জারোস্লাভ সিফার্ট- এর কবিতা <br /> অনুবাদ ও ভূমিকা – উদ্দালক ভরদ্বাজ

জারোস্লাভ সিফার্ট- এর কবিতা
অনুবাদ ও ভূমিকা – উদ্দালক ভরদ্বাজ

যদিও চেকোস্লোভাকিয়ার বাইরে কবির পরিচিতি ছিল , মূলত অনুবাদের অভাবে, তাঁর দেশের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন বড় প্রিয়, কবি হিসেবে, এবং এক শোষণকারী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে বাক-স্বাধীনতার অন্যতম প্রতিভূ হিসেবেও। সিফার্টের শ্রমজীবী সমাজে কাটানো ছেলেবেলা, কম্যুনিস্ট আন্দোলনের অগ্রভাগে থেকে বিভিন্ন পত্রিকায় সেই সঙ্ক্রান্ত লেখালেখির কাজ এবং সম্পাদনা, এবং পরের দিকে সোভিয়েত শাসনের করাল কুটিল ছায়ার বিরুদ্ধেও তাঁর সরব সাংবাদিকতা, সবেরই প্রভাব পড়ে তাঁর কবিতায়। শ্রমজীবী মেহনতী মানুষের সর্বাত্মক বন্ধনমুক্তির কথা ছড়িয় আছে তাঁর প্রথম দিকের কবিতায়; ১৯২১ সালে প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ City in Tears, ১৯২৩-এর সামা লাস্কা (Samá láska, ১৯২৩) এবং ১৯২৫ এর স্বাতেবনি সেসতায় (Svatební cesta) আমরা পাই আশাবাদী ও নতুন পৃথিবী গড়ার স্বপ্নে অর্পিত সিফার্টকে। ১৯২৬ সালে কম্যুনিজম নিয়ে স্বপ্নভঙ্গের পর কবি লিখলেন The Nightingale Sings Badly; এই কবিতাগুলিতে স্পষ্ট প্রভাব অধিবাস্তববাদ এবং দাদা-ইজমের, যদিও সেই প্রভাব বেশী দিন থাকে নি তাঁর লেখায়। সময়ের সাথে কবির ভাবাদর্শও পরিণত হতে থাকে এবং ক্রমশ সমাজতন্ত্রের সমালোচনায় মুখর হইয়ে উঠতে থাকে কবির লেখনী। ১৯২৯ সালে আরও ছজন কম্যুনিস্ট লেখকের সঙ্গে তিনিও সই করলেন, চেকোস্লোভাকিয়ার কম্যুনিস্ট পার্টির বলশেভিক গতিবিধির বিরুদ্ধে সাক্ষরনামায়। এই ব্যক্তিগত বিশ্বাস বদলের পরে, কবির কবিতায়ও আমরা দেখতে থাকি বিভিন্ন পটভূমি, বিষয় এবং স্টাইলের আনাগোনা। প্রচার ও আদর্শবাদ থেকে সরে ক্রমশ কবির প্রবেশ দেখি জীবনের অন্যান্য বিষয়ে, প্রেমেও। জাব্লকো জ ক্লিনা (Jablko z klína, ১৯৩৩) কাব্যগ্রন্থের কবিতায়, পরিভাষা থেকে নানা শব্দ উঠে এলো, প্রকৃতির নানা ছবির সাথে মিলেমিশে তৈরি করল এক নতুন রীতি। অজস্র কবিতার বিষয় হিসেবে পাওয়া গেল ভালবাসা, এই বইয়ে এবং পরবর্তী বই রুসে ভেনুসিনি (Ruce Venušiny, ১৯৩৬)-তেও। সামগ্রিক দৃষ্টিতে সিফার্টের কবিতার মূলত তিনটি বিষয়, নারীর রূপ, শিল্প ও তাঁর স্বদেশ ভাবনা। কখনো কখনো একই কবিতায় এই তিন বিষয়ই কবি ছুঁয়ে গেছেন, এমনও দেখা যায়। তবে যেই শিহরিত পুলকে কবি নারীপ্রেম ও নারীবন্দনায় রত থেকেছেন সারা জীবন তা একান্তই বিরল এবং অসম্ভব আকর্ষকও বটে। সেসব কবিতার ক্ষেত্রে অবশ্য কবির দায়বদ্ধতা খুব স্পষ্ট ভাবেই ছিল শিল্পের প্রতি, রাজনীতির সেখানে খুব জায়গা হত না। ১৯৩৬, ১৯৫৫ এবং ১৯৬৮ তে কবি ভূষিত হন রাষ্ট্রীয় সম্মানে। ১৯৬৭ সালে কবিকে চিহ্নিত করা হয় রাষ্ট্রীয় শিল্পী হিসেবে। ১৯৮১ সালে সিফার্টের আত্মজীবনী সেকি ক্রাসি স্বেটা (Všecky krásy světa , All the Beauty of the World) আন্তর্দেশীয় স্তরে প্রকাশিত হওয়ার পরে পরেই সিফার্ট মনোনীত হলেন নোবেলের জন্যে। এই গ্রন্থে সিফার্ট, দুই বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিকায়, এবং নাৎসি অবরোধের প্রেক্ষাপটে, চেক আভান্ত-গারদে আন্দোলনের হুবহু নকশা আঁকলেন। ১৯৭৯ সালের Deštník z Picadilly (An Umbrella from Piccadilly) গ্রন্থের 'Finger Prints' কবিতায় কবি লিখলেন, “হয়ত করেছি কোনও পাপ মানুষের কাছে / জানি না! / আইন বুঝি না আমি। / তবু শাস্তি পেয়েছি যাবজ্জীবনের।/ ভালবাসা যদি হয় অজস্র আয়নায় ভরা গোলকধাঁধাঁ, জানি আমি ঠিক তাই সে,/কবেই পেরিয়েছি তার সীমার কাঁটাতার আমি, এসেছি সজ্ঞানে তার মোহের পেলবে/ সেই থেকে ঘুরে মরি, বেরোবার রাস্তাও জানি নি আর”। ১৯৮৬ সালের ১০ই জানুয়ারি মৃত্যু হয় সিফার্টের। রাষ্ট্রীয় শিল্পী হিসেবে যথোচিত মর্যাদায় পালিত হয় তার অন্তিম সংস্কার। ট্রিভিয়াঃ ১৯৮৪ সালে যখন নোবেল পুরস্কারের সম্মান ঘোষিত হয়, সিফার্টের শরীর তখন বেশ খারাপ এবং নিজের হাতে পুরস্কার গ্রহণে তিনি অক্ষম। তাঁর মেয়ে এই পুরস্কার গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রীয় স্তরে, প্রথম চেক কবি হিসেবে সিফার্টের নোবেল পুরস্কার পাওয়া একটি বিশেষ ঘটনা, অথচ সে সময়ে চেকদেশীয় প্রচার মাধ্যমগুলি খুব একটা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে নি। লৌহ-পর্দার অপসারণের বাদেই দেশের মানুষ অবহিত হয়েছিলেন তাদের মাঝের এই বিরল শিল্প প্রতিভার সম্বন্ধে। সিফার্ট নিজে যদিও তাঁর স্বদেশের, সোভিয়েত কবল থেকে মুক্তি দেখে যেতে পারেন নি। বরং ১৯৮৬ সালে, ক্রালুপিতে তাঁর অন্তিম সংস্কারের সময়ে অগুন্তি সাদা পোশাকের পুলিশের অবস্থিতি ছিল দেখার মত। শবানুগামীদের তরফে কোন রকম অসন্তোষ প্রকাশ রোধ করতে ছিল সরকারের সব টুকু প্রচেষ্টা।

জারোস্লাভ সিফার্ট: কবিতার প্রেম, প্রেমের কবিতা
জন্ম:২৩ সেপ্টেম্বর, ১৯০১, জিজকভ, প্রাগ, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গারি (অধুনা চেকোস্লোভাকিয়া)
মৃত্যু: ১০ জানুয়ারি, ১৯৮৬, প্রাগ, চেকোস্লোভাকিয়া
নোবেল সাল, প্রাপ্তির সময়ে আবাস: ১৯৮৪, চেকোস্লোভাকিয়া
নোবেল প্রাপ্তির প্রণোদনা: “তাঁর কবিতার অভিনভত্ত্ব, ইন্দ্রিয়সুখাশক্তি ও উদ্ভাবনী শক্তির প্রাচুর্য, পাঠকের পরিচয় করিয়ে দেয় অদম্য প্রাণশক্তিপূর্ণ ও বহুমুখী মানবাত্মার এক চিরমুক্ত রূপের সঙ্গে।”
ভাষা: চেক
প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা: ৩০
প্রথম প্রকাশিত কবিতা: ১৯ বছর বয়েসে
প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: Město v slzách (City in Tears, ১৯২০)
শেষ প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: Býti básníkem (To Be a Poet, ১৯৮৩)
বিখ্যাত কবিতা: Zhasněte světla (Put Out the Lights, ১৯৩৮)

জীবিকাঃ সাংবাদিক, লেখক, সম্পাদক: রভনস্ত (Rovnost), সাতেক (Srsatec), রিফ্লেক্তর (Reflektor), নোভা সিনা (Nova Scena) সম্পাদনা সম্পর্কিত কাজ: পেস্ত্রে ভেতি (Pestré kvety), র‍্যানি নভিনি (Ranní noviny)

কবিতা প্রসঙ্গে জারোস্লাভ: কবিতা আমাদের সাংস্কৃতিক জীবনে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। কবিতা বা গান আমাদের সাথে এক পূর্বনির্দিষ্ট ঘনিষ্ঠ কথোপকথনে যুক্ত হয়। শুধু তাই নয়, আমাদের ক্লান্ত মনের গভীরতম এবং নিরাপদ আশ্রয়ও কবিতাই। জীবনের অনেক প্রতিকূলতা, যার কোন নামও দিতে কুণ্ঠা আমাদের, তারও উজ্জ্বল উদ্ধার, কবিতার গোপন মর্মস্থল (নোবেল বক্তৃতা ১৯৮৪)

জীবন, সাহিত্য, জনমানসে কবির স্থানঃ

যদিও চেকোস্লোভাকিয়ার বাইরে কবির পরিচিতি ছিল , মূলত অনুবাদের অভাবে, তাঁর দেশের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন বড় প্রিয়, কবি হিসেবে, এবং এক শোষণকারী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে বাক-স্বাধীনতার অন্যতম প্রতিভূ হিসেবেও। সিফার্টের শ্রমজীবী সমাজে কাটানো ছেলেবেলা, কম্যুনিস্ট আন্দোলনের অগ্রভাগে থেকে বিভিন্ন পত্রিকায় সেই সঙ্ক্রান্ত লেখালেখির কাজ এবং সম্পাদনা, এবং পরের দিকে সোভিয়েত শাসনের করাল কুটিল ছায়ার বিরুদ্ধেও তাঁর সরব সাংবাদিকতা, সবেরই প্রভাব পড়ে তাঁর কবিতায়। শ্রমজীবী মেহনতী মানুষের সর্বাত্মক বন্ধনমুক্তির কথা ছড়িয় আছে তাঁর প্রথম দিকের কবিতায়; ১৯২১ সালে প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ City in Tears, ১৯২৩-এর সামা লাস্কা (Samá láska, ১৯২৩) এবং ১৯২৫ এর স্বাতেবনি সেসতায় (Svatební cesta) আমরা পাই আশাবাদী ও নতুন পৃথিবী গড়ার স্বপ্নে অর্পিত সিফার্টকে। ১৯২৬ সালে কম্যুনিজম নিয়ে স্বপ্নভঙ্গের পর কবি লিখলেন The Nightingale Sings Badly; এই কবিতাগুলিতে স্পষ্ট প্রভাব অধিবাস্তববাদ এবং দাদা-ইজমের, যদিও সেই প্রভাব বেশী দিন থাকে নি তাঁর লেখায়। সময়ের সাথে কবির ভাবাদর্শও পরিণত হতে থাকে এবং ক্রমশ সমাজতন্ত্রের সমালোচনায় মুখর হইয়ে উঠতে থাকে কবির লেখনী। ১৯২৯ সালে আরও ছজন কম্যুনিস্ট লেখকের সঙ্গে তিনিও সই করলেন, চেকোস্লোভাকিয়ার কম্যুনিস্ট পার্টির বলশেভিক গতিবিধির বিরুদ্ধে সাক্ষরনামায়। এই ব্যক্তিগত বিশ্বাস বদলের পরে, কবির কবিতায়ও আমরা দেখতে থাকি বিভিন্ন পটভূমি, বিষয় এবং স্টাইলের আনাগোনা। প্রচার ও আদর্শবাদ থেকে সরে ক্রমশ কবির প্রবেশ দেখি জীবনের অন্যান্য বিষয়ে, প্রেমেও। জাব্লকো জ ক্লিনা (Jablko z klína, ১৯৩৩) কাব্যগ্রন্থের কবিতায়, পরিভাষা থেকে নানা শব্দ উঠে এলো, প্রকৃতির নানা ছবির সাথে মিলেমিশে তৈরি করল এক নতুন রীতি। অজস্র কবিতার বিষয় হিসেবে পাওয়া গেল ভালবাসা, এই বইয়ে এবং পরবর্তী বই রুসে ভেনুসিনি (Ruce Venušiny, ১৯৩৬)-তেও। সামগ্রিক দৃষ্টিতে সিফার্টের কবিতার মূলত তিনটি বিষয়, নারীর রূপ, শিল্প ও তাঁর স্বদেশ ভাবনা। কখনো কখনো একই কবিতায় এই তিন বিষয়ই কবি ছুঁয়ে গেছেন, এমনও দেখা যায়। তবে যেই শিহরিত পুলকে কবি নারীপ্রেম ও নারীবন্দনায় রত থেকেছেন সারা জীবন তা একান্তই বিরল এবং অসম্ভব আকর্ষকও বটে। সেসব কবিতার ক্ষেত্রে অবশ্য কবির দায়বদ্ধতা খুব স্পষ্ট ভাবেই ছিল শিল্পের প্রতি, রাজনীতির সেখানে খুব জায়গা হত না।
১৯৩৬, ১৯৫৫ এবং ১৯৬৮ তে কবি ভূষিত হন রাষ্ট্রীয় সম্মানে। ১৯৬৭ সালে কবিকে চিহ্নিত করা হয় রাষ্ট্রীয় শিল্পী হিসেবে। ১৯৮১ সালে সিফার্টের আত্মজীবনী সেকি ক্রাসি স্বেটা (Všecky krásy světa , All the Beauty of the World) আন্তর্দেশীয় স্তরে প্রকাশিত হওয়ার পরে পরেই সিফার্ট মনোনীত হলেন নোবেলের জন্যে। এই গ্রন্থে সিফার্ট, দুই বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিকায়, এবং নাৎসি অবরোধের প্রেক্ষাপটে, চেক আভান্ত-গারদে আন্দোলনের হুবহু নকশা আঁকলেন। ১৯৭৯ সালের Deštník z Picadilly (An Umbrella from Piccadilly) গ্রন্থের ‘Finger Prints’ কবিতায় কবি লিখলেন, “হয়ত করেছি কোনও পাপ মানুষের কাছে / জানি না! / আইন বুঝি না আমি। / তবু শাস্তি পেয়েছি যাবজ্জীবনের।/ ভালবাসা যদি হয় অজস্র আয়নায় ভরা গোলকধাঁধাঁ, জানি আমি ঠিক তাই সে,/কবেই পেরিয়েছি তার সীমার কাঁটাতার আমি, এসেছি সজ্ঞানে তার মোহের পেলবে/ সেই থেকে ঘুরে মরি, বেরোবার রাস্তাও জানি নি আর”। ১৯৮৬ সালের ১০ই জানুয়ারি মৃত্যু হয় সিফার্টের। রাষ্ট্রীয় শিল্পী হিসেবে যথোচিত মর্যাদায় পালিত হয় তার অন্তিম সংস্কার।
ট্রিভিয়াঃ ১৯৮৪ সালে যখন নোবেল পুরস্কারের সম্মান ঘোষিত হয়, সিফার্টের শরীর তখন বেশ খারাপ এবং নিজের হাতে পুরস্কার গ্রহণে তিনি অক্ষম। তাঁর মেয়ে এই পুরস্কার গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রীয় স্তরে, প্রথম চেক কবি হিসেবে সিফার্টের নোবেল পুরস্কার পাওয়া একটি বিশেষ ঘটনা, অথচ সে সময়ে চেকদেশীয় প্রচার মাধ্যমগুলি খুব একটা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে নি। লৌহ-পর্দার অপসারণের বাদেই দেশের মানুষ অবহিত হয়েছিলেন তাদের মাঝের এই বিরল শিল্প প্রতিভার সম্বন্ধে। সিফার্ট নিজে যদিও তাঁর স্বদেশের, সোভিয়েত কবল থেকে মুক্তি দেখে যেতে পারেন নি। বরং ১৯৮৬ সালে, ক্রালুপিতে তাঁর অন্তিম সংস্কারের সময়ে অগুন্তি সাদা পোশাকের পুলিশের অবস্থিতি ছিল দেখার মত। শবানুগামীদের তরফে কোন রকম অসন্তোষ প্রকাশ রোধ করতে ছিল সরকারের সব টুকু প্রচেষ্টা।

অনুদিত কবিতাগুলি নিয়ে কিছু কথা:

১৯৮৫ সালে প্রকাশিত সিফার্টের কবিতার ইংরেজি অনুবাদের সঙ্কলন An Umbrella from Picadillyর সমালোচনা করতে গিয়ে মাইকেল হেনরি লিখছেন “এক অভূতপূর্ব সৃষ্টিশীল জীবনের পড়ন্ত বিকেলের আভা এই কবিতাগুলির শরীরে ছড়ানো। এক নিঃশর্ত আনুগত্য, অন্তরঙ্গ ভাষার প্রতি, নারীর প্রতি (এবং এই অনুরাগ নারীকে শুধু এক সর্বাঙ্গ সুন্দর সৃষ্টি রূপে নয়, সমগ্র মানবতার প্রতীক হিসেবে দেখায়) এই কবির কবিতার প্রত্যেক ছত্রে ছড়ানো”। অনুবাদ করতে গিয়ে আমিও বেছে নিয়েছি সেই সব কবিতা, যা কবির এই নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের কথাই বলে। ‘কবির জীবন’ কবিতায় কবি তাঁর কবিতা ও জীবনের এই সারমর্মের কথাই তুলে ধরেন। কবিতার ভাষা যেন ছবি এঁকে দেয় পাঠকের মনে, কবিমনের, কবিজীবনের। ‘পিকাডেলির ছাতা’ কবিতায় কবি রসিক প্রেমিক। বয়েসের ভারে ন্যুব্জ কবি, কিন্তু সৌন্দর্য এখনো হাতছানি দিয়ে যায় তাকে। তবু সেই রূপের কাছে গিয়ে সেই অনুরাগ ব্যক্ত করার সময় বা সুযোগ এখন আর নেই। তাই সেই ইচ্ছাকে এড়িয়ে যেতে কবি বৃষ্টি এবং ছাতার অনুষঙ্গে এক অদ্ভুত কমেডির সৃষ্টি করেন যা একই সঙ্গে মনে এনে দেয় বেদনা এবং সহজ সরল হাসির উচ্ছাসও। ‘ছেঁড়া চিঠি’ কবিতায়, ফুরিয়ে আসা জীবনের পারে দাঁড়িয়ে এক প্রেমিক কবির ফিরে দেখা এবং সহজ স্বীকারোক্তি; নারীর শরীর নিয়ে মুগ্ধতা এবং নারীকে ভালবাসা ছাড়া আর কিছুই মনে পড়ছে না তাঁর। জীবনের একমাত্র উপজীব্য কি তাহলে শুধু এই প্রেম? এখনো, মুহূর্তের আবেশেও সেই প্রাঞ্জল কামনার এক টুকরো স্বাদ পেতে আগ্রহী কবি, কারণ জীবন শেষের পারে যে শুধুই আঁধার। নশ্বর নিখিল-মানবমনের এই করুণ আর্তি ঝরে ঝরে পড়েছে এই কবিতার প্রত্যেক ছত্রে। শেষ কবিতা ‘এবার বিদায় দাও’-এ কবি তাঁর নিজের জীবনের সমাযোগ করছেন এক অপূর্ব আবেগে, সেখানে অহংকার নেই সার্থক সৃষ্টির, নেই আকাঙ্ক্ষা চিরন্তনতা অর্জনেরও। এই কবিতার কবি খুব স্পষ্ট অনুভবে জানেন, মানব মনের সমস্ত আর্তি এবং তার উচ্চারণ, সে যতই শ্লাঘ্য হোক না কেন, মননে এবং প্রকাশের আলোয়, তবু তার দাম, কনামাত্র নেই এই নিখিল সৃষ্টির নিরিখে। ঝিঁঝিঁর করুণ কান্নার চেয়ে সিকিভাগ বেশীও নয় তার মিলিত প্রজ্ঞা। তবু এই বিপুল সৃষ্টির তরঙ্গে কবি কেঁপে উঠে যে ভাষা প্রকাশ করতে চেয়েছেন, সেই চিরন্তন ভাষা শুধু জানে প্রেমিক প্রেমিকা; তাদের স্বপ্নিল চোখে, ঠোঁটে জাগে সেই ভাষা, সৃষ্টির আদিম উন্মাদনা। সে ভাষাই কবিতা তো, তাকেই তো ছুঁতে চেয়েছেন কবি জীবনের প্রত্যেক চর্যায়। সে চাওয়ায় ভুল নেই কোন, ত্রুটি হতে পারে না কোন। কারণ সৃষ্টিই এক মাত্র সত্য আর ভালবাসাই তার মন্ত্র, আর কিছু নেই, কোথাও, কোনখানে।

অনূদিত কবিতা

কবির জীবন

জীবন আমাকে অনেক আগেই
শিখিয়ে দিয়েছে-
কবিতা, গান, জীবনের
সব চেয়ে মধুর পাওয়া সব,
হৃদয়ে আশ্বাস আনে,
স্নিগ্ধতায় ঢেকে দেয় আমাদের।
প্রেমের কথা আলাদা অবশ্য।

সে বছরই ভার্কলিকের মৃত্যু
হয়েছিল, মনে আছে।
আমি ইম্পিরিয়াল প্রিন্টিং প্রেসের
“কবিতার তত্ত্ব” বইয়ে কাব্য ও উপমা
অংশ গুলে খেলাম।

কাঁচের গ্লাসে গোলাপ সাজিয়ে,
মোমবাতি জ্বালিয়ে শুরু হল
আমার প্রথম কাব্যচর্চা।
“জাগো, আমার আগুন-পাখি শব্দ,
ওড়ো!, ঝাঁপিয়ে পড়ো লেলিহান শিখায়,
আমার খাতার পাতার ব্যর্থ অন্ধকারে।
তাতে যদি আঙুল পোড়ে, পুড়ুক।“

অব্যর্থ উপমার মূল্য নাকি
আঙুলে আংটি পরানোর চেয়ে
ঢের দামি ! যত্ত সব!
পাকমাজারের ছন্দ অভিধানেও
কিছুই লাভ হল না।
অনর্থক চেষ্টায় শুধু খুঁজেই গেলাম
প্রথম লাইনের প্রেরণা;

অসম্ভব মরিয়া, শেষমেশ
চোখ বন্ধ করে ভাবতে বসলাম।
অথচ, নিশ্চুপ সেই অন্ধকার মগ্নতায়,
শব্দ নয়, স্পষ্ট দেখলাম
নারীমুখ এক। বিচ্ছুরিত হাসি,
হাওয়ায় ওড়া চুল,
নির্ভুল, মধুর…

এই আমার নিয়তি…
সারা জীবন, ইথার তরঙ্গের মত,
রুদ্ধশ্বাস, মন্ত্রমুগ্ধ উল্কার বেগে
উড়ে চলি, বার বার,
শুধু সেই স্বর্ণিল ভবিতব্যের দিকে।
আর কোনও গতি
জানি নি কোনদিন
জানবও না বোধ হয়।


পিকাডেলির ছাতা

তুমি যদি ভালবাসায় জেরবার হয়ে গিয়ে থাক,
তাহলে আর এক বার প্রেমে পড়ে যাও ।
কার সাথে ?
এই ধর ইংল্যান্ডের রানীর।
কেনই বা নয় ?
তার মুখশ্রী তো, সে বর্ষীয়ান দেশের
সমস্ত পোস্টেজ স্ট্যাম্পে ছড়ানো,
অসুবিধাটা কই?
তবেঁ হ্যাঁ, যদি তুমি তার সাথে
হাইড পার্কে ঘুরতে যেতে চাও-
তাহলে মুশকিল,
তোমার অপেক্ষা যে অন্তহীন হবে
তা প্রায় নিশ্চিত ।
.
যদি বিন্দুমাত্রও সুবুদ্ধি থেকে থাকে
তাহলে তুমি নিজেকে বোঝাবে –
“আরে, যাওয়া তো যায়ই ঘুরতে ,
সে আর অসুবিধা কই ?
কিন্তু মুশকিল হল
হাইড পার্কে যে বৃষ্টি পড়ছে এখন
নাহলে তো…”
.
আমার ছেলে সেবার
লন্ডনের পিকাডেলি থেকে
ভারি সুন্দর, একটা
ছাতা কিনে দিয়েছে আমায় ।
আমার মাথার ওপর তাই এখন
আমার নিজস্ব একটা ছোট আকাশ থাকে ।
হয়তো কালো , কিন্তু টান টান,
তার ধাতব স্পোক-গুলো বেয়ে
যে কোন মুহূর্তে বিদ্যুতের মত,
নেমে আসতে পারে
ঈশ্বরের পরম করুণা ।
.
আমি তাই ছাতা মেলে ধরি
এমন কি যখন বৃষ্টি হচ্ছে না, তখনো,
সামিয়ানার মত ।
শেক্সপিয়ারের সনেটের বইটা,
যেটা আমি সর্বদা পকেটে রেখে
ঘুরে বেড়াই –
তার ওপরেও ধরি ।

তবু মাঝে মাঝে
এই ঝকঝকে ফুলের তোড়া,
এই আকাশী চাঁদোয়া –
আমাকে ভীষণ ভয় পাইয়ে দেয়।
সমস্ত সৌন্দর্য ছাপিয়ে আতঙ্কে নীল হই
ওর অন্তহীন অসীমতার আভাসে,
ঠিক যেন মৃত্যু, অন্তিম শয়ন।

ভয় দেখায় আদিগন্ত ব্যাপী
ওর হিমশীতল শূন্যতাও।
অযুত আলোকবর্ষ ছড়ানো
কোটি তারার কুহেলি
আমাকে জাগিয়ে রাখে,
তাদের অশরীরী বিচ্ছুরণের
মোহ-আবেশে ।

এর মধ্যে যেটির নাম “ভেনাস”
তিনি তো সব চেয়ে মারাত্মক।
তার তো সমস্ত পাথর শিলাই
ফুটন্ত এখনো ।
দানবাকার ঢেউয়ের পাহাড়
সেখানে, প্রতি দিন উঠছে, নামছে ।
আর জ্বলন্ত গন্ধক, ধোঁয়া ওঠা –
গলে পড়ছে ঝরনার মত;
নরক যদি থেকে থাকে কোথাও
সে সেখানেই ।

একটি নশ্বর ছাতা
কিই বা করতে পারে
এই বিশাল ব্রহ্মাণ্ডের কোপের মুখে !
তা ছাড়া, আমি আর
সঙ্গে রাখি না তাকে।
এমনিতেই অনেক কাজ বাপু,
হেঁটে যাওয়া, পায়ে পায়ে;
মাটির ওপর সটান দাঁড়িয়ে,
মাটির কাছাকাছি থেকে –
দিনের আলোয়, রাত্রির মথের মত
গাছের বাকলের
কর্কশ স্থিরতার দিকে।

সারাজীবন সেই স্বর্গ খুঁজেছি আমি,
ছিল যা এখানেই । যার ভগ্নরেখ,
যৎকিঞ্চিত পরিচয় আমি পেয়েছি
শুধু নারীর অধরে ।
এবং তার অব্যর্থ শরীরের বাঁকে
নির্ভুল কানাচে, যখনই জেগেছে সেও
উষ্ণ প্রেমে, গ্রন্থিল সিঁথিতে…

সারা জীবন মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় কাটিয়ে
অবশেষে পেয়েছি সেই অলখ দরজা
অযাচিত স্বর্গের তোরণ –
মৃত্যু তার নাম ।

এখন, যখন শিথিল শোণিত,
বুড়ো হাড়ে নেই কোন সুঠাম বিশ্বাস,
এখনো, কখনো চকিতে,
কোন নারীমুখ
তীক্ষ্ণ বাতাসের মত
যখন ছুঁয়ে যায় দুচোখ,
তার চঞ্চল হাসি,
জাগায় উন্মন ঘূর্ণি
আমার ক্লান্ত রক্তের নদী-বুকে-

সলাজ সম্ভ্রমে আমি, ঘুরিয়ে নিই দৃষ্টি,
আর মনে করি ইংল্যান্ডের রাণীকে;
যার মুখশ্রী কিনা, সে বর্ষীয়ান দেশের
সমস্ত পোস্টেজ স্ট্যাম্পে ছড়ানো ।
ঈশ্বর রাণীকে দীর্ঘায়ু করুন !

আর হ্যাঁ, আমি ভালো করেই জানি
আজ হাইড পার্কে তুমুল বৃষ্টি…

ছেঁড়া চিঠি

কাল সারা রাত
অঝোর-ধার বৃষ্টি আছড়ে
পড়েছে জানলার কাঁচে,
ঘুমোতে পারি নি আমি।
শেষমেশ, আলো জ্বালিয়ে
চিঠি লিখতে বসলাম ।

ভালবাসা যদি উড়তে পারত !
পারে না যদিও, তবু যদি মাটি কামড়ে
পড়ে থাকার অভ্যেস ছেড়ে দিয়ে
উড্ডীন হত আকাশপারের খেয়ায়,
বেশ হত কিন্তু সেই হাওয়ায়
ভেসে থাকতে পারলে !

মত্ত মৌমাছির মত
ঝাঁকে ঝাঁকে, চুমু নেমে আসে;
মেয়েলি শরীরের মধু, কানাচে কানাচে
ঈর্ষায়, তাপে, উদ্বৃত্ত আবেগে।
এলোপাথাড়ি, অধৈর্য হাত
আঁকড়ে আঁকড়ে ধরে
যা কিছু পাথেয়,
তার শরীরী সড়কে ।

থামে না প্রমত্ত কামনা;
মৃত্যুও যন্ত্রনাহীন বোধ হয়
সেই চির উচ্ছ্বল উল্লাস-
মুহূর্তের আঙ্গিনায় ।

কে কবে রেখেছে হিসেব –
কতখানি ভালবাসা, জমে থাকে
উদ্যত প্রেমের দু হাতে!

প্রেমিকার চিঠি পাঠাতে তাই, সর্বদা,
আমি পায়রা ব্যবহারেই বিশ্বাস করি।
চিল বা বাজকে এই কাজে লাগান অসমীচীন ।

আমার কলমের নীচে
নাচে না এখন আর কবিতার লতার শরীর;
আর চোখের কোনে আটকে থাকা-
এক ফোঁটা অশ্রুর মত
পৃথিবী দুলছে
সময়ের অনন্য কিনারায়।
আর আমার গোটা জীবনটা
যেন আর কয়েক ঘণ্টা মাত্র,
দ্রুতগামী ট্রেনের কামরায়।

চলন্ত গাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে আমি।
প্রতি দিন ছিটকে যাচ্ছি
দুঃখের কুয়াশায় মোড়া অতীত রাস্তায়।
এক এক সময়ে পাগলের মত
খুঁজে চলছি এমারজেন্সি ব্রেকের হাতল ।

হয়তো এক বার, ভেসে উঠবে জানলায় –
আরও এক ষোড়শীর হাসি,
ছেঁড়া ফুলের পাপড়ির মত
আটকে থাকা, তার চোখের পাতায়-
হয়তো আরও এক বার সম্মতি পাব,
শেষ চুমু,
ছুঁয়ে ফেলা,
পাপড়ির নরম,
অন্ধকারে মিলিয়ে যাওয়ার আগে!

হয়তো আরও এক বার
কারও নিভাঁজ গোড়ালি –
মসৃণ পাথর ছেনে,
ছড়াবে রত্নের আভা।
আর, আরও এক বার
দম আটকানো কামনায়
নিঃশ্বাস বন্ধ করে-
আরও এক বার
বেঁচে নেব আমি ।

এক জন মানুষ, কতটা সঞ্চয়
ক্রমাগত ফেলে ফেলে যেতে পারে, বল তো ?
বিস্মৃতি স্টেশন পৌঁছনোর আর কত দূর ?
সেখানে তো ছড়িয়ে আছে
মাইল মাইল বিস্তৃত মন্দার বন;
যার মদির গন্ধ, ভুলিয়ে দেবে সব টুকু
এই প্রেম, নশ্বর কামনা, কাদা, সেও ।

সেই শেষ স্টপ তো,
আর কোথাও যাবার নেই যে…

এবার বিদায় দাও

সেই সব অজস্র পঙক্তি পৃথিবীর
আমিও জুড়েছি কয়েকটি আরও।
ঝিঁঝিঁর একটানা কান্নার চেয়ে
বেশী প্রাজ্ঞ নয়, তেমন কিছু
বলারও ছিল না, জানি;
ক্ষমা করো আমায়,
দিনও ফুরিয়ে এলো এবারের মত।

চাঁদের মাটিতে প্রথম পদচিহ্নের
মত ছিল না সে সব শব্দ,
যদি কখনো নিঃশব্দ বিচ্ছুরণে
ছুঁয়ে থাকে তোমায়-
সে আলো ওদের ছিল না
ধার করা মায়া সব।

সেই ভাষা ভালো লেগেছিল তবু।
যে ভাষায় স্তব্ধ ঠোঁট
কেঁপে ওঠে নির্জন আবেশে,
প্রমত্ত চুমুতে মাতে তরুণ যুগল,
স্বর্ণীল সন্ধ্যায় হেঁটে যায় যখন ওরা-
স্বপ্নের দুরন্ত ইশারায়,
রোদে-রাঙ্গা ফসলের ক্ষেত পেরিয়ে…

কবিতা তো আমাদের সাথে
সেই প্রথম দিনের থেকে।
প্রেম, ক্ষুধা, মহামারি, যুদ্ধের মতই
মর্মন্তুদ, নিবিষ্ট গহনে,
জীবনের মাঝে, জীবন হয়েই তো।

কখনো আমার শব্দ, জানি আমি
ঝরেছে মূঢ়তায়, কিন্তু তারও
দেব না কৈফিয়ত কোন।
কেন না আমি এখনো বিশ্বাস করি,
মনোলোভা শব্দের চয়ন,
ঢের ভালো, হত্যা, ধ্বংস, নিধনের চেয়ে।

সুত্রপঞ্জি
1. My Poetic Side Bio: https://mypoeticside.com/poets/jaroslav-seifert-poems
2. Nobel.org life sketch: https://www.nobelprize.org/prizes/literature/1984/seifert/facts/
3. Authorscalender Bio: http://authorscalendar.info/jseifert.htm
4. Wikipedia: https://en.wikipedia.org/wiki/Jaroslav_Seifert
5. Poetry foundation: https://www.poetryfoundation.org/poets/jaroslav-seifert
6. New Yorker article after Siefert’s death: https://www.nytimes.com/1986/01/11/obituaries/jaroslav-seifert-czech-poet-is-dead.html

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)