
সোমা দত্ত-র কবিতাগুচ্ছ
বিভেদ
তুই হিন্দু না মুসলমান? রামশঙ্কর তিওয়ারি না রামশরণ বাল্মীকি
আমি বলেছিলাম আমি ধোবি বা কুত্তা– না ইহাকা না উহাকা
লোকটা বলল, শালা বাস্টার্ড !
তোকেই তো খুঁজছিলাম
যাকে দরকারে লটকে দিতে পারি
পোশাক বদলে বলতে পারি সেনাপতি হাঁকাও কামান
তরোয়াল হাতে বলতে পারি লাগাও দাঙ্গা
ভণ্ডুল করো আন্দোলন
তুই আমার গমের মরিচা, মাজরা পোকা, পেস্টিসাইড
আর যত্রতত্র তোকে ভ্যানিশ করে আমি পি সি সরকার
নির্বাচিত
আপনি নিশ্চয়ই রাজা শশাঙ্কের কথা পড়েছেন?
হূণ শাসক মিহিরকুল?
পুষ্যামিত্র শুঙ্গ? রাজেন্দ্র চোল? – তাও?
আপনি কী বাবরের প্রার্থনা পড়েছেন?
যদি না পড়ে থাকেন
তাহলে আপনি নিরাপদ
এ দেশ ওদের অস্বীকার করে
মুছে দেয় ইতিহাস থেকে
হয়তো এভাবেই ওরা রক্ষা করতে চায় নিজেদের
কোনো একটি বিশেষ মৌলবাদকে উৎখাত করে
প্রতিষ্ঠা করতে চায় অন্য আর এক
এরপর আকবর, আওরংজেবের কথা অন্য কাউকে বললে
আপনার জরিমানা হতে পারে
আর কবিতার বইয়ের আদলে কোনো বিধর্মী আচরণ দেখলে
ছুঁড়ে ফেলা হতে পারে তালিবানি কারাগারে
প্রচার
অধিকার কিসের?
ধৃত আসামীর মতো ফিরে যাও দরবারে
হাত দুটি বাড়াও মৃত্যুদণ্ডে
আত্মসমর্পণ করো
এনকাউন্টার হোক
বিপ্লব ভাইরাল হবে এক্স হ্যান্ডেলে
পরিত্যক্ত
কয়েকটি মাত্র ফুল ফুটে আছে শৈশবে
কয়েকটি গাছ ছুঁয়ে আছে খেলা
বাকিরা বড় হয়ে গেছে
টুকটুকে বিষফলের মতো রাঙা
বৃদ্ধ দানবের মতো
পাখির ডানা ছিঁড়ে খায়
গাছ কাটে, পাহাড় কাটে
পিঁপড়ের পেটে টিপে গুঁড় নিংড়ে নেয়
আমরা এই সংসারকে কোল্ড স্টোরেজে
জমিয়ে রেখেছি
সাদা চুল দাড়িওলা ওই যে শিশুটি
বহন করে চলেছে ছেঁড়া ফুলের যন্ত্রণা
সে তার চারটি ফুলের মতো সন্তানকে
বড় করে তুলেছে
অথচ জীবনের ফুল পাতা গাছ
চিবিয়ে খায়নি বলে ছোট হয়ে বেঁচে আছে
পরিত্যক্ত প্ল্যাটফর্মে
পরিগ্রহ
পাতা ঝরে যায়
হলুদ রঙে বয়সের ভার
মধু জমে ক্ষার
অম্লে অরুচি
স্বাদমতো অভিনয় ভর করে বাকলে
বাণপ্রস্থে পড়ে থাকি যেন উইয়ের ঢিবিতে ঢাকা বাল্মীকি
তৃতীয় নয়নে তারা খসে, শল্কপত্র সরে, খোলস ছেড়ে
বেরিয়ে আসে সাপ
তারপর ছায়াখানি তস্করের মতো খুঁজে চলে উর্বর জমি
শাবল চালায়
গোপন ক্রিয়া যেন জবরদখল
উদ্বাস্তুর মতো পড়ে থাকে কালের সমীহ
ফুল ফোটে, ভোর হয়
দুয়ারে জল দেয় সতীন বউটি
চিহ্ন
জীবনের সব চিহ্ন মুছে ফেলা সহজ
অথচ
মৃত্যুকে চাইলেও মুছে ফেলা যায় না
ভেন্টিলেশনে জেগে থাকে
বাবার মৃত্যুর পর তার সব জিনিসপত্র
মা দান করে দিল
কাগজপত্র, ফাইল, ডায়েরি সব জ্বলে পুড়ে খাক
বলল যে ফিরবে না তার কোনো চিহ্ন রাখব না
যা একদিন এমনিই নষ্ট হবে
তাকে সরিয়ে দেব নিজের হাতে
আজই – এই মুহূর্তে
এখন বাবার প্রায় কোনোকিছুই আর বাড়িতে নেই
শুধু একটা ডেথ সার্টিফিকেট ছাড়া
সামান্য একটা কাগজ ছিঁড়তে মা’র হাত কাঁপে –


খুব ভালো লাগলো
ভীষণ ভালো।