দুপুরে
সুদীপ বসু

দুপুরে

একটু ভারি রাতের দিকে ছেলেটি বাড়ি ফিরে এল।
সারাটাদিন নানান কাজে অসম্ভব উদ্বেগের ভেতর দিয়ে গেছে।
একটা নিচু মফস্বলের প্রাচীন ভাড়াবাড়ির স্যাঁতস্যাঁতে একতলার ঘর। টিভির মনে টিভি চলছে। খাবার টেবিলে বসে দুই করতলের ওপর চিবুক রেখে একটি কমবয়সী মেয়ে নির্ণিমেষে তাকিয়ে আছে টি.ভির দিকে।
কিন্তু টি.ভি দেখছে না।
মেয়েটি আজ ভয়ঙ্কররকম আনমনা।
ছেলেটি ঘরে ঢুকেই একমুহূর্ত থমকে দাঁড়াল। কিন্তু ঘরের বড় আলোটা জ্বালল না। মেয়েটি টেরও পায়নি।
নাইটল্যাম্পটা একা একা জ্বলছিল।
‘আজও এসেছিল?’ ছেলেটি জিজ্ঞেস করল।
‘….’
ছেলেটি প্রশ্ন রিপিট করল – ‘আজও এসেছিল?’
‘ও তুমি?’ মেয়েটির এবার চটক ভেঙেছে, ‘এত দেরি? আমার দারুণ চিন্তা হচ্ছিল জানো?’
‘না।’ ছেলেটি বলল।
‘কী না?’
‘ওই চিন্তা হওয়াটা।’
‘বিশ্বাস করো।’ মেয়েটি এবার অনুনয়ের সুরে বলল, ‘ফোন করলাম। প্রথমবার নট রিচেব্‌ল। পরেরবার বোধহয় কেটে দিলে, বিশ্বাস করো।’ মেয়েটি আবার বলল।
‘আমার বিশ্বাস অবিশ্বাসে কী যায় আসে! যাকগে …’ ছেলেটি বলল।
‘যায়। এবং আসে।’ মেয়েটি থেমে থেমে বলল।
‘না।’
‘হ্যাঁ।’
‘আজও এসেছিল?’ ছেলেটি বলল।
‘হুঁ।’
‘আজ পাঁচদিন হয়ে গেল। পর পর পাঁচদিন। ভাবা যায়?’
‘ছয়।’
‘ছয়? ছ’দিন? তাহলে ছ’দিন। সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আজও কি সেই একই কথা একই ঘ্যানর ঘ্যানর ?’
‘হুঁ।’
‘অথচ কিছুই করছি না আমরা। ভাবো কিছুই করছি না। বসে বসে নাটক দেখছি। বোবা দর্শক। কেবলমাত্র তোমার আপত্তিতে, অনিচ্ছায়।’
‘হুঁ।’
‘কী হুঁ?’
‘কিছু না। এমনি হুঁ।’
‘এমনি হুঁ? শোনো কালকের দিনটা দেখব। অনিকেতকে জানিয়েছি। বাধ্য হ’য়েই জানালাম। প্রথমে লোকালি একটা এফ.আই.আর করতে হবে। প্রপার প্রসিডিয়োরে এগোতে হবে। বেশি দেরি হ’য়ে গেলে পুলিশ নিতে চাইবে না। বলবে, “অ্যাদ্দিন ঘুমোচ্ছিলে নাকি? ঘুমোচ্ছিলে?” বুঝেছ?’
‘হুঁ।’
‘খুব সাবধানে।’
‘কী?’
‘এগোতে হবে।’
‘….’
‘যেন কেউ টের না পায়।’
‘হুঁ’
‘কালকের দিনটা ওয়েট করবে তো?’
‘বাহ্‌ রে তুমিই তো বললে করবে।’
‘হ্যাঁ। করব। আর একটামাত্র দিন। তারপর একটা হেস্তনেস্ত হবে। করতেই হবে। এসব কেসে শাস্তি অনেকদূর অবধি গড়ায়। জানো তো?’
‘না।’
‘কী না ?’
‘জানি না।’
‘আরে আমিও কি জানতাম? অনিকেতই বলল। ওর বউ দূর্বাকেও, …. দূর্বাকে তো তুমি চেনো?’
‘হ্যাঁ, দুর্বা, একবার বোধহয় কোথায় যেন দেখা হয়েছিল।’
‘দূর্বাকে অমন একজন জ্বালাতন করত। শাস্তি দিয়েছিল অনিকেত।’
‘তাতে কী হল?’
‘আমিও দেব।’
‘কী?’
‘শাস্তি।’
‘না।’
‘কী না?’
‘হবে না। শাস্তি। হবে না।’
ছেলেটি থমকে গেল।
‘মানে!’
‘….’
‘হঠাৎ এই কথা? কুহু? কী হয়েছে?’
‘কিছুই হয়নি। সবসময় কিছু হতে হবে? কিছু না হলে কি কিছুই হয় না?’
‘নিশ্চয়ই কিছু একটা হয়েছে। তোমার চোখমুখ আজ অন্য কথা বলছে।’
‘কী বলছে চোখমুখ?’ মেয়েটি খুব সতর্কভাবে প্রশ্ন করল।
‘আগে বলো কী হয়েছে? তেমন বেকায়দা কিছু কি বলেছে লোকটা আজ ফোনে?’
‘….’
‘তোমাকে আজ অন্যরকম দেখাচ্ছে।’
‘কী রকম?’
‘কেমন বড় বেশি শান্ত, ক্লান্ত …’
‘আর।’
‘ঠান্ডা।’
‘আর?’
‘মনমরা।’
‘….’
‘যেন ভয়ে গুটিয়ে আছো।’
‘ও তোমার চোখের ভুল, অরি।’ মেয়েটি বলল।
মেয়েটি এবার চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে জানলার লোহার গ্রিলে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। দেখল বাইরে দু-চারটে হাতে গোনা ছিঁটেফোঁটা নক্ষত্র ফুটে উঠেছে অন্ধকার আকাশে। তার মধ্যে একটা অসম্ভব নীল।
‘কী ভীষণ নীল দেখাচ্ছে ওই তারাটা, দ্যাখো, অরি।’ মেয়েটি বলল।
‘তারা নয় কুহু তুমি ওই উড়ো টেলিফোনের কথা বলো।’ ছেলেটি ধমকের সুরে বলল।
‘উড়ো টেলিফোন নয়, আমার যত কথা সব ওই একলা নীল তারাটাকে ঘিরে।’ মেয়েটি ম্লান হাসি হেসে বলল – ‘সারাজীবন ধরে। তুমি জানো।’
তারপর দুজনেই চুপচাপ হয়ে গেল।
‘আচ্ছা বলতে পারো অরি, একটা লোকের, সে যেই হোক, এমনি এমনি শাস্তি হবে কেন?’ মেয়েটা হঠাৎ বলল।
‘এমনি এমনি মানে’, ছেলেটি বলল, ‘একটা অচেনা লোক একটা অচেনা মেয়েকে দিনের পর দিন বিভিন্ন নম্বর থেকে ভরদুপুরে ফোন করে জ্বালাবে আর তার শাস্তি হবে না? কী বলো কী তুমি?’
‘দিনের পর দিন? কিন্তু ছ’দিনের মাথায় যদি এটা বোঝা যায় যে একটা চেনা লোক একটা চেনা মেয়েকে ভরদুপুরবেলা টেলিফোন করছে। তা নিয়ে থানা পুলিশ হবে কেন?’
‘চেনা লোক কুহু? লোকটাকে চেনা গেছে?’
‘না।’
‘মানে?’
‘না মানে না।’
‘তবে?’
‘কন্ঠস্বরটাকে, গলার আওয়াজটাকে, মনে হয় চিনতে পেরেছি।’
‘এটা কার গলার আওয়াজ কুহু?’
‘তুমি চিনবে না। তোমার চেনার কথাও নয়।’
‘আমি নয় নাই চিনলাম, তবু!’
‘হুঁ। সেই।’ মেয়েটিকে আবার আচমকা খুব আনমনা শোনাল, ‘তুমি নয় নাই চিনলে, তবু?’
‘কার গলার আওয়াজ? বলবে না কুহু? লোকটা আসলে কে?’
মেয়েটি জানলার বাইরে চেয়ে কিছুক্ষণ স্তব্ধ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর বলল, ‘বলছি।’
ছেলেটি দেখল সেই নীলতম নক্ষত্র এখন যেন আরো অনেকটা কাছে এগিয়ে এসেছে।
তা আসুক।
ছেলেটি বলল ‘বলো। আমি অপেক্ষা করছি।’
মেয়েটি বলল ‘তুমি চিনবে না, আমাদের বাড়ি অনেকবছর আগে একজন সন্ন্যাসী আসতেন।’
‘….’
‘বৃদ্ধ। বেশ বয়স হয়ে গিয়েছিল।’
‘….’
‘সে অনেক যুগ আগেকার কথা অরি। তখন আমি ক্লাস নাইন কি টেন হবে। কিম্বা আরও আগে।’
‘ও’।
‘মাঝে মাঝে আসতেন আমাদের বাড়ি।’
আবার কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ থেকে মেয়েটি বলল – ‘আমাদের ধানকল রোডের ভাড়াবাড়ির একতলার একচিলতে ঘরে। ছোড়দা হারিয়ে যাওয়ার পরদিন থেকে ওঁকে আর কখনো দেখা যায়নি।’
‘ও। তা এটা কি ওঁর গলার আওয়াজ বলে মনে হল?’
‘হ্যাঁ, অবিকল ওঁর।’
‘সে সন্ন্যাসী তো বললে তখনই খুব বৃদ্ধ ছিলেন।’
‘হ্যাঁ তা তো ছিলেন। মা বলত ময়ূরবাহন এসেছেন। বাড়ির বাইরে রাস্তায় কাঠমল্লিকা গাছের নিচে ওঁর ময়ূরটা অপেক্ষা করছে।’
‘ময়ূর? তাই নাকি? ময়ূরের পিঠে চড়ে আসতেন?’
‘হ্যাঁ। তেমনটাই বলা হত আমাদের।’
‘সেসবই বুঝলাম। কিন্তু সেই বৃদ্ধ সন্ন্যাসী আজও বেঁচে আছেন বলতে চাও?’
‘না। বেঁচে নিশ্চয়ই নেই।’
‘আর দুপুরবেলা তোমায় টেলিফোন করছেন?’
‘না। আমি তো বললামই লোকটাকে নয় আমি কন্ঠস্বরটাকে চিনতে পেরেছি।’
‘….’
‘ওঁর কন্ঠস্বরটা হয়তো আজও বেঁচে আছে। হতে পারে না অরি?’ মেয়েটিকে খুব দিশেহারা দেখাচ্ছিল।
‘আশ্চর্য!’ ছেলেটি অস্ফুটে বলল।
মেয়েটি বলল – ‘জানি না তুমি কী ভাবো, অরি, আমি কিন্তু বিশ্বাস করি একজন মানুষ চলে যাবার সময়, তার হাসি, কান্না, রোখরাগ, কথা বলার ঢঙ, চিৎকার মান-অপমান … সব এখানে রেখে দিয়ে যায়।’
‘কী হয় সেসব দিয়ে পৃথিবীর?’
‘কিছুই হয়তো হয় না … কিম্বা হয়তো অন্য কেউ পায়।’
‘বুঝলাম না।’
‘বলছি। অনেক সময় দেখবে একজনকে কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখলে অন্য কোনো দেশের অন্য কোনো সময়ের অন্য কোনো একটা মুখের কথা আচমকা মনে পড়ে যায়। তোমার এরকম হয় না অরি? কেমন একটা কুয়াশার স্মৃতি?’
‘না, হয় না। তুমি টেলিফোনের লোকটার কথা বলো।’
‘প্রথম দিনই আমি আঁতকে উঠেছিলাম। গলাটা যেন আগে শুনেছি না কোথাও? কোথায়? কবে? কোন জন্মের পারে? তোমাকে বলিনি। বলা যায় না। আস্তে আস্তে মনে করবার চেষ্টা করলাম। এ’কদিন ধরে। সারাদিন ধরে। এখন সব জলের মতো পরিস্কার।’
‘….’
‘আগে ভয় করছিল খুব।
‘অজানার ভয়?’
‘না। অজানাকে হঠাৎ জেনে যাওয়ার ভয়। অতীতকে কাটাছেঁড়া করতে গিয়ে কখন কোন ফাঁকফোঁকর দিয়ে কোন কালশিটে বেরিয়ে পড়ে, তার ভয়।
‘আর এখন?’
‘এখন? এখন সবই জলের মতো পরিস্কার। এখন আমি মুক্ত।’
‘আচ্ছা কুহু, ধরা যাক তুমি চিনতে পেরেছ ওই কন্ঠস্বর। ওই গলার আওয়াজ। ধরা যাক লোকটাকেও তুমি চিনতে পারলে। কিন্তু এই টেলিফোনের সমস্যাটা তো সমস্যাই থেকে গেল। এটা নিয়ে এখন কী করবে?’
মেয়েটি অবশ্য এ প্রশ্নের উত্তর দিল না। ঘুরিয়ে বলল – ‘জানো অরি, অনেকগুলো বছর কেমন ভুলে গিয়েছিলাম সব। মরে গিয়েছিলাম বোধহয়। মরে গিয়েছিলাম নাকি? তোমার কী মনে হয়?’
‘….’
‘নাকি আরো বেশি বেশি করে বাঁচতে চাইছিলাম? তাই তোমাকে কোনোদিন কিছু বলিনি। …. সব ছবি ধীরে ধীরে ফিরে আসছে আবার।’
‘অতীতের?’
‘হ্যাঁ। অতীতের। যা আমার ভবিষ্যৎও হতে পারত। হয়নি।’
‘তারপর? আমাকে এবার খুলে বলবে তো সব?’
‘তখন খুব দৈন্যের দিন ছিল আমাদের। সে কথা তুমি অনেকটাই জানো। অনেকটাই জানো না। সুধাকাকিমার সঙ্গে বাবা চলে যাওয়ার পর মা খুব অসুস্থ হয়ে পড়ল। একদিন সন্ধের দিকে স্ট্রোকে একটা দিক আংশিক পড়ে গেল মা’র। চোখেও খুব কম দেখতে শুরু করল। তারপর মাথাটা চলে যেতে শুরু করল।
‘এসবই তো আমি জানি কুহু।’
‘মাথা চলে গেলে মানুষের কী থাকে? বলো। কিচ্ছু থাকে না, ধানকলরোডের সেই স্যাঁতস্যাঁতে ভাড়াঘরে খাটের ওপরে শুয়ে থাকত মা। আর মাঝে মাঝে চিৎকার করে উঠত ‘রুনু তোর হারমোনিয়ামটা নিয়ে আয়।’
‘হারমোনিয়াম?
‘হারমোনিয়ামটা নিয়ে আয় শিগগির। ক’জন মিলে ধরাধরি করে হারমোনিয়ামটা নিয়ে এসে মা’র সামনে ডালা খুলে পেতে দেওয়া হতো। রিডগুলোর মাঝখানে মাঝখানে যেসব ফাঁকফোঁকর তার দিকে কতক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকত মা।
‘হারমোনিয়ামের ভেতর তাকিয়ে থাকত? রিডের ফাঁকফোঁকরের ভেতর? কী ছিল সেখানে?’
‘অন্ধকার। মা বলত কী অন্ধকার!’
‘?’
‘যে অন্ধকারের এত খোঁজ করত মা তা নাকি খুঁজে পেয়েছিল ওই সন্ন্যাসীর দুচোখে?’
‘চোখের ভেতরে অন্ধকার? হারমোনিয়ামের? অদ্ভূত তো!’
‘খাটের ওপর শুয়ে থাকত মা। একই ঘরের মধ্যে আমরা চার ভাইবোন। কেউ পড়ছি, কেউ খেলছি, কেউ খুনসুটি করছি, কেউ ঘুমিয়ে পড়েছি। মা কিন্তু নজর করত সব।’
‘…’
‘মা নজর করত সব। যাবার সময় একটা বেলজিয়াম কাচের আয়না রেখে গিয়েছিলেন বাবা। সেই আয়না ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মা লক্ষ্য রাখত সবার ওপর।’
‘তখন তিনি নিশ্চয়ই একটু ভালো।’
‘হ্যাঁ। একটু ভালো থাকত যখন। একটু একটু করে নিজের থেকেই ঠিক হয়ে আসত যখন। মা টের পেত এখন আর তেমন কোন শ্বাসকষ্ট নেই। অন্ধকার নেই। আয়নার ভেতর দিয়ে আমাদের শাসন করত তখন। যাকে যা কাজের কথা বলার, বলত। বকাবকি করত। আদর করত। আবার হয়তো কয়েকদিন পর যে কে সেই। ওই সময়টাতেই …’
‘ওই সন্ন্যাসী আসতেন। ময়ূরবাহন?’
‘হ্যাঁ। এসে সরসরি মা’র বিছানাতেই বসতেন। মা’র পাশে। অস্ফূটে কী সব কথা বলতেন আমরা তার কতটুকুই বা বুঝতাম? মা বলত তোরা একটু বাইরে গিয়ে দাঁড়া। দাঁড়া না! আমরা দরজার বাইরে গিয়ে দাঁড়াতাম। আমরা ময়ূরবাহনের ময়ূরটাকে খুঁজতাম তখন।’
‘খুঁজে তো পাওনি কোনোদিন নিশ্চয়ই!’
‘না। কোনোদিন খুঁজে পাইনি। কেউ তাকে কোনোদিন দেখেইনি।’
‘সন্ন্যাসীর কথাবার্তা কিছু মনে পড়েনা এখন?’
‘না। তেমন কিছু নয়। খুবই ভাসা ভাসা। টুকরো টুকরো। ছাড়া ছাড়া। সেসব খুব কঠিন কথা। খুব জটিল। অস্পষ্ট। অনেকরকম অর্থে ভরা। তবে ওঁর চোখদুটো মনে পড়ে। গলার আওয়াজ মনে পড়ে।’
‘হুঁ।’
‘মনে পড়ে অরি ওঁর কথাবার্তা ছিল কেমন শরীরী গন্ধে ভরা। কেমন মাংসময় রক্তময় সবকিছু। কেমন একটা রক্তের মায়া যেন…’
‘বুঝতে পেরেছি। এধরণের সন্ন্যাসীরা মাছমাংস খেতে বলে। শরীরের চোরা আকাঙ্খাগুলোকে শান দেওয়ার কথা বলে। বলে ত্যাগ নয় জীবন ভোগের উদ্‌যাপন।’
‘ঠিক তাই। যাবার আগে মার জীর্ণ হাতদুটোকে নিজের করতলের ভেতরে চেপে ধরে বলতেন “যোগিন্দর সিংকে তোর কথা বলে রেখেছি তো। এত চিন্তা কীসের?” আর যেই না নিজের হাতের মধ্যে মা’র হাতদুটো চেপে ধরা পোষা ময়নাটা দাঁড়ের ওপর পাগলের মতো লাফাত আর চিৎকার করত “জল পড়ে পড়ে যায় রুনু দ্যাখ জল পড়ে পড়ে যায়। নিজের চোখেই দ্যাখ।” হাত ছেড়ে দিলেই ময়নার সব লম্ফঝম্প শেষ।’
‘যোগিন্দর সিং?’
‘হ্যাঁ যোগিন্দর সিং। ওই নামটা ওঁর মুখে ঘুরেফিরে কতবার যে শুনতাম। একবার ধূম জ্বর হল আমার। যাওয়ার আগে আমার কপালে হাত রেখে ময়ূরবাহন বললেন ‘বেটি ভালো হয়ে যাবি।’ যোগিন্দর সিং নাকি আমার রক্তের সব বিষ শুষে নিচ্ছেন।’
‘এই যোগিন্দর সিং-টি আবার কে?’
‘জানি না। কেউ জানে না। আর জানে না বলেই উনি যোগিন্দর সিং। মা বলত যোগিন্দর সিং মানে যাকে জানি না সে।’
‘মানে?’
‘ওঁর নাম আমরা ওই ময়ূরবাহন সন্ন্যাসীর মুখেই প্রথম শুনি। মা’কে বলতেন। মা খুব যোগিন্দর সিং-এ বিশ্বাস করত।’
‘যোগিন্দর সিং-এ বিশ্বাস? এতে বিশ্বাসের কী আছে?’
‘হ্যাঁ। মা বলত যোগিন্দর সিংকে কখনো দেখা যায় না। উনি আড়াল থেকে সবার জীবনের সবকিছু গড়ে দেন। রাগ হলে আড়াল থেকে ভাঙেন। তিনি অসুখ দেন তিনিই সারিয়ে তোলেন। আড়াল থেকে তিনি আমাদের শাস্তি দেন। একবার মা সন্ন্যাসীর কাছে কেঁদেকেটে পড়ল – ‘সবার সকাল হয়, আমার হয় না কেন ঠাকুর।’ সন্ন্যাসী বললেন … ‘দাঁড়া যোগিন্দরকে বলছি।’ কী আশ্চর্য পরেরদিন থেকেই সকাল হতে শুরু করল মায়ের।’
‘ওই যোগিন্দর না কে সে তবে সন্ন্যাসীর মর্জিতেই চলত।’ ছেলেটি হঠাৎ ব্যঙ্গের বাঁকা হাসি হেসে বলল।
‘না, ঠিক তা নয়। সন্ন্যাসীর নাম ছিল ময়ূরবাহন। সন্ন্যাসীর ইচ্ছের নাম ছিল যোগিন্দর সিং।’
‘….’
‘রকির কথা মনে পড়ল। আচমকাই।’
‘রকি?’
‘একটা রোগা বাচ্চা ছেলে। হতদরিদ্র। মাথাভর্তি কোঁকড়ানো চুল। তালিমারা শার্ট। মায়াবী চোখ। ময়ূরবাহনের সঙ্গে আসত। এমনিতে কথা বলতে গেলে আটকে আটকে যেত। কিন্তু গান গাইবার সময় অন্য ম্যাজিক। কী সুরেলা গলা ছিল ছেলেটার। ছোড়দি বলত ওর গলায় একটা জিনিশ লুকিয়ে আছে। কী জিনিশ কী জিনিশ আমরা ঘিরে ধরতাম ছোড়দিকে … ?’
‘কেকা বলত না?’
‘না। বলত না। কিছুতেই বলত না। বলেছিল আট বছর পর। ওর বাসী বিয়ের রাত্রিবেলা। একটা সাদা চিরকুটে লিখে চার ভাঁজ করে আমার হাতে গুঁজে দিল।’
‘কী লেখা ছিল তাতে?’
‘“সাপের ছোবল ছিল রে কুহু … সারাজীবন ঝিম মেরে আছি।” তদ্দিনে সেই ময়ূরবাহন আর রকি সব অতীত হয়ে গেছে।’
‘আর যোগিন্দর সিং?’
‘যোগিন্দর সিং?’, মেয়েটিকে এবার বিস্মিত দেখাল, ‘তিনি কোথায় যাবেন? তিনি তো একটা ছায়া। মা বলত যাবজ্জীবনের ছায়া। তাঁর বয়স পৃথিবীর বয়সের সমান।’
‘আশ্চর্য! তুমিও তবে এসবে বিশ্বাস করো কুহু?’
‘জানি না। বিশ্বাস হয়তো করি না। কিন্তু বিশ্বাস করতে পারলে ভালো হত।’ মেয়েটি বলল, ‘বেঁচে যেতাম।’
‘তুমি কোনোদিন তো আগে এসব কথা বলোনি কুহু।’ ছেলেটি বলল।
‘ইচ্ছে হয়নি। তাছাড়া মা’র মানা ছিল। এইসব ধ্বংসস্তূপের গল্প। হাহাকার।’
‘আজ হঠাৎ বলে ফেলে নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে না?’
‘খুউব। খুউব। ময়ূরবাহনের কথা … বাচ্চা ছেলের কথা, আমাদের ওই অত অন্ধকারের গল্প … মা’র মানা ছিল।’
কান্নায় মেয়েটির গলা বুজে এল।
‘কিন্তু এসবই তো হল টেলিফোনের ওপারের ওই লোকটার জন্যে। ও অকারণে তোমার সব অতীতকে ধরে টান দিল। সব ফাঁস করে দিল। শাস্তি হবে না?’
‘না।’
‘কেন, তোমার ওই ময়ূরবাহনের কন্ঠস্বর বলে?’
‘না। মোটেও নয়।’
‘তবে?’
‘তবে কিছু নয়।’
মেয়েটি আবার কয়েকমুহূর্ত চুপ করে থাকল।
‘শুনলে তুমি কী ভাববে জানি না, …. লোকটা আজ আমাকে একটা নতুন কথা বলল। একেবারে নতুন কথা।’
‘নতুন কথা পুরনো কথা কিছুই আমার মাথায় ঢুকছে না কুহু।’
‘এ ক’দিনে একবারও একথা বলেনি, আজ যা বলল। সেই থেকে আমার খুব ভয় করছে অরি। দারুণ ভয় করছে।’
‘কী এমন বলল লোকটা আজ নতুন কথা?’
‘বলল …. আমি যখন নানান কাজে রাস্তায় বেরোই, বন্ধুদের কাছে যাই, ওষুধের দোকানে গিয়ে দাঁড়াই, রান্নাঘরে রান্না করি, ও নাকি আড়াল থেকে আমার হাতদুটো লক্ষ্য করে শুধু।’
‘শুধু তোমার দুটো হাত? কোন আড়াল থেকে?’
‘সেসব কিছু বলল না।’
‘হাতের নড়াচড়া, ওঠাপড়া, হাতের গড়ন লক্ষ্য করে শুধু।’
‘তাতে ওর কী লাভ?’
‘ওর কী লাভ জানি না। বলল যেসব মানুষ শান্ত ঠান্ডা নির্জীব হয়ে থাকে সারাজীবন আর আচমকা একদিন খুব কাছের কাউকে অকারণে নৃশংসভাবে খুন করে পালিয়ে যায় আমার হাতদুটো নাকি অবিকল তাদের মতো।’
‘তোমার হাতদুটো সেইসব খুনিদের মতো?’
‘হুঁ।’
‘বলল আর তুমি বিশ্বাস করলে এইসব?’
‘জানি না। কিন্তু অরি, অবিশ্বাস থেকেও তো ভয় আসে। আসে না? আসে তো? শুনে আমার শিরদাঁড়া বেয়ে কী একটা শীতের মতো নেমে গেল। গা শিরশির করে উঠল কতবার। কতবার মনে হল পৃথিবীটা উল্টেপাল্টে যাবে এক্ষুণি, ছারখার হয়ে যাবে।’
‘লোকটা এসব কথা তোমাকে সরাসরি বলে দিল? বলার সাহস পেল এত?’
‘হ্যাঁ। সেই থেকে ভয়ে কাঁটা হয়ে আছি।’
‘আশ্চর্য! এতে আবার ভয়ও পেয়ে গেলে তুমি?’
‘ভাবছি….’
‘কী ভাবছ? এতে এত ভয় কীসের তোমার? ভাবনা কীসের? এসব কি তোয়াক্কা করবার মতো জিনিশ? যত সব….’
‘ভাবছি।’
‘কী?’
‘আমি অনেকক্ষণ ধরে তাই ভাবছি অরিন্দম। এসব বিশ্বাস না করাই ভালো। কী বলো? এসব কি তোয়াক্কা করবার মতো জিনিশ? ঠিকই তো। আমি কি পালিয়ে যাবো? আমি কি আর কোনোদিন তোমাকে একলা ফেলে পালিয়ে যাবো বলো?’
ছেলেটি তখন বাইরে শীতমাঠের নির্জন সাপচরা অন্ধকারের দিকে অপলক তাকিয়ে রয়েছে। একটু পরে সে হয়তো মেয়েটির চোখের দিকে তাকাবে। হয়তো আর তাকাবেই না।
‘আমি কি ফিরে আসিনি? তোমার কাছে থাকব বলে কি পাকাপাকিভাবেই ফিরে আসিনি আমি? বলো?’ মেয়েটি বলেই চলল।

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)