তিরন্দাজির পথে, জেন <br /> দশম পর্ব <br /> পার্থজিৎ চন্দ

তিরন্দাজির পথে, জেন
দশম পর্ব
পার্থজিৎ চন্দ

'জেন’- শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে চলা রহস্যময়, মিস্টিক এক সাধনপদ্ধতি; প্রাচ্যের সুগভীর দর্শনের একটি ধারা, যে ধারার মধ্যে মিশে রয়েছে পারমিতার ছায়া, ‘না-জানা’র মধ্য দিয়ে জানার গূঢ় পদ্ধতি। একটি সুবিখ্যাত জেন-কবিতায় পাওয়া যায়, ‘Sitting quietly, doing nothing / Spring comes, and the grass grows itself’। এই‘ ‘কিছুই না-করা’র পদ্ধতি অর্জন করতে হয় দীর্ঘ অনুশীলনের মাধ্যমে। আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের এই ধারার সঙ্গে তিরন্দাজির মতো একটি শৌর্যময় বিষয়ের কি কোনও সংযোগ থাকতে পারে? তিরন্দাজি কি শিল্প? এই শিল্পের মধ্যে দিয়ে কি প্রবেশ করা সম্ভব জেন-এর মিস্টিক পৃথিবীতে? আজ থেকে প্রায় সত্তর বছর আগে প্রকাশিত হয়েছিল অয়গেন হেরিগেল-এর ‘Zen in the Art of Archery’। ব্যক্তি-অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ এ কাহিনি যেন এক রোমাঞ্চকর শান্ত থ্রিলার, ইউরোপের চোখে ‘জেন’ দর্শন অথবা ভিন্নধারার ডিসকোর্স।

এখান পর্যন্ত এসে আমার আশঙ্কা, পাঠকের মনে সন্দেহ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক, যেহেতু তিরন্দাজি আজ আর দুটি মানুষের মধ্যে যুদ্ধকে বোঝায় না তাই এটি বর্তমানে নিছক একটি আধ্যাত্মিক বিষয় হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, তারা এটাও ভেবে নিতে পারে যে এর বিকাশ স্তব্ধ হয়ে গেছে। কারও যদি এটা মনে হয় তাকে দোষও দেওয়া যায় না।
এক্ষেত্রে আমি একটা কথা বলতে পারি, জাপানের প্রতিটি শিল্প’ই বহু শতাব্দী ধরে ‘জেন’-এর প্রভাব বয়ে নিয়ে চলেছে। এমনকি বহু শতাব্দী আগের কোনও তিরন্দাজির গুরুজিকে যদি এখন প্রশ্ন করার সুযোগ থাকত তো দেখা যেত তিনি তাঁর শিল্প সম্পর্কে আজকের গুরুজিদের থেকে খুব আলাদা কিছু বলছেন না। তাঁদের কাছে এ শিল্প একদিন যেমন জীবন্ত ছিল, আজকের গুরুজিদের কাছেও এ শিল্প তেমনই জীবন্ত। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শিল্পের ধারা অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, ঠিক যেমন ‘জেন’ নিজেও তেমন পরিবর্তিত হয়নি।
পাঠকের মনে সন্দেহের মেঘ থাকা স্বাভাবিক, নিজের অভিজ্ঞতা থেকে সেটা জানি। সেটা দূর করাও দরকার; এক্ষেত্রে আমি আরেকটি শিল্পের দিকে নজর দেবার কথা বলতে পারি। ‘অসিচালনা’ সেই শিল্প, এ সময়ে এসেও তার শৌর্যের দিকটিকে অস্বীকার করা যায় না।
আমি অসিচালনার কথা উল্লেখ করলাম, তার পিছনে দুটি কারণ আছে। গুরুজি আওয়া একজন সাধক অসিচালক, তিনি বারবার তিরন্দাজি আর অসিচালনার মধ্যে সাদৃশ্য দেখিয়ে দিতেন আমাকে। অরেকটি কারণ হল, জাপানে সামন্ততন্ত্র যখন বিদ্যমান তখন অসিচালকদের নিজেদের জীবন বিপন্ন করে সামন্তপ্রভুদের সামনে দক্ষতার প্রমাণ দিতে হত। সামান্য ত্রুটি মানে সাক্ষাৎ মৃত্যু। সে সময়কার একটি গ্রন্থ এখনও পাওয়া যায়। গ্রন্থটিতে জেন-গুরু টাকুয়ানের কিছু কথা লিপিবদ্ধ আছে যেখানে তিনি অসিচালন-পদ্ধতি, জেনের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। গ্রন্থটির নাম ‘দ্য আনমুভড আন্ডারস্ট্যান্ডিং’। আমি জানি না আর কোনও গ্রন্থে অসিচালনার ‘মহান ঐতিহ্য’ নিয়ে এত বিস্তৃত আলোচনা আছে কি না। এটাও জানি না যে জেন আর তিরন্দাজি নিয়ে এমন বিস্তৃত আলোচনাসমৃদ্ধ কোনও গ্রন্থ আছে কি না। আমাদের সৌভাগ্য, টাকুয়ানের কথাগুলি সংরক্ষণ করা গেছে; এর বেশিরভাগ কৃতিত্ব ডি টি সুজুকি’র। তিনিই প্রায় অবিকৃত অবস্থায় বইটির অনুবাদ করেন, ফলে টাকুয়ানের বইটি* আজ পৃথিবীজুড়ে পাঠকের কাছে পৌঁছে গেছে। এ বইয়ের একদম শেষে এসে আমি সংক্ষিপ্তভাবে টাকুয়ান-কথিত অসিচালনা বিষয়ে আলোচনা করব; দেখাতে চেষ্টা করব একসময়ে অসিচালনা বিষয়ে মানুষ কী ভাবত আর আজ অসিচালনা নিয়ে তাদের ভাবনা ঠিক কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে।

*Suzuki, Daisetz Teitaro, Zen Buddhism and its Influence on Japanese Culture.

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)