
পার্বতী রায়-এর গুচ্ছ কবিতা
পরের মুহূর্ত গুলি
১
দুলুনির মধ্যে আমি ছিলাম।
সময় কি মেনে নেবে তাপপ্রবাহ?
আলপিন এসে ফুটছে গায়ে।
নেই কোনো সমুদ্র,
কাছাকাছি তোমাকে দেখতে পাব—
এমনটাও নয়।
২
পরের মুহূর্তগুলিতে গান ধরব।
আলগা হবে শহর।
যেসব কথোপকথনের ভেতরে মেঘ আসবে,
তুলে ধরব সেইসব শব্দ।
উল্টো করে টাঙিয়ে রাখা পৃথিবী
আমাকে কি কিছু বলবে?
৩
এই আলোচনাগুলো দূরে থাক।
তোমার আর আমার মধ্যে কত সমুদ্র,
কত ফুল, কত পাতা।
অথচ বেশিরভাগ সময় আমরা ঘুমিয়ে থাকি।
আমাদের ফটোফ্রেম
নড়েচড়ে বসে।
৪
একান্ত কিছু মুহূর্ত আছে আমাদের।
আমরা বলতে পারি না।
আমাদের চোখ আটকে যায়।
বর্ণনা দিতে দিতে
আমরা ফিরে আসি আবার
আগের ঠিকানায়।
বিয়েবাড়ি, অনুষ্ঠান, পূজার সামগ্রী—
এসব নিয়েই আমরা কথা বলে উঠি।
৫
আজ আর বয়ে চলা হবে না।
ঘড়ির টিকটিক আওয়াজে
দম বন্ধ হয়ে আসছে।
রাতের পর রাত
আমার ঘুম আসে না।
কত তীর্থের কাজ
বাকি রয়ে গেছে।
তোমাদের উঠোনে পাতাবাহার দেখে
মা-কাকিমারা
ভীষণ খুশি হয়েছেন।
একটি বোবা টানেলের ভেতরে
১
সেই মতো মঞ্চে এসে বসলাম
মনকেমনকে ধরলাম চোখের পাতায়।
আজান-সম্পর্কিত প্রতিটি বাণী
আমার চোখ ধুইয়ে দিয়েছিল।
জল পড়ার অপেক্ষায় আমরা দাঁড়িয়েছিলাম,
থেকে থেকে দেখছিলাম সাজিয়ে তোলার মুহূর্ত।
ডুব দেব কি না ভাবছিলাম,
কান্না এসে ঘিরে ধরেছিল আমাদের।
২
ব্যাকরণ জানি না,
দিনভর জিজ্ঞাসা—
একটি বোবা টানেলের ভেতরে
এত এত জলপাই কাঠের আসবাব কী করে এলো!
মুহুর্মুহু ডাকছিল ছাদ
আর কিছু সাদা পায়রা।
আমরা অতিক্রম করছিলাম বহু দূর।
৩
সাহস হচ্ছিল না কিছুতেই।
মেঘ ভেঙে যাওয়ায়
উতলে পড়ছিল নদী বন্ধ কামরার ভেতরে,
আর কিছু চড়ুই জল খেতে এসে
ডাকাডাকি করছিল।
৪
বিরামহীন একটি হাত
যাতায়াত করছিল আমাদের মধ্যে।
ভেতরের গুঞ্জন
বাইরে আসছিল না কিছুতেই।
তিলখেতে আলো জ্বলে উঠছিল।
প্রাণচঞ্চল একটি নদী
এসে ঠেকছিল মোহনায়।
বাতি অতিক্রম করে
কারা যেন ছুটে আসছিল
সাদা বিছানায়।
৫
লাল লাল ফুল ফুটেছিল,
যদিও মেরুন রং আমাদের প্রিয়।
কিছু জলযাতনার দৃশ্য
ফুটে উঠছিল।
মনে মনে বেসুরো হচ্ছিলাম।
ক্লান্ত পথ।
শিবিরে নেমে এসেছিল ঘুম।
ঘুমের পরমায়ু খেতে
কিছু আরশোলার উৎপত্তি হয়েছিল।
শ্মশানঘাট তখন আলো আলো।
৬
জীর্ণ শোকসভা।
মিছিলে লোক নেই তেমন।
আগন্তুক বৃষ্টি পথ দেখাচ্ছিল।
নোনাধরা হাওয়া
উঠতে দিচ্ছিল না কিছুতেই।
রাঙা দিদার চিতা জ্বলছিল।
৭
আমরা উপেক্ষা করতে পারছিলাম না কিছুই।
ততক্ষণে বাড়ি ফেরা জরুরি ছিল আমাদের।
বাঁশবনের মাথায় চাঁদ দুলে উঠতেই
আমরা ভেবেছিলাম
ভোর হয়ে আসার কথা।
ডালিম গাছে সোনা রোদ
মুখ উপুড় করে দিয়েছিল।
কথা হচ্ছিল না কিছুই।
শীর্ষ মেঘের আনাকানিতে
আমাদের বাসাখানা দুলছিল।
৮
মা হতে পারিনি,
দুঃখ পুষেছি অনেক।
পানের পাতার ভাঙা বোঁটায়
গান রেখে এসেছিলাম।
পান্থপথ, ধুলোঘাট , জ্যোৎস্না—
ঘুমেদের প্রতিলিপি গড়ছিল।
মনে মনে মনকেমনকে
দীর্ঘ করছিল অনেক।
৯
একটি ট্যাবলয়েডে
এত এত কথার যাত্রী
কীভাবে যাবে ওপারে!
টস করে নিচ্ছিলাম আমরা।
ধানখেতে মধুর প্রণয় দেখছিলাম।
‘কাল যাব, কাল যাব’ করে
ঘুরে ফিরছিল বাতাস।
মহুয়া ফুলের আলোতে
মনে পড়ছিল সবটাই।
১০
বিছানা অনেক হার্দিক ছিল।
ক্লোজ এক্সিটে যেতে হলে
কিছু কারণ লাগবে— বলা হয়েছিল।
আমাদের মুখে মুখে
কিছু কথা ফিরছিল।
পোতাশ্রয়, লবণঘাট—
সব মনে পড়ছিল।
কিছু অস্থির চিত্রকল্প
আমাদের ঘুমোতে দিচ্ছিল না কিছুতেই।
বিছানায় টান পড়ছিল।
১১.
নদীর বিদ্রুপে
আমরা সাড়া দিয়েছিলাম।
ফেনা নিভে গেলে
আর কেউ কি থাকবে ঘাটে?
রাঙা দিদার পথ প্রশস্ত হল
মাইথন ড্যামের ভিতরে।
আমরা মানবিক হলাম।
তার ছায়া তুলে রাখলাম দেয়ালে।
স্রোতস্বিনী
এতক্ষণে চুপচাপ হল।

