কে সচ্চিদানন্দনের কবিতা    ভূমিকা ও অনুবাদ : শাশ্বত গঙ্গোপাধ্যায়

কে সচ্চিদানন্দনের কবিতা ভূমিকা ও অনুবাদ : শাশ্বত গঙ্গোপাধ্যায়

সমকালীন ভারতীয় কবিতার এক প্রবাদপুরুষ কে. সচ্চিদানন্দনের জন্ম কেরালার পুল্লুট গ্রামে ১৯৪৬ সালের ২৮ শে মে l তিনি মালয়ালম এবং ইংরেজি, দুই ভাষাতেই লেখেন l কেরালা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর এবং কালিকট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাহিত্যতত্ত্বে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। কিছুদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করার পর তিনি সাহিত্য অকাদেমির সাহিত্যপত্রিকা ইন্ডিয়ান লিটারেচার-এর সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৯৬ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত তিনি অকাদেমির সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি আবার অধ্যাপনায় ফিরে আসেন এবং ইন্দিরা গান্ধী ন্যাশনাল ওপেন ইউনিভার্সিটিতে অনুবাদ অধ্যয়ন বিভাগের পরিচালক ও অধ্যাপক হিসেবে ২০১১ সালে অবসর নেন। ষাটের দশকের শেষ থেকে শুরু হওয়া সচ্চিদানন্দনের কবিজীবন অর্ধশতাব্দী অতিক্রম করেছে। মালয়ালমের তথাকথিত ‘আফটার-মডার্নিস্ট’ ধারার অন্যতম পথিকৃৎ তিনি। তাঁর কবিতায় বিশ্বসাহিত্যের প্রতি মুগ্ধতা, দৃষ্টিভঙ্গির বৈশ্বিকতা এবং ভাষার স্বচ্ছতা এক অনন্য আধুনিকতা তৈরি করেছে। ইতালীয় সমালোচক কার্লো সাভিনি তাঁর কবিতা সম্পর্কে লিখেছিলেন— 'সচ্চিদানন্দনের কবিতায় এক বিস্ময়কর আধুনিকতা আছে; সহজ অথচ গভীর শব্দের ব্যবহার, অলঙ্কারহীন আত্মকথনের ঢঙ, প্রতীকের প্রাচুর্য আর নিখুঁত মসৃণতা, তাঁর কবিতাকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে l' সমকালীন ভারতীয় কবিদের মধ্যে সবথেকে অনুবাদিত কবি তিনি l তাঁর কবিতা আরবি, অসমিয়া, বাংলা, ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, গুজরাটি, হিন্দি, কানাড়া, লাত্ভীয়, মারাঠি, উড়িয়া, পাঞ্জাবি, সুইডিশ, তামিল, তেলুগু ও উর্দুসহ বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি বিশ্বসাহিত্যের বহু কবিকে মালয়ালমে অনুবাদ করে ভাষাটিকে সমৃদ্ধ করেছেন। সত্তর ও আশির দশকে মালয়ালম সাহিত্যকে ঘিরে যে সমাজ-সংস্কৃতির নতুন জাগরণ তৈরি হয়েছিল— তার অন্যতম মুখ ছিলেন সচ্চিদানন্দন। তিনি বরাবরই দলিত, প্রান্তিক, নারী, সংখ্যালঘু ও নিপীড়িত মানুষের সামাজিক অধিকারের পক্ষে সোচ্চার থেকেছেন। নারীর লেখাকে তিনি ‘পেন্নেয্যুথু’ নামে পরিচিত করেছেন— মালয়ালমে নারীবিষয়ক সমালোচনার এক প্রতীকী শব্দ হিসেবে। তিনি বলেন— 'কবিতা কোনো শব্দের খেলা নয়; তা উঠে আসে অনুভূতির গভীর সমুদ্র থেকে ; যে অজানাকে নাম দেওয়া যায় না, তাকে নাম দেওয়ার চেষ্টা ; যে কণ্ঠরোধকে প্রকাশ করা যায় না, তাকে ভাষা দান করার প্রচেষ্টা।' তাই প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকেও তিনি বরাবরই ছিলেন সতর্ক ও সমালোচনামূলক এক জোরালো গলার স্বর । এখনো তিনি ন্যায় ও সমতার সমাজের পক্ষে সক্রিয়। সচ্চিদানন্দনের মালয়ালমে ৬০টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, যার মধ্যে ২১টি কাব্যগ্রন্থ ও সমসংখ্যক অনুবাদ-সংগ্রহ রয়েছে; এছাড়া নাটক, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনি এবং ইংরেজিতে চারটি সমালোচনামূলক গ্রন্থও রয়েছে। তিনি ৫০ টিরও বেশি পুরস্কার ও সম্মান পেয়েছেন, যার মধ্যে চারটি কেরালা সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার (কবিতা, নাটক, ভ্রমণলেখা ও সমালোচনার জন্য), তিনটি জাতীয় সম্মাননা, পোল্যান্ড সরকারের 'ফ্রেন্ডশিপ মেডেল', ইতালি সরকারের 'অর্ডার অব মেরিট' উপাধি এবং দান্তে-মেডেল উল্লেখযোগ্য। জার্মান অনুবাদ Ich Glaube Nicht an Grenzen–এর ভূমিকায় ভলফগ্যাং কুবিন লিখেছিলেন— 'সচ্চিদানন্দন এমন কবি নন যিনি নিজেকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে রাখেন। তিনি এক যাত্রাপথের কবি; তাঁর কবিতা সব দেয়ালের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। ভারতের সীমা ছাড়িয়ে তাঁর কসমোপলিটান মানবিকতাই তাঁকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে, পৃথিবী জুড়ে খ্যাতি এনে দিয়েছে l' ২০২৬ এ আশি বছর হচ্ছে এই প্রবাদপ্রতীম ভারতীয় কবির l তাঁর একগুচ্ছ কবিতায় বাংলাভাষার পক্ষ থেকে রাখা থাকলো আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য l

 

আমি

আমার মা বিশ্বাস করেননি,
যখন ১৯৪৫ সালে আমি তাঁর স্বপ্নে গিয়ে বলেছিলাম—
পরের বছর আমি তাঁর গর্ভে জন্ম নেব।

আমার বাবা আমাকে চিনেছিলেন সঙ্গে সঙ্গেই,
আমার বাঁ-হাতের বুড়ো আঙুলের নিচের তিল দেখে।
কিন্তু মা শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস করলেন না,

তাঁর মনে হলো অন্য কেউ জন্ম নিয়েছে,
আমার ছদ্মবেশে।

বাবা আর আমি অনেক বোঝালেও,
স্বপ্ন তো বিশ্বাস করার মতো সাক্ষী নয়।
তাই তিনি সেই প্রতিশ্রুত সন্তানের জন্য
অপেক্ষা করতে থাকলেন মৃত্যুর দিন পর্যন্ত।

শুধু তখনই, যখন তিনি আমার মেয়ে হয়ে জন্মালেন,
তিনি স্বীকার করলেন—সেটি সত্যিই আমি ছিলাম।

কিন্তু তখন আমার মনে সন্দেহ জন্মাল—
আমার শরীরে অন্য কারো হৃদয়
ধুকপুক করছে।

একদিন আমি ফিরে পাবো আমার নিজস্ব হৃদয়,
আমার ভাষাও।

 

 

পাগল

পাগলের কোনো জাত নেই,
ধর্ম নেই,
লিঙ্গের বাঁধন নেই।
তারা সব মতবাদ ছাড়িয়ে বাঁচে।

আমরা তাদের নির্দোষতাকে পাওয়ার যোগ্য নই।
তাদের ভাষা স্বপ্নের নয়,
অন্য এক বাস্তবতার ভাষা।

তাদের প্রেম চাঁদের আলো—
পূর্ণিমার রাতে
যা উথলে ওঠে, ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে।

তারা আকাশের দিকে তাকালে
যেসব দেবতাকে দেখে
তাদের নাম আমরা কোনোদিন শুনিনি।
তারা যখন ডানা ঝাপটায়,
আমরা ভেবে নিই তারা কেবল কাঁধ ঝাঁকাচ্ছে।

তারা বিশ্বাস করে, মাছিরও প্রাণ আছে,
ঘাসফড়িংয়ের সবুজ দেবতা
পাতলা পায়ে লাফিয়ে ওঠে।

কখনও তারা দেখে গাছের শরীর ফেটে রক্ত ঝরছে,
শুনতে পায় শহরের রাস্তায় সিংহের গর্জন।
কখনও তারা স্বর্গকে খুঁজে পায়
একটি বেড়ালের চোখে—
যেমন আমরাও পাই।
কিন্তু কেবল তারাই
পিঁপড়ের দলকে একসঙ্গে গান গাইতে শুনতে পারে।

তারা বাতাসে হাত রাখলে
ভূমধ্যসাগরের ওপরকার এক ঝড়কে শান্ত করে।
তাদের ভারী পায়ের আওয়াজে
আগ্নেয়গিরির ফেটে ওঠা থেমে যায়।

তাদের সময় আলাদা।
আমাদের শতাব্দী
তাদের কাছে এক সেকেন্ড।
কুড়ি সেকেন্ডে তারা পৌঁছে যায় খ্রিস্টের কাছে,
ছ’ সেকেন্ড পরে বুদ্ধের সান্নিধ্যে।
একদিনেই তারা পৌঁছে যায়
সৃষ্টির মহাবিস্ফোরণের শুরুতে।

তবুও তারা হাঁটতে থাকে, অস্থির—
কারণ তাদের পৃথিবী এখনো
ফুটছে, জ্বলছে।

পাগলরা আসলে
আমাদের মতো পাগল নয়।

 

সপ্তাহের দিনগুলি

রবিবার আসে
বিদ্যুৎ-রেখার মতো উড়ে,
স্বর্গের সোনালি দরজা খুলে দেয়
সূর্যের রশ্মি গায়ে এসে পড়ে l

সোমবার ওঠে
নরকের রান্নাঘর থেকে,
পোড়া দুধের হাঁড়ির ধোঁয়ার
তিক্ত গন্ধে ভরে থাকে চারপাশ।

মঙ্গলবার হেঁটে আসে,
রক্তাক্ত, পৃথিবীর
অন্ধকার গুহা থেকে টেনে আনা,
তার ফণাকে আঘাতে চূর্ণ করা হয়েছে।

বুধবার ভেসে আসে
সমুদ্রের তলদেশের
প্রবাল প্রাচীর থেকে,
দীর্ঘ লেজ, তীক্ষ্ণ দাঁত, কালো আঁশে ঢাকা।

বৃহস্পতিবার হেঁটে আসে,
তার চুলে জমে থাকা নীরবতা নিয়ে,
বরফের গুহা থেকে নামা
এক তুষারমানবের মতো নিঃশব্দ পায়ে।

শুক্রবার টলতে টলতে আসে,
কাঁপতে থাকা এক কুঁজো মানুষ,
ধূসর দাড়ি, জট বাঁধা চুল,
তার পিঠে ব্যর্থ বিপ্লবের ব্যাগ ঝুলছে।

শনিবার আসে
একটি কফিনের ওপর চড়ে,
মাথা তুলে চিৎকার করে ওঠে
কালো চাদর জড়ানো এক ডাইনির মতো।

আর শেষে রবিবার ফিরে যায়,
পিছনে স্বর্গের দরজা বন্ধ করে,
নিজের আধো-অন্ধকার, এলোমেলো ছোট ঘরে ফিরে,
একটি কবিতা লিখতে বসে।

 

 

জ্বর

 

জ্বর হলো এক আগুনের নদী,
যেখানে শরীর গলে যায়
নিঃশব্দ ধাতুর মতো।

জ্বর হলো এক লাল ঘোড়া,
যে ছুটে চলে রক্তের মাঠের ভেতর দিয়ে,
অচেনা শহরের ভাঙা গলিপথে।

জ্বর আমাদের বিছানায় ফেলে রাখে
অস্থির স্বপ্নের মতো,
যেখানে মৃতদের গলার আওয়াজ
আমাদের ঘিরে ফিসফিস করে।

জ্বর হলো এক অদৃশ্য দেশ—
যেখানে প্রতিটি মানুষ
নিজের ভেতরের অপরিচিতের সঙ্গে দেখা করে।

জ্বর কেবল শরীরের নয়—
এটা পৃথিবীরও।
মৃত্যুর কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া এক আগুন
যা শেষে আমাদের শেখায়—
কীভাবে জীবনের জন্য তৃষ্ণার্ত হতে হয়।

 

 

 

 

 

গান্ধী এবং কবিতা

কবিতা বসে থাকে গান্ধীর পায়ের কাছে।
মোজাম্বিকের শিশুটি যে গান গায় ক্ষুধার্ত পেটে,
কবিতা সেই গান।

কবিতা হলো মৃত এক কৃষকের ফেলে যাওয়া
চাষের যন্ত্রের শব্দ।
কবিতা লুকিয়ে থাকে কলেরা-আক্রান্ত
এক গ্রামীণ মেয়ের চোখের ভেতর।

কবিতা জেগে ওঠে ঝোপঝাড়ের ভিতর,
যেখানে লাশ চাপা দেওয়া হয়েছে রাতের অন্ধকারে।
কবিতা তখন ঘুমিয়ে পড়ে যখন হত্যাকারীরা
মঞ্চে উঠে বক্তৃতা দেয়।

কবিতা জেগে থাকে জনতার ভিড়ে,
যারা মিছিলে পায়ে পায়ে ইতিহাস গড়ে।
কবিতা ক্ষুধা, প্রতিরোধ আর প্রতিবাদের ভাষা।

কবিতা হলো গান্ধীর খালি হাত,
যেখানে বন্দুক নেই, আছে কেবল সাহস।
কবিতা রক্ত নয়, কিন্তু রক্তকে থামানোর শক্তি।

কবিতা গান্ধীর সঙ্গী—
শান্তির মতো জেদি,
সত্যের মতো ভয়ঙ্কর।

 

 

দরজাওয়ালা মানুষ

একজন মানুষ শহরের রাস্তায় হাঁটছে,
কাঁধে নিয়ে একটি দরজা।
সে খুঁজছে সেই ঘর,
যার সঙ্গে এই দরজাটি মানাবে।

স্বপ্নে সে দেখেছে
তার স্ত্রী, সন্তান আর বন্ধুরা
সেই দরজা পেরিয়ে আসছে ভেতরে।

এখন সে দেখে—
এক পুরো পৃথিবী পেরিয়ে যাচ্ছে
তার কখনো তৈরি না-হওয়া বাড়ির দরজা দিয়ে:
মানুষ, গাড়ি, গাছ,
পশু, পাখি—সবকিছু।

আর সেই দরজা,
নিজের স্বপ্ন নিয়ে ভেসে ওঠে আকাশে,
হয়ে উঠতে চায় স্বর্গের সোনালি দরজা,
কল্পনা করে মেঘ, রামধনু,
অসুর, পরী আর সাধুরা
যেন তার ভেতর দিয়ে চলাফেরা করছে।

কিন্তু নরকের মালিকই
অপেক্ষা করছে এই দরজার।

এখন দরজার ইচ্ছে হয়-
সে যেন এক গাছ হয়ে যায়,
পাতাভরা, বাতাসে দুলতে থাকা,
যাতে অন্তত একটু ছায়া দিতে পারে
তার সেই গৃহহীন বাহককে।

একজন মানুষ হাঁটছে শহরের রাস্তায়
একটি দরজা নিয়ে;
তার সঙ্গে হাঁটছে একটি তারা।

 

 

যে মানুষ সবকিছু মনে রাখত

সে মানুষটি
মনে রাখত প্রতিটি ক্ষুদ্র শব্দ,
পাতা ঝরার শব্দ পর্যন্ত,
মনে রাখত প্রতিটি মুখ,
যাদের সঙ্গে সে অল্পক্ষণ দেখা করেছিল
কোনো ভিড়ভাট্টার রাস্তায়।

সে ভুলত না কোনো ঋতুর গন্ধ,
এমন কি বৃষ্টির ছায়া,
এমন কি বিদ্যুতের ক্ষণিক আভা।

সে মনে রাখত সেইসব পাথরও,
যাদের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক ছিল না,
মনে রাখত প্রতিটি গানের ভাঙা সুর,
ভুলতে পারত না ভোরের আলোয়
একটি পাখির উড়ান।

তার স্মৃতি এত ঘন, এত ভারী হয়ে উঠেছিল
যে তার জীবন একসময়
বহন করা অসম্ভব বোঝার মতো হয়ে গেল।

শেষ পর্যন্ত
সে প্রার্থনা করল—
ভুলে যাওয়ার আশীর্বাদ যেন তাকে দেওয়া হয়।

 

 

মৃত্যুদণ্ড

আমি জন্মেছিলাম মৃত্যুদণ্ড নিয়ে।
আমার জন্মই ছিল আমার অপরাধ।

আমি হাঁটতে শিখলাম,
রাস্তার ভিড়ে আমায় ঠেলে ফেলা হলো।
আমি কথা বলতে শিখলাম,
আমার ঠোঁটে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হলো।

আমি লিখতে শিখলাম,
আমার আঙুল কেটে নেওয়া হলো।
আমি স্বপ্ন দেখতে শিখলাম,
আমার চোখ ছিনিয়ে নেওয়া হলো।

আমি প্রেম করতে শিখলাম,
আমাকে একলা করে দেওয়া হলো।
আমি গান শিখলাম,
আমার গলা চেপে ধরা হলো।

আমি ভাবলাম, এ পৃথিবী আমারও—
তখনই ফাঁসির দড়ি নিয়ে এলো রাষ্ট্র।

আমার অপরাধ?
আমি বেঁচে ছিলাম।

 

পরিত্যাগ

যেমন এক অসহায় মা
আড়ালে অপেক্ষা করে থাকে —
কেউ এসে তার সন্তানটিকে তুলে নেবে,
চুমু খাবে, কোলে করে বাড়ি নিয়ে যাবে —
সেই শিশুটি যাকে সে বহন করেছিল
নিজের জরায়ুতে, রক্তমাখা ক্ষতচিহ্নসহ…

তেমনি আমি আমার কবিতাটিকে
উলঙ্গ করে রাখি রাস্তায়,
শুনি তার প্রথম কান্না,
অপেক্ষা করি যতক্ষণ না তা তোমার হয়ে ওঠে।
ভাবি, কোনো একদিন হয়তো
সে আমায় চিনে ফেলবে —
ভালোবাসবে, কিংবা দূর থেকে অভিশাপ দেবে।

 

 

 

আমার গোষ্ঠী

মেক্সিকোর অ্যাজটেকরা বিশ্বাস করে —
প্রজাপতিগুলো হল মৃত মানুষদের আত্মা :
যুবক, যারা যুদ্ধে নিহত হয়েছিল,
আর মায়েরা, যারা সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা গেছে।

আমার গোষ্ঠী বিশ্বাস করে —
দেশের সীমান্তগুলোর কাঁটা তারে লেগে আছে
সেই যোদ্ধাদের রক্ত
যারা সীমান্তযুদ্ধে প্রাণ দিয়েছে
আর তাদের মায়েদের অশ্রু l
আমরা বিশ্বাস করি, ঈশ্বরের কোনো জাত নেই,
ধর্ম নেই, লিঙ্গ নেই, বর্ণ নেই।

আমাদের দেশের সীমান্ত আকাশ —
সেখানে কোনো রাজা বা প্রজা নেই l
সবাই জানে সব ভাষা —
কাঠঠোকরা স্প্যানিশে কথা বলে,
যেমন কাকেরা বলে মালয়ালমে।

এখানে যে কেউ যে কাউকে ভালোবাসতে পারে
ঘাস পোকাকে ভালোবাসে,
চড়ুই চাঁদের আলোকে,
ফেরেশতা মানুষকে,
আর মানুষ স্বপ্ন ও স্মৃতিকে।

আমাদের সব দরজা খোলা —
বেড়াল, মানুষ আর ধূমকেতুর জন্য।
এখানে অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ—
কোনো দেয়াল দিয়ে আলাদা নয়।
ব্যাকরণও এখানে প্রহরী হয়ে দাঁড়ায় না।

যখন আমাদের মধ্যে কেউ মারা যায়,
আমরা কেবল পাতা ঝরাতে থাকি —
যতক্ষণ না আরেকজন জন্ম নেয় গোষ্ঠীতে।
তখনই আসে বসন্ত,
আগে থেকে কোনো ইঙ্গিত না দিয়েই l

আমরাই পৃথিবীর প্রাচীনতম গোষ্ঠী —
আর ক্ষুদ্রতমও।
আমাদের চিহ্ন এক অক্ষর,
যা খোদাই করা পাখির ডানায়।
আমরা বিশ্বাস করি —
যতদিন পৃথিবীতে থাকবে পাখি আর অক্ষর,
আমরাও থাকব।

যেখানেই পাঁচজন মানুষ একসঙ্গে হাসবে,
আমরা থাকব তাদের ভেতর একজন হয়ে।
আর যেখানে একজন একা কাঁদবে —
আমরা থাকব, তার নিঃশব্দ সঙ্গী হয়ে।

 

ভাস্কর্য

 

ভাস্করের ছেনি
হাওয়ার ভেতর খোদাই করে এক মূর্তি—
যে হাওয়া বুনো ফুলের গন্ধ বয়ে আনে।

নৌকো চালকের দাঁড়, রাতের মতো কালো,
নদীর ঢেউয়ে গড়ে তোলে এক ভাস্কর্য।

পাইলটের অভ্যস্ত হাত
মেঘে মোড়া আকাশে খোদাই করে আরেক ভাস্কর্য।

আমি লিখে চলেছি এক অন্তহীন ভাস্কর্য
কলমের ধারালো নিবে,
কাগজের মসৃণতা থেকে
বারবার ফসকে যায় তা।
আঙুল কেঁপে ওঠে—

যেন আমি খোদাই করছি
চলমান সময়ের বুকে
যা কখনও থেমে থাকে না।

 

 

গ্যালিলিও

তার ঘর ছিল এক উপত্যকায়,
বেগুনিফুলে ভরা।
ঘণ্টার আওয়াজে মেঘেরা লজ্জায় লাল হতো।
বৃষ্টির ঘুম পাড়ানি গানে
সে দ্রুত বড় হয়ে উঠেছিল,
যেন কোনো বুনো গাছের মতো।

মায়ের দুধের গন্ধ
এখনও শরীর ছাড়েনি,
তবুও তার সামনে রাখা হলো
একটি দড়ি, একটি ছুরি, একটি হুক।
মুখ বন্ধ করে দেওয়া হলো,
যেন তার কান্না ঈশ্বরকে না বিরক্ত করে।

তার চোখের নীল আকাশ
আমি সহ্য করতে পারিনি,
না পারিনি সেই নাচ দেখা
যা তার খুরে আটকে গিয়েছিল।
যখন তারা দড়ি টানল,
সে শুনল এক বাঁশির সুর।
সে ঘাড় বাড়িয়ে দিল,
যেন মায়ের স্তনের দিকে।

তারপর তারা তাকে রাখল
একখণ্ড পাথরের উপর।
আমরা চোখ বন্ধ করলাম—
স্বর্গের অন্ধত্ব আমাদের ঢেকে নিল।

তার রক্তাক্ত মাথার ভেতর আমি দেখলাম—
সূর্যালোকিত সবুজ ঘাসের ঢালু মাঠে
সাদা ভেড়ার দল, যেন তারার ছড়িয়ে থাকা ঝাঁক।
সেই দলের মাঝখানে
এক কৃশ,অর্ধনগ্ন তরুণ,
লম্বা চুলে ঢাকা,তার শরীরে পাঁচটি ক্ষতচিহ্ন।

 

 

ভাষা শেখা

আমি শিখতে চাই ভাষা—
সাঁওতালি, বালুচি, কাতালান, স্লোভেনীয়।
এই সব ভাষাতেই
আমরা বলতে পারি ‘ভালোবাসি’;
এই ভাষাতেই
বলতে পারি ‘মেরে ফেলি’।

এখন অনেক দেরি—
সময় নেই এমনকি
একটা ঘড়ির নকশা বানানোরও।
তবু হয়তো বানাতে পারি
একটা কবিতার টুকরো।

ভালোবাসার বয়স পেরিয়ে
ভাষাগুলো হাঁটে,
একটা হেঁটে চলা কাঠের ছড়ির ভরসায়।

আমিও একদিন যাব—
সেই দেশে,
যেখানে সময় থাকবে ভরপুর
সব ভাষা শেখার।
তারপর—
ভালোবাসা দিয়েই
তোমায় মেরে ফেলব।

 

 

ঠাকুমা

আমার ঠাকুমা ছিলেন পাগল।
তাঁর উন্মাদনা মৃত্যুর দিকে পাক খেতে খেতে
যখন ঘুরে বেড়াত,
আমার কৃপণ কাকা
তাঁকে রাখলেন গুদামঘরে—
খড়ের ভেতর মোড়া অবস্থায

ঠাকুমা শুকিয়ে গেলেন, ফেটে গেলেন,
তাঁর ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা বীজ
উড়ে গেল জানলা দিয়ে।

রোদ এল, বৃষ্টি এল—
একটি চারা গজাল,
যার কামনা থেকে জন্ম নিলাম আমি।

তাহলে কি আমি না লিখে থাকতে পারি
সোনার দাঁতওয়ালা বানরের কথা?

 

 

 

 

ক্যাকটাস

কাঁটাই আমার ভাষা।
রক্তাক্ত ছোঁয়ায় আমি জানাই— আমি বেঁচে আছি।
এই কাঁটাগুলোও একসময় ছিল ফুল।

আমি ঘৃণা করি সেই প্রেমিকদের— যারা বিশ্বাস ভাঙে।
কবিদের দেখেছি মরুভূমি ছেড়ে
ফিরে গেছে বাগানের দিকে।
এখানে শুধু উট রয়ে গেছে, আর বণিকেরা—
যারা পায়ে পিষে দিতে চায় আমার ফোটা রূপ।

প্রতিটি অমূল্য জলকণার জন্য আমি তুলে দিই একেকটা কাঁটা।
প্রজাপতিকে আমি ডাকিনি,
কোনো পাখি গায়নি আমার প্রশংসা।

আমি খরা মানি না,
অন্ধকার ভেদ করে আমি গড়ে তুলি এক অন্য রূপ

যা চাঁদের আলোতেও ধরা পড়ে না,
স্বপ্নেরও এপারে জন্ম নেয়—
তীক্ষ্ণ, বিদ্ধ করা, সমান্তরাল এক ভাষা।

 

 

 

 

 

 

পুনরাবৃত্তি

আমরা সমুদ্রতটে ভালোবাসি,
আর ভালোবাসি লিখে রেখে যেতে
বালির ওপর আঁকা কিছু চিহ্নে—
‘আমরা এখানে ভালোবেসেছিলাম।’

হাওয়া, ঢেউ আর উদাসীন পায়ের ছাপ
ঈর্ষায় যেন মিলেমিশে
ছিঁড়ে ফেলে দেয় সেই উৎসবের পতাকা।

ভালোবাসার ক্ষণস্থায়িত্ব
আমাদের চুলের গোড়ায় লবণ জমিয়ে দেয়,
সব চুল খাড়া হয়ে ওঠে।

আগামীকাল আবার অন্য এক জোড়া
এখানে এসে পৌঁছাবে—
একজন পুরুষ আর একজন নারী,
হয়তো পুরুষ আর পুরুষ,
অথবা নারী আর নারী।
তারাও লিখে যাবে
সেই একই বাক্য
চলমান বালির ওপর,
একই নোনতা হাওয়া
তাদেরও শোনাবে ঘুমপাড়ানি গান।

ভালোবাসা চিরন্তন নয়,
সে কেবল অবিরাম নিজেকে পুনরাবৃত্তি করে,
নোনতা স্বাদে—সমুদ্রের মতো।

 

 

 

কবিতা ফিরে আসবে

আমাদের দরকার ভাত, নুন,
লঙ্কা আর জ্বালানি কাঠ;
কবিতা ছাড়া বাঁচা যায়।
তবু, কবিতা ফিরে আসবে—

ভাতের মতো,
পৃথিবীর বীজ হয়ে,
খোসা আর ভূষি ছাড়িয়ে সেদ্ধ হয়ে,
উপচে পড়বে প্রতিটি মাপজোক,
প্রতিটি গুদামঘর, প্রতিটি দেবালয় থেকে।

নুনের মতো,
সমুদ্রের স্মৃতি হয়ে,
মুখে জল আনবে,
ব্যথায় জ্বালিয়ে দেবে,
তবু ক্ষত সারাবে,
আমাদের শিকড়ে পুষ্টি দেবে।

লঙ্কার মতো,
মাটির কামনা হয়ে,
গরম করে দেবে ঠোঁট, জিহ্বা,
স্তন, কোমর, শিরা আর স্নায়ু—

আর জ্বালানি কাঠের মতো,
অরণ্যের অস্থি হয়ে,
যার মজ্জা টগবগ করে গলে যায়,
ধীরে ধীরে দাউ দাউ করে জ্বলে,
কাঁপতে-থাকা শিখায়, এক নিঃশ্বাসে
উচ্চারণ করে—

ভাত,নুন, লঙ্কা, কাঠ, কবিতা।

 

ক্যাকটাস

কাঁটাই আমার ভাষা।
রক্তাক্ত ছোঁয়ায় আমি জানাই— আমি বেঁচে আছি।
এই কাঁটাগুলোও একসময় ছিল ফুল।

আমি ঘৃণা করি সেই প্রেমিকদের— যারা বিশ্বাস ভাঙে।
কবিদের দেখেছি মরুভূমি ছেড়ে
ফিরে গেছে বাগানের দিকে।
এখানে শুধু উট রয়ে গেছে, আর বণিকেরা—
যারা পায়ে পিষে দিতে চায় আমার ফোটা রূপ।

প্রতিটি অমূল্য জলকণার জন্য আমি তুলে দিই একেকটা কাঁটা।
প্রজাপতিকে আমি ডাকিনি,
কোনো পাখি গায়নি আমার প্রশংসা।

আমি খরা মানি না,
অন্ধকার ভেদ করে আমি গড়ে তুলি এক অন্য রূপ

যা চাঁদের আলোতেও ধরা পড়ে না,
স্বপ্নেরও এপারে জন্ম নেয়—
তীক্ষ্ণ, বিদ্ধ করা, সমান্তরাল এক ভাষা।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

অনুবাদক

শাশ্বত গঙ্গোপাধ্যায়, কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক

 

saswata.ganguly10@gmail.com

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

CATEGORIES
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)
demon slauer rule 34 lena the plug leak amateurtrheesome.com cumming in milfs mouth mujer haciendo el amor a un hombre, belle delphine of leaked emma watson in porn xxxamat.com big booty in public hidden cam gay sex, sit on face porn g a y f o r i t forcedpornanal.com please screw my wife female celebrity sex tapes
404

404

Page not found.

Home