
যৌথ খামার থেকে শীতকালীন পাকপ্রণালী / লুইস গ্লিক (১৯৪৩-২০২৩ ) এর সাম্প্রতিক কবিতার বই
বাংলা তর্জমা: অংকুর সাহা।

কবিদের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি একটি বিরল ঘটনা; সেখানে কথাসাহিত্যিকদের নিপুণ আধিপত্য। ১৯৯০ এর দশকে পরপর দুবছর কবিদের নোবেলপ্রাপ্তি ঘটেছিলো: ১৯৯৫ সালে আয়ারল্যান্ডের কবি শেমাস হিনি (১৯৩৯-২০১৩) এবং ১৯৯৬ সালে পোল্যান্ডের কবি ভিসওয়াভা শিমবোরস্কা (১৯২৩-২০১২)। এর পরে ২০১১ সালে নোবেল পেয়েছিলেন সুইডেনের কবি টোমাস ট্রান্সট্রোমার (১৯৩১-২০১৫) এবং একই সঙ্গে তিনজন নোবেল জয়ী কবি জীবিত ছিলেন পৃথিবীতে। কিন্তু খুব তাড়াতাড়িই তাঁদের মৃত্যু ঘটলো একের পর এক। এবং সেই সঙ্গে এক দশকের খরা, যদিও মার্কিন গীতিকার, সংগীতকার ও গায়ক বব ডিলান (১৯৪১- ) নোবেল পেলেন ২০১৬ সালে এবং তাঁর লেখা ও গাওয়া গানগুলির অভিঘাত কাব্যময় হলেও, তাঁকে ঠিক প্রথাগতভাবে কবি বলা যাবে না। সেই কারণে ২০২০ সালের অক্টোবর মাসের এক হিমশীতল ভোরবেলায় যখন খবর এলো মার্কিন কবি লুইস গ্লিকের নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তির, তখন একই সঙ্গে বিস্মিত ও আপ্লুত হয়েছিলাম।
লুইস গ্লিককে “আত্মজৈবনিক কবি”র অভিধা দেওয়া পারে; নোবেল কমিটির মতে তাঁকে এই পুরষ্কার দেওয়া হয়েছে “for her unmistakable poetic voice that with austere beauty makes individual existence universal.” নিরলঙ্কার, নিরাভরণ সৌন্দর্য তাঁর কবিতার এক প্রধান উপাদান। ১৯৯৩ সালে তিনি তাঁর “বুনো আইরিস“ কাব্যগ্রন্থের জন্যে পুলিৎসার পুরস্কার পেয়েছিলেন। ২০০৩ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন আমেরিকার সভাকবি। আমেরিকার কবিতার পাঠকমহলে তিনি প্রতিষ্ঠিত ও সুপরিচিত। আমি তাঁর কবিতার বাংলা অনুবাদ করেছি এই কাগজের অনলাইন সংখ্যায় কিছুদিন আগে।
নোবেল পুরষ্কার জেতার পরে লেখকের আর নতুন কী চাইবার থাকে? নতুন লেখার অনুপ্রেরণা তিনি কীভাবে পেতে পারেন? নোবেল পুরষ্কারে রবীন্দ্রনাথের কোনো ক্ষতিবৃদ্ধি হয়নি — তিনি পরের সাতাশ-আঠাশ বছর একই ভাবে লিখে গেছেন, তাঁর বিষয় বা শৈলীর কোনো পরিবর্তন হয়নি সেই পুরষ্কারের অভিঘাতে।
মার্কিন কবি লুইস গ্লিক (১৯৪৩– ) সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কার পান ২০২০ সালে। পরের বছর প্রকাশিত হয় তাঁর ত্রয়োদশ এবং সাম্প্রতিকতম কাব্যগ্রন্থ: “যৌথ খামার থেকে শীতকালীন পাকপ্রণালী”, প্রকাশক: ফারার, স্ট্রস এবং জিরো। তিন ফর্মার বই: ছোটোবড়ো মিলে পনেরোটি কবিতা। আমি তাদের থেকে বেছে নিয়েছি দশটি।
কবিতা
দিন ও রাত্তির এসে হাজির হয়
হাত ধরাধরি করে বালক বালিকার মতন
উড়ন্ত পাখিদের ছবি দিয়ে কারুকার্য করা জামবাটি থেকে
বুনো বেরিফল খাওয়ার জন্যে অল্পক্ষণ থামে কেবল।
বরফে ঢাকা পাহাড়ের চূড়ায় উঠে তারা
ডানা মেলে উড়ে যায় সাবলীল। কিন্তু তুমি আর আমি
তা পেরে উঠবো না কোনোদিন —
সেই একই পাহাড়ে আমরাও উঠি;
হাওয়ার কাছে মানত করি
আমাদের ঠেলে তোলার জন্যে
কোনো কাজ হয় না তাতে;
দু হাতে মাথা-মুখ ঢাকো তুমি
যাতে শেষটা না দেখতে হয় —
হাওয়া আমাদের নামিয়ে নিয়ে যায়
নীচে আরো নীচে আর অতলে আরো অতলে;
সান্ত্বনা দিতে চাই তোমায়
কিন্তু শুধু কথায় কোনো কাজ হয় না;
যেভাবে মা আমায় গান ঘুমপাড়ানি শোনাতো
আমি শোনাই তোমায় —
চোখদুটো বন্ধ তোমার। শুরুর সেই বালক বালিকা
আমাদের পেরিয়ে হেঁটে যায়;
এখন তারা কাঠের সেতুর ওপরে দাঁড়িয়ে;
পেছনে দেখা যায় তাদের বাড়িঘর;
দেখি কত জোরে যেতে পারো তোমরা:
হাঁক দেয় তারা, কিন্তু না, আমাদের কানে
কেবল হাওয়ার শোঁশোঁ,
আমরা তাই শুনি —
এর পরে একমাত্র আমাদের পতন —
আর আমাদের পেরিয়ে যায় ধরিত্রী,
সবগুলো ধরিত্রী,
আগের চেয়ে অনেক সুন্দর হয়েছে তারা;
তোমাকে আগলে রাখতে
আলতো করে চিবুক ছুঁই তোমার —
মূল কবিতার নাম “POEM”।
নিশীথ ভাবনা
অনেক কাল আগে আমার জন্ম।
আমাকে শিশুরূপে দেখেছেন
এমন একজন মানুষও বেঁচে নেই এখন।
আমি কি সুবোধ শিশু ছিলাম? না কি
ভীষণ দামাল? আমার মাথার ভেতর ছাড়া
এই বিষয় নিয়ে তুমুল তর্ক
চলে না আর কোনোখানে।
দামাল শিশু কাকে বলে? আমি ভাবি।
কলিকের ব্যথা,
আমার মা বলেছিল, যার অর্থ
দিনরাত কাঁদতাম আমি।
তাতে কার কী ক্ষতি হলো?
কতটা কঠিন বেঁচে থাকা,
তারা সবাই যে মারা গেছে এতে
বিস্ময়ের কিছু নেই। আর কতোটাই
ছোট ছিলাম আমি, মায়ের শরীরে
ডুবে থাকা অবস্থায়, মা হাত বুলিয়ে
আদর করতো।
কী লজ্জার কথা যে আমি
কথা বলতে শিখলাম, আর কোনো সম্পর্ক
নেই সেই স্মৃতির সঙ্গে। কেবল মায়ের স্নেহ!
নির্গত হলাম খুব দ্রুত
আমার নিজস্ব সত্তায়,
শক্তপোক্ত কিন্তু গোমড়ামুখো,
অ্যালার্মঘড়ির মতন।
মূল কবিতার নাম “NIGHT THOUGHTS”।
শীতকালীন ছুটির দিন
প্রচুর হাসিখুশির সূর্যালোক চারপাশে
তুষারের ওপরে ঝলমলে — প্রায় জীবন্ত,
আমি ভাবি, আবার দেখে ভালো লাগে খুব;
আমার হাতদুটো এই ঘোর শীতেও প্রায়-ঊষ্ণ।
পদার্থবিদ্যার কোনো তত্ত্ব তার পেছনে, আমার মনে হয়:
প্রশংসার যোগ্য, মানুষের জীবন নিয়ে
আগ্রহ দেখানো, কিন্তু কোনো ঝুঁকি না মেনে
আমি তাল তাল তুষার তুলে নিয়ে ছুঁড়ে মারি
কাঁধের ওপর দিয়ে, কারণ লবণ নেই আমার সঙ্গে।
আর যেন সঙ্গে সঙ্গেই মেঘরাশি ফিরে আসে,
আর সঙ্গে সঙ্গেই আকাশ হয়ে ওঠে আঁধার
ও ভয়ঙ্কর, সবকিছুই আগের মতন, কেবল
ক্ষতির পরিমাণ বেড়েই চলে —
এবং আমরা জানি যে কয়েক মুহূর্ত আগেও
ঝলমলে সূর্য ছিল আকাশে। কি আনন্দময় ছিল
আমার মনন, সেই রশ্মিগুলো গায়ে মেখে,
আগে তাকে অনুভব করে হৃদয়, আর পরে
আমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। এক পরিত্যক্ত মৌচাক।
আনন্দময় — এই একটা কথা
অনেক দিন আসেনি আমাদের মুখে।
মূল কবিতার নাম “PRESIDENT’S DAY”।
টীকা: ১৯৬৮ সালে আমেরিকার ক্যালেন্ডারে একটি নতুন ছুটির দিন যুক্ত হয়: ফেব্রুয়ারি মাসের তৃতীয় সোমবারটি “প্রেসিডেন্ট’স ডে” হিশেবে ছুটি। দুজন জনপ্রিয় রাষ্ট্রপতি, জর্জ ওয়াশিংটন (১৭৩২-১৭৯৯) এবং আব্রাহাম লিংকন (১৮০৯-১৮৬৫): দুজনেরই জন্ম ফেব্রুয়ারি মাসে।
হেমন্ত
জীবনের যে অংশটুকু
গভীর ধ্যানের জন্য নিবেদিত
তার সঙ্গে নিয়মিত সংঘর্ষ
কর্মবহুল জীবনের।
***********************************
হেমন্ত আগতপ্রায়।
কিন্তু আমার মনে পড়ে
সে এগিয়ে আসছিল ক্রমাগত
মে মাসে ইশকুল শেষ হওয়ার পর থেকেই।
************************************
জীবন মানে, আমার দিদি বলে,
জ্বলন্ত মশালটা শরীর থেকে
মনের কাছে পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু,
দিদি বলে চলে, মন সবসময়
প্রস্তুত থাকে না সেটা হাতে নেবার জন্য।
সূর্য অস্ত যেতে বসেছে তখন।
আহ, সেই মশালটা, দিদি বলে।
নিভে গেছে কবে, আমার বিশ্বাস।
আমাদের ক্ষীণ আশা: সেটা ধিকিধিকি জ্বলছে এখনও।
হেই/হো, হেই/হো, শিশু আর্নেস্টের মতন
তার খেলনা ছুঁড়ে দেয় তার ক্রিবের এক কোণে
আবার টেনে আনতে ব্যস্ত থাকে। খুব দুঃখের কথা,
দিদি বলে, এখানে কোনো বাচ্চাকাচ্চা নেই।
তাদের থেকে অনেক কিছু শেখার রয়েছে,
ফ্রয়েড যেমন শিখেছিলেন।
*****************************************
অনেক সময় আমরা
ডাইনিং রুমের বাইরে উবু হয়ে বসতাম।
পাতা পোড়ার গন্ধ বাতাসে।
এই বৃদ্ধেরা আর আগুন, দিদি বলে।
বিপজ্জনক! পুরো বাড়িটাই পুড়িয়ে দেবে একদিন।
*****************************************
অতীতের কাহিনী জমে জমে
বিশাল ভারী আমার হৃদয়।
সেখানে কি সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর
ঢুকে পড়ার জায়গা রয়েছে?
তাদের তো যেতে হবে কোথাও?
কতদিন আর বাইরে একা বসে রইবে তারা –
*****************************************
জলের ওপরে ঝিকমিক করে নক্ষত্রেরা।
স্তূপাকার পাতা জড়ো করা, আগুন জ্বালানোর জন্যে।
****************************************
অন্তর্দৃষ্টি, আমার দিদি বলে।
ওই তো, সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
কিন্তু অন্ধকারে তাকে দেখতে পাওয়া মুশকিল।
পায়ের পুরো ওজন তার ওপর ফেলার আগে
পায়ের তলার মাটিটা পরীক্ষা করে নেওয়া প্রয়োজন।
মূল কবিতার নাম: “AUTUMN”।
টীকা: হেই/হো, হেই/হো: মূল কবিতায় “fort/da, fort/da”। মনঃস্তত্ববিদ সিগমুন্দ ফ্রয়েড (১৮৫৬-১৯৩৯) এর ১৮ মাস বয়েসের নাতির নাম আর্নেস্ট, সে আপনমনে খেলতে খেলতে এইরকম শিশুসুলভ আওয়াজ করত এবং তার থেকে তিনি শিশুমনঃস্তত্বের গবেষণায় নতুন পথের সন্ধান খুঁজে পান।
দ্বিতীয় জন্ম
মনে হয় আমার পুনর্জন্ম হয়েছে,
দিদি বলে। অনেকটা
আগের জন্মের মতোই, কিন্তু
সেটা এখন সমাপ্ত, আমার মনে আছে। ওহ
কী শক্তিশালী সেই জন্ম, যার হাওয়ায়
পাতা ঝরে যায় সব গাছ থেকে।
আমার তা মনে হয় না,
আমি বলি। ওই দ্যাখ,
ঝরাপাতাগুলো পড়ে রয়েছে মাটিতে, দিদি বলে।
মনে আছে, সেডারহার্স্টের সেই পার্কে
আমরা ঝাঁপ দিতাম ঝরা পাতার স্তূপে,
ভেঙে ফেলতাম তাদের?
না তোরা কেউই লাফাতিস না, মা বলে।
তোরা দুজনেই লক্ষ্মী মেয়ে;
যেখানে বসিয়ে দিতাম, শান্ত হয়ে থাকতিস।
আমরা মনে মনে ভাবতাম অন্য কিছু,
দিদি বলে। আমি দুহাত বাড়িয়ে জড়াই
দিদিকে। কী সাহসী তুই, দিদি আমার,
আমি বলি।
মূল কবিতার নাম: “THE SECOND WIND”।
একটি বাক্য
সবকিছুর শেষ ঘনিয়ে আসে, আমি বলি।
কেন এমন কথা মুখে আনিস, দিদি বলে।
কারণ, আমি বলি, এই মুহূর্তে শেষ না হলেও, হবে শিগগির
তার মানে সেই একই কথা। আর যদি তাইই হয়,
তাহলে এমনকি একটা বাক্যেরও
সূচনা করে লাভ কি।
না একই কথা নয়, দিদি বলে,
এই শেষ হয়ে যাওয়াটা অবান্তর কথা।
অন্ততঃ একটা প্রশ্ন বাকি রয়েছে।
বোকার মতন প্রশ্ন করিস না, আমি উত্তর দিই।
মূল কবিতার নাম: “A SENTENCE”।
একটি শিশুপাঠ্য কাহিনি
গ্রামের জীবনযাত্রায় বিরক্ত হয়ে, রাজদম্পতি
ফিরে আসেন রাজধানীতে,
গাড়ির পিছনের সিট কাঁপিয়ে
খুদে খুদে রাজদুলালীরা
অস্তিত্বের গান গেয়ে চলে:
“আমি আছি, তুমি আছো, সে আছে, তারা আছেন” —
কিন্তু গাড়ির ভেতর, না, না,
শব্দরূপ মেলানোর সুযোগ নেই।
কে বলতে পারে ভবিষ্যতের কথা?
কেউ জানে না কী ঘটবে ভবিষ্যতে,
এমন কী গ্রহনক্ষত্রেরাও নয়।
কিন্তু রাজদুলালীরা বাস করবেন সেই ভবিষ্যতে।
এমনই এক দুর্ভাগ্যের দিন এসেছে সেই রাজ্যে।
গাড়ির কাচের বাইরে সরে সরে যায় তৃণভূমি আর চরে খাওয়া গরুবাছুরগুলো:
তাদের দেখে মনে হবে শান্ত, কিন্তু সত্যতা নেই সেই শান্তিতে।
সত্যতা রয়েছে তাদের হতাশায়; তাদের মা-বাবা জানেন
এই সত্য। আর কোনো আশা
বেঁচে নেই পৃথিবীতে। যেখানে
আমরা তাকে হারিয়েছি, সেই বিন্দুতে
ফিরে যাওয়া চাই, তাকে ফিরে পেতে হলে।
মূল কবিতার নাম: “A CHILDREN’S STORY”।
একটি স্মৃতি
উড়ে আসে এক অসুখ আমার শরীরে
কোথা থেকে আসে তা জানা যায় না কোনোদিন
কিন্তু স্বাভাবিকতার ভান করে থাকাও
দিনের পর দিন কঠিন থেকে কঠিনতর,
সুঠাম স্বাস্থ্যের অথবা আনন্দময় অস্তিত্বের —
ক্রমশঃ এমন হয় যে আমি সেই সব মানুষের সঙ্গই চাই
যাদের মতিগতি আমার মতন; তেমন মানুষই খুঁজে ফিরি
যতোটা পারি, সেটা কিন্তু সহজ ব্যাপার না
কারণ তারা সবাই হয় ছদ্মবেশে অথবা অন্তরালে।
অনেক খুঁজেপেতে কিছু সঙ্গী পাই এবং
সেসময় তাদের একজন বা অন্যজনের সঙ্গে হাঁটতে যাই
নদীর কিনারে আর এমনভাবে নিজেকে মেলে ধরি,
যা আমি নিজেই প্রায় ভুলতে বসেছিলাম —
কিন্তু তাও, বেশির ভাগ সময়ে আমরা নীরব, আমাদের যে কোনো
কথার তুলনায় নদীর স্রোতকেই মনে হয় বেশি অর্থময় —
নদীর দুই তীরে উঁচু উঁচু জলাভূমির ঘাস হেমন্তের বাতাসে
শান্তভাবে দুলে দুলে যায় ক্রমাগত।
সেই সময়েই আমার মনে হয় যে শৈশবেও
আমি এখানে এসেছিলাম, যদিও আমার শৈশবে
ছিলো না কোনো নদী, কেবল ঘরবাড়ি
আর ঘাসে ভরা লন। তাই মনে হয়
আমি ফিরে যাচ্ছি আমার জন্মেরও আগের
কোনো সময়ে, হয়তো অবলুপ্তির অতলে, হয়তো
সেই সময়ের নদীই রয়ে গেছে আমার স্মৃতিতে।
মূল কবিতার নাম: “A MEMORY”।
বিকেল এবং আসন্ন সন্ধেগুলো
তোমার মরণ হবার ঠিক আগের সোনালি দিনগুলো যখন তুমি কিন্তু
অচেনা মানুষদের সঙ্গে এলোমেলো কথোপকথনে মেতে উঠতে পারো,
এলোমেলো অথচ চিন্তাশীল, পৃথিবীকে পর্যবেক্ষণ করার অভিঘাতে
গড়ে তুলছো নতুন প্রকরণ আর পাল্টে নিচ্ছো নিজেকে,
এবং শহরটা এই গ্রীষ্মে প্রখর উজ্জ্বল আর জনবিরল
অথচ সবকিছু ঘটে আগের চেয়ে শ্লথগতিতে —
বুটিক, রেস্তোরাঁ, একটেরে এক মদের দোকানের স্ট্রাইপ দেওয়া শামিয়ানা,
তার দরজার সামনে শুয়ে থাকতো মিনিবেড়াল।
ছায়াছায়া শীতল পরিবেশ সেখানে, আমারও ইচ্ছে করে
শুয়ে থাকতে আর মনেক ভেতর কোনো চিন্তাভাবনা না রাখতে।
বিকেলে আমরা খাবো সাগানাকি পনির আর আলুসেদ্ধ দিয়ে বানানো
কাঁচা অকটোপাসের স্যালাড, ওয়েটার সামনে দাঁড়িয়ে জলপাই তেলের ভেতর
ওরেগানোর পাতা কেটে কেটে পরিবেশন করবে —
ক’টা বাজলো এখন — সন্ধে ছ’টা? তার মানে যখন বেরোবো আমরা
আলো থাকবে বাইরে এবং দিনের আলোয় শহরটাকে দেখবো আমরা,
তারপর আমাদের গাড়িতে উঠে রওনা দেবো —
কোথায় যাবে এর পরে, যতো কিছু ঘটলো এবার,
যদিও তুমি যে হারিয়ে গিয়েছিলে, সে কথা বলতেই পারবে না।
মূল কবিতার নাম: “AFTERNOONS AND EARLY EVENINGS”।
টীকা: মূল কবিতায় যে খাবারগুলোর নাম রয়েছে:
পলপো (Polpo): আলুসেদ্ধ দিয়ে বানানো কাঁচা অকটোপাসের স্যালাড। ইতালির ভেনিস শহরের বিখ্যাত জলখাবার। ইতালিয় ভাষায় “পলপো” মানে “অকটোপাস”।
সাগানাকি (Saganaki): ছাগল বা ভেড়ার দুধ থেকে তৈরি গ্রিক পনির।
ওরেগানো (Oregano): ধনেপাতা মতন দেখতে — খাবারের ওপরে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
সঙ্গীত
লিও ক্রুজ সুন্দর সব চিনেমাটির শাদা বাসনপত্তর বানায়;
ভাবছি তার কয়েকটা পাঠাবো তোমায়
কিন্তু প্রশ্নটা হল — কীভাবে
বিশেষ করে এই সময়ে
সে আমাকে
মরুভূমিতে জন্মানো ঘাসের নাম শেখায়;
আমি একটা বই কিনেছি এই বিষয়ে
ঘাস চোখে দেখে তাদের নাম মনে রাখা অসম্ভব
লিও’র চিন্তাভাবনা অনুযায়ী
মানুষের হাতে বানানো জিনিশ
প্রাকৃতিক বস্তুর থেকে বেশি সুন্দর
এবং আমি বলি — না।
এবং তা শুনে লিও বলে
ঠিক আছে, দেখা যাবে।
আমরা প্ল্যান করি
মরুভূমির পথ ধরে হাঁটবো দুজনে।
কিন্তু কবে, তাকে শুধাই, কবে?
কোনোদিন না:
কিন্তু সে কথা আমরা কেউই বলি না।
সে আমাকে শেখায়
কল্পনার জগতে বাস করতে:
মরুভূমি পার হতে হতে
ঠান্ডা বাতাসের ঝলক পাই;
দূরে দেখা যায় তার বসত;
চিমনি থেকে গলগল ধোঁয়া বেরোয়
ওটাই বোধহয় তার চুল্লি;
মরুভূমির বুকে বসে লিও চিনেমাটি বানায়
আহ, সে বলে, আবার দিবাস্বপ্ন দেখছো তুমি
আমি তখন বলি: স্বপ্ন দেখে আমার সুখ
ভেতরে আগুন জ্বলে এখনও
মূল কবিতার নাম “SONG”।
বাংলা তর্জমা: অংকুর সাহা।
© অংকুর সাহা। মে ২০২৩।

