
গুচ্ছ কবিতা – অন্তরা মণ্ডল
১. আবহমান
চাঁদ নেই,
আকাশে পূর্ণিমার জ্বালা নেই, তবুও
একটা বিপন্ন আলো হঠাৎ ঝাঁপ দিয়ে ফিরে আসে অন্ধকারের কোলে
বধির রাতের গায়ে আলো এসে পড়ে
মুখ তুলে মনে হয়-
মন্বন্তর শেষ হলো।
পৃথিবী যে ক্লান্ত তা বুঝে গেছি-
এখন আর অস্থির হই না, বরং
প্রস্তুত হই।
যে শূন্যতা অবলেহন করেছি,
তা মরীচিকাকে ভালোবেসে উন্মাদ হয়ে যাওয়া নয়, বরং
শহরের নগ্নতা উপেক্ষা করে
সময়ের অর্বুদ পথে এগিয়ে চলা- ক্লান্তিহীন।
নিজেকে লিখতে গিয়ে লিখে ফেলছি
মায়ের আঁচল, একটা অর্ধ উলঙ্গ মাছ, আর অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু।
ফিকে হয়ে আসা ছন্দগুলো, তখনও উড়ছে হাওয়ায়,
নীরবে-নিঃশব্দে…
২. প্রাতিস্বিক
এই পাড়ে রহস্য রেখে
নির্ঝর স্তব্ধতার কামুক উন্মাদনায় মেশে উৎকর্ষ,
যাদের বৃষ্টিতে ভেজার কথা ছিল-
তারা ভেজে জ্যোৎস্নায়, আর
কামুক পৃথিবীর মায়া সাজায় নৈঃশব্দ্য বিথী।
একঝাঁক পাখির উদ্ভট আচরণ থেকেই
আমার অধঃপতনের সূত্রপাত।
দুই প্রান্তের অশ্রুসঙ্গমে আবক্ষ মরীচিকা নিয়ে
ক্ষইতে ক্ষইতে গলে যায় শিকড়ের মাটি,
বিকল্প নির্জনে-
নিরন্তর স্তব্ধতার উপর জ্বলে ওঠে মুদ্রিত নক্ষত্রেরা।
চারদিকে শৈশব হারানো শিশুদের কান্নার বোলে যাদের মন ভাঙে
তারাও যান্ত্রিক শহরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে
এক চিমটি সুদিনের, অথচ
কেউ কোনো প্রশ্ন করে না, উত্তর খোঁজে না,
বরং হাহাকার করা একরত্তি অন্ধকারে
ছেঁড়া চাঁদের গায়ে এঁকে দেয় বীজগণিত,
ভিজে যাওয়া অবিশ্বাস আর গন্তব্যচ্যুত পথিকের মতো
ক্রমশ তলিয়ে যায়
অনিচ্ছা নির্বাসনের পথে…
৩. অপাংক্তেয়
ঘুম ঘুম সকালে একটা কবিতাকে দেখে ফেলাই প্রেম
আর সেই প্রেমের চোখে তাকালেই
আমার মতিভ্রম হয়।
পৃথিবীর যা কিছু নিখুঁত সবটাই নকল,
তাই প্রিয় কবিতা হোক কিংবা প্রেম
আমি সবেতেই খুঁত খুঁজে বেড়াই।
কবিতা হতে পারে
একটা সার্থকতা, একটা আনন্দ, একটা বিশ্রাম, কিংবা
এগুলোর জায়গায় নির্দিষ্ট একজন মানুষের নাম;
অথচ সেই নির্দিষ্ট একজন
ইচ্ছে করেই কবিতা বোঝে না।
অতঃপর তোমাকে জানানো হয় না-
আজও এদেশের মানুষ,
তোমার প্রস্থানের পথে নিরুপায় করুণ দৃষ্টিতে
তাকিয়ে থাকা চোখের মতোই বেহায়া।
মহানগরের ব্যস্ত রাস্তায় তুমি হারিয়ে যাও;
নিপীড়িত মানুষের মতো ফুটপাথের এক পাশে পড়ে থাকে
অপাংক্তেয় কিছু শব্দের অসমাপ্ত মায়া।
৪. আবেক্ষণ
কেউ যেন বিশাল শূন্যের দিকে আমাকে প্রতিদিন ঠেলে ঠেলে দেয়
শূন্য ঘর, শূন্য বারান্দা, নিশ্চিহ্ন কবিতা
সাজানো পংক্তি থেকে খসে পড়া আখরগুলো
ভেসে যায় কোপাই নদীর স্রোতে,
আর এক ভুলে যাওয়া নিরুদ্দেশের পথ আমাকে চমকে দেয় প্রতিটি ক্ষণ
কবির অক্ষরজ্ঞানের অবক্ষয় ঘটে।
এক মাথা বিতর্ক নিয়েই সাঁঁকোর নীচে তাকিয়ে দেখি-
যে শূন্যের ভিতর আমি কান পেতে ছিলাম
সে সর্বস্ব কেড়ে নেওয়ার ভয় দেখিয়ে শাসিয়ে যায় আমাকে;
যে তরুণী ঘোলাটে পূর্ণিমার রাতেও খিলখিলিয়ে উঠেছিল
তার চোখে তাকিয়ে দেখি-
কাঁপছে কত আকাশ, কত মৃত্যু, কত নতুন জন্ম
আমি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকিয়ে পুরোটা বোঝার চেষ্টা করি
ক্রমশ তলিয়ে যাই, নিঃশ্বাস ফুরিয়ে আসে;
ফাঁকফোকরের মধ্যে তখন ফুঁসে ওঠে ধ্বনিহীন ক্ষোভ
দাহ্য সন্ধ্যার একমুঠো ভস্ম কলমে ভরে
আত্মগোপন করি, আর প্রার্থনা করি
পরের জন্মে নদী হবো, গাছ হবো, মেঘ হবো,
কিন্তু আর কখনও কবি হবো না।
৫. মেঘ হয়ে যাই
তারপর, অনেকগুলো দিন কেটে গেল।
আমি ফিরে এলাম
নিঃসঙ্গতা বুকে নিয়ে
চৈতন্য উন্মুক্ত হওয়ার আগেই; শুধু
তোমার জন্য তোমার সান্নিধ্যে রেখে এলাম ধ্রুপদী অস্পষ্টতা।
পরিত্যক্ত নিঃসঙ্গ সৈনিকের কম্পিত ঠোঁটে
যেমন লেগে থাকে তোমার নামের বিষাদ গীতি,
এই পড়ন্ত বিকেল, পাতাঝরার মরশুম,
আর ফিরতি পথের ক্লান্ত পথিক সকলেই তো আশ্রয় খোঁজে,
কিন্তু ফুরিয়ে আসা অনুভূতির কাছে
কেউ আর অধিকারবোধ দেখায় না।
অন্ধকার সাঁকোর কাছাকাছি
ছিন্নভিন্ন একটা বাদুড় শুয়ে থাকে, মৃত শিশুর মতো,
তার মুখের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে মৃত্যুর স্বাদ জানতে বড্ড সাধ হয়
আচ্ছা, সে কি কখনও অমরত্বের আস্বাদ পাবে না?
দ্বিধান্বিত হয়ে তখনও দাঁড়িয়ে থাকি সাঁকোর কাছেই।
তারই মাঝে অনুচ্চারিত কিছু জেদি শব্দ ডানা ঝাপটায়।
চলতে গিয়ে হোঁচট খাই,
আমার পায়ের নিচে ডুকরে ওঠে একরাশ বিষণ্ন স্বপ্ন
মাথা তুলে দেখি, তারা আমাকে ঘিরে রয়েছে উর্নাজালের মতো
কিছুক্ষণ বসে থাকি খুব একা,
তারপর মেঘ হয়ে যাই।
৬. শেষ অবধি
শেষ অবধি,
সপ্তাহ কাটে ঊর্ধ্বশ্বাসে ,
এক আশ্চর্য ইউটোপিয়ান ড্রিম নিয়ে বেঁচে থাকা কবিরা
দুটো শূন্যস্থানকে পাশাপাশি বসিয়ে রাখে অপেক্ষায়,
যান্ত্রিক জীবনের জটিলতাগুলো
তাদের কানে কানে বলে যায় দীর্ঘ ব্যর্থতার কথা।
ইচ্ছা, অনিচ্ছা, আকাঙ্খাগুলো
পাখি হয়ে এসে বসে তাদের পাশে,
ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দেয় সময়ের ফাঁকে,
তাদেরও কি আমার মতো কবিতা লিখতে ইচ্ছা করছে
কিংবা আরও একা হতে?
শেষ অবধি,
ভালোবাসা অসুখের মতো ছড়িয়ে পড়ে শিরায়-উপশিরায়,
তোমার চোখের আশ্চর্য জেলখানায় বন্দি হতেই
গৃহত্যাগী হই;
তারপর পুড়ে যাই আলগোছে, অবলীলায়।
শেষ অবধি,
আমার আর কবিতা লেখা হয় না,
কারা যেন কবিতার উপর ছিটিয়ে দেয় তাজা লাল রক্ত,
কবিদের হাড়গোড় ভেঙে
শব্দের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয় নিষেধাজ্ঞা, তাই
দুই শূন্যস্থানে ষড়যন্ত্র আর গণতন্ত্র বসিয়ে
মূষিকের মতো জুবুথুবু পায়ে লুকিয়ে পড়ি আস্তাকুঁড়ে।

