
শ্রাবণী গুপ্ত-র কবিতা
তাবাকোশি
১.
সাঁকো ছিল, ভেঙে গেছে
এখন নদীর ‘পরে ভাঙা সেতু দুলে দুলে ওঠে
ওপারে নিজস্ব গ্রামে আগুন জ্বলেছে, শীতঘুম
ছুটে গেছে, আমিও কি বিষাদ ঋতুর কাছে
চলে যাব, নদীকে নিহত রেখে
এভাবে, অভাবে!
২.
বৃষ্টি নেমেছে
অথচ অভাব বলতে—এখানে আগুন
নেই, নেই কোনো মুহূর্ত বেদনা।
৩.
দূরের কটেজে দেখি আলো জ্বলে
কারা এলো—
কারা এসে ছেড়ে দিল মৃদু কোলাহল
এই ঘুমন্ত পাহাড়ে!


পশ্চিমবঙ্গের উত্তরবঙ্গের এক নিভৃত পাহাড়ি জনপদ তাবাকোশি। এই নামটিকে শিরোনাম করে কবি এখানে প্রকৃতি, বিচ্ছিন্নতা এবং অন্তরের বিষাদকে এক সুতোয় গেঁথেছেন।
কবিতাটির মূল সুর হলো বিচ্ছিন্নতা (Alienation) এবং একটি গূঢ় অস্থিরতা। তবাকোশি বা পাহাড়ি নির্জনতা সাধারণত শান্তির প্রতীক হলেও, এখানে কবি তাকে দেখছেন এক ভিন্ন চোখে:
বিচ্ছেদ ও ধ্বংস: প্রথম স্তবকেই ‘ভাঙা সেতু’ এবং ‘সাঁকো ভেঙে যাওয়া’র চিত্রকল্পটি অত্যন্ত শক্তিশালী। এটি কেবল ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা নয়, বরং মানুষের সাথে তার শিকড় বা ‘নিজস্ব গ্রাম’-এর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার শোকাবহ প্রতিচ্ছবি।
বিপরীত বৈপরীত্য: ওপারে আগুন জ্বলছে (বিপদ বা ধ্বংসের প্রতীক), অথচ এপারে কবি এক স্তব্ধ নদীর সামনে দাঁড়িয়ে। নদীকে ‘নিহত’ বলা এবং ‘বিষাদ ঋতু’র কাছে আত্মসমর্পণ করার মধ্য দিয়ে এক চরম একাকীত্ব ও নিঃস্বতার বোধ ফুটে উঠেছে।
অভাবের নতুন সংজ্ঞা: সাধারণত ‘অভাব’ বলতে আমরা বস্তুগত কিছু বুঝি। কিন্তু কবি এখানে অভাবকে দেখছেন আবেগের অনুপস্থিতি হিসেবে। যেখানে ‘আগুন নেই’ বা ‘মুহূর্ত বেদনা’ নেই—সেই শূন্যতাকেই তিনি বড় অভাব মনে করছেন।
কবি অত্যন্ত মিতব্যয়ী শব্দচয়নে এক গভীর চিত্রকল্প (Imagery) তৈরি করেছেন।
গতিশীল বনাম স্থবির: ‘ভাঙা সেতু দুলে দুলে ওঠে’—এই দৃশ্যকল্পের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা আছে, যা কবির মনের দ্বিধাকে ফুটিয়ে তোলে।
আগুন ও শীতঘুম: ‘আগুন’ ও ‘শীতঘুম’ পরস্পরবিরোধী শব্দ। আগুনের উত্তাপ শীতঘুম ভাঙিয়ে দেয়, যা জীবনের রূঢ় বাস্তবতাকে ইঙ্গিত করে।
’নদীকে নিহত রেখে’: নদী সাধারণত বহমানতা বা জীবনের প্রতীক। তাকে ‘নিহত’ বলার মাধ্যমে কবি এক থমকে যাওয়া সময় বা মৃতপ্রায় সম্পর্কের ইঙ্গিত দিয়েছেন।
’মৃদু কোলাহল’: শেষ স্তবকে ‘মৃদু কোলাহল’ শব্দবন্ধটি পাহাড়ি নির্জনতার বিপরীতে মানুষের আগমনের এক অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি করে। পর্যটকদের আনন্দ আর কবির অন্তরের বিষাদের মধ্যে এক অদৃশ্য দেওয়াল তৈরি হয়।
কবিতাটি তিনটি ছোট ছোট খণ্ডে বিভক্ত, যা অনেকটা সিনেমার মন্তাজের (Montage) মতো কাজ করে:
প্রথম খণ্ড: শোক ও ব্যক্তিগত সংকট।
দ্বিতীয় খণ্ড: অনুভূতির শূন্যতা।
তৃতীয় খণ্ড: বহির্বিশ্বের সাথে সংযোগ ও নির্লিপ্ত পর্যবেক্ষণ।
’তাবাকোশি’ কবিতাটি কেবল একটি স্থানের বর্ণনা নয়, বরং এটি মানুষের অস্তিত্বের এক সংকটকাল। কবি এখানে প্রকৃতির সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বিপন্নতা ও অপ্রাপ্তিকে তুলে ধরেছেন। “এভাবে, অভাবে!”—এই হাহাকারটিই কবিতার প্রাণভোমরা, যা পাঠককে এক গভীর শূন্যতাবোধের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।