ওবায়েদ আকাশের কবিতাগুচ্ছ

ঘুঙুর খেলা

কিছু সময় বদলে দিয়ে
উড়ে যাবার সময় হয়েছে ঘুঙুরের?

ছোটবেলায় ঘুঙুরনাচ নাচতে গিয়ে— একবার দু’বার
শরীরছেঁড়া মৃদু রক্তে— ভেসে গেছে ঘুঙুরের মুখ
আর তাকে মানিয়ে নিয়েছে— উচ্ছ্বাসের দুরন্ত প্রকার

মা বেঁধে দিতেন কোমরে ঘুঙুর
আর কোরবানির ষাঁড়ের পশুকে সংসারের পিতা

তারপর সবাই খুলে নিতেন
উভয় নৃত্যের একই রকম হাসি দেখবার পর

ঘুঙুর খেলা— একদার সাংসারিক সত্যে আমরা যাপন করেছি

ঘুঙুরের পরনে ছিল পিতলের আভা—
উচ্চতা যথারীতি, আর
গোলগাল চেহারায়— নাভির ওপর দীর্ঘ ফাঁড়া দাগ

গোরখোদক

আলাউদ্দিন, গোরখোদক
একটি একটি কবর খোঁড়ার পর
সারারাত নিজের জন্য স্বনির্মিত কবরেই ঘুমিয়ে থাকে

তার দেহখানা আলনায় ঝুলিয়ে দেয় আর
আত্মাটাকে খুলে রেখে কবরের দরজা ভেজিয়ে দেয়

গোরস্থানে আলাউদ্দিন এক স্বনামখ্যাত ডাক
তার মুখভর্তি ছোটবড় কাচের আসবাব
বুকভর্তি রাজপথ এবং
চোখভর্তি হরপ্পা-মহেঞ্জোদারো সভ্যতার বিস্মৃতি

সকলের চোখ ফাঁকি দিয়ে আলাউদ্দিন যা করে :
কখনো কাকতাড়ুয়া আবার কখনো
বাঘের চামড়ায় ঢেকে নিজেকেই দাঁড় করিয়ে দেয়
গোরস্থানের মূর্তিমান মনুষ্য-আতঙ্ক করে

আর ভাবে মনে মনে, পৃথিবীতে যে কোনো মিথ্যাকে সত্য আর
সত্যকে মিথ্যা বানানো গেলে
এই প্রকার মনুষ্য-আতঙ্ক একদিন
মানুষের মৃত্যুকেও প্রতিরোধ করার শক্তি যোগাবে!
অভিধান থেকে ইতিহাস— গোরখোদক শব্দটি
আর কোথাও থাকবে না

হঠাৎ চিৎকার করে কবরের ভেজানো দরজায় লাথি মেরে দেখে
কে যেন তার খুলে-রাখা পুরনো আত্মাটি
হাতিয়ে নিয়ে গেছে
এবং নিজেকে আবিষ্কার করে একটি নতুন আত্মার মুখোমুখি

আলাউদ্দিন, গোরখোদক
অভিধাটি আজকাল কেউ ব্যবহার করে না আর

রক্তের ধারা

মাছবাজারে যে মাছটির দরদাম নিয়ে
কথা কাটাকাটি হাতাহাতির দিকে যাচ্ছিল—
তার পাশের ডালা থেকে একটি কর্তিত কাতলের মাথা
আমার ব্যাগের ভেতর লাফিয়ে ঢুকে গেল

তখন মস্তকবিহীন কাতলের অবশিষ্ট দেহের দিকে তাকাতেই
আমার সমস্ত শরীর রক্তে লাল হয়ে গেল

কাতলের যিনি প্রকৃত ক্রেতা ছিলেন
মানিব্যাগ থেকে মূল্য পরিশোধ করে বললেন—

“এ নিয়ে কিছু ভাববেন না হে
আজকাল মাছেরা যেভাবে রক্তপাত করতে শুরু করেছে
এভাবে চললে আপনি-আমি সবাই এমন রক্তে নেয়ে যাবো”

আর তৎক্ষণাৎ বাজারের সকল মৎস্যবিক্রেতা যার যার রক্তের ধারা
আবিষ্কার করতে ব্যস্ত হয়ে গেল

কেউ বলল: আমি সেন বংশজাত, আমি পাল বংশোদ্ভূত, আমি…

এবং দেখা গেল, বাজারে যে ক’জন ক্রেতা ছিলেন
শুধু তারাই ছিলেন মীনবংশজাত

যারা নিজেরাই নিজেদের মাংস ভক্ষণ করতে
বাজারে এসে কথা কাটাকাটি থেকে রক্তারক্তি পর্যন্ত চলে যেতে পারে

সময়

ঘড়ির দিকে তাকালে
কোন কাঁটাটি কখন ঠিক বুকের মধ্যে বিঁধে যায়
এই ভয়ে ঘড়িকে বর্জন করেছি

অথচ রাত্রি হলে হৃৎপিণ্ডের উচ্চারণের চেয়ে
অধিক আপন হয়ে ওঠে ঘড়ির টিকটিক

তখন ব্যবহৃত বাসনকোসন ঘড়ির নিচে পেতে দিয়ে
ডায়াল থেকে টুপ টুপ করে ঝরে-পড়া সময় সংগ্রহ করি

ভোর অবধি এত এত সময় আমার সমস্ত ঘর উপচে
জানালা দরজা দিয়ে গড়িয়ে ছড়িয়ে যায়

আর সন্ধে নামার আগেই
সময়ের সাথে পৃথিবীর সম্পর্কের চিতায়
দাউ দাউ আগুন জ্বলে ওঠে

প্রশ্ন

কিংকর্তব্যবিমূঢ় তোমার দেখালেপনা
এখন শহরজুড়ে একটিও নদীর সন্ধান দিতে পারছে না

অথচ শহরের স্তনবৃন্ত
ভরা মৌসুমের আঙুরের বোঁটার মতো ঝরে পড়তে পারে
এমন আসন্ন বেলা—

তখন দুধের নহরে শহর ভেসে গেলে কী জবাব দেবে
বলো?

প্রতিদিন ট্রাকভর্তি ফুলকপি-ঢেড়সের দুধ
ঝিঙে-পটলের লালা এবং
পুঁইশাক-পাটশাকের লাবণ্য এসে
পুরো শহর মেকআপ করে দিচ্ছে

আর পরনারী পরপুরুষেরা তাতে
মোহিত হয়ে বিবিসি সিএনএন
আল জাজিরায় প্রচার করে দিচ্ছে—

তোমার দুয়ারে এখন আজন্তর্জাতিক নন্দনতাত্ত্বিক
আর
গণমাধ্যমের বিশ্বখ্যাত কূটনৈতিক বার্তা পরিবেশক

এবার তাদের চোখা চোখা প্রশ্নের কী জবাব দেবে
বলো?

মিশেল ফুকো ও মামুন হুসাইনের চিকিৎসাপদ্ধতি

মিশেল ফুকো পাগলাগারদের বৃত্তান্ত বোঝেন
তার প্রতিটি অস্থিসন্ধির প্রলাপ— ভিসুভিয়াসের উত্তপ্ততায়
মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে অকৃত্রিম অনুরাগীকুলে

পাশ্চাত্য-যৌনতার উন্মুক্ততা ও অবদমন বিষয়ক তর্ক কিংবা
স্বভাব মনোবিকলনকালে, যখন তিনি হেঁটে হেঁটে
আমাদের মধ্যরাত্রিক চেতনার উদ্যানজুড়ে বসিয়ে দেন মীমাংসা;—
আমরা কি তখন ততটাই প্রলাপমুখর গভীর তন্দ্রায়?

কিংবা আমাদের প্রতিদিনের কারাগারের অবিশ্বাস্য বোঝাপড়ায়
যখন মিশেল ফুকো দাম্পত্যে, প্রেমে, রান্নাঘরে, বাথরুমে
অফিসে, বক্তৃতায়, সংগ্রামে, সৈকতে— ঘরে ঘরে পাঠ্য হয়ে ওঠেন—
আমরা তখন ফুকোর চকচকে টাক উঠোনের আমগাছের ছায়ায়
বিছিয়ে নিয়ে দল বেঁধে দিবানিদ্রায় যাই—

আজ প্রাচ্য কিংবা পাশ্চাত্যে দর্শন ও শল্যচিকিৎসার
করুণ পরিণতিজুড়ে একদিন আমাদেরও খোয়াবনামায়
জুড়ে বসেছিল মিশেল ফুকোর আসমান-সমান প্রকাণ্ড ছায়া

তবু ফুকো আমাদের প্রতিদিনের আসবাবপত্র ঝাড়মোছ
ঘষামাজায় কতটা কি যোগান না যোগান, তার চেয়ে বড়
তিনি আমাদের অগণিত প্রধান সড়কের পাশে পদ্মপাতার
অসংখ্য শুশ্রূষালয় ফেরি করে ফেরেন ফরাসি ভাষায়—

তখন আমি আমাদের অসামান্য কথাকার, মনোচিকিৎসক
মামুন হুসাইনের শরণাপন্ন হলে— তিনি আমাকে তার উপন্যাস
ও গল্পের বিভাষায় একটি টাকা আটকানোর রাবার বাঁহাতে লাগিয়ে
চলতেফিরতে ও সময়মতো টেনে আবার শরীরে ছুড়ে মারতে বলেন!
তাতে আমি যেমন চিৎকার করে সুস্থ হয়ে উঠি;
তেমনি দিনদিন মামুন হুসাইনের অন্ধ ভক্ত হয়ে— প্রতিদিন তার
কোলেপিঠে চড়ে মিশেল ফুকোর বেবাক গল্প শুনি

বাবার গন্ধ

আমার আড়াই বছরের কন্যা
ফ্রিজ থেকে একটি পুরনো সেভেন-আপের বোতল বের করে
তার মায়ের হাতে দিয়ে বলল:
“মা দেখো, এটা বাবার গন্ধ”

শুনে আমরা বিস্মিত হলাম। এবং বোতল শুঁকে বুঝলাম:
কোনোদিন তাতে বিশেষ ধরনের পানীয় জমা রাখা ছিল

গতকাল রাতেও আমরা পেপসি-রঙের
বিশেষ পানীয় পান করেছি, প্রকাশ্যে—
আমাদের ভীষণ পেপসি-প্রিয় মেয়ে একবারও আগ্রহ করেনি
পেপসিতে চুমুক বসাতে—

এবারও আমরা বিস্মিত হয়েছি। এবং
আজও যখন তার কারণ খুঁজতে জামতলা থেকে ছাতিমতলা
ইতিহাস ঘেঁটে চলেছি—
মেয়েটি এসে বাবার গন্ধের সাথে
পরিচয় করিয়ে মীমাংসা খুঁজে দিল—

তবে কি সম্পূর্ণ কথা না-ফোটা সন্তান
‘বাবার গন্ধ’ নামের
নতুন এক গন্ধ আবিষ্কার করে
তার প্রতি অনাগ্রহ দেখিয়ে চলেছে?

নাকি বাবার জন্য যা প্রযোজ্য
নিজের জন্য তাকেই বর্জ্যনীয় ভাবতে শিখেছে?

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)