অপ্রিয় কবিতার সাধক <br /> মৃন্ময় চক্রবর্তী

অপ্রিয় কবিতার সাধক
মৃন্ময় চক্রবর্তী

জীবনানন্দ বলেছিলেন, 'কবিতাও একই জীবনের অন্যরকম উৎসার’। এটাই তো সার সত্য। কবিতা তো যাপিত জীবনেরই গান। তাই আপনার কবিতায় শহুরে মধ্যবিত্ত জীবন অনুপস্থিত। কবি সমীর রায় অত্যন্ত সঠিকভাবেই বলেছিলেন, "অপ্রিয় হবার সাধনায়" আপনি বড়ো বেশি স্থির। তাই দেখি আপনার কবিতায় প্রখরভাবে উঠে এসেছে নিম্নবিত্ত, সম্বলহীন মানুষের জীবনযন্ত্রণা। এত বেশি দ্রোহকালকে ছুঁয়ে গেছে আপনার পংক্তিমালা যে আপনাকে স্বীকার করতে অনেকেরই দ্বিধা। আপনার কবিতায় আমি নিজেকে খুঁজে পাই। এই জীবনের যন্ত্রণা, ক্লেদ, স্বপ্ন ও সম্ভাবনার মন্ত্র আপনার লেখায় ছাড়া আর কোথায়?

ভুবন ভরে গিয়েছে আজ / চোখের জলের সমারোহে ; / যেদিকে চাই ক্ষুধার সভা / নরক যেন যায় বিবাহে। / অথচ দশদিক বিধবা / বোবার মতো দাঁড়িয়ে দূরে ; / বধির যারা দেয় বাহবা / একটি দুটি পয়সা ছুঁ’ড়ে। / বিবসনা বসুন্ধরা / সপ্তঋষির অন্ন জুড়ায় ; / গন্ধে বাতাস শিউরে ওঠে / আলোর দেশে ঝড় বয়ে যায় / অনেক দূরে অরুন্ধতীর / ওষ্ঠ জ্বলে চোরের চুমায় / আর সমস্ত আকাশ জুড়ে / যুধিষ্ঠিরের কুকুর ঘুমায়।
( রাত্রি, কালরাত্রি / মহাদেবের দুয়ার)

আজকাল আপনার কবিতা পড়তে বসলেই এই কবিতাটির দিকে চোখ চলে যায়। আপনার মুখ মনে ভেসে ওঠে। কী যে আপন মনে হয় আপনাকে, বোঝাতে পারি না! আপনার মোটা পাওয়ারের চশমার পিছনে দিগন্তগামী উজ্জ্বল দুটি চোখ যেন কত দিনের চেনা। এই কবিতাটির মতো নিজের। অথচ আপনাকে তো আমি দেখিনি কখনো। আপনার মৃত্যুর বছরে আমি নিতান্তই একটি বালক। যে ভালো করে বোঝেই না কবিতা কী বস্তু।
আমার বাবা আপনাকে চিনতেন। আপনার খুবই স্নেহভাজন ছিলেন তিনি । কবিতার ধারপাশ দিয়ে না যাওয়া সেই তরুণ শ্রমিকটিকে আপনি একাধিকবার কবিতার আড্ডায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর কাছেই আপনার কথা প্রথম শুনেছিলাম। যদিও স্কুলপাঠ্যে আপনার ‘জন্মভূমি আজ’ কবিতাটি ছিল। কিন্তু সিলেবাস বহির্ভূত হওয়ায় খুব বেশি মনোযোগ দিয়ে তখন পড়া হয়নি কবিতাটি। আপনার মৃত্যুর পরে প্রকাশিত আপনার কবিতা ভেঙে তৈরি করা কয়েকটি গানের একটি সংকলন বাবার কাছ থেকে পেয়েছিলাম। প্রতিবেশীর কাছে টেপরেকর্ডার ধার করে অজস্রবার আমি সেই অডিও ক্যাসেটের গানগুলো শুনেছি। এই গানগুলোই আপনার কবিতার বিকল্প পাঠ হিসেবে হাজির হয়েছিল আমার কাছে। কবিতার অনন্য উজ্জ্বল ছন্দটি আমি আবিস্কার করেছিলাম সেই ক্যাসেটটি শুনতে শুনতে। শিশির মঞ্চে প্রতিবছর আপনার স্মৃতিতে যে অনুষ্ঠান হত, সেই অনুষ্ঠানের জন্য পাওয়া আমন্ত্রণপত্র আমার হাতে দিয়ে বাবা আমাকে যেতে বলতেন। আমি যেতাম, শুনতাম, মুগ্ধ হতাম আপনার কবিতার ছিন্নবিচ্ছিন্ন অংশের পাঠে ও সংগ্রহে। কিন্তু আশ্চর্য ব্যপার হল আপনার বই তখনও আমার বইয়ের তাকে নেই। খোঁজারও যে চেষ্টা করেছি তাও বলা চলে না। কারণ তখনও কবিতা আমার অনুশীলনের চৌকাঠে পা রাখেনি। একদিন আচমকাই আমার এক নাট্যকর্মী ও কবিবন্ধুর বাড়িতে বই নাড়াচাড়া করতে করতে পেয়ে গেলাম আপনার কবিতাগ্রন্থ ‘মুন্ডহীন ধড়গুলি আহ্লাদে চিৎকার করে’। তারপর একে একে পেলাম আরো কিছু বই। এইভাবে একটু একটু করে আপনার দিকে এগিয়ে যাওয়া শুরু হল আমার।
এখন আপনাকে আর অদেখা অচেনা লাগে না। বাবার মুখে শোনা বর্ণনায় আর আপনারই কবিতার অনুষঙ্গে আপনাকে বারবার খুঁজে পাই। দেখি ভাঙাচোরা ঘর থেকে বেরিয়ে একজন কবি সামান্য সম্বল নিয়ে বাজারে চলেছেন। টানাটানির পকেট নিষ্কাশিত করে কিনবেন হয়ত পোকাকাটা কিছু সামগ্রী। তার পরিমাণ হয়ত এতটাই অল্প যে পেটের ভেতর উনুনের আগুন ‘আশ্চর্য ভাতের গন্ধে’ জ্বলে থাকবে সারারাত। তবুও কবিতার প্রতি আপনার একহৃদয় ভালোবাসা কবিতাকে ক্রমাগত করে তুলেছে জীবনের শস্ত্র। লিখেছেন, অন্ন যারা কেড়ে খায় তাদের ধ্বংসের মন্ত্রগান। কালো অন্ধকারের বিরুদ্ধে জোনাকির ইশতেহার হয়ে ছুটে বেড়াবার নির্দেশ দিয়েছেন প্রিয় ছন্দকে ।
আপনার চারপাশে একদিন জড়ো হয়েছিলেন অনেক কবি। তাঁদের ভেতর কেউ কেউ ক্ষমতার জহ্লাদদের দিকে তর্জনী তুলেছিলেন আপনার অফুরন্ত প্রেরণায়, আবার কেউ আপনাকে ভালোবাসলেও জীবনের কবিতা থেকে দূরে গিয়ে কবিতার ‘ধ্যান’ করতে করতে ভুলেই গিয়েছিলেন কালো আকাশের তলায় অগণিত জর্জর মানুষের গান। তবু শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মতো সাধককে আপনি ভালোবাসতেন। বাবা একবার নেশায় চুর শক্তিকে ড্রেন থেকে তুলে দিয়েছিলেন রিকশায়। শক্তিকে তিনি চিনতেন আপনার বাড়িতে কবিতার আড্ডায় যাবার সুবাদে। এই ঘটনার পর সত্তর দশকের অগ্নিশুদ্ধ তরুণটি তীব্র শ্লেষ সহযোগে আপনাকে বলেছিলেন, এই আপনার কবি, বীরেনদা? মদ খাইয়্যা ড্রেনে পইড়্যা থাকে! কিন্তু আপনি তো সেই কবিদের ঘৃণা করেন যাদের চোখ বিদেশে উন্মুক্ত কিন্তু স্বদেশে অন্ধ, যারা কবিতা সাধনের চেয়ে বেশি পছন্দ করেন ক্ষমতার পদসেবা। শক্তি কবিতার সাধনায় সৎ ছিলেন বলেই তাঁর প্রতি তাই আপনার ভালোবাসা ছিল আন্তরিক। সেকারণেই আপনি স্নেহের প্রদীপকে উত্তরে বলেছিলেন, না না প্রদীপ এমন কইয়ো না, ও বড়ো ভালো ল্যাখে! অথচ নীরেন্দ্রনাথ ও সুভাষের মতো কবিদের ভর্ৎসনা করতে ছাড়েন নি আপনি। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের লাল চোখ উপেক্ষা করে কবি সরোজ দত্তের হত্যার বিরুদ্ধে উচ্চারণের দুঃসাহস তো কেবল আপনারই ছিল।
জীবনানন্দ বলেছিলেন, ‘কবিতাও একই জীবনের অন্যরকম উৎসার’। এটাই তো সার সত্য। কবিতা তো যাপিত জীবনেরই গান। তাই আপনার কবিতায় শহুরে মধ্যবিত্ত জীবন অনুপস্থিত। কবি সমীর রায় অত্যন্ত সঠিকভাবেই বলেছিলেন, “অপ্রিয় হবার সাধনায়” আপনি বড়ো বেশি স্থির। তাই দেখি আপনার কবিতায় প্রখরভাবে উঠে এসেছে নিম্নবিত্ত, সম্বলহীন মানুষের জীবনযন্ত্রণা। এত বেশি দ্রোহকালকে ছুঁয়ে গেছে আপনার পংক্তিমালা যে আপনাকে স্বীকার করতে অনেকেরই দ্বিধা। আপনার কবিতায় আমি নিজেকে খুঁজে পাই। এই জীবনের যন্ত্রণা, ক্লেদ, স্বপ্ন ও সম্ভাবনার মন্ত্র আপনার লেখায় ছাড়া আর কোথায়?
আপনার কবিতাটির কথা বলতে বসে এলোমেলো কতগুলো কথা বলা হয়ে গেল। আসলে বারবার আপনার কবিতার কাছে ফিরে যেতে গিয়ে এসবই মনে পড়ে। মনে পড়তে পড়তে আবার চোখ ফিরে আসে কবিতাটির উপর। দেখি এই পঙক্তিগুলির ভেতর যেন আমাদের এই স্বপ্নচ্যুত হতভম্ব সময়টি থমকে দাঁড়িয়ে আছে। ভুবনময় চোখের জলের সমারোহ আর ক্ষুধার সভা ঠেলে নগ্ন নির্লজ্জ নরকের বিবাহযাত্রা দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে গেছে অসহায় বিধবা দশদিক। বোবার মতো দাঁড়িয়ে দেখছে সে, করণীয়হীন। দিগন্তের স্বপ্নপ্রসূত ব্যর্থ সূর্যের দিকে ভিক্ষা ছুঁড়ে দিচ্ছে নির্বোধ, বধিরেরা। চোরেরা চুমু খাচ্ছে অরুন্ধতীসম দূরবর্তী আনন্দকে আর নগ্ন বিবসনা বসুন্ধরা নিরুপায় হয়ে অন্ন জোগাচ্ছে, মনোরঞ্জন করছে গুটিকয়ের। কিন্তু এতকিছু দেখেও সমস্ত আকাশজুড়ে ঘুমিয়ে রয়েছে ধর্মচ্যুত, ন্যায়চক্ষুহীন যুধিষ্ঠিরের কুকুর। কী আশ্চর্যভাবেই না এ কবিতা চিরকালীন, ধ্রুপদী হয়ে উঠেছে আপনারই অলক্ষ্যে । নইলে আপনিই তো চেয়েছিলেন এমন কবিতা যেন একদিন মিথ্যে হয়ে যায়। কিন্তু তা তো যায় নি, বরং আরো বেশি দেয়ালের লেখা হয়ে উঠেছে।
তবু আপনার এই কবিতার ভেতরে বেদনার বারুদ ঘুমিয়ে আছে দেখি। এই বারুদ আমাদের কাঁদার জল দেয়, বুকে বুকে প্রজ্জ্বলনের জন্য যোগায় সক্রোধ আগুন। ভেঙে ফেলতে বলে এই কালরাত্রির মহাপাপ। দীর্ঘ রৌরবের বিরুদ্ধে আরো একবার সামিল করে জীবনের যুদ্ধে।
_______________________
ঋণ : বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মূল্যায়নের প্রাথমিক খসড়া / সমীর রায়

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)