
রুমেলা দাশগুপ্ত-র কবিতা
ভয়
সে-সূর্যাস্ত খোলা ভেঙে ঝিনুক দেখায়
নিয়ম করে এনে দেয় উৎসাহ বিরতিহীন,
তোমাকে বলিনি তার কথা
তবু, কেমন করে সে কথাও জেনে ফেলেছ তুমি
এখন আমার সমস্ত বিকেল জুড়ে বিস্তৃত জমি
ঝিনুকের ভাঙ্গা খোলা দেখে চিনে নিতে চায় পথ,
কতটা উচ্চতায় দাঁড়ালে সমুদ্র দেখব অবলীলায়-
তুমি ঠিক করবে সেসব মানচিত্র বিষয়
ঠিক করবে চাঁদের আলো কতখানি কোণ করে পড়েছে বিছানায়
বসবে পাশে ব্যস্ততাহীন, বসবে, যতক্ষণ বসা যায়,
যে সময় ফুরিয়েছে বৃথা কাজে, তার হিসেব থাক
যে সময়ে তোমাকে পেয়েছি কাছে, আরো কাছে পেয়ে যাওয়ার লোভে
সেসবই লিখেছি খাতায়, কিছুটা স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাক,
তাতে কী এমন আসে যায়, তোমাকে পেয়েছি কাছে,
এর থেকে ঢের সত্যি, তোমাকে আরো বেশি কাছে পাওয়ার ভয়!
দূরত্ব
দূরত্ব ছিল তখনো তোমার থেকে
তুমি সরে গেছ তারাদের থেকে দূরে
বিমনা রাতের নিষ্প্রভ দ্বীপ জ্বেলে
আমি বেয়ে যাই এই তরীখানি একা
তুমি পরিণয় দুরূহ বিনয় ঢেলে
তোমাকে দেখেছি সন্দেহাতীত মোহে
দুচোখ পুড়েছে স্নেহশীল উত্তাপে
সীমানা পেরিয়ে ইপ্সিত আয়ুরেখা
তুমি বলেছিলে জীবন শর্তহীন
বেঁচে ফিরে যাব আমরা দুজনে ঠিক
পিঠে বেঁধেছিলে ভাজা চাল মুড়ি ছোলা
আমরা দুজন বেপথু বিপ্রতীপ
তোমার জন্য আজো চুমু খায় চাঁদ
তোমার কপালে রাজকীয় টীকা আঁকে
তুমি ছেড়ে গেছ এ বিষাদ ছবিঘর
তুমি ফেলে গেছ অদেখা অন্তরীপ।
তুমি যদি হও
ব্যথা নয়, স্মৃতি নয়, তুমি যদি হও
শুকনো পাতা কানাঘুষো, হেলাফেলা ভীষণরকম
ছেড়ে এসেছি জেনেও রেখেছ বয়াম,সুবাসিত
ম্লান নদীতীর ধরে হেঁটেছ বিলাসে
কী এমন পিছুটান, ফেরাতে পারো নি
দু’বেলা জ্বরের ঘোরে ডেকেছ তাকেই
ডাকনাম ভুলে গিয়ে চেয়েছিলে মুখে
কাছেই তো রেখেছিলে ওষুধের কালো শিশি
কত লোক আনাগোনা, কতদিন থেকে,
জানতে পারো নি যে,
তোমার টেবিল থেকে পড়ে
ভেঙে গেছে, সেই শিশি, কার অভিশাপে!
নিরুদ্দেশ
অঘটনটি ঘটার পরই তুমি চলে গেছ,
ঠিক কতখানি দূরে, জানা নেই আর
তবে রয়েছ যেখানে, সেখান থেকে এসেছে হাওয়া
উল্লেখযোগ্য নয়, তবু বলি,
তোমার কথা হাওয়ার কানে,
আশৈশব রাঙিয়ে দিয়ে কোথায় গেলে!
সন্ধ্যামালতী উঠছে ফুটে
দুয়ার জোড়া কার পায়ের ছাপে ব্যস্ত পড়শি
জড়ো করছে গানের রসদ
ঘরের প্রদীপ নিভিয়ে দিয়েও দেখতে এল পাড়ার বউটি
তার চিকন কালো ভুরু দুটি কৌতূহলী, চেয়ে দেখে পায়ের ছাপ
শরীর ছেয়ে কালো ভ্রমর বাসা বাঁধে, বন্ধু খোঁজে
তিনকুলেতে ঢি ঢি পড়ে
পায়ের ছাপে কে এসেছে, আমার ঘরে
আমার শরীর শুকিয়ে যায়, কোন অনন্ত জলের টানে
দুয়ার ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকি,
হাওয়া আসে মনখারাপের,
পেরিয়ে যাও এ জন্মঘোর,
এখন তোমায় পাব কোথায়?
রাতের ট্রেন
রাতের ট্রেনে যেভাবে এসেছ তুমি
আধখোলা জানলায় একরত্তি করুণ আলোয়
কত কত বাড়ি ঘর, বিস্ময়ে ঢাকা
তুমি তারও চেয়ে কিছু বেশি বিস্ময় মেখে দাঁড়াও
একেক সময় ভুল হয়
তোমাকেও যেন চেনা ঠেকে
এত গাঢ় অন্ধকার, তবু কীভাবে দেখে ফেলি ও মুখ, এতই যে চেনা
রাতের ট্রেনে ভেসে যায় গ্রাম, ভিটেজমি,
এত দীর্ঘ হাড় ভাঙ্গা খাটুনির দিব্যি-
রাতের ট্রেনে ধেয়ে আসে পণ্ডশ্রম
ছিঁড়ে খায় তোমাকে, উদ্বৃত্ত আমার রমন!
জল
আশা তো রাখিনি কোনোদিনই
তবু তুমি ভুলে গেছ যে মুখ শহর
শুকিয়েছে ফুলগাছ , টবে রাখা মাটি
হলুদ পাতার শ্বাসে হেমন্তের জ্বর,
শ্বেত পাথরের থালা মেঝেতে বিছানো
দূরের বাসনে লেগে বিরহের ধুলো
কোন পথে তবে আজ করো যাতায়াত
ছেড়েছ বাসনা সুখ অতীত আঁঠালো?
আজ তার পোড়া জ্বালা তোমাকে ভাবায়
তুমি রোজ মেপে দ্যাখো কতখানি জল
ছুঁয়েছে গভীরে ব্যথা, নিরাময় গুণে
টেনে রাখো সীমারেখা, অস্পষ্ট অতল,
সে জলের ছোঁয়া লাগে দুপুরের ঘুমে
তুমি আশেপাশে থাকো গোপন কাজলে
দূরে ফেরি করে ফেরে যে মালতী ফুল
জেনো, তার ইহলোক ধুয়েছে সে জলে।
বশীকরণ
যখনই ভেবেছি তোমাকে
চাঁদ সরে গেছে অন্য সীমানায়
যেখানে ভেবেছি কখনো যাব, তোমাকে নিয়ে
তুমি দূরত্ব ভালোবাসো
তাই নাম ধরে ডাকিনি কখনো
অথচ মনে মনে অসংখ্যবার,
কী হয় তবে, সাড়া যে দাও না
যেমন করে সাড়া দিলে কাজ তারিখ বদলায়,
যেমন করে কাছে এলে মন দৌড়ে পালায়,
এমন অশান্ত ঢেউয়ে কীভাবে শান্ত হয় মন?
ঠিক এই ভাবনার পরই দেখি, তুমি,
আলো জ্বলে ওঠে, এক দুই তিন
নিথর তীর, তুমি এসেছ,
অলৌকিক রাতের ভোরে
এই বেঁচে থাকা শূন্যে উজাড় করে-
এমন অশান্ত নামের পায়ে কেন যে এত বিবশ হই!

