দৃশ্যান্তর অভিষেক বসু
“আর কতক্ষণ অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে রে কেলো?” সমিতের কথায় অন্যমনস্কভাবে ঘাড় নাড়ে কালী। বৃষ্টিতে এই স্কুল-বারান্দায় আটকে পড়া ইস্তক মোবাইলে রিলস-এ ডুবে আছে সে। একের পর এক নতুন ভিডিও, নতুন দৃশ্য আর গল্প। বৃষ্টিটাকেও যদি আঙুলের ছোঁয়ায় সরিয়ে দৃশ্যান্তরে চলে যাওয়া যেত!
সমিতের একবার ইচ্ছে হলো মোবাইল ঘাঁটে। দেখতে মন্দ লাগে না রিলসগুলো। যদিও ভালো মন্দ কিছুই বিশেষ মনে থাকে না, তবে সময় কেটে যায়। এখন তো আবার সবাই ও’সব বানিয়ে অনেক টাকাও কামাচ্ছে। মেয়ে রুমিরও ইচ্ছে আছে, কিন্তু ওর মায়ের আপত্তি। সামনে মাধ্যমিক। মেয়েটা পড়াশোনায় ভালো। এখন ও’সব না, ওর স্ত্রী গৌরী বলে।
গৌরীর প্রসঙ্গ সমিতের মুখে হাসি এনে দেয়। মেয়ের সামনে কড়া হলেও গৌরী কিন্তু গোপনে সমিতকে নিয়ে একটা গানের ভিডিও বানিয়েছিল। কি সুন্দর গান দিয়ে গানের কথার সঙ্গে ঠোঁট মিলিয়েছে গৌরী। অসাধারণ লাগছিল ওকে ।
সমিত জোর করে ওর মনের মত আরেকটা ভিডিও বানিয়েছিল গৌরীর। যখন গৌরীকে কাছে পাবে না তখনকার জন্য। পরে অবশ্য মুছে দেয়। ছেলেমেয়েটা ফোনটা ঘাঁটে তো।
ওদের কথা ভেবেই মোবাইলটা ঘাঁটতে পারছে না সমিত। বেশি চার্জ নেই। আকাশের যা অবস্থা কারেন্ট চলে যেতে পারে যে কোন মুহূর্তে। মেয়েটার ফোনটা লাগে, মাস্টারেরা ছুটিতে কাজ পাঠায়। এমনিতেই আজ দেরি হয়ে গেছে। আগে ছেলেটা একটু মোবাইলটা পেলে মেয়েটাকে দিয়ে দেয় কোন ঝামেলা ছাড়াই। সমিত বাড়ি ফিরলে দুজনেই ছুটে আসে।
মনটা একটু খারাপ হলো; বাবা বাড়ি ফিরে এসেছে বলে নয়, মোবাইলটা পাওয়ার জন্য আসে। সে যাই হোক, ওরা ছেলেমানুষ। কতটুকুই বা করতে পেরেছে ওদের জন্য? এবার চৈত্রে আর একটা স্মার্টফোন কিনে বাড়িতে রাখতে বলবে ওদের। আপাতত পুরনো এফএম ফোনেই মেয়েটা গান শোনে। সেটা আর কত দিনই বা চলবে? এমনিতেই অর্ধেক সময় লাইন পাওয়া যায় না। এই আজ আসার কথাও জানাতে পারেনি সমিত।
স্কুলটা গ্রামের একটু বাইরে। দূর থেকে গ্রামটাকে ছোটোবেলায় ভূত-ভূত খেলার লেপ চাপা টর্চের আলোর মত লাগছে। ফুটো ফাটা দিয়ে আলো পালিয়ে বেরোচ্ছে। “এদিকে একটু আলোও তো দিতে পারতো টেনে, যারা কলকাতা কাজে যায় বা পড়তে শহরে যায় তারা সন্ধ্যায় ফিরবে কি করে? মোবাইলের আলোয় বৃষ্টিতে যাওয়া যায় না কি ? আলো থাকলে না হয় দেখা যেত।“
—কে’ই বা ফিরবে? কাজে বা পড়তে যায় কজন? এখন সবাই তিন-চার মাসের জন্য দিল্লি, বিহার ঝাড়খন্ড। ফিরে এসে পায়ের উপর পা তুলে আরো তিন-চার মাস। তখন মেলা-পার্বণ-মোচ্ছব। তারপর টাকা ফুরোলেই আবার ভিনদেশী।
—কি অবস্থা হ্যাঁ? পড়াশোনা করার লোক নাকি কমছে? কাজ-বাজ নেই বলেই, বল ?
—কম্পিটিশন টা দেখেছো? পড়ার খরচ জানো? পাতি কলেজে পড়ে আজকাল কিছু হয় না। সেসব চাকরি এখন মায়ের ভোগে। মেয়ের জন্য পাত্র দেখো ’দা, দিনকাল ভালো নয়। পড়াশোনা করেছে, ভালো । তবে বেশি পড়াশোনা করলে আবার পাত্র পাবে না।
“দেখাই যাক না ! এখনো তো মেয়েটা ঠিকঠাকই পড়াশোনা করছে। মতিগতি আছে বলেই তো মনে হয়।” একটু দুর্বল শোনায় সমিতের গলা? পড়াশোনা না জানা রোজগেরে ছেলেপুলের ব্যবহার সে রোজই দেখছে। যদিও অনেকেই নামে ছাত্র-ছাত্রী। এই পরিবেশে রুমি কতটা কি করে উঠতে পারবে?
কালী কথাটা শুনতে পেলো কি না বোঝা গেল না। বিড়ি ধরাতে ধরাতে বললো, “ ফোনটা সঙ্গে আছে?”
সমিত ঘাড় নাড়লো।
অদ্ভুত শব্দ করে দুটো মেসেজ ঢুকলো ফোনে। রুমির পছন্দ। ফোনগুলো নিয়ে ওই করে মেয়েটা। এখন যেমন এই ফোনের রিংটোন ‘ঢাকের তালে’ আর ওই ফোনে সমিতের প্রিয় গান ‘রিমঝিম এ ধারাতে ‘।
কালির পাঠানো দুটো হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ দুটো ফেসবুক রিলের লিংক। “তুমি মেলায় মেলায় ঘুরে বেড়াও দা। সবকিছু তোমার পক্ষে দেখাও সম্ভব না। আমিও জানতাম না।” কালির কথা শেষ হতে না হতেই হুড়মুড় করে স্কুল বারান্দায় ঢুকে পড়ল এক অন্ধকার মূর্তি , “অনেকক্ষণ থেকে ভাবছি কাদের যেন গলা পাচ্ছি অন্ধকারে!”
—নরেনকা ! তুমি ছিলে কোথায়?
নরেন বয়সে ওদের থেকে খুব বেশি বড় নয় তবে গ্রামের সম্পর্কে কাকাই হন। “পাশের গেরামে ডেকেছিল! ফেরার পথে বৃষ্টিতে ঐ স্কুলের বাথরুমের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তোদের গলা পেয়ে এলাম।”
“তুমি তো এখন দোকানদারি কম আর মানুষের কাজই বেশি করছো কাকা।” নরেন কাকা এখন পাড়ার হোমরা-চোমরাদের ছায়াসঙ্গী। যদিও নিজে হোমরা চোমড়া হতে পারেননি , তবে গাঁয়ের সর্বক্ষণের উপস্থিতি আর খবর চালাচালিতে ভূমিকা থাকায় খুব একটা অসুবিধেও তার হয় না। “তা কে ডেকেছিল কাকা, মদ্দ না মাগী?”
বড্ড বাজে বকে কালোটা! সমিত বিরক্ত হয়। “কি হচ্ছে কি কেলো?”
“ও একটু হয় । কাকা কিছু মনে করে না!” নরেন কাকার মহিলাপ্রীতি সর্বজনবিদিত। তবে লোকটি অমায়িক। জিভ কেটে বললেন, “তা আমার কথা ছাড়ো, তোমাদের কথা বলো? কিসের এত আলোচনা?”
—ও কিছু না, মেয়েদের বিয়ে-থা নিয়ে কথা হচ্ছিল । দিনকাল, গাঁয়ের পরিবেশ, কোন কিছুই তো ভালো না।
কথাটা মনে ধরল কাকার। “শোনো তোমাদের একটা কথা বলি বাবা। সবকিছুর একটা নিয়ম আছে। যে সময় যা সিস্টেম। তুমি যখন যেখানে আছো তার সিস্টেম মেনে চলতে হবে, তবে সব ঠিক থাকবে।”
সমিতের অসহ্য লাগছিল। একবার ভাবল বড় বারান্দার ওই প্রান্তে গিয়ে দেখে কালি কি পাঠিয়েছে, কিন্তু নরেন লোকটা বড় গায়ে পড়া। তার উপর ভিডিও চললে আওয়াজ হবে পরিষ্কার। শুকনো গলায় সে জিজ্ঞাসা করল “কেন কাকা ?”
“কেন?” নরেনের চক্ষু বিস্ফোরিত হলো, “মানুষের হাতে যদি কাঁচা পয়সা আসে না বাবা, সে ধরাকে সরা জ্ঞান করে। কোন নিয়ম ,সিস্টেম মানে না। আমাদের গাঁয়ের হয়েছে সেই দশা। কোথায় মিলে মিশে আলোচনা করে কাজ বার করে নেবে তা নয়, পয়সা ছড়িয়ে, দল পাকিয়ে নেশা-ভাঙ, মেয়ে নিয়ে নোংরামো আর গায়ে পড়ে ঝগড়া।”
— তাই !
“তাই! তুমি দাঁড়িয়ে আছো সেখানে আর তাই! বাবা পয়সা ছড়িয়ে রোজগারের লোভ দেখিয়ে যুবসমাজকে একেবারে সর্বনাশ করছে কয়েকজন। আইন কানুন প্রশাসন কিছু মানছে না…” বোধহয় আরো কিছু বলার ছিল তার, কিন্তু এক দীর্ঘকায় মূর্তি ও তার ততোধিক বড় ছাতার অবয়বের সঙ্গে ভেসে আসা ভারী কন্ঠে সে ভূত দেখার মতো চমকে যায়।
—কার কথা হচ্ছে কাকা?
—বিকাশ!
—ও, আমার কথা?
—না না তোমায় দেখে নামটা মুখে চলে এলো!
“ও তাই বল!” আশ্বস্ত হওয়ার ভান করে বিকাশ, “ আসলে আমি আনন্দ-ফুর্তি করতে একটু ভালবাসি তো, অনেকের আবার সহ্য হয় না।” সমিতের দিকে তাকিয়ে হাসে বিকাশ, “ সমিতদা যে! আজ ফিরছো?”
—হ্যাঁ রে, তুই কেমন আছিস ?
—এইতো দিল্লি থেকে এলাম ও মাসে, কালীপুজো কাটিয়ে তারপর যাব।
“বিকাশ এখন লেবার সরদার হয়ে গেছে, বুঝলে সমিতদা।” কালী বলে, “ গ্রামের বেশিরভাগ ছেলেদের ও’ই কাজে নিয়ে যায়।”
—ধুর! ছাড়ো তো ওসব। ভগবানের কৃপায় চলে যাচ্ছে এটুকুই। তবে হ্যাঁ, নিজের মতো থাকি। আনন্দে থাকি। তবে হ্যাঁ, নিজের পয়সাতেই আনন্দ করি, দালালির পয়সায় নয়।
নরেন কাকা নড়েচড়ে ওঠেন, “তুমি ঠিক কি বলতে চাইছো বিকাশ? অন্যেরা অন্যের পয়সায় করে বুঝি? তুমি কি একাই রোজগার করো নাকি?”
—আহা চটো কেন কাকা? আমি কি তোমায় কিছু বললাম? এ তো ঠাকুর ঘরে কে ….
—বড়দের প্রতি সম্মান চিরকালই তোমার কম। আর এখন দু’পয়সার মুখ দেখে দেখছি সেই রোগ আরো বেড়েছে। আর শুধু নিজে নয় তুমি অন্যদেরকেও তো উচ্ছন্নে পাঠাচ্ছ।
“মানে? আমি কি ওদের হাত ধরে টেনে আনছি, না ওরা কচি ছাওয়াল? তাছাড়া তোমাদের চামচা না হলেই সে উচ্ছন্নে যাচ্ছে?”, বিকাশের গলা চড়ে, “ এত সমস্যা হলে গ্রামে নেশার জিনিস বিক্রি বন্ধ করে দাও না। গাঁয়ের মধ্যে এসব বিক্রি হয় কার প্রশ্রয় জানিনা ভেবেছ? বখরা তো সবাই পাও।”
সমিত আর সহ্য করতে পারল না। সে স্কুলে লম্বা বারান্দার অন্য প্রান্তে এসে লিংকটা খুললো।
দুটো ভিডিওতেই সুন্দরী লাগছে রুমিকে। মায়ের উপরই গেছে মেয়েটা। কিন্তু সমিতের সেদিকে খেয়াল নেই। অচেনা একটা ছেলের সঙ্গে ভোজপুরি গানে চটুল ভঙ্গিতে নাচানাচি করছে রুমি। এই পোশাক ওকে কে কিনে দিল? ছেলেটাই বা কে?
পরের ভিডিওটা আরো ভালো করে দেখে উত্তর পেলো সমিত। ছেলেটার নাম সৌরভ। পাশের গ্রামের ছেলে। ভিডিওটা ওই ছেলেটার প্রোফাইল থেকেই নেওয়া।
দ্বিতীয় ভিডিওটাও মোটামুটি একই কিন্তু এটা শেষ হচ্ছে একটু অন্যভাবে। শেষের দিকে একই ঠান্ডা পানীয়ের বোতলে থেকে বের হওয়া দুটো স্ট্র রুমি আর ছেলেটার মুখে। ক্রমশ ছবি ওদেরকে আরো কাছ থেকে ধরছে এবং অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দৃশ্যান্তরে ওরা হাত ধরাধরি করে একটা ঝোপের পিছনে হারিয়ে যাচ্ছে।
সমিতের মাথায় আগুন জ্বলে ওঠে। নরেন আর বিকাশের ঝগড়া, কালির কন্ঠস্বর সমেত গোটা পৃথিবীটাই আছড়ে শেষ করে দিতে চায় সে । হাতটা তুলেও সামলে নেয় সে, বাড়ির নম্বরে ফোন করে।
কয়েকবার লাইন পায় না, কিন্তু সমিত উন্মত্তের মতো চেষ্টা করে যায়। অবশেষে রিং হতে থাকে । কেউ ধরছে না কেন ? কি অদ্ভুত! সমিত রিংটোন শুনতে পাচ্ছে কি করে? ঐ তো গান ভেসে আসছে, ‘রিমঝিম এ ধারাতে’!
—কালি !
সমিতের বিহ্বল চিৎকারে ছুটে যায় ওরা । সমিতের হাতে ফোন ধরা। ডান দিকে ইঙ্গিত করে সুমিত বলে, “ ফোন !”
“হ্যাঁ , ফোন!”, কিছু না বুঝে ঘাড় নেড়েই স্তব্ধ হয়ে যায় কালী ; স্কুল বারান্দার ডাইনে লাগোয়া বারান্দা থেকে ভেসে আসছে ফোনের রিংটোন। নিশ্চয়ই সমিত এটা চেনে।
ডান দিকের বারান্দা ফাঁকা। শেষ ঘরের দরজা বন্ধ থাকলেও তালা খোলা, একটা কড়াতে ঝুলছে। “ঘরটা ফাঁকা থাকে, তালা টানলে খুলে যায়।” বিকাশ বলে।
আরেকবার ফোন করে সমিত । লাইন পায় না। ওরা ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। “আমি স্পষ্ট শুনেছি কালী!”,অবিশ্বাস ঝরে পড়ে সমিতের গলায়। আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠা পায়ে পায়ে তার গতি রোধ করে। বিকাশের ইশারায় কালী সমিতের কাঁধে হাত রাখে। ওরা দাঁড়ায়। সমিত কালীর দিকে তাকিয়ে কেঁপে ওঠে, ওর হাত সরিয়ে ছুটে যেতে চায় খোলা দরজা দিকে। কালী ওকে জাপটে ধরে, “ওরা আগে যাক ‘দা। আমরা দাঁড়াই।”
নির্বাক যন্ত্রণায় নিজেকে ছাড়িয়ে চলে যাওয়ার চেষ্টা করে সমিত। ওরা দুজনেই পড়ে যায় । অন্ধকারে বিলাপ আর ধস্তাধস্তি কতক্ষণ চলতো তা বলা সম্ভব নয়, কিন্তু হঠাৎই যেন বিকাশ আর নরেনের দ্রষ্টব্য নাটকে স্পটলাইট এর মত টর্চের আলো জ্বলে ওঠে সমিতের মুখে। ওরা পিছন ফেরে।
—বাবা !
এতক্ষণ যে প্রান্তে ওরা দাঁড়িয়েছিল সেখানে ছাতা মাথায় টর্চ হাতে কিংকর্তব্যবিমূঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছে আর কেউ না, স্বয়ং রুমি ।
সমিত একবার সামনে দরজার দিকে, একবার পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা রুমিকে দেখে। কয়েক মুহূর্ত যেন যুক্তিবোধ সময় চেয়ে নেয় তার কাছে। ছুটে এসে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে সমিত। রুমিও কি জানি কি ভেবে জড়িয়ে ধরে ওকে। সমিতের কাঁধে হাত রেখে কালি বলে, “বাড়ি চল সমিতদা। এদিকটা ওরা দেখে নিক। এসবের মধ্যে থাকিস না।“
অপসৃয়মান তিনজনের শেষ চিহ্ন মিলিয়ে গেলে নরেন বিকাশের দিকে তাকায়, “চলো ভাইপো, এবার দেখা যাক ব্যাপারটা।“
বিকাশ দাঁত বার করে, “তুমি যখন আছো কমিশন কি আর তুমি ছাড়বে কাকা? চলো দেখি কি কেস!”
বাড়ির বারান্দায় ধপ করে বসে পড়ে সমিত । রুমি জল এনে দেয়, ছেলেটা ছুটে আসে কিন্তু মোবাইল চায়না। ওর পাশে দাঁড়িয়ে থাকে।
“মা কোথায়?” মেয়েকে জিজ্ঞাসা করে সমিত।
—মাসির বাড়ি গেছে ।
“মাকে কিছু বলার দরকার নেই।”, একটা বিড়ি ধরিয়ে বলে সমিত। অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। এক অপরাধবোধ, তীব্র লজ্জা কাজ করে ওর মধ্যে। ও বোধহয় আর কোনদিন রুমির চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারবে না। ওই স্কুল বারান্দার দাঁড়িয়ে যে কল্পনায় গা গুলিয়ে উঠছিল ওর, রুমির নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকালে তা দুঃস্বপ্নের মতো তাড়া করবে না ওকে? ভাগ্য ভালো ওর পাপ আরো বাড়বার আগেই দেবদূতের মতো এসেছিল রুমি।
কি একটা ভেবে সমিতের ভ্রু কুঞ্চিত হলো। রুমিকে ডাক পাড়লো সে।
—হ্যাঁ বাবা?
“তুই জানলি কি করে আমি ওখানে থাকবো? আমার যে আজ আসার কথা তাই তো জানাতে পারিনি!”
রুমির নীরবতা শয়তানের মত ফিসফিস করে সমিতের কানে। বোধ করি তাকে দমাতেই চেঁচিয়ে ওঠে সে, “কাকে খুঁজতে গেছিলি? ফোনটা কোথায় রুমি?”
—মা’র কাছে।
ঘন্টাখানেক পর মায়ের কণ্ঠস্বরে অজানা আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে রুমি। ঘুমন্ত ভাইয়ের আলিঙ্গন ছাড়িয়ে বাইরে ছুটে আসার আগেই সমিত বেরিয়ে পড়েছে। তার রক্তবর্ণ চোখ, ভিজে জামা কাপড় কি বিস্মিত করল গৌরীকে? “তুমি? এই দেখো না কি বৃষ্টি!”
দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটে আসে সমিত; তার প্রচন্ড প্রহারে ছিটকে পরে গৌরী। ব্যাগ থেকে ছিটকে পরে কিছু জামাকাপড় আর ছোট মোবাইল ফোনটা।
সমিত কাপা হাতে স্মার্টফোনটা থেকে ডায়াল করে। বৃষ্টি বজ্রপাতের মধ্যেও স্পষ্ট শোনা যায়, পুরুষ কন্ঠের গান ‘বড় একা লাগে এই আঁধারে’।
হাত থেকে ফোনটা পড়ে যায় সমিতের। মাথাটা ধরে ঝাঁকিয়ে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয় সে। গৌরী এতক্ষন অবিশ্বাস ভরা চোখে দেখছিল সমিতকে, এবার সে ধীরে ধীরে উঠে খুঁড়িয়ে পাশের ঘরে ঢুকে পড়ে।
সমিত জানতো না মুছে দেওয়া ভিডিও একমাস ফোনে থাকে। ফোন সারানোর দোকানের ছেলেটা জানতো। ভিডিওটা তার হাতে পড়ায় তার কথা শুনতে বাধ্য হয়েছিল গোরী। আজও স্কুলে ঐ পশু দুটো যখন ছিঁড়ে খাচ্ছিল ওকে, তখনও বাধ্য হয়েই চুপ করে ছিল সে।
এতটা সত্যি নিতে পারতো সমিত? বিশ্বাস করতো গৌরীকে? ক্ষমা করতো নিজেকে?
নিজেকে কি শেষ করে দেওয়া উচিত ছিল গৌরীর? লজ্জায় মিশে যাওয়া উচিত ছিল মাটিতে? ও লজ্জা পায়নি, ওর অসহায় লেগেছিল। তারপর মনে হলো, এই এত বছর সমিতকে নিয়ে কম, এই অসহায়তার অনুভূতি নিয়ে ঘর করেই তো দুই ছেলে মেয়েকে বড় করলো সে; আজ ছেড়ে দেবে? কি অন্যায় করেছে সে?
তার চেয়ে এই ভালো। দিদিকে বলা আছে; নরেন আর বিকাশও যা বলার বলবে। বড়জোর বিভ্রান্তি থাকবে কিছুদিন, তারপর ব্যস্ততায় কোথায় মিলিয়ে যাবে, যেমন রিলের পর রিল হারিয়ে যায়।
স্নানে ঢোকে গৌরী। গায়ে জল পড়তেই একটা তীব্র সুখানুভূতি হয়, একেবারে শরীর জাত। শরীরও অদ্ভুত! এই জ্বালায় জ্বলে, আবার জুড়োবার সময় আঁকড়ে ধরে সেই জ্বালাকেই! নিজেকে হঠাৎ জীবন্ত মনে হয় ওর। বিকাশের কথা মনে পড়ে। ছেলেটার বুদ্ধি আছে।
‘বড় একা লাগে..’ গুনগুন করে ওঠে জলধারা।

