
আদিত্য ঘোষ- এর কবিতা
সফরনামা
ছুটে চলা মেঘদল, জড়িয়ে আসা ঘুম
সফর শেষে তোমার জন্য রইল দুকলম।
যা কিছু আছে আমাদের, থাকুক নিভৃতে
বাসব আমরা ভাল,ভাসব উল্টো স্রোতে
তোমার জন্য ভোরের উজান, তোমার জন্য আলো
তোমার জন্য সফরসূচী, যা কিছু আছে ভালো।
ঠোঁটে ঠোঁটে আবদার সারি, আবার ফিরে আসি
জড়িয়ে থাকব ঝড়ের মতো, ঝড়কে ভালবাসি।
তুমি আমার সফরনামা, ঝরা সময়ের গান
তুমি আমার সবটুকু, স্নিগ্ধ কলতান।
আলো হয়ে
হঠাৎ করে মনে হলো, যে বারান্দায় তোমাকে-
দেখার জন্য ছুটে যায় বারবার। কয়েকটা দিন পরে-
ওখানে ধুলো জমবে। তবুও যাব দেখতে-
তোমাকে ছাড়া বারান্দাটা কেমন থাকে।
কেমন থাকবে আমাদের চেনা রাস্তার কুকুরগুলো।
কেমন থাকবে হঠাৎ করে ধেয়ে আসা ধুলো ঝড়?
চায়ের কাপ ভাগ করে নেওয়ার কেউ থাকবে না,
থাকবে না ছুঁয়ে দেখার, পাশাপাশি বসবে না প্রিয় গন্ধ
যে রাস্তার মোড়ে বারবার জড়িয়ে ধরেছি মোহে
সেই রাস্তাটা বড্ড একা হয়ে যাবে। তবুও তুমি থাকবে,
আমাদের প্রার্থনা নতজানু হয়ে বসবে বহুদূরে
আমরা দুজন দুজনকে ঘিরে থাকবো
কোনও গোয়েন্দা গল্পের রহস্যের মতো আমাদের অজানা-
প্রার্থনার জোরে আমরা সবীজ থাকবো চিরকাল।
বুকের ভিতরটা হু হু করে উঠল, তোমাকে ছাড়া-
তোমার বারান্দায়, আমাদের চেনা পথে।
আমাদের প্রথম দেখা হওয়া ক্যাফেটেরিয়ার টেবিলে-
হঠাৎ করে মনে হলো, তুমি তো কোথাও যাচ্ছ না!
এই চেনা শহরেই থাকবে আলো হয়ে, আরও আলো…
রঙবাহারির দেশে
রঙবাহারির দেশে ওইসব অভিমান মানায়
রোদ চশমায় সহজেই লুকোনো যায় চোখ।
মনখারাপে দিব্যি কাটিয়ে দেওয়া যায় জলের ধারে
আলতো রোদে পিঠ বেঁকিয়ে ছবি ওঠে নিদারুন
ওইসব জংলা দেশে সবই মানায়।
ছাপোষা আমি এখন বহুদূরে,
মেঘ আর রোদের কোলাহলের কোলাকুলিতে
ঘামে ভিজে যাওয়া পুরোনো জামায় আঁশটে গন্ধ
শ্যাওলা ধরা ছাদে ঝেঁপে আসে ধুলোঝড়
কার্নিশ বেয়ে নেমে আসে প্রথম দেখা হওয়ার দিন
এইসব আলোর দেশে মনখারাপের বিলাসিতা-
আমাকে মানায় না। তবুও অপেক্ষায় থাকে বৃষ্টি,
যদি আবার একই আকাশের নীচে কোনওদিন-
একই আলোর কোলে মাথা রাখতে পারি দুজনে,
যদি কোনওদিন আবার ঝেঁপে আসে প্রেম-
তোমাকে হারাতে দেব না, কথা দিলাম।
দেবাঞ্জলি
এই পথের শরিক হবো, আলছায়াময় দিন
হেঁটে যাবো তোমার পাশে নির্জন শব্দহীন!
রোদে ভেজা এই ক্যাফে গান গাইবে আলোর
নতজানু হয়ে বসব, যা কিছু আছে ভালোর-
তোমার জন্য প্রার্থনা, শুনবে আবার কৃষ্ণচূড়া
ছড়িয়ে দেবে আঁচল পেতে মন্ত্রমুগ্ধ স্নিগ্ধতা
তোমার শুধু গন্ধ নেবো, মিথ্যে হলেও ভালবাসো
হঠাৎ করে ঝড়ের মতো সন্ধ্যে হলেই চলে এসো
দেখা হবে না, বাজবে না আর প্রিয় গান
বারান্দায় আসবে না কেউ, করবে না আর রৌদ্রস্নান।
রোদে ভেজা শহরে প্রতিদিন ভালথাকার গল্প বলি
আদুরে আবদারে নীরবে ভিজে থাকবে দেবাঞ্জলি!
ভ্রম
এইখানে এলে বুঝি শেষ হয়,
রাত নামে ঝুপ করে।
দোকানপাট, বাজারহাট চুপ করে যায়।
বৃষ্টি পড়ে এখানে রাতদিন, দিনরাত বিষণ্ন হয়ে আসে
বিরামহীন শোক ধেয়ে আসে দক্ষিণ দিক থেকে
উত্তরের আশায় চাতকের মতো থেকে যায় দিন
আমি তবুও শীতলপাটি বিছিয়ে বসি, এক কাপ চা-
তোমাকে কথা দেওয়া শেষ সিগারেটের দিব্যিটুকু,
আমাদের ভীষণ ভাল রঙিন কোনও দিন ছিল
আমাদের একটা সবুজ মাঠ ছিল
বিচ্ছিন্ন একটা অফিস আর নোংরা একটা মালিক ছিল।
বিচার চেয়ে পথ ভিজেছে, ভিজেছে আস্ত একটা শহর
এই শহরে একটা গল্প লিখব বলে, ভেবেছিলাম দুজনে
একসঙ্গে পাহাড় দেখব বলে, একটা ভাঁড় ভেঙেছিলাম
তারপর ঝুপ করে সন্ধে নামল পশ্চিমপাড়ে।
শেষ হয়ে গেল একটি রাত। বৃষ্টি। আর তুমি।
ভাল হবে
যারা ভাল আছে মখমলে কোনও আদরে
তারা ভাল থাকুক আজান শোনা ভোরে।
খোলা ছাদের উদাসীনতায় খুঁজে নিস আরও একটু সুখ
প্রিয় ফুল গুঁজে নিস খোঁপায়,
প্রিয় শাড়ি পড়িস তোরই কোনও প্রিয় দিনে
মুখোমুখি বসে এই শহরেই বুনিস রূপকথা
মনে থাকবে তো সব?
আমাদের গল্প বলিস প্রাণভরে,
পাশাপাশি হেঁটে যাস রোদের মতো চিরকাল
চিরকাল ছায়া হয়ে চলিস।
মনে থাকবে তো?
এই জন্মের না পাওয়াটা এই জন্মেই ছেড়ে গেলাম
পরের জন্মের জন্য আর অপেক্ষা করব না।
মনে থাকবে তো সব, ভাল হবে তো সব?

