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন ঐতিহাসিক বাস্তবতায় জন্ম নিয়েছে সেগুলো একেবারে পৃথক ফলাফলের জন্ম দিয়েছে। এরকম প্রতিটি বিবর্তনকে আলাদা করে পর্যবেক্ষণ এবং তুলনা করলে যে কেউ সহজে বুঝতে পারবে এগুলোর অন্তর্নিহিত সত্যিকে, কিন্তু এরকমটা ঘটা কখনও সম্ভব নয় যে কেউ এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছুলো যে একটি ‘master key a general historico-philosophical theory, the ·supreme virtue of which consists in being super-historical’ রয়েছে।” যদি থাকে তাহলে একে আর ঐতিহাসিক বলা যাবেনা, বলতে হবে “super-historical”। (Marx and Engels – Selected Correspondence, সংশোধিত ২য় সংস্করণ, প্রোগ্রেস পাবলিশার্স, ১৯৬৫, পৃঃ ৩১৩)
মার্ক্স তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত রচনা এবং বিশ্বের চিরস্থায়ী সম্পদ ক্যাপিটালঃ এ ক্রিটিক অফ পলিটিকাল ইকোনমি (আমেরিকান সংস্করণ, ১৯০৬)-তে লিখছেন – “the conversion of fractional work into the life-calling of one man, corresponds to the tendency shown by earlier societies, to make trades hereditary; either to petrify them into castes, or whenever definite historical conditions beget in the individual a tendency to vary in a manner incompatible with the nature of castes, to ossify them into guilds.” (পৃঃ ৩৭৩)
অর্থাৎ, বলবার কথা এই যে ইউরোপের সামাজিক বিকাশের ধারার সাথে একেবারে মেলেনা প্রাচ্যের এদিকগুলোর বিশিষ্টতা তাঁর জীবনাবসান পর্যন্ত ক্রমাগত ভাবিয়েছে। এর মধ্যে caste একটি উপাদান। আরেকটি উপাদান হল Asiatic Mode of Production। তাঁর চিন্তা একজায়গায় থেমে থাকেনি। এবং, একইসাথে, তাঁর অনুগামীদের সতর্ক করেছেন এই বলে যে বিশ্বের বিভিন্ন বৈচিত্র্যসম্পন্ন ভিন্ন ভিন্ন সমাজের মুক্তির জন্য কোন একটি সব-খোল চাবি তথা masterkey নেই।
১৯৭৪ সালে লরেন্স ক্রেডার সম্পাদিত The Ethnological Notebooks of Karl Marx (Van Gorcum & Company, Netherlands) থেকে আমরা জানতে পারি ১৮৮১-৮২ সাল পর্যন্ত মার্ক্স (প্রয়াত ১৮৮৩ সালে) এশীয় দেশগুলোর সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রানৈতিক বৈশিষ্ট্য বোঝার জন্য সক্রিয়ভাবে চিন্তা করেছেন। তিনি চারজনের লেখা – Lewis Henry Morgan, Sir Henry Sumner Maine, Sir John Budd Phear and John Lubbock – মন দিয়ে অধ্যয়ন করেছেন। লেখাগুলোর পাশে জার্মান ইংরেজি মিশিয়ে নোট রেখেছেন।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভারতের গ্রাম ব্যবস্থা নিয়ে লেখা ফিয়ারের ১৮৮০ সালে প্রকাশিত The Aryan Village in India and Ceylon বইটি। এই বইয়ের একজায়গায় ফিয়ার লিখছেন – “The chief development of the Boistobs originated with Chaitanya, who preached purity, meditation, and the equality of all men, without distinction of sect or caste, before God. He threw aside all ceremonies and outward symbols. And a certain freedom from caste trammels and disregard of religious observances”। এ অংশটুকু মার্ক্স আলাদা গুরুত্ব দিয়ে নোট করেছেন। (The Ethnological Notebooks of Karl Marx, পৃঃ ২৬০)
Phear-এর মূল বইটির একজায়গায় রয়েছে – “in some villages, where the occupation of a caste, say the weavers caste, has died a natural death , the members forced to earn their livelihood by manual labour, amongst other employments take to labour on the land for wages.” (The Aryan Village in India and Ceylon, পৃঃ ১৫) মোদ্দা কথা হল, কিছু কিছু গ্রামে জাত-ভিত্তিক পেশার “স্বাভাবিক মৃত্যু” ঘটেছে, জীবননির্বাহের জন্য এদের মজুরি তথা শ্রমশক্তির ওপরে নির্ভর করতে হয়। এখানে আমাদের মনে আসবে শরৎচন্দ্রের কালজয়ী কাহিনী “মহেশ”-এর কথা যেখানে ভূমিহীন কৃষক সব হারিয়ে পাড়ি দেয় চটকলের শ্রমিক হবার অজানা জীবনের পথে। মনে পড়বে মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝি-র কথা।
বোঝা যায়, ১৮৫৩ সালে মার্ক্সের ভারত নিয়ে ভাবনা ১৮৮১ সালে এসে ক্রমান্বয়ে পরিবর্তিত হচ্ছে। একটি চির-প্রশ্নশীল মন এবং সজীব চিন্তন এই দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয় থেকেছে এবং চিন্তার সরণী ধরে সম্মুখে অগ্রসরমান হয়েছে।
মার্ক্সের চিন্তাভূমিতে থাকা Asiatic Mode of Production নিয়ে আমি এখানে কোন আলোচনায় যাচ্ছিনা। তবে এটুকু উল্লেখ করাই যায় যে ১৯৭৪ সালে প্রথমবারের জন্য মিশরীয় স্কলার সামির আমিন একে “tribute-paying mode” বলে আখ্যায়িত করেন (“Modes of Production and Social Formation”, Ufahamu: A Journal of African Studies, 4 (3), 1974)। পরবর্তীতে অনেক গবেষকই “tributary mode of production” দিয়ে বিষয়টিকে বুঝতে চেয়েছেন।
গান্ধী এবং আম্বেদকর নিয়ে আলোচনার আগে একেবারে হালে (প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০২১) লেখা ক্রিস্তফ জাফ্রেলোর Modi’s India: Hindu Nationalism and the Rise of Ethnic Democracy থেকে দেখে নিই। জাফ্রেলো ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের উল্লেখ করে বলছেন – “সোশ্যাল মিডিয়ার পথিকৃৎ ব্যবহারের সঙ্গে বিজেপি সমান্তরালভাবে ভারতীয় রাজনীতির সবচেয়ে প্রাচীন পদ্ধতি নিম্ন জাতের পটভূমি থেকে উঠে আসা কিছু প্রার্থীকে নির্বাচনে লড়াইয়ের জন্য মনোনয়ন দেবার কায়দা গ্রহণ করেছিল। এই কৌশল সহজ হয়েছিল এ কারণে যে জাত-ভিত্তিক সংরক্ষণ সমানভাবে সমস্ত Scheduled Castes and Other Backward Classes-এর অন্তর্ভুক্ত মানুষদের সামাজিক সুবিধে দেয়নি … মহারাষ্ট্রে মাহার জাতের মানুষ যারা একসময় আম্বেদকরের পার্টিকে সমর্থন করেছিল তারা বিজেপির সমর্থনে কথা বলল … উল্লেখজনকভাবে, দরিদ্র SC এবং OBC মানুষেরা মধ্যবিত্ত SC এবং OBCদের তুলনায় বিজেপিকে অনেক বেশি ভোট দিয়েছে।” (পৃঃ ৩২৯-৩৩০)
এগুলো জাত নিয়ে ব্যবহারিক রাজনীতির দিক যা ভোটের আবাদে ভালো ফসল ফলায়। সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে বিজেপি ভারতের সমস্ত পার্টিকে এখানে টেক্কা দিয়েছে। আরেকটি ভিন্ন চরিত্রের ব্যবহারিক দিক নিয়ে এ প্রবন্ধের শুরুতেই আলোচনা করেছি – যেখানে মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রদের একদিকে সামাজিকভাবে তার জাত কি এটা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে, আবার অন্যদিকে তাকে জায়মান নতুন রাষ্ট্রের উপযোগী সুশীল ও বাধ্য তৈরি করার লক্ষ্যে নিয়ে আসা হচ্ছে “সেকুলার” শিক্ষাক্রমের মধ্যে।
আম্বেদকর এবং গান্ধী তাঁদের সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থান থেকে জাতের অবস্থান বুঝতে চেয়েছেন। উপনিবেশিক ভারতের বিশিষ্টতায় রাজনীতিতে জাতের অংশগ্রহণের চরিত্র কি এবং কোন প্রক্রিয়ায় হতে পারে কিংবা ভারতে যে সামাজিক কাঠামো সহস্রাধিক বছর ধরে ভারতকে নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে সেটাকে অক্ষুণ্ণ রেখে আদৌ একাজটি করা সম্ভব কিনা এ বিতর্কে প্রবৃত্ত হয়েছেন।
অরুন্ধতি রায় সম্পাদিত আম্বেদকরের Annihilation of Casteঃ The Annotated Critical Edition, (ভার্সো, ২০১৪) পুস্তকে “The Doctor and the Saint” শিরোনামে অরুন্ধতি রায়ের নিজের একটি সুদীর্ঘ ভূমিকা বা স্বতন্ত্র গবেষণাজাত লেখা রয়েছে। সে লেখাটি থেকে কিছুটা উদ্ধৃত করা যায় আলোচনাকে সহজ করার জন্য।
অরুন্ধতি লিখছেন – “অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে গান্ধীর প্রচারাভিযান যা কার্যকরীভাবে করেছিল তাহল শতাব্দী-প্রাচীন ক্ষতের ওপরে মলমের প্রলেপ দেওয়া (to rub balm on injuries that were centuries old)। বিপুলসংখ্যক এই অস্পৃশ্য মানুষদের কাছে, যারা এতদিন ধরে ক্রমাগত সন্ত্রস্ত হয়ে থাকতে অভ্যস্ত হয়েছে, সমস্ত ক্ষেত্রে কেবল বিতাড়িত এবং ক্ষতবিক্ষত হয়েছে (accustomed only to being terrorised, shunned and brutalised), তাদের মাঝে গান্ধীর এই মিশনারি কার্যকলাপ কৃজ্ঞতা এবং পুজো করার মতো বোধের জন্ম দেবে। গান্ধী এটা জানতেন, তিনি একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন। আম্বেদকর রাজনীতিবিদ ছিলেননা। অথবা কোন হিসেবেই ভালো রাজনীতিবিদ নন। গান্ধী জানতেন কিভাবে দাক্ষিণ্যকে একটি ঘটনায়, একটি থিয়েটারে, আতশবাজির মতো তাক-লাগানো প্রদর্শনীতে পরিণত করা যায় (how to make charity an event, a piece of theatre, a spectacular display of fireworks)। একারণে, যখন ডক্টর (আম্বেদকর) দীর্ঘস্থায়ী নিরাময় খুঁজে চলেছেন, সন্ত (গান্ধী) সমগ্র ভারত পরিভ্রমণ করেছেন এবং placebo বিতরণ করে চলেছেন।” (পৃঃ ১৩০)
এ প্রবন্ধের পরিসরে গান্ধী কিংবা আম্বেদকর দুজনের কাউকে নিয়েই বিস্তৃত আলোচনার অবকাশ নেই। তবে উভয়েরই সামান্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধারণা নিয়ে আলোচনা করা যায় – cherry-picking-কে পরিহার করে।
গান্ধী গুজরাতিতে গুজরাতি জার্নাল নব-জীবন-এ caste নিয়ে একটি লেখা লিখেছিলেন। আম্বেদকর সে লেখার ইংরেজি অনুবাদ করেন। এ লেখাতে গান্ধী বলেন – “আমি বিশ্বাস করি হিন্দু সমাজ যে দাঁড়িয়ে আছে তার কারণ হচ্ছে এটা জাত-ব্যবস্থার ওপরে প্রতিষ্ঠিত … যে সমাজ জাত-ব্যবস্থা সৃষ্টি করতে পারে তার অবশ্যই অনন্য সাংগঠনিক ক্ষমতা রয়েছে … জাত-ব্যবস্থার প্রাথমিক শিক্ষাবিস্তারের ক্ষেত্রে একটি রেডিমেড পদ্ধতি রয়েছে। প্রতিটি জাতই তার জাতের শিশুদের শিক্ষার দায়িত্ব নিতে পারে। জাতের রাজনৈতিক ভিত্তিও আছে … জাতের অন্য নাম হল নিয়ন্ত্রণ। জাত-ব্যবস্থা আনন্দ-উল্লাসের ক্ষেত্রে সীমারেখা টেনে দেয়। আনন্দ উপভোগের জন্য জাত-ব্যবস্থা কখনও একজনকে তার জাতের সীমা লঙ্ঘনের অনুমতি দেয়না। বিভিন্ন জাতের একসাথে বসে খাওয়া বা অসবর্ণ বিবাহকে আটকানো হল এই জাত-ব্যবস্থার মূল অর্থ। অভিজ্ঞতা এ কথা বলেনা যে বিভিন্ন জাতের একসাথে বসে খাওয়া কোন বন্ধুত্বের জন্ম দেয় … জাত-ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা এবং পশ্চিমী ইউরোপীয় সমাজ ব্যবস্থাকে গ্রহণ করার অর্থ হল হিন্দুরা বংশগত পেশার নীতিমালাকে বিসর্জন দেবে, যা জাত-ব্যবস্থার আত্মা স্বরূপ। বংশগত নীতি হল শাশ্বত নীতি। একে পরিবর্তন করার অর্থ হল চরম বিশৃঙ্খলার জন্ম দেওয়া … জাত-ব্যবস্থা সমাজের একটি প্রাকৃতিক বিন্যাস। ভারতে একে ধর্মের আবরণ দেওয়া হয়েছে।” (Dr. Babasaheb Ambedkar Writings and Speeches, Vol. 9, ২০১৪, পৃঃ ২৭৫-২৭৬)
আমেরিকান থিওলজিস্ট ডঃ জন আর মটের সাথে (ডঃ মট ১৯৪৬ সালে নোবেল শান্তি পুরষ্কার পান) গান্ধীর ১৯২৯ সালের মার্চ মাসে একটি কথোপকথন হয়েছিল। সে কথোপকথনে মটের একটি প্রশ্নের উত্তরে গান্ধী জানান – “ডঃ মট আপনি কি মনে করেন যে আপনি একটি গরুর কাছে আপনার গসপেল প্রচার করবেন? ভালো কথা, অস্পৃশ্যদের একটি অংশ বোধবুদ্ধির ক্ষেত্রে গরুর চেয়েও নিকৃষ্ট।” (যোগেন্দ্র যাদব, “Discussion of Mahatma Gandhi with John R. Mott” May 8, 2013, Gandhi Research Foundation, Jalgaon, Maharashtra, India)
অরুন্ধতি জানাচ্ছেন যে ১০ জানুয়ারি ১৯২৭-এ “মহদ সত্যাগ্রহে”র (১৯২৭ সালের ২০ মার্চ আম্বেদকারের নেতৃত্বে হাজার হাজার দলিতদের নিয়ে মহারাষ্ট্রের মহদ বা মাহাদ অঞ্চলে যে ঐতিহাসিক সত্যাগ্রহ হয়েছিল) প্রাক্কালে গান্ধী তাঁর স্পনসর এবং বন্ধু জি ডি বিড়লাকে একটি চিঠিতে জানান “অর্থের জন্য আমার তৃষ্ণা প্রশমিত হয়না। আমার এখন অন্তত ২,০০,০০০ টাকা প্রয়োজন – খাদি, অস্পৃশ্যতা এবং শিক্ষার জন্য।” (পূর্বোক্ত, পৃঃ ১০৬) বিড়লা Margaret Bourke-White-কে (লাইফ ম্যাগাজিনের যিনি চিত্র সাংবাদিক ছিলেন) বলেন – “অকপটে বললে, আমরা মন্দির বানাই বটে তবে মন্দিরে বিশ্বাস করিনা। মন্দির বানাই ধর্মীয় মানসিকতা ছড়িয়ে দেবার জন্য।” (পূর্বোক্ত, পৃঃ ১৩০) এই ধর্মীয় মানসিকতা প্রকৃতপক্ষে উচ্চবর্ণ নিয়ন্ত্রিত, প্রধানত ব্রাহ্মণ ও বেনিয়া নিয়ন্ত্রিত, জাত-ব্যবস্থাকে ভারতীয় সমাজে চিরস্থায়ী রাখার ধর্ম।
অরুন্ধতি আরও জানাচ্ছেন – “বাল্মিকীদের (অস্পৃশ্যদের মধ্যেও নীচুতলার) প্রতি গান্ধীর মনোযোগ, তাঁর অতি-প্রচারিত “ভাঙ্গি বস্তি”তে যাওয়া, রাজনৈতিক লভ্যাংশ দিয়েছে। যদিও এটা ঘটনা যে ভাঙ্গিদের তিনি অনুকম্পা এবং ঘৃণার চোখেই দেখতেন।” (পৃঃ ১০২)
এখানে আরেকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করে গান্ধী প্রসঙ্গে ইতি টানা যায়। আমেরিকান সাংবাদিক লুই ফিশারের সাথে গান্ধীর কথোপকথন থেকে (জুন ৬, ১৯৪২) জানতে পারি গান্ধীর কাছে ফিশার জানতে চান “তাঁকে কংগ্রেস দল নিয়ে আলোচনার জন্য বেশ কিছু প্রশ্ন ছিল। অতি উচ্চপদস্থ ব্রিটিশরা, আমি স্মরণ করলাম, আমাকে বলেছেন যে কংগ্রেস বৃহৎ ব্যবসায়ীদের ক্রীড়নক এবং গান্ধীকে বোম্বের মিল মালিকরা সমর্থন করে, তিনি যতটা চান ততটা অর্থ দেয়। “এর মাঝে কতটা সত্যি আছে?”। গান্ধী প্রত্যুত্তরে বলেন – “দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এগুলো সত্যি”, গান্ধী সহজভাবে জানান। “কংগ্রেসের কাছে এর কাজকর্ম চালানোর মতো যথেষ্ট অর্থ নেই। আমরা শুরুর দিকে ভেবেছিলাম প্রতিটি সদস্যের কাছ থেকে প্রতিবছর ৪ আনা (প্রায় ৮ সেন্ট, আমেরিকান মুদ্রায়) করে চাঁদাসংগ্রহ করলে কাজ চলে যাবে। কিন্তু এ দিয়ে কোন কাজ হলনা।” “(Louis Fisher, A Week with Gandhi, George Allen & Unwin Ltd, পৃঃ ৫১)
এরকম একটা অবস্থানে থেকে জাত-ব্যবস্থা এবং সামাজিক রূপান্তরের বিষয়ে কেউ ভাবছেন বা ভাবতে পারেন একথা ভাবনায় আনা অলীক কল্পনা মাত্র।
খানিকটা প্রসঙ্গের বাইরে হলেও (আবার এক অর্থে প্রাসঙ্গিকও বটে) ইহুদিদের ওপরে হিটলার এবং নাৎসীবাহিনীর অত্যাচার নিয়ে গান্ধীর অভিমত আলোচনা করা যেতে পারে। হরিজন পত্রিকায় (১৭.১২.১৯৩৮) “Some Questions Answered” শিরোনামের একটি প্রবন্ধে লিখলেন – “সবচেয়ে পাথুরে হৃদয়কেও অহিংস হবার কষ্টভোগ গলিয়ে দেয় বলে প্রমাণিত হয়েছে। আমি দৃঢ়তার সাথে বলতে চাই, যদি ইহুদিরা তাদের আত্মিক ক্ষমতাকে সাহায্য করার জন্য কেবলমাত্র অহিংসা থেকে উদ্ভুত শক্তিকে ডেকে নিতে পারে তাহলে Herr Hitler তাদের সাহসিকতার কাছে মাথা নত করবে। এমন ঘটনা মানুষদের সাথে ব্যবহার করার সময় হিটলার এখনও অবধি বৃহদাকারে প্রত্যক্ষ করেনি। যদি এই শক্তি দেখানো যায় তাহলে যে দেখাচ্ছে তার অধিকারে থাকবে সেই শক্তি যা হিটলারের storm trooperদের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। শক্তির এই প্রদর্শনী কেবল তখনই সম্ভব যখন সত্যের ঈশ্বর এবং অহিংসার প্রতি (তথা ভালোবাসা) জীবন্ত বিশ্বাস রয়েছে।” (Collected Works of Mahatma Gandhi, vol. 74, পৃঃ ২৯৮)
ইহুদিদের গণহত্যা তথা Holocaust নিয়ে গান্ধীর ধারণা ছিল এরকম – “হলোকস্ট বা ঐতিহাসিক গণহত্যাকে পেছন ফিরে দেখে গান্ধী বলেছিলেন, হিটলার ৫০ লক্ষ ইহুদিকে হত্যা করেছে। আমাদের সময়ে এ ঘটনা বৃহত্তম অপরাধ। কিন্তু ইহুদিরা তাদেরকে এক ঘাতকের ছুরির সামনে নিজেদের উৎসর্গ করবে। তাদের উচিত পাহাড়ের চুড়ো থেকে নিজেদেরকে সমুদ্রে ফেলে দেওয়া …’ তিনি আরও বলেছিলেন, যদি ইহুদিরা নিজেরাই সম্মিলিতভাবে আত্মহত্যা করে তাহলে তাহলে সেটা হবে এক “বীরত্ব”।” (“Repudiating Gandhian pacifism in the face of mass murder”, The Jerusalem Post, মার্চ ৩১, ২০১৬) গান্ধীর হিসেবে ৫০ লক্ষ ইহুদির মৃত্যু হলেও তাঁর ইহুদিদের জন্য পরামর্শ ছিল যে তারা যেন ঘাতকের ছুরির সামনে নিজেদের উৎসর্গ করে। তাহলে সমগ্র পৃথিবীর মানুষ তাদের “বীরত্ব”কে স্মরণে রাখবে। এরকম পরামর্শও বাস্তবে দেওয়া সম্ভব?
আমরা একটু গভীরে নজর করলে অন্য একটি দার্শনিক/মতাদর্শগত সত্যকেও হয়তো হৃদয়ঙ্গম করতে পারব। প্রকৃত অর্থে গান্ধী ইহুদিদেরকে রাষ্ট্রের তরফে সমাজে যে স্থিতাবস্থা রয়েছে তাকে মান্য করার পরামর্শ দিচ্ছেন নানা অছিলায় (লঘু করে বললে) – কখনো সত্যাগ্রহের অবলম্বন, কখনো নিষ্ক্রিয়ভাবে আত্মাহুতি দেবার কথা বলে। এর সাথে ভারতে জাত নিয়ে গান্ধীর যে সুস্পষ্ট অভিমত ছিল তার মিল এখানেই যে নীচুজাত/অস্পৃশ্যদের “হরিজন”-এর মতো শ্রুতিকটুর পরিবর্তে কোমল নাম দিয়ে অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়টিকে লঘু করে ভারতের সামাজিক স্থিতাবস্থা রক্ষা করার জন্যই চেষ্টা করে গেছেন।
“এটিক” এবং “এমিক” – সমাজের বাইরের ও ভেতরের বিতর্ক
বিস্তৃতভাবে এ বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য আরও অনেক পুস্তক এবং প্রবন্ধের মধ্যে একটি হল টমাস হেডল্যান্ড, কেনেথ পাইক এবং মারভিন হ্যারিস সম্পাদিত বই Emics and Etics: The Insider/Outsider Debate (সেজ প্রকাশনা)। বইটি ১৯৯০ সালে প্রকাশিত হয়। সহজভাবে বলকে, এ বইয়ে “এমিক” শব্দটিকে শবতত্ত্ব, নৃতত্ত্ববিদ্যা এবং সমাজতত্ত্বের দিক থেকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এভাবে – যাঁরা স্থানীয়ভাবে মানুষের মাঝে অবস্থান করেন এবং বোঝার চেষ্টা করেন মানুষ কিভাবে ভাবছেন এবং সে বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা করেন। এঁরা একটি নির্দিষ্ট সংস্কৃতি নিয়েই কথা বলেন। এই অর্থে গান্ধী বা আম্বেদকর ভারতীয় সমাজের ভেতরের লোক বা “ইনসাইডার”। বিপরীতদিকে, “এটিক” approach হল “বাইরের লোক” হিসেবে বিভিন্ন সংস্কৃতি ও সমাজের মধ্যেকার যোগসূত্র খোঁজার ও বোঝার ধারাবাহিক ও নিরলস প্রয়াস। এই অর্থে মার্ক্সের ভারতের সমাজব্যবস্থা বোঝার ও ব্যাখ্যা করার প্রচেষ্টা “এটিক” অবস্থান।
আমাদের বর্তমান আলোচনার এদুটি অবস্থানের পারস্পরিক সংযোগ আছে, আবার নেইও। যারা আগ্রহী পাঠক তাঁরা এ বিষয়ে আরও অনেকদূর ভাবতে পারবেন। এ কারণে এ প্রসঙ্গকে ছুঁয়ে যাওয়া।

আম্বেদকর (১৮৯১-১৯৫৬)
এক দরিদ্র, অস্পৃশ্য পরিবার থেকে উঠে আসা মানুষটি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং লন্ডন স্কুল অফ ইকনোমিকসের মতো দুটি বরেণ্য প্রতিষ্ঠান থেকে দুবার ইকনোমিকসে ডক্টরেট ডিগ্রি পান। লন্ডনে আইন শিক্ষার বিখ্যাত শিক্ষাকেন্দ্র Gray’s Inn-এ আইন শিক্ষার জন্যও তিনি তাঁর নাম ১৯১৬ সালে নথিভুক্ত করেন। ১৯১৬ সালে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার’স থিসিস হিসেবে লেখেন “Castes in India: Their Mechanism, Genesis and Development”, এবং এ থিসিসটি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যান্থ্রোপোলজি বিভাগের সেমিনারে পাঠ করেন। ১৯১৭ সালের মে মাসে Indian Antiquary জার্নালে (Vol. XLVI) লেখাটি প্রকাশিত হয়।
এ থিসিসে তিনি কতকগুলো প্রণিধানযোগ্য প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। ভারতে caste-এর ব্যাপারে বিদেশী শ্রোতাদেরকে বলেন – আমি যে বিষয়টি আলোচনা করতে যাচ্ছি তার জটিলতা নিয়ে স্মরণ করানোর কিছু নেই। আমার চেয়ে সূক্ষ্ম মনন এবং শক্তিশালী কলম জাতের রহস্যময়তা খুলে ধরার কাজে প্রবৃত্ত হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এ বিষয়টি এখনও “অব্যাখ্যাত” অঞ্চলের মধ্যে পড়ে, যদি “un-understood” নাও বলি।” (Annihilation of Caste and Other Essays, Mapple Classics, ২০২১, পৃঃ ১০১)
আম্বেদকর তাঁর থিসিসে অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ যে কথাটি তিনি বলছিলেন তাহল – “একক সংখ্যায় “caste” বলা বস্তুত অবাস্তব বিষয়। “Castes” কেবলমাত্র বহুবচনে অস্তিত্ব লাভ করে … জাতের ক্ষেত্রে সাহসভরে সামাজিক বিধিকে লঙ্ঘন করেছে যে পাপী তার ক্ষেত্রে কোন করুণা কাজ করেনা।” (পৃঃ ১২১)
তাঁর বক্তব্যে যুক্তি দিয়ে দৃঢ়তা নিয়ে বলা হয়েছিল – “ভারতে জাতের অর্থ হচ্ছে কৃত্রিমভাবে জনসমাজকে কেটে স্থায়ী এবং নির্দিষ্ট এককে পর্যবসিত করা, যেখানে এন্ডোগ্যামি বা অন্তর্বিবাহের প্রথার ফলে একজন আরেকজনের সাথে মিশে যাবার ক্ষেত্রে বাধাপ্রাপ্ত হয়। ফলে যে সিদ্ধান্তটিতে উপনীত হওয়া যায় তাহল Endogamy is the only characteristic that is peculiar to caste …” (পৃঃ ১০৫-১০৬) পরবর্তীতে বললেন – “এভাবে এন্ডোগ্যামিকে এক্সোগ্যামির (বহির্বিবাহ বা অসবর্ণ বিবাহ) ওপরে চাপিয়ে দেওয়ার নির্গলিতার্থ হচ্ছে জাতের সৃষ্টি করা।”(পৃঃ ১০৭) বিখ্যাত সমাজতাত্ত্বিক ম্যাক্স ওয়েবারও মনে করতেন যে হিন্দুদের ক্ষেত্রে caste হচ্ছে হিন্দুদের একেবারে ভিত্তি/প্রতিষ্ঠান। আম্বেদকরের ১৯১৬-এর থিসিসের অনেকদিন পরে আরেক বিদগ্ধ সমাজতাত্ত্বিক আঁদ্রে বেতেই (Andre Betteile) বলবেন – “caste may be defined as a small and named group of persons characterised by endogamy, hereditary membership, and a specific style of life which sometimes includes the pursuit by tradition of a particular occupation and is usually associ:lted with a more or less distinct ritua l status in a hierarchical system.” (Caste, Class and Power: Changing Patterns of Stratification in Tanjore Village, ১৯৬৫, ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফর্নিয়া প্রেস, পৃঃ ৪৬)
কার্যত, জাত-ব্যবস্থার সাথে যুক্ত হিন্দু সমাজের ভিত্তি এন্ডোগ্যামির সাথে, একদিক থেকে ভাবলে, হিটলারের অনুসৃত কেবলমাত্র সবল আর্যজাতির মধ্যে বিবাহবন্ধন, ইউজেনিকস এবং, পরিণতিতে, হলোকস্টের মাঝে বৌদ্ধিক পার্থক্যরেখা (ইউরোপীয় দেশ, উন্নত বিজ্ঞান এবং বৈজ্ঞানিক মোড়ক ছাড়া) খুব প্রকট এমনটা বলা যাবে বলে মনে হয়না।
এবারে আম্বেদকরের সবচেয়ে আলোচিত এবং বিখ্যাত প্রতিবেদন (যা ১৯৩৬ সালে জাত-পাত-তোড়ক মণ্ডলের অধিবেশনে পঠিত হয়, এবং পরে পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়) অ্যানিহিলেশন অফ কাস্ট (পূর্বোক্ত মেপল ক্ল্যাসিকস সংস্করণ, ২০২১) নিয়ে স্বল্প আলোচনা করবো। এ লেখায় তিনি দেশের সাংবিধানিকতা এবং রাজনৈতিক বৈধতার গোড়ার প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন – “That the makers of political constitutions must take account of social forces is a fact which is recognised by no less a person than Ferdinand Lassalle, the friend and co-worker of Karl Marx. In addressing a Prussian audience in 1862, Lassalle said:
The constitutional questions are in the first instance not questions of right but questions of might. The actual constitution of a country has its existence only in the actual condition of force which exists in the country: hence political constitutions have value and permanence only when they accurately express those conditions of forces which exist in practice within a society.” (পৃঃ ২৫)
তিনি এ লেখায় প্রশ্ন করেছিলেন – “একথা কি বলা যায় যে ভারতের প্রোলেতারিয়েত শ্রেণী, যেরকম দরিদ্র অবস্থায় আছে, ধনী এবং দরিদ্র ছাড়া আর কোন পার্থক্য বুঝতে পারেনা? একথা কি বলা যায় যে ভারতের দরিদ্র শ্রেণী জাত অথবা ধর্মীয় বিশ্বাস, উঁচু অথবা নীচু ছাড়া আর কোন পার্থক্যকে স্বীকার করেনা? যদি ঘটনা এটাই হয় তাহলে ধনীদের বিরুদ্ধে প্রোলেতারিয়েতদের সংগ্রামে কি ধরনের unity of front আশা করা যেতে পারে? যদি প্রোলেতারিয়েতরা unity of front তৈরি করতে না পারে তাহলে কিভাবে বিপ্লব হওয়া সম্ভব?” (পৃঃ ৩৩)
এ বক্তব্য থেকে আমাদের নজরে আসবে – ভারতের বিশেষ প্রেক্ষিতে ধনী, দরিদ্র, প্রোলেতারিয়েত শ্রেণী ইত্যাদির মাঝে সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে জাত। প্রোলেতারিয়েত শ্রেণী যদি এদের সাথে যুক্ত ফ্রন্ট বা unity of front তৈরি করতে না পারে তাহলে সমাজ পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি সংগ্রাম সফল হওয়া সম্ভব নয়। এই প্রেক্ষাপটে আম্বেদকরের অন্য একটি পর্যবেক্ষণ ভেবে দেখা জরুরী – “জাত ব্যবস্থা কেবলমাত্র শ্রমের বিভাজন নয়। এটা শ্রমিকদের মাঝেও বিভাজন … অন্য কোন দেশে শ্রমের বিভাজন কোনভাবেই শ্রমিকদের ক্রমবিন্যাসের সাথে যুক্ত নয়।” (পূর্বোক্ত, পৃঃ ৩৫। নজরটান মূল লেখায়)
আম্বেদকর হিন্দুত্বের মূল বনিয়াদকে অস্বীকার করেছিলেন। ভেঙ্গে ফেলতে চেয়েছিলেন। এবং জাত-ব্যবস্থার বিনাশ সাধন হিন্দু সমাজকাঠামোর বিনাশের সাথে সংপৃক্ত, এটা তাঁর বিশ্বাস ছিল। তাঁর যুক্তি ছিল – “হিন্দুরা বর্বরদের সভ্য করার জন্য যে কোন মানবিক কাজ করেনি শুধুমাত্র এখানেই শেষ নয়, উচ্চবর্ণের হিন্দুরা স্বজ্ঞানে Hinduism-এর সীমারেখার মাঝে বসবাসকারী নীচুজাতদের উঁচু জাতের সাংস্কৃতিক মানে আরোহণ করতে বাধা দিয়েছে … সত্যি করে বললে, কে বেশি ভালো এবং শ্রদ্ধা পাওয়ার যোগ্য – মুসলমানেরা এবং খ্রিস্টানরা যারা অনিচ্ছুক ব্যক্তিদের (যারা এদের বলা মুক্তির মার্গকে মানেনি) গলা চেপে ধরেছে অথবা হিন্দুরা যারা মুক্তির আলো ছড়িয়ে দেবেনা, যারা নীচু জাতকে অন্ধকারে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করবে, যারা তাদের সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক উত্তরাধিকার ভাগ করে নেবেনা তাদের সাথে যারা প্রস্তুত হয়ে আছে নিজেদের আত্মগঠনের জন্য হিন্দু সজ্জাকে (make-up) গ্রহণ করতে? আমার এ কথা বলতে কোন দ্বিধা নেই যে যদি মহমেডানরা নিষ্ঠুর হয়ে থাকে তাহলে হিন্দুরা নীচ মানসিকতা রক্ষা করে, এবং নীচতা নিষ্ঠুরতার চেয়ে বেশি খারাপ।” (পূর্বোক্ত, পৃঃ ৪৭-৪৮)
তাঁর সুচিন্তিত ভাবনায় ছিল – “একটি আদর্শ সমাজ গতিময় হবে, এক প্রান্তের পরিবর্তন অন্য প্রান্তে পরিবহনের জন্য বিভিন্ন প্রবাহীপূর্ণ হবে। একটি আদর্শ সমাজে সচেতনভাবে বিভিন্ন সুবিধা জ্ঞাপন করা হবে এবং ভাগ করে নেওয়া হবে … In other words there must be social endosmosis … গণতন্ত্র কেবলমাত্র সরকারের একটি ধরন নয়। প্রাথমিকভাবে এটা হল সম্মিলিতভাবে বাঁচার পথ, পরস্পরযুক্ত যোগাযোগ ও অভিজ্ঞতা। অপরিহার্যভাবে পাশের মানুষটির প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মানের মনোভাব হল গণতন্ত্র।” (পূর্বোক্ত, পৃঃ ৫৬)
আমরা কি এরকম গণতন্ত্রের সহজ স্বাভাবিক আবহাওয়া অর্জন করতে পেরেছি? এ লেখায় আম্বেদকর বললেন যে কার্ল মার্ক্স অর্থনৈতিক বিপ্লব সংঘটিত করার জন্য প্রোলেতারিয়েতদের বলেছিলেন “তোমাদের শৃঙ্খল ছাড়া হারাবার আর কিছু নেই”। কিন্তু, তাঁর বিচার অনুযায়ী, মার্ক্সের এই শ্লোগান জাত-নির্ভর হিন্দু সমাজের জন্য অর্থহীন। কারণ? উত্তর তিনিই দিয়েছেন – “Castes form a graded system of sovereignties, high and low, which are jealous of their status and which know that if a general dissolution came, some of them stand to lose more of their prestige and power than others do. You cannot, therefore, have a general mobilisation of the Hindus (to use a military expression) for an attack on the caste system.” (পূর্বোক্ত, পৃঃ ৮৩)
এজন্য তিনি জোর দিয়েছিলেন “reason” এবং “morality”-র অনুশীলনের ওপরে। (পৃঃ ৮৭) সময় অতিক্রম করার সাথে সাথে ২০২২ সালের ভারতবর্ষে আমরা ক্রমশ সামাজিকভাবে, সামগ্রিকভাবে এ দুটি চর্চা থেকে দূরে, আরও দূরে চলে যাচ্ছি।
অন্যত্র অমোঘ এক বার্তা দিয়েছিলেন আম্বেদকর – “একজন হিন্দু একটি জাতে জন্মায়, সেই জাতের সদস্য হিসেবে মারা যায়, এখান থেকে পালানোর পথ নেই। জাত-হীন কোন হিন্দু থাকতে পারেনা, জাত থেকে পলায়ন করতে পারেনা। এবং জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জাতের বাঁধুনিতে বেঁধে থেকে জাতের সামাজিক নিয়ন্ত্রণ এবং ঐতিহ্যের, যেগুলোর ওপরে তার কোন নিয়ন্ত্রণ নেই, একজন বাহক হয়ে ওঠে।” (The Essential Writings of B. R. Ambedkar, ed. Valerian Rodrigues, ২০০২, পৃঃ ১০২)
শেষ কথা
গান্ধীর সমসাময়িক পণ্ডিতা রমাবাইয়ের কথা আমাদের স্মৃতিতে আসতে পারে। রামাবাই একক নারী হিসেবে সেসময়ের কঠিন সামাজিক প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে, জাত-ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। যদিও আমাদের বর্তমান আলোচনায় তিনি খুব বেশি প্রাসঙ্গিক নন।
একটি ঘটনা দিয়ে শেষ করি। ঘটনাটি অরুন্ধতি তাঁর পূর্বোল্লেখিত “The Doctor and the Saint” লেখাটিতে উল্লেখ করেছেন। বছর চল্লিশের সুরেখা ভোটমাঙ্গে মহারাষ্ট্রের ভাণ্ডারা জেলার খেরলাঞ্জি গ্রামের “অস্পৃশ্য” তথা শিডিউলড ট্রাইব জাতের বাসিন্দা ছিল। ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বাড়ির দুই নারী সুরেখা এবং প্রিয়ংকাকে গ্রামের মাঝে নগ্ন করে প্যারেড করানো হয়। এবং পরিবারের ৪ জনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। অপরাধ? তাদের নিজেদের জমি উচ্চবর্ণের মানুষ দখল করতে চাইলে ওরা নিজেদের সম্বলটুকু বাঁচানোর জন্য বাধা দেয়। উইকিপিডিয়াতে “Khairlanji massacre” এন্ট্রিতে এ ঘটনার বিবরণ খুঁজে পাওয়া যাবে। বিস্তৃত খবর রয়েছে।
এখানে আমাদের মালালা ইয়ুসাফজাইয়ের কথা মনে পড়বে নিশ্চয়ই। মালালা তাঁর নির্ভীক ভূমিকার জন্য নোবেল পুরষ্কার অব্দি পেয়েছেন। আর সুরেখা? উত্তর দিয়েছেন অরুন্ধতি – “সুরেখা ভোটমাঙ্গে এবং তার সন্তানেরা মুক্ত বাজারের বন্ধু এক গণতন্ত্রে বাস করত। এজন্য রাষ্ট্রসংঘের তরফে ভারত সরকারের কাছে ‘I am Surekha’-র মতো কোন পিটিশন দেওয়া হয়নি। এমনকি কোন রাষ্ট্রপ্রধানের তরফে ক্রোধ প্রকাশ করে বার্তাও দেওয়া হয়নি। এমনটাইতো হবার কথা ছিল, কারণ আমরা চাইনা আমাদের ওপরে কোন daisy-cutters বোমা পড়ুক (যেমনটা আফগানিস্তানে পড়েছিল) এবং আমরা জাত ব্যবস্থা প্র্যাকটিস করি।” (“The Doctor and the Saint”, পৃঃ ২০)

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (5)
  • comment-avatar
    Soumya+Panigrahi 1 month

    তথ্যপূর্ণ মর্মান্তিকে সত্য , একটি দেশের ওতথা নাব জাতির সযত্ন চর্চিত ক্লেদ । যা আমরা স্বাভাবিক ধরে নিয়েছি প্রায় ।
    বিষয় টি সামনে তুলে ধরার জন্য অনেক ধন্যবাদ ॥

  • comment-avatar
    তমা দাস 1 month

    ভালো লাগলো পড়ার সুযোগ পেয়ে, বাকীগুলোও পড়বো।

  • comment-avatar
    দেবলীনা 1 month

    অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি লেখা।কিন্তু আমাদের সমাজ বদলাবে না। রাজনৈতিক নেতারাই বদলাতে দেবে না।

  • comment-avatar
    সুকুমার ভট্টাচার্য্য 1 month

    ভারতীয সমাজের আবহমান কালের জাত, ধর্ম ও বর্ণবিদ্বেষের পরিষ্কার চিত্রের চমৎকার উপস্থাপন। মূল বক্তব্য ও তার প্রামাণ্য তথ্যগুলির সাথে সহমত না হওয়ার কোন সুযোগ নেই, “পাপী” বলে চিহ্ণিত হলেও। “Divide and rule” তত্ত্বের জন্য ইংরেজদের দায়ী করা অন্যায়। ভারতে তা অনেক আগেই ছিল এবং ইংরেজরা সেটা ব্যবহার করেছে আর স্বাধীনতার পরে আমরা তা রাজনৈতিক স্বার্থরক্ষার জন্য আরও যত্ন করে ব্যবহার করছি।
    ধন্যবাদ লেখক, ডঃ জয়ন্ত ভট্টাচার্যকে।

  • comment-avatar
    মদন দাস 4 weeks

    জাতপাতের বিষয়ের উল্লেখযোগ্য সব তাত্ত্বিক আর একেবারেই হাল সময়ের তথ্যসূত্র লেখা এক্সপ্রেস পড়ার সুযোগ পাওয়া গিয়েও, শেষপর্যন্ত অমীমাংসিত এক হতাশার মন আচ্ছন্ন
    সত্যিই তো জন্মভিত্তিক জাতপ্রথা ঘরবাড়ির অস্তিত্ব এমনভাবে জড়িত যে প্রশাসনিক বা রাষ্ট্র নৈতিক আইনকানুন ওলটপালট করেও পারিবারিক অভ্যাস এক ইঞ্চি পরিবর্তন সম্ভব হবে বলে মনে হয় না,সেক্ষেত্রে উৎপাদন কাঠামোর ঘূর্ণিপাকে যে যেখানে ছিটকে পড়ে যে সত্তাপরিচয় গড়ে ওঠে,সেটাকেই শেষ হবে,তবে সচেতনতা আর গতিশীল উৎপাদন প্রক্রিয়ার মধ্যে দলগুলোর রাজনৈতিক মুনাফা লাভ কমছে,আরও কমতে কমতে অর্থনৈতিক মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা পাবেই,সুতরাং বহির্বিবাহ বাড়তে থাকবে,যদিও জাতপাতের স্বীকার না থাক,উল্লেখ আপাততঃ কেন,বহুকাল ধরে থেকেই যাবে
    প্রসঙ্গত, অরুন্ধতী রায় র বিশ্বাসী পরিচিতি গুগলের কলামে জাতপাতের সবিশেষ উল্লেখ আছে,ভারতের বাইরে যখন জাতপাতের ধারণাই খুব নেই,তখনও তাঁর এহেন পরিচয় দান কি অদ্ভুত ব্যাপার!