
‘প্রত্ননির্মাণ’ সিরিজ থেকে চারটি কবিতা
ঋজুরেখ চক্রবর্তী
খ্যাতি
যে তুমি আকাশে উড়ে বেড়াও, পতঙ্গ নও তবু কিংবা জড়ও─
কীটের জীবন থেকে মাটি বেছে বেছে ক্রমে বিখ্যাত যে তুমি─
বাল্মীকির জন্মকথা তোমারই জয়ের যেন সহযাত্রী ছিল;
তোমাকে অনতিক্রম্য মনে হয়, এমনকি অতিদূর অসেতুসম্ভবও।
তোমাকে অনতিক্রম্য মনে হয়, রূপকের মতন অজেয়─
যে তুমি জলের তোড়ে ভেসে যাও যাবতীয় সন্তরণকুশলতাসহ─
যেন বা তোমার ধ্যানে অভিরুচি বলে কিছু নেই, যেন কিংবদন্তির
নিয়তি এভাবে টেনে নিয়ে যেতে যেতে ক্রমে অমরত্ব ছোঁবে।
যে তুমি উড়ান দাও, যে তুমি ভাসান যাও, মাটি খুঁটে খাও─
তোমাকে অপরাজেয় মনে হয় মহাকাব্যে শ্লোক হয়ে থাকা।
প্রতিশোধ
যে লোভে প্রার্থনা মিশে নিষেধের শর্তাবলি মন্ত্র হয়ে ওঠে,
যে ক্ষত জুড়োয় মুখে রক্তস্বাদ রেখে যাবে বলে─
অযোধ্যা প্রাসাদে তার অভিজ্ঞান ব্যর্থ বাসনার মতো লেগে।
ঝড় এলে ধুলো ওড়ে, ঝরা পাতা ভীরু ক্যাডারের মতো ধায়─
তখন তোমার মুখে উপদেশে সাবলীল বর্ষাগান রবিঠাকুরের।
কে কাকে জেনেছে, বলো? কে কার কালের ক্রিয়াপদ বকলমে
বসাতে বসাতে শেষে ভুলে গেছে সর্বনামে কী বিশেষ্য ছিল?
প্রেমের প্রতুল গতি চেনে যে অতুলনীয় ভ্রমপ্রবণতা,
সেই সর্বনাশ জানে সাবেক অহিংসানীতি ব্যর্থ ছিল কেন।
পরমহংস
কে কবে জলের মতো সহজ হওয়ার কথা বলেছিল!
সে আমি সহজতর প্রবণতা থেকে ভুলে গেছি,
বহে গেছি জলবৎ, সহজে না, পাথরে পাথরে ঠিকরিয়ে।
আসক্ত আষাঢ়ে জন্ম, নির্বেদ সহজ ছিল না
গ্রীষ্মজাতকের মতো অথবা হেমন্তে শীতে যাত্রা শুরু যার─
এ মহাতীর্থের পথে বৈরাগ্য অন্তিম কড়ি পারানির, জানি।
অথচ জটিল খুবই এ পরমহংসের ইতিকথা
প্রতি পদে অপমান উপেক্ষা ও লাঞ্ছনার জলরেখা শুষে।
আমার কী রূপ ছিল পৃথিবী নামক গ্রহ নির্মাণের আগে?
অন্ধকার
এক অন্ধকার থেকে আরও এক ঘোর অন্ধকারে
পাক খেয়ে যেতে থাকে সুনীল সবুজ এই ঈশ্বরত্যাজিত গ্রহখানি,
অয়নাংশে আলো পড়ে কখনও বা, কখনও পড়ে না,
রূপকথা মনে হয় এ জীবন, অলৌকিক, আত্মকেন্দ্রিকতামুখী।
এমত চলনকালে মনে করো ভাষাহীন ব্যাকরণহীন আদিকথা─
হিংসার পরম লগ্নে আমাদের দেখা হল উভমুখী সুসময়মতো─
শোক নেই, শ্লোকও নেই তাই, শুধু অচরিতার্থতা আছে বড়,
আর আছে মাঝখানে সীমায়িত হিমায়িত অন্ধকার অসেতুসম্ভব;
দেখা হল বেদনা-অজ্ঞাত দুটি কলেবরে, তারপর মিলনের শেষে
ধ্বংস হয়ে গেলাম দুজনে, শুধু পড়ে রইল অভিজ্ঞতামালা।
কীরূপ দেখাবে এই আমাদের একদিন পৃথিবীর বিনাশের পরে?

