
সৌমাল্য মুখোপাধ্যায়-এর কবিতা
সজারু
যে দৃশ্য দেখিনি, সেই দৃশ্যের সম্ভাবনায় গর্ভবতী হয়ে আছি। ঘটনাবলি ভেঙে, নসিব ফাটিয়ে, জলের সবুজ সংকেতজিভ বেরিয়ে পড়ে; পরমার্থের গোড়ায় নাচে ময়ূর। সজারুর সংগে এই ঘটনার সংসারে মজা হল খুব। তার কাঁটায় হাত দিলে রোমাঞ্চ হয়, শঙ্খচূড়ে মাথা তোলে, ঘন ঝোপের আড়ালে নিয়তি কেঁপে ওঠে। পাড়ার প্রৌঢ়-প্রৌঢ়া বললেন, মানুষ ও সজারুর সংসার টিকতে পারে না, মানুষের খুন বইবেই। কিন্তু যখনই মাজার থেকে ভেসে এলো গান, দেখি সজারু খোদ আশমানের দিকে তাকিয়ে, খুদে চোখদুটোয় জল নড়ছে। তখনই আমি খসে পড়লাম— খাদ থেকে খাদে। করুণ কাঁটাগুলি আমার সর্বাঙ্গে মোঘল ইতিহাস লিখে দিল— বাদশা হুমায়ুন, আকবর বাদশার নাম, শাহী কেতা, খোয়াব; আমার শরীর ও ত্বক ক্রমে ভরে উঠলো ফার্সি লিপিচিত্রে। যে দৃশ্য দেখিনি, সেই দৃশ্যের সম্ভাবনায় সজারু আমায় গর্ভবতী করে দিয়ে গেল।
হাওয়া
শরীরের দক্ষিণ দিকে বজ্রাঘাত হল কঠোর। দক্ষিণ দিকটির সঙ্গে দাস্যভাব ছিল দেহের। বিশেষ ওই দিকটিই ছিল গুরু, দেহ ছিল চ্যালা। শুক্রবারের সন্ধ্যায় বাতাস শীতল হয়েছিল, ঘুঙুর পরে নেচেছিল হাওয়া, সারাটা দক্ষিণ দিক থেকে উঠে এসেছিল গান, অঙ্গগুলিও নেচেছিল নর্তকীর মতো, ঘুরে-ঘুরে, পাকে-পাকে। তারপর এক কৃষ্ণপক্ষে হঠাৎ মেঘ বিনত হয়, এবং দক্ষিণ দিকে বজ্রাঘাত— যেন আচমকা সাপ শ্রীমতীর বেণীতে! শরীরাংশে ঘন হয় রাহু, সমস্ত দিকটিই ক্রমে ধুঁকে মরে যায়। তারপর থেকে আমার প্রয়াত গুরুর দেহ আমি কাঁধে নিয়ে চলি। এবং অস্তিত্ব— ওই স্বর্গীয় পক্ষাঘাতের ওপর মাঝেমধ্যে নেমে আসে শিলা, আঃ শিলাবৃষ্টি।
সন্ধ্যা
আমার ভিক্ষাপ্রবণতার পাশে
তুমি তোমার গ্রীবা ও কটাক্ষ রেখেছো;
কাঁসার থালায় এখন অগ্নুৎপাত ভেসে আছে জলে,
এভাবে সমস্ত দেশ অন্নপূর্ণা হয়ে যাবে ভেবেছিলে কখনো—
দুর্যোগের তলায় ধাতুমূর্তি তিরতির কাঁপে,
স্পর্শ, শ্বাস, তড়িৎ, চন্দ্র চক্রাকারে ঘোরে,
জলোচ্ছ্বাসে ফণাটুকু তুলেছে লোকালয়—
এমন শান্ত গ্রহণবেলায় আমার ভিক্ষাপ্রবণতার পাশে
তুমিও কটাক্ষ গোপন করলে

