
মাছি মূল গল্পঃ দ্য ফ্লাই – ক্যাথরিন ম্যান্সফিল্ড অনুবাদ – অরুণাভ ঘোষ
“তোমার এই জায়গাটা খুবই আরামদায়ক” তারিফের সুরে বললেন মিঃ উডফিল্ড আর বাচ্চারা যেমন প্র্যাম থেকে উঁকি দেয় ঠিক তেমন ভাবে তাঁর বন্ধু ‘বস’-এর টেবিলের পাশের বিশাল সবুজ রঙা চামড়ার আরামকেদারা থেকে মাথা বের করে ইতিউতি চাইলেন তিনি। তাঁর কথা শেষ; এবার তাঁর বেরিয়ে পড়ার সময়। কিন্তু তাঁর মোটেও যেতে ইচ্ছে করছিল না। আসলে রিটায়ার করার পর থেকে – মানে ওঁর স্ট্রোকের পর থেকে – স্ত্রী এবং মেয়েরা সারা সপ্তাহ ওঁকে বাড়িতে আটকে রাখেন, মঙ্গলবার বাদে। মঙ্গলবার সেজেগুজে, চুলটুল আঁচড়ে শহরে ঘুরে আসার ছাড়পত্র দেওয়া হয় যদিও সেখানে গিয়ে উনি কী করেন সেটা স্ত্রী এবং মেয়েরা কল্পনা করতে পারেন না। বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করে উৎপাত করেন সম্ভবত, এমনটাই তাঁদের ধারণা। হয়তো তাই। যাইহোক, গাছ যেমন শেষ পাতাদের আঁকড়ে রাখে আমরাও তেমনই অন্তিম সুখগুলির সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে চাই। তাই, বসে বসে সিগারে টান দেন বৃদ্ধ উডফিল্ড আর লোভাতুর চোখে চেয়ে থাকেন নিজের অফিস-চেয়ারে দোল খাওয়া, শক্তপোক্ত, আপেলের মতো টুকটুকে, তাঁর চেয়ে বছর পাঁচেকের বড় অথচ এখনও যথেষ্ট দড়, এখনও চালকের আসনে বসে থাকা ‘বস’-এর দিকে। ওঁকে দেখলে নিজেরই ভালো লাগে।
“এই জায়গাটা খুবই আরামদায়ক, মাইরি বলছি!” একটা হাল্কা আশ্লেষ, একটা তারিফ লেগে থাকে বৃদ্ধের স্বরে।
“তা যথেষ্ট আরামদায়ক বটে”। কাগজ কাটার ছুরি দিয়ে ফিনান্সিয়াল টাইমসের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে সহমত হ’ন ‘বস’। সত্যি বলতে কী নিজের ঘরটা নিয়ে তাঁর বেশ একটা শ্লাঘা আছে। ঘরটার প্রশংসা শুনতে – বিশেষ করে বুড়ো উডফিল্ডের মুখে – তাঁর দিব্য লাগে। মাফলার জড়ানো দুর্বল বৃদ্ধের মুগ্ধ দৃষ্টির সামনে ঘরের ঠিক মাঝখানে অবস্থান করার মধ্যে একটা সুগভীর পরিতৃপ্তির আস্বাদ পান তিনি।
“কিছুদিন আগেই সব ঠিকঠাক করিয়েছি”, তিনি ব্যাখ্যা করেন। যেমনটা তিনি করে আসছেন গত – কত সপ্তাহ ধরে যেন? “নতুন কার্পেট” – তিনি ইশারা করেন বড় বড় সাদা বৃত্তের নকশা করা উজ্জ্বল লাল কার্পেটের দিকে। “নতুন আসবাব” – এবং তিনি মাথার ইঙ্গিতে দেখিয়ে দেন মস্ত বইয়ের তাক আর পাকানো মিষ্টি-লাঠির মতো পায়াওয়ালা টেবিলটাকে। “ইলেক্ট্রিক হিটিং!” হাতের উচ্ছ্বসিত ভঙ্গিমায় দেখিয়ে দেন অল্প কাত করা তামার ফ্রাইং প্যানে ঢিমে আঁচে ভাজা হতে থাকা পাঁচটি স্বচ্ছ মুক্তো সদৃশ সসেজ।
কিন্তু টেবিলের ওপরে রাখা ফটোগ্রাফি স্টুডিওর ঝড়ের মেঘ আঁকা বনাঞ্চলের প্রায় ভৌতিক প্রেক্ষাপটে তোলা ইউনিফর্ম পরিহিত গম্ভীর দর্শন একটি ছেলের ছবির দিকে তিনি উডফিল্ডের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন না। ছবিটা নতুন নয়। ছ’বছর ধরে ওখানেই আছে।
“তোমাকে একটা কথা বলব ভেবেছিলাম”, বলেন বৃদ্ধ উডফিল্ড। কথাটা মনে করতে গিয়ে চোখটা কুঁচকে যায় তাঁর। “এই দেখো, কী যেন কথাটা? আজ সকালে যখন বেরিয়েছিলাম কথাটা মাথায় ছিল”। তাঁর হাত কাঁপতে শুরু করল এবং দাড়ির ঠিক ওপরে লাল লাল ছোপ দেখা দিল।
বেচারা বুঢঢা, শেষ দশায় পৌঁছে গেছে একদম – ভাবেন বস। এবং সদয় বোধ করে তার দিকে চোখ মটকে ঠাট্টা করে বলেন, “বলি কী তোমায়, আমার এখানে কয়েক ফোঁটা দ্রব্য আছে, আবার ঠান্ডায় বেরোনোর আগে তোমার বেশ উপকারে লাগবে। জিনিসটা দিব্য। একটা বাচ্চারও সমস্যা হবে না”। কোমরে বাঁধা ঘড়ির চেন থেকে একটা চাবি বের করে নিজের ডেস্কের নিচের একটা টানা খুলে কালো রঙের পেট মোটা একটা বোতল বের করে আনেন। “এটাই সেই ওষুধ” বলেন তিনি, ‘আর যে লোকটার থেকে জিনিসটা পেয়েছি সে আমাকে কথাটা এক্কেবারে গোপন রাখতে বলেছে – মালটা উইন্ডসর ক্যাসেলের সেলার থেকে এসেছে”।
বৃদ্ধ উডফিল্ডের মুখটা হাঁ হয়ে যায় দৃশ্যটা দেখে। বস যদি একটা খরগোশও বের করতেন তাহলেও বোধহয় তিনি এতটা অবাক হতেন না।
“ওটা তো হুইস্কি, নয়?” ধরা গলায় জিজ্ঞেস করেন তিনি।
বস বোতলটা ঘুরিয়ে খুব যত্নের সঙ্গে তাঁকে লেবেলটা দেখান। হুইস্কি তো বটেই।
“তুমি কি জান, বাড়িতে ওরা আমায় এসব ছুঁতেও দেয় না”। বসের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলেন তিনি। দেখে মনে হয় যেন এক্ষুনি কেঁদে ফেলবেন।
“আরে, এ ব্যাপারে তো মেয়েদের চেয়ে আমরা একটু বেশিই জানি”। বলেই টেবিলের ওপর জলের বোতলের পাশে রাখা দুটো গেলাস ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে দুটোতেই বেশ খানিকটা পানীয় ঢেলে দেন। “মেরে দাও চট করে, মন্দ হবে না তোমার। আর শোনো, এর সঙ্গে জল মিশিয়ো না কিন্তু। এ সব দ্রব্যে জল মেশানো পাপ। আহ!” নিজেরটা এক ঢোঁকে গলায় চালান করে দিয়ে রুমাল বের করে গোঁফটা মুছে আড় চোখে বুড়ো উডফিল্ডের দিকে তাকালেন যিনি তখনও গেলাসটা হাতে ঘুরিয়েই চলেছেন।
বৃদ্ধ চুমুক দিয়ে এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে ঝাপসা গলায় বললেন, “বাদামের গন্ধ! পাগলা!”
কিন্তু জিনিসটা তাঁকে গরম করে তুলে জমে যাওয়া বুড়ো মগজে সেঁধিয়ে গেল – ওঁর মনে পড়ে গেল।
“যেটা বলছিলাম,” নিজেকে চেয়ার থেকে ঠেলে তুলতে তুলতে বললেন তিনি, “মনে হয় তুমি শুনতে চাইবে। গত সপ্তাহে মেয়েরা বেলজিয়ামে বেচারা রেগির কবর দেখতে গেছিল আর সেখানেই তোমার ছেলেরটাও দেখতে পায়। ওরা খুব কাছাকাছি রয়েছে বলেই মনে হয়”।
বৃদ্ধ উডফিল্ড একটা বিরতি নেন কিন্তু বস কোনো জবাব দেন না। শুধুমাত্র চোখের পাতা সামান্য কম্পন থেকে বোঝা যায় তিনি শুনেছেন।
“জায়গাটা যে ভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছে সেটা মেয়েদের খুব ভালো লেগেছে”, বৃদ্ধের স্বর আবার শোনা যায়। “চমৎকার করে সাজানো। বাড়িতেও এতটা ভালো হতো না। তুমি সেখানে কখনও যাওনি – গেছ?”
“না, না!” নানা কারণে বস সেখানে যাননি কখনও।
“মাইলের পর মাইল জুড়ে জায়গাটা”, কাঁপা গলায় বলেন বৃদ্ধ উডফিল্ড, “কিন্তু যেন বাগানের মতো গোছানো। সব কবরেই ফুল ফুটে আছে। সুন্দর চওড়া পায়ে চলা পথ”। তাঁর স্বর থেকে এটা স্পষ্ট বোঝা যায় সুন্দর চওড়া পথ তাঁর কতটা পছন্দের।
একটা বিরতি আবার। তারপর বৃদ্ধ যেন ঝলমলিয়ে ওঠেন।
“জান, হোটেলটা মেয়েদের থেকে এক পাত্র জ্যামের জন্য কত আদায় করেছে?” জিজ্ঞেস করেন তিনি। “দশ ফ্রাঁ! ডাকাতি, আমার মতে। গার্ট্রুড বলল ছোট্ট একটা পট, আধ ক্রাউনের চেয়ে বড় নয়। এবং ও এক চামচের চেয়ে বেশি নেয়নি অথচ ওরা দশ ফ্রাঁ চার্জ নিল। ওদের শিক্ষা দিতে গার্ট্রুড পাত্রটাই নিয়ে চলে এসেছে। বেশ করেছে। ওরা আমাদের আবেগ নিয়ে ব্যবসা করছে। ওদের ধারণা যেহেতু আমরা ওখানে গেছি ঘুরে দেখতে তাই যা দাম চাইবে আমরা দিয়ে দেবো। ব্যাপারটা এরকমই”। তিনি দরজার দিকে ঘুরলেন এবার।
“ঠিক কথা ঠিক কথা”, সায় দিলেন বস। কিন্তু কিসের যে ঠিক কথা তাঁর কোনো ধারণাই ছিল না। তিনি নিজের ডেস্ক থেকে উঠে এসে দরজা পর্যন্ত বৃদ্ধের পা ঘষটে যাওয়ার দৃশ্য দেখলেন এবং তাঁকে বিদায় জানালেন। উডফিল্ড অন্তর্হিত হলেন।
দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন বস, তাকিয়ে রইলেন শূন্যে। অফিসের পাকা চুলের বার্তাবাহক ততক্ষণ তাঁর দিকে চোখ দিয়ে বসে রইল। মাঝে মাঝে নিজের চিলতে ঘর থেকে উঁকিঝুকি দিতে থাকল যেমনটা বাইরে ঘুরতে নিয়ে যাবার আশায় করে পোষা কুকুর। “আগামী এক ঘন্টা কারোর সঙ্গে দেখা করব না মেসি”, বললেন বস। “কারোর সঙ্গেই নয়। বুঝেছ?”
“একদম, স্যার”।
দরজা বন্ধ হয়ে গেল, দৃঢ় ভারি পদক্ষেপে উজ্জ্বল কার্পেট পেরিয়ে নিজের স্থূল দেহটা স্প্রিং দেওয়া চেয়ারে ছেড়ে দিলেন তিনি এবং ঝুঁকে পড়ে নিজের মুখ ঢেকে ফেললেন বস। তিনি চাইছিলেন, তাঁর ইচ্ছা করছিল, তিনি প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন কান্নার . . .
ছেলেটার কবর নিয়ে বৃদ্ধ উডফিল্ড যখন আচমকা মন্তব্যটা করেছিলেন তখন জোর একটা ধাক্কা খেয়েছিলেন তিনি। যেন ভূমি বিদীর্ণ হয়ে গেছিল আর তিনি ছেলেটাকে সেখানে শুয়ে থাকতে দেখছিলেন যার ওপর একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল উডফিল্ডের মেয়েরা। ব্যাপারটা কিন্তু সত্যিই আশ্চর্যজনক। ছ’বছর কেটে গিয়ে থাকলেও ছেলেটিকে একইভাবে নিখুঁত ইউনিফর্ম পরে শায়িত থাকা ছাড়া আর কিছু কল্পনাও করে উঠতে পারেননি বস। “আমার ছেলেটা!” গোঙানির মতো কথাটা উচ্চারণ করলেন বস। তবু চোখে এক ফোঁটা জল এল না। অতীতে, ছেলে মারা যাবার প্রথম কয়েকমাসে, এমনকি কয়েক বছর পরেও, ওই দুটো শব্দ উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে এমন এক বেদনা তাঁকে গ্রাস করে ফেলত যে উদ্দাম কান্না ছাড়া তাঁর শোক প্রশমিত হতো না। সময় – তিনি বলতেন, সকলকেই বলতেন – কোনো কিছু বদলাতে পারবে না। অন্য লোকেরা হয়তো সামলে উঠতে পারে, হারানোর তীব্রতা তাদের কমে যেতে পারে কিন্তু তাঁর ক্ষেত্রে এমনটা হবে না। কীভাবেই বা সম্ভব? ও যে তাঁর একমাত্র ছেলে ছিল। ওর জন্মের পর থেকেই বস এই ব্যবসাটা ওরই জন্য গড়ে তুলেছিলেন; ছেলের কাজে না লাগলে এসবের আর কোন মানে নেই। তাঁর ছেলেই তাঁর স্থান অধিকার করবে, যেখানে তিনি ছাড়বেন সেখান থেকে সব এগিয়ে নিয়ে যাবে এই প্রতিশ্রুতি না থাকলে কীভাবে তিনি বছরের পর বছর ক্রীতদাসের মতো খেটে, নিজেকে বঞ্চিত করেই সব কিছু চালিয়ে নিয়ে গেছেন?
এবং সেই প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হওয়ার কত কাছাকাছি চলে এসেছিল। যুদ্ধ শুরুর আগে ছেলেটা এক বছর ধরে অফিসের খুঁটিনাটি সব কাজকর্ম শিখে নিচ্ছিল। রোজ সকালে দু’জনে এক সঙ্গে বেরোতেন; একই ট্রেনে ফিরে যেতেন। আর ছেলের বাপ হিসেবে কত যে অভিনন্দন তিনি পাচ্ছিলেন! হবেই তো; ছেলেটা তো চমৎকারভাবে সব সামলাচ্ছিল। আর কর্মচারীদের মধ্যেও ওর জনপ্রিয়তা ছিল দারুণ। প্রতিটি লোক, বুড়ো মেসি পর্যন্ত, ওর প্রশংসায় ছিল পঞ্চমুখ। এসব সত্ত্বেও এক ফোঁটাও বিগড়ে যায়নি ছেলেটা। বরাবরের মতো হাসিখুশি স্বাভাবিক ছিল, সকলের জন্য সঠিক শব্দ ছিল ঠোঁটে, ছেলেমানুষি চেহারা আর কথায় কথায় বলার অভ্যাস, “ফাটাফাটি!”
কিন্তু সে সব কিছু এখন চুকেবুকে গেছে যেন এমনটা কখনো ঘটেইনি। সে একটা দিন ছিল যেদিন মেসি তাঁর হাতে এনে দেয় সেই টেলিগ্রামটি যার অভিঘাতে মুহূর্তের মধ্যে তাঁর মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। “গভীর দুঃখের সঙ্গে আপনাকে অবহিত করা হচ্ছে যে . . .”। এবং সেদিন তিনি অফিস ছেড়েছিলেন এক ধ্বস্ত মানুষ হিসাবে যাঁর জীবন তছনছ হয়ে গেছে।
ছ’বছর আগে, ছ’বছর . . . সময় কত দ্রুত চলে যায়! ঘটনাটা যেন গতকালই ঘটে থাকতে পারত। বস মুখ থেকে হাত সরিয়ে নিলেন; তিনি বিভ্রান্ত। কিছু একটা যেন গোলমাল চলছে তাঁর মধ্যে। যেমনটা অনুভব করতে চাইছেন তেমনটা যেন ঠিক আসছে না। উঠে গিয়ে ছেলের ফোটোগ্রাফটা একবার দেখার মনস্থ করলেন। কিন্তু এই ছবিটা তাঁর তেমন পছন্দের নয়; চাউনিটা কেমন যেন অস্বাভাবিক। শীতল। কিছুটা কঠিন যেন বা। ছেলেটাকে কখনোই অমনটা দেখতে ছিল না।
সেই মুহূর্তে বসের নজরে পড়ল একটা মাছি পড়েছে তাঁর চওড়া দোয়াতদানিতে। দুর্বল প্রাণীটি মরিয়া হয়ে হাঁচড়পাঁচড় করে প্রাণান্ত চেষ্টা করছে বেরিয়ে আসার। লিকলিকে ঠ্যাংগুলো ছটফট করে যেন বলছে বাঁচাও! বাঁচাও! কিন্তু দোয়াতদানির ধারগুলো ভিজে এবং পিছল; মাছিটা পিছলে পড়ে আবার সাঁতারাতে লাগল। বস একটা কলম তুলে নিলেন, কালির থেকে মাছিটাকে তুলে একটু ঝাঁকিয়ে একটা ব্লটিং কাগজের টুকরোয় রেখে দিলেন। মুহূর্তের ভগ্নাংশের জন্য মাছিটি নিথর পড়ে রইল তার চতুর্দিকের ছড়িয়ে পড়া কালো ছোপের মাঝখানে। তারপরই নড়ে উঠল সামনের ঠ্যাংগুলো, আঁকড়ে ধরল কাগজ এবং নিজের ছোট্ট জ্যাবজ্যাবে শরীরটা তুলে ধরে ডানা থেকে কালি ঝেড়ে ফেলার বিপুল শ্রমসাধ্য কাজে মন দিল। ওপর নীচ ওপর নীচ একটা ঠ্যাং ক্রমাগত চলতে লাগল একটা ডানায়, যেমন কাস্তে শান দেওয়ার সময় ওপর নীচে চলে পাথর। তারপর একটা ছোট্ট বিরতি। মাছিটা যেন পায়ের আঙ্গুলে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে প্রথমে একটা তারপর অন্য ডানাটা মেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। শেষ পর্যন্ত সফল হয়। তারপর বসে পড়ে একটা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বেড়ালের মতো নিজের মুখটা পরিষ্কার করতে শুরু করে। কল্পনা করাই যায় যেন সামনের দুটো পা একে অন্যের সঙ্গে ফূর্তিতে ঘষাঘষি করছে। একটা সাংঘাতিক বিপদ কেটে গেছে; বেঁচে গেছে প্রাণীটি। জীবনের জন্য আবার প্রস্তুত সে।
ঠিক তখনই বসের একটা খেয়াল চাপল। কলমটা কালিতে ডুবিয়ে নিয়ে ব্লটিং কাগজে নিজের চওড়া কব্জিটা রেখে মাছিটা উড়ে যাবার মুহূর্তে একটা মস্ত ফোঁটা কালি ফেলে দিলেন। এবার কী করবে সে? কীই বা করবে! ছোট্ট ভিখারিটা ভয়ে যেন একদম কুঁকড়ে গেল, বিহ্বল, নড়াচড়া করতেও ভয়, যেন এরপর কী ঘটবে জানা নেই। তবু, তারপরেও অত্যন্ত কষ্ট করে যেন নিজেকে টেনে নিয়ে চলল। সামনের পাগুলো নড়ে উঠল, আঁকড়ে ধরল এবং এবারে অনেক ধীরে হলেও কাজটা আবার শুরু থেকে শুরু হল।
ব্যাটার হিম্মত আছে তো! ভাবলেন বস এবং মাছিটার সাহসের জন্য তারিফ খেলে গেল মনে। এভাবেই সব কিছুর মোকাবিলা করতে হয়; এটাই সঠিক মনোভাব। কখনোই বোলো না হেরে গেছি; একটাই প্রশ্ন শুধু . . . কিন্তু ততক্ষণে মাছিটা আবার তার শ্রমসাধ্য কাজটা সেরে ফেলেছে আর কলমে কালি ভরে ওই পরিষ্কার করা শরীরে আরেক ফোঁটা কালো কালি ফেলার সময়টুকুই ছিল বসের। এবার কী হবে? একটা কষ্টকর উদ্বেগের মুহূর্ত আর তারপর আবার নড়ে উঠল সামনের পাগুলো। একটা নিদারুণ স্বস্তি অনুভব করলেন বস। মাছিটার দিকে ঝুঁকে পড়ে নরম স্বরে বললেন, “ব্যাটা ধড়িবাজ বান. . .” মাছিটার গায়ের কালি শুকোতে সাহায্যের জন্য তার ওপর ফুঁ দেওয়ার চমকপ্রদ আইডিয়াটা খেলে গেল মাথায়।
যাই হোক, এবারে মাছিটার চেষ্টা যেন অনেক ভয়ার্ত, অনেক দুর্বল। না, এবারেই শেষবার – দোয়াতে কলম ডোবাতে ডোবাতে ভাবলেন বস।
তাই-ই হল। শেষ ফোঁটাটা ব্লটিং কাগজে পড়ল আর ভিজে চুপচুপে মাছিটা পড়ে রইল তার মধ্যে। অনড়। পিছনের পাগুলো শরীরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে, সামনের পাগুলো দেখা যাচ্ছে না আর।
“আরে কী হল – উঠে পড়!” বলে উঠলেন বস। কলম দিয়ে মাছিটাকে নেড়ে দেখলেন, বেমতলবে। কিছুই হল না, হওয়ার কিছু ছিলও না। মাছিটা মরে গেছে।
কাগজ কাটার ছুরির ডগায় মাছিটার শব তুলে ছেঁড়া কাগজের ঝুড়িতে ছুঁড়ে দিলেন বস। কিন্তু এমন এক শোচনীয় দুর্দশার অনুভূতি ঘিরে ধরল তাঁকে যে তিনি শঙ্কিত হয়ে পড়লেন। টেবিলে ঝুঁকে পড়ে মেসিকে ডাকার জন্য ঘন্টা বাজালেন তিনি।
“খানিকটা পরিষ্কার ব্লটিং পেপার নিয়ে এস। জলদি”। কঠিন হুকুমের সুরে বললেন তিনি। পুরোনো প্রভুভক্তটি থপথপ করে চলে গেল আর সেই অবসরে ভাবার চেষ্টা করতে লাগলেন এর আগে ঠিক কী ভাবছিলেন তিনি। কী ভাবছিলেন? সেটা হল. . . রুমালটা পকেট থেকে বের করে কলারের পাশে গুঁজে দিলেন। হাজার চেষ্টা করেও মনে করতে পারলেন না কী ভাবছিলেন।
লেখক পরিচিতিঃ ক্যাথরিন ম্যান্সফিল্ড
১৮৮৮ সালে নিউজিল্যান্ডের ওয়েলিংটনে এক বিত্তশালী পরিবারে জন্ম ক্যাথরিনের। ইউরোপীয় জীবন-অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের বাসনায় এবং লেখিকা হিসেবে যশপ্রাপ্তির আশায় সুদূর নিউজিল্যান্ড থেকে মাত্র কুড়ি বছর বয়সে ইংল্যান্ডে চলে আসা থেকে আমৃত্যু (মৃত্যু ১৯২৩) ছোটগল্পের শিল্পচর্চায় নিমজ্জিত থেকেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গল্প সংকলন ‘ইন আ জার্মান পেনশন’, ‘ব্লিস’,’দ্য গার্ডেন পার্টি’ এবং ‘দ্য ডাভস্ নেস্ট’। যক্ষ্মা আক্রান্ত হয়ে মাত্র পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে মারা যান। ক্যাথরিন কখনো উপন্যাস লেখেননি।

