চিন্তার চিহ্নমালা ১৪ <br /> সন্মাত্রানন্দ

চিন্তার চিহ্নমালা ১৪
সন্মাত্রানন্দ

ঘুমের মধ্যে দেখলাম, কোথায় যেন গেছি। অনেক গাছ-গাছালিতে ভরা একটা আশ্রমই বোধহয়। না, আশ্রম কিনা বুঝতে পারছি না। অনেক উঁচু উঁচু গাছপালার মধ্য দিয়ে ঝুরু ঝুরু বাতাস বইছে। সেই সব গাছেদের দুপাশে রেখে লম্বা পিচঢালা পরিষ্কার রাস্তা চলেছে। কোথাও কোনো মানুষজন নেই। একদম শুনশান। ভাবছিলাম, এ কোথায় এলাম? ঘুরে ঘুরে দেখলাম, কোথাও পাঁচিল চোখে পড়ল না। প্রত্যেকটা রাস্তাই একটা করে বড়ো প্রাসাদের মতো বাড়িতে গিয়ে শেষ হয়েছে। উঁচু বারান্দা, ভারী ভারী থাম, অনেক উপরে সিলিং, পুরোনো দিনের কাঠের পেল্লায় দরজা। সব ঘর খোলা। অথচ কেউ নেই। এখানে কি কেউ থাকে না? একটা শূন্য ঘরে গিয়ে ঢুকলাম। ঘরে আসবাব খুবই কম। এককোণে একটা সাধারণ খাট। টানটান করে বিছানার চাদর পাতা। ধবধবে। একটা বালিশ। খাটটার মাথার কাছে একটা র‍্যাক। র‍্যাকে কিছু বই। আরেকটা টেবিলে বইখাতা, তুলিকলম। মাথার ওপর কড়িকাঠগুলো লোহার বিম দিয়ে তৈরি। অনেক ওপরে ছাদ। ঘরে আর কিচ্ছুটি নেই। তবে কি এখানে কেউ থাকেন? নিশ্চয়ই থাকেন। তাঁরই বই, খাতা। জপের মালা। তাঁরই কলম-দোয়াত-কাগজ-তুলি। কিন্তু সেই মানুষ কোথায়? বারান্দা দিয়ে বেরিয়ে এসে দেখলাম, দেওয়ালে একটা সাইকেল ঠেসানো। চিন্তার চিহ্নমালা। সন্মাত্রানন্দ। চতুর্দশ পর্ব।

ঝাপসা হয়ে আসা চশমা

একেকটা এমন কঠিন সময় আসে, মনে হয় আর চাপ নেওয়া যাচ্ছে না। মনের ভেতর একটা প্রচণ্ড অস্থিরতা, দিনানুদৈনিক জীবনের প্রয়োজন ব্যস্ত রাখে আমাদের উদয় থেকে অস্ত। চারিপাশের পরিবেশ, সামাজিক সঙ্কট, পারিবারিক বিপর্যয়, অর্থাভাব, সম্পর্কের জটিলতা—এক কথায় সমস্ত দিক থেকে যেন একটা হাজার মাথার হাইড্রা আমাদের অবিরত আক্রমণ করে চলেছে। গত দু’বছর এমনই চলছে। একে তো বিশ্বব্যাপী মহামারি, তার দরুন বহুদিন ঘরবন্দি হয়ে থাকা, তার সঙ্গে অর্থনৈতিক মন্দা-আক্রান্ত বাজার। মুখে মাস্ক আর চোখে ঝাপসা হয়ে আসা চশমা নিয়ে জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করে চলেছি অহরহ। কোথাও ইতিবাচক কিছু হচ্ছে না, তা হয়তো নয়। কিন্তু সেসবের ইঙ্গিত ক্রমশ সুদুর্লভ হয়ে আসছে। একই সঙ্গে মৃত্যুর মিছিল গত দু’বছর ধরে ধাবমান। কতজন পরিচিত প্রিয়জন যে এই দু’বছরে গেলেন, তার আর লেখাজোখা নেই। কোথাও দু’দণ্ড বসে জিরোনোর উপায় নেই, যেন এক প্রবল সময়ের স্রোত আমাদের টেনে নিচ্ছে তার ঘুরনিপাকের ভেতর; একমাত্র মৃত্যু ছাড়া আর যেন পরিত্রাণ নেই কোথাও। সংশয় আছে, অস্থিরতা আছে, প্রশ্নাতুর অস্তিত্বের মুখ আমাদের সাজানো ব্যবস্থার প্রান্তদেশে বারবার মুখ তুলছে, পরিধি থেকে ক্রমাগত কেন্দ্রের দিকে যন্ত্রণা চারিয়ে যাচ্ছে।

পৃথিবী শুধু সংক্রমিতই নয়, আক্রান্তও। ভয়াবহভাবে আক্রান্ত তার মূল্যবোধ। মানুষের আচরণকে পাশবিক বললে পশুকে অপমান করা হয়, এমন অবস্থা। পৈশাচিক বলাই ভালো, কেননা সাক্ষাৎ পিশাচের দেখা পাই না আমরা সচরাচর। কিন্তু পিশাচের দেখা পাই না কি? পথে ঘাটে তাহলে ওরা কারা হাঁটছে? অন্যের শান্তি, সুখ ম্লান করে দেওয়া ছাড়া যাদের অন্য কোনো কাজ নেই? মানুষ যে এত নীচে নামতে পারে, এ শতাব্দীর প্রথম দুটি দশক না-দেখলে বিশ্বাস হত না। আফগানিস্তানে যারা ঝাঁপিয়ে পড়েছে, নিতান্ত বর্বরের মতো যারা শিশু-বৃদ্ধ-নারী-পুরুষের ওপর উৎপীড়ন চালাচ্ছে, সেই তালিবানদের সঙ্গে আমাদের তফাৎ কী? আমাদের প্রত্যেকের বুকের মধ্যে ওরাই তো বসত করছে এখন। অন্যের মুখের গ্রাস ছিনিয়ে নিয়ে মাটিতে ছড়িয়ে ফেলে দিয়ে হা-হা করে হাসতে হাসতে অবচেতনের অন্ধকার চোরাগলির মধ্যে লুকিয়ে পড়ছে আমাদেরই মুখোশপরা উন্মত্ততা। এতদিন সঙ্কট এভাবে ঘনীভূত হয়নি বলে খুন, অপহরণ, ধর্ষণ, অত্যাচার দুর্ঘটনা বলেই বিবেচিত হত। এখন আর দুর্ঘটনা নয় সেসব, প্রতিদিনের স্বাভাবিক ঘটনা।

এবং প্রায়শই কেউ মুখ খুলছে না। পোলিটিকালি কারেক্ট থাকতে চাইছে সকলেই। ভেবেছিলাম, বিশ্বব্যাপী এই নৈরাজ্যে প্রতিবাদের ঝড় উঠবে। হা ভগবান! একেবারেই ভুল ভেবেছিলাম দেখছি। আফগানিস্তানে এমন মৌলবাদী আক্রমণের সার্বিক প্রতিবাদ তো হচ্ছেই না, উপরন্তু এটা দেখে অবাক হলাম, অনেক অনেক মানুষ এমন নৃশংস অত্যাচারে উল্লসিত বোধ করছেন। এটা যেন তাঁদের জয়। আবার অনেকেই এই ঘোলা জলে মাছ ধরতে নেমে পড়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, আফগানিস্তানে এমন হচ্ছে, এখানে কি হচ্ছে না? মৌলবাদী শক্তি সব দেশেই ক্রিয়মাণ; কিন্তু সেই যুক্তিতে তো আফগানিস্তানের ঘটনাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া যায় না। ছোটো ছেলেদের ইস্কুলে কোনও ছাত্র অন্য কোনও ছাত্রের ওপর উৎপীড়ন করলে ‘কেন এমন করলি?’ জিগগেস করলে প্রায় প্রত্যেকটি বাচ্চাই এই কথা বলে: ‘ও আমাকে আগে মেরেছে, আগে আমার চুল টেনে ধরেছে, আমাকে আগে খামচে খিমচে রক্তাক্ত করেছে। কই তখন তো আপনি কিছু বলেননি?’ এমন কথা বাচ্চা শিশুকে মানায়। পরিণত বুদ্ধির মানুষ যখন প্রতিটি ক্ষেত্রে একেই তর্কের একমাত্র যুক্তি হিসেবে মর্যাদা দিয়ে চলে, তখন তাকে আর সুস্থ বলে মনে হয় না আমার।

অথচ প্রত্যেকেই চাইছে, অন্যরা তাকে সমর্থন করুক। সমর্থন না-করলে অন্যরা জাহান্নমে যাক। অসমর্থনকারীর বেঁচে থাকারও অধিকার নেই। এই তো মৌলবাদের বীজ! একে অসভ্যতা বলে চিহ্নিত করা হবে না কেন?

একটি দুষ্টু ছেলে প্রতিদিন স্কুল থেকে ফিরত মারপিট করে মুখ ফাটিয়ে, ঠোঁট চোখ কেটে সব রক্তাক্ত করে। তার বাবা এসব দেখে একদিন বললেন, ‘বাবুসোনা! তুমি এত মারপিট করো কেন?’

ছেলে উত্তর দিল, ‘আমার ক্লাসের অন্য ছেলেরা আমার সঙ্গে লাগতে আসে কেন? তাইতে আমার খুব রাগ হয়।’

ভদ্রলোক বললেন, ‘এখন থেকে রাগ হলে তুমি এক থেকে পঁচিশ গুনবে মনে মনে। তাহলে রাগ কমে যাবে।’

ছেলে চেঁচিয়ে বলল, ‘তারপরেও যদি ওরা আমার পেছনে লাগে?’

ভদ্রলোক বললেন, ‘বেশ তো! তখন না হয় তুমি স্কুলের শিক্ষিকার কাছে অভিযোগ করবে।’

ছেলে তখনকার মতো কথাটা মেনে নিল। কিন্তু সেদিনও স্কুল থেকে বাচ্চাটি ফিরলে দেখা গেল, শার্টের বোতাম ছেঁড়া। নীচের ঠোঁটটা কেটে গেছে। কপাল ফুলে আলু হয়ে গেছে।

বাবা বললেন, ‘কী রে? আজও মারপিট করেছিস?’

ছেলের উত্তর, ‘হ্যাঁ, আজও ওরা আমাকে বাজে কথা বলল তো!’

ভদ্রলোক ছেলের কপালে স্যাভলন লাগাতে লাগাতে বললেন, ‘তোকে যে বলেছিলাম, এক থেকে পঁচিশ গুনতে?’

ছেলে ঘড়ঘড়ে স্বরে উত্তর দিল, ‘কী করব? ওদের বাবারা তো ওদের এক থেকে পঁচিশ গুনতে শেখায়নি!’

এ কেমন ধরনের যুক্তি? দশজন লোকের প্রত্যেকেই বলছে, অন্যরা সহ্য করলে তারপর সে সহ্য করবে। মূল্যবোধের শিক্ষা ব্যক্তিগত স্তর থেকে শুরু হয়, নাকি সমষ্টিস্তরে শুরু হয়? কোনো বড়ো ভাবনায় আগে সমাজকে দীক্ষিত করা হোক, তারপর ব্যক্তিমানুষ তার অনুসরণ করবে—এ কেমন কথা? সমাজ কাকে নিয়ে? মানুষের সমষ্টিচেতনাকে সমাজ বলে। এছাড়া আউট দেয়ার ‘সমাজ’ বলে কিছু নেই। এখন প্রতিটি মানুষই যদি আক্রমণ ও প্রত্যাক্রমণের ধারণায় বিশ্বাস করে, তাহলে সেই সমাজ রক্তাক্ত রণাঙ্গন ছাড়া আর হবে কী?

যে-মানুষ যত মৌলবাদী, যত খারাপ যুক্তির অধিকারী, তার ভাষা বা আচরণ তত কদর্য। এমনিতেই চারিদিকে অশিক্ষার চাষ চলছে। এমন একটা পরিস্থিতিতে, অপযুক্তি ও অসভ্যতার পরিবেশে জীবনের হাতে মার খেতে খেতে একদিন ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। না ঘুমোলেই সুবিধে হত, প্রচুর কাজ জমে আছে, চোখ জ্বেলে হলেও সেগুলো শেষ করা দরকার। এদিকে কারেন্ট নেই, ল্যাপটপের ও-এস জবাব দিয়েছে, মোবাইল ফোনে ডেটা নেই, টাকাকড়িও শেষ আর বৃষ্টি পড়ছে আসকাল। এ বছরের মতো এত গিদগিদে বৃষ্টিও কখনও দেখিনি। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি এসে পড়েছি। এখনও এত বৃষ্টিভরা ঘনঘোর সকাল!

ঘুমের মধ্যে দেখলাম, কোথায় যেন গেছি। অনেক গাছ-গাছালিতে ভরা একটা আশ্রমই বোধহয়। না, আশ্রম কিনা বুঝতে পারছি না। অনেক উঁচু উঁচু গাছপালার মধ্য দিয়ে ঝুরু ঝুরু বাতাস বইছে। সেই সব গাছেদের দুপাশে রেখে লম্বা পিচঢালা পরিষ্কার রাস্তা চলেছে। কোথাও কোনো মানুষজন নেই। একদম শুনশান। ভাবছিলাম, এ কোথায় এলাম? ঘুরে ঘুরে দেখলাম, কোথাও পাঁচিল চোখে পড়ল না। প্রত্যেকটা রাস্তাই একটা করে বড়ো প্রাসাদের মতো বাড়িতে গিয়ে শেষ হয়েছে। উঁচু বারান্দা, ভারী ভারী থাম, অনেক উপরে সিলিং, পুরোনো দিনের কাঠের পেল্লায় দরজা। সব ঘর খোলা। অথচ কেউ নেই। এখানে কি কেউ থাকে না? একটা শূন্য ঘরে গিয়ে ঢুকলাম। ঘরে আসবাব খুবই কম। এককোণে একটা সাধারণ খাট। টানটান করে বিছানার চাদর পাতা। ধবধবে। একটা বালিশ। খাটটার মাথার কাছে একটা র‍্যাক। র‍্যাকে কিছু বই। আরেকটা টেবিলে বইখাতা, তুলিকলম। মাথার ওপর কড়িকাঠগুলো লোহার বিম দিয়ে তৈরি। অনেক ওপরে ছাদ। ঘরে আর কিচ্ছুটি নেই। তবে কি এখানে কেউ থাকেন? নিশ্চয়ই থাকেন। তাঁরই বই, খাতা। জপের মালা। তাঁরই কলম-দোয়াত-কাগজ-তুলি। কিন্তু সেই মানুষ কোথায়? বারান্দা দিয়ে বেরিয়ে এসে দেখলাম, দেওয়ালে একটা সাইকেল ঠেসানো।

রাস্তায় নেমে আসতে রাস্তা পালটে গেল। এখন এটা আর পিচ ঢালা রাস্তা নয়। জলের রাস্তা। নদীও একে বলা যেতে পারে। যে-নদীতে হাঁটু জল। তিরতিরে স্বচ্ছ স্রোত। সেই রাস্তা বা নদী বা খাল বেয়ে আমি হাঁটতে লাগলাম। হাঁটছি…হাঁটছি… বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল। রাস্তা বা নদীর একপাশে একটা প্রতীক্ষালয়। কিন্তু প্রতীক্ষালয়ে কোনো মানুষ নেই। একটা পাখির একটু ডাকও নেই। মাথার ওপর দিয়ে চলে গেছে একটা ফ্লাই-ওভারের মতো কিছু। তার ওপর দিয়ে দেখা যাচ্ছে সন্ধ্যার আকাশ। আরক্তিম। ব্যাকুল। স্তব্ধ।

ঘুম ভাঙল যখন, মনে হল, শরীরে শান্তি ভরে আছে। এক নিঃস্পৃহ, নির্লিপ্ত শান্তি। কেমন এক আর্দ্র করুণার ভাব!

তাহলে আমাদের মনের ভেতর এমন ডিফেন্স মেকানিজম আছে, যা সহস্র যন্ত্রণার মধ্যে অন্তত অল্প কিছু সময়ের জন্য হলেও আমাদের সেই শান্ত অবস্থাটাতে নিয়ে যেতে পারে। এ যদি না-থাকত, তাহলে আত্মহনন ছাড়া গতি ছিল না আমাদের। এ না-থাকলে ‘জাগিবার অবিরাম ভার’ আমাদের শ্বাসরোধ করে দিত এত দিনে।

(ক্রমশ)

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)