
ঋদ্ধি পান-এর কবিতাগুচ্ছ
সাধারণ দিনগুলি ছেয়ে
১
আনন্দকে ছেয়ে আছে অশ্রু ধারাপাত
তোমার হাত অনন্ত আর ক্ষুদ্র জলপ্রপাত
খন্ডিত আর দ্বিখণ্ডিত ন্যায়ের আলোকধারা
আমায় সে পাঠিয়েছে এক যৌবনের তারা
লাল লাল লাল আলোক হাঁটে ভালোবাসার শিস
আমিই তাকে চিনিয়েছিলাম বিদ্রোহের বিষ
লড়াই লড়ে মন্মথ আর মন্মথর ছায়ে
ঝলমলমলানি বুকের কাছে তীর ধনুক ধায়ে
সেই শপথে শপথ রাখি সেই ভিটেতে আগুন
রাজার ঘরে ভিখারি নয় আলোর মাসে ফাগুন
যাচ্ছি আজই সমুখ ক্ষেতে ফসল ফলার গান
শূন্য থেকে শুরু করেই আকুল আঘ্রাণ।
তোমায় কেন দেখিয়েছিলাম নাকি তুমিই আমায়
বিপ্লবেরই সমর্থনে বিপ্লবের দামামায়।
বর্ম বরম বর্ম বরম আটক দিচ্ছি গায়
অভিমানের হলদে পরত আটকে নিচ্ছি পায়
যে যেখানে ছড়িয়ে আছে ভালোবাসার ফুল
তুমিই আমায় ধরিয়ে দিলে কোথায় ঠিক ভুল !
২
আমাকে ঠিক কোথায় রাখবে এইভেবে
সারারাত জানি ঘুমোওনি
পথেপ্রান্তরে আমাকে দেখে অবাকও হওনি
শুধু জিজ্ঞাসা করে গেছো, কোথায় ,কেন, কীভাবে!
তারপর
বনফুল ফুটিয়েছি, তুমিও বেশ সর্বাগ্রে হেঁটে গেছ
এই রাত এই দিন এই দিন এই রাত
কোথায় পালাবে ?
আরও অলিগলি বিস্তার করে
কোথায় রাখবে বাড়ির জন্মদিন।
তার চেয়ে আসে রাখো চারাগাছ
চুপ করে থাকা পাতার সংলাপ
শিকড়ে শিয়রে জল
উঠে আসে
তোমাকে দেখলেই ঢোক গিলি !
আমিও নেমে গেছি সর্বাগ্রে
কচিঘাস, বুনো কচু , পেয়ারা, বট
কটাক্ষ করেছে ,
দাবানলে সরে গেছে মন্মথবাবু
চোখের নীচে তুমি বালিয়াড়ি
জল , সেইসব জল রেখে গেছে
সেই সব পালাবদল রেখে গেছে
গ্রামের সংস্কৃতি, জন জন মানুষ
দু হাতে হাঁপাইনি , সবদিন আমিও ঢুকে গেছি
উঠোনে তোমার ,
ভরা অক্ষরের জলরাশি
তলিয়ে নিয়ে গেছে সমুদ্রে।
এখন তোমার মুকুট আমাকে মানায়
তোমাকে ছাড়াই আমাকে মানায় ।
৩.
বাড়ী আমার একটি
বসত করি সুখে
অনেকগুলো বাড়ি ছিল
পুড়ে গেছে দুখে
তিনকালের ডিম
এককালেই পাড়ি
একদিন ছেড়েছি তাই
বন্ধনের নাড়ী
পথের পাশে
মানুষ ঘোরে
উচ্চ নিচ্চু হাত
ফিরছি আমি
মহিমামন
শরৎকালের ঘায়ে
মাথায় মাথায় জল
মাথায় মাথায় কালি
কোনটা ছেড়ে
কোনটা ধরি
জালন্ধরের হাড়ি
তবু তোমার বসত
নামে কেটেছে গাঁয়
মুক্তি পেলেই মন চলে যায়
আকাশ ঢাকা ঘায়ে।
অস্ত গেল বিন্তি ফুলে
অস্ত গেল রশি
পাগুলো সব ধুলোর পথে
কন্ট তুলে শ্বাসি।
৪.
অলংকার রেখে অলংকার নিয়ে
যে প্রেম সরিয়ে রেখেছি দুই জনে
বিগত বৎসর ধরে আমি একা জলচান
পুবে ও পশ্চিমের রোদ, আকাঙ্ক্ষা
দাহকার্য শত আচ্ছন্নের পরও দীপ ও দ্বীপপুঞ্জ
হেঁয়ালি করেছে যারা শূন্য মহাসমুদ্রের ভার
তোমার দিকেই দেব ঠেলে প্রচ্ছন্ন স্নিগ্ধও মধুর
পায়ে পায়ে ডানদিক পায়ে পায়ে বাম ছড়ানো
ভিটেমাটি প্রগাঢ় উপুড় করা পায়েসের বাটি
মুখের মধ্যে দিতে দিতে তুমি স্পষ্ট হও
অস্পষ্ট রেখার মতো বাল্যের কৈশোরের কাঙাল
সীমারেখার মধ্যে আজকাল কেউ থাকছে না
তুমি আছ পার্বত্যপ্রবাহের গুহায় অসুখ করেছে পঞ্চাশ বছর
তির পাতা আছে সঙ্গে গেলাস সাদা মাটি
মুখের চেয়েও বড়ো অন্ধকার করে রাখা আছে
কাছে টানি পঞ্চালিকার সুতো মনখারাপ হয়
তখন ছন্দে নামি বিভোর হয়ে পড়ি
নূপুরের ছলাৎ ছলাৎ অসহ শান্ত তিব্বতি মেঘ
এভাবে পাশাপাশি রামধনু দানের আকাশ দেখি ক্ষীণ সরোবরে লজ্জা
বীভৎস আহারের পাশে ঘুমিয়ে পড়ি
তোমাকে চেনার হলে চিনতাম
তোমার অসুখে অন্ধ হতাম।
৫.
একদিন যে গ্রাম ছাড়া হয়
চড়ক আর গাজনতলার রথ
সেইখানে এক দুগগাতলা ভার
ফিরতি পথে যাচ্ছি কিন্তু আবার পারাপার
সময় হলেই বাজবে সেতার,
সাঁতবে কুলতলি
আকাশ ভেঙে নামছে মাথা
জোয়ারে ঢেউ তুলি
গ্রামের পথে কাদা এবং বৃক্ষ শাল্মলী
পরশ করে দিনগুলো সব
ফুটিয়ে ভুলগুলি ।
৬.
যাবজ্জীবন অন্ধ আছি অন্ধ ছিলাম রাতে
তোমার সঙ্গে আমার দেখা এ কোন প্রভাতে
খড়ি এবং খামারবাড়ি সাত বছরের গাঁ
সেইখানের জন্ম ভেঙে দিয়েছিলেন কা
হয়নি আর যাওয়া আমার হারিয়ে গেছে ভাঁজ
উপুর্যুপুর দু:খগুলো বাড়িয়ে আছে খাঁজ
ভিটেমাটি ভিটেমাটি থাকতে হবে আরও
পায়ের তলার বিদ্যুৎ আজ মনেই চমকালো
বেরিয়ে পড়ি তোমার চেয়ে রাস্তা আরও সরু
গন্ধে সবুজ বাসি মুখের জোড়া দু খান ভুরু
তোমাকে দেখে নিচ্ছি রোদ অবাধ্যতার মান
এইখানেই শেষ হয়না কোনো রূপকথা আখ্যান !

